ভবিষ্যতের কর্মবাজারে এআইভিত্তিক ‘অ্যাপ্লাইড আইসিটি’ হবে গেম চেঞ্জার: উপাচার্য আমানুল্লাহ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ১৯ জুলাই ২০২৬, ১৬:৫৮
অ- অ+

ভবিষ্যৎ কর্মবাজারে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স-এআইভিত্তিক ‘অ্যাপ্লাইড আইসিটি’ হবে গেম চেঞ্জার জানিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. এএসএম আমানুল্লাহ বলেছেন, উচ্চশিক্ষার মূল লক্ষ্য এমন দক্ষ, সৃজনশীল ও দায়িত্বশীল মানবসম্পদ তৈরি করা, যারা পরিবর্তনশীল বিশ্বে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে। প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান বাস্তবতায় প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য ডিজিটাল সক্ষমতা, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা এবং বাস্তব সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা অপরিহার্য। এ লক্ষ্যেই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক (সম্মান) দ্বিতীয় বর্ষের সকল বিষয়ে ‘অ্যাপ্লাইড আইসিটি’ কোর্সকে আবশ্যিক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে।

রবিবার সাভারের ব্র্যাক সিডিএম-এ ইউনিসেফ বাংলাদেশের কারিগরি সহযোগিতায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত চারদিনব্যাপী ‘রিসোর্স ম্যাটেরিয়ালস ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ভাইস-চ্যান্সেলর বলেন, স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ে আমরা একটি উন্নত ও সময়োপযোগী শিক্ষাক্রম তৈরি করতে পারি নাই। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও সনদের মান নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও এখানকার অসংখ্য গ্র্যাজুয়েট নিজ যোগ্যতায় দেশ-বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তবে দক্ষতাভিত্তিক পাঠ্যক্রমের ঘাটতির কারণে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী কর্মবাজারের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তিনি বলেন, এ বাস্তবতার জন্য শিক্ষার্থী বা শিক্ষক নয়, বরং এর জন্য নীতিনির্ধারকরাই দায়ী।

ভাইস-চ্যান্সেলর বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে যে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে, তার মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করা। আইসিটি শিক্ষাকে বাস্তবভিত্তিক ও প্রয়োগমুখী করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সাইবার সিকিউরিটি, ডিজিটাল মার্কেটিং, গিগ ইকোনমি, ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে দক্ষতা দিতে পারলে উচ্চশিক্ষা ও বৈশ্বিক কর্মক্ষেত্রের জন্য তারা তৈরি হতে পারবে। কর্মক্ষেত্রে ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হবে।

ড. আমানুল্লাহ বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান আইসিটি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিকে আরও কার্যকর ও ফলপ্রসূ করতে কাজ চলছে। ইতোমধ্যে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে যে প্রশিক্ষণ মডিউল ও রিসোর্স ম্যাটেরিয়াল তৈরি করা হয়েছে, সেগুলো আরও সমৃদ্ধ করে প্রতিটি কলেজে পৌঁছে দেওয়া হবে। এগুলো শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য একটি মানসম্মত রেফারেন্স ও গাইডলাইন হিসেবে কাজ করবে।

ভাইস-চ্যান্সেলর ড. আমানুল্লাহ সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, রাজশাহী, বগুড়া, নওগাঁসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে দেখেছি, অপ্রতুল সম্পদ ও শিক্ষক সংকটের মধ্যেও তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কোথাও একজন শিক্ষককে গড়ে ১৬-১৭টি ক্লাস নিতে হচ্ছে। আইসিটি ল্যাব না থাকলেও শিক্ষকেরা প্রজেক্টরের মাধ্যমে ক্লাস নিচ্ছেন। এই সংকটগুলো আমরা সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানিয়েছি এবং তারা দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ২০২৬-২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আইসিটি দক্ষতা বাড়াতে বড় ধরনের বিনিয়োগ ও বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের আইসিটি সিলেবাসের কনটেন্টগুলো অত্যন্ত প্রায়োগিক (অ্যাপ্লাইড)। এগুলো ঠিকমতো আয়ত্ত করতে পারলে শিক্ষার্থীরা সাইবার সিকিউরিটি ও ডিজিটাল মার্কেটিং এ নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে পারবে, যা তাদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চাকরির বাজারে এগিয়ে রাখবে এবং উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করবে। এই বিষয়টি মাথায় রেখে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিটি কলেজের জন্য একটি মানসম্মত ও সুনির্দিষ্ট ‘রিসোর্স মেটেরিয়াল‘ ও গাইডলাইন তৈরি করছে।

শিক্ষার্থীদের আগ্রহের কথা উল্লেখ করে ভাইস-চ্যান্সেলর বলেন, আমাদের ছেলে-মেয়েরা মোটেও ডিজিটালি ব্লাইন্ড (ডিজিটাল জ্ঞানে অন্ধ) নয়। প্রায় সবার কাছে স্মার্টফোন আছে এবং তারা বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে যুক্ত। শিক্ষার্থীরা এখন শুধু চাকরি খুঁজছে না বরং ডিজিটাল ইকোনমি ও অনলাইন ব্যবসার প্রতি তাদের তুমুল আগ্রহ। একেক অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ভাবনা একেক রকম। তাদের এখন শুধু প্রয়োজন একটি সঠিক ও পদ্ধতিগত গাইডলাইন (Systematic Knowledge)।

ডিজিটাল লিটারেসি ও সামাজিক মূল্যবোধ প্রসঙ্গে ড. আমানুল্লাহ তাঁর ১০ বছর আগের একটি গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে বলেন, "সে সময় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল লিটারেসি ছিল মাত্র ১৯ শতাংশ। বর্তমানে পরিস্থিতির উন্নতি হলেও ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহারের সচেতনতায় আমাদের এখনো অনেক ঘাটতি রয়ে গেছে। সামান্য বিষয় নিয়ে দেশের জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের ট্রল করার যে অনাকাঙ্ক্ষিত সংস্কৃতি আমরা দেখছি, তা থেকে তরুণ প্রজন্মকে বের করে আনতে হবে। ডিজিটাল মাধ্যমে আমাদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়ে ব্যাপক সচেতনতা ও বিস্তর কাজ করা প্রয়োজন। কিশোর ও যুবকদের সামাজিকীকরণ ও ভুল ট্র্যাকে চলে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি তাদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জটি সাহসের সাথে মোকাবিলার আহ্বান জানান।

ড. আমানুল্লাহ বলেন, এই কোর্সের সফলতা নির্ভর করবে এর মানসম্মত বাস্তবায়নের ওপর। এজন্য প্রয়োজন সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ মডিউল, শিক্ষার্থীবান্ধব লার্নার ম্যাটেরিয়ালস, দক্ষ প্রশিক্ষক এবং আধুনিক শিক্ষণ-পদ্ধতি। আজকের এই কর্মশালা শুধু একটি প্রশিক্ষণ আয়োজন নয়; এটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনমুখী করে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এখান থেকে প্রণীত শিক্ষা-উপকরণ দেশের লাখো শিক্ষার্থীর শেখার অভিজ্ঞতাকে আরও কার্যকর, বাস্তবমুখী ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করতে সহায়ক হবে।

ভাইস-চ্যান্সেলর বলেন, বর্তমান সময়ে কর্মক্ষেত্রে সফল হওয়ার জন্য শুধু একাডেমিক জ্ঞান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ডিজিটাল লিটারেসি, তথ্য বিশ্লেষণের সক্ষমতা, কার্যকর যোগাযোগ, দলগত কাজ এবং প্রযুক্তির সৃজনশীল ব্যবহার। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এসব সক্ষমতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে গড়ে তুলতে পাঠ্যক্রম ও শিক্ষণ-পদ্ধতিতে ধারাবাহিক সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। এ ক্ষেত্রে ইউনিসেফ বাংলাদেশের কারিগরি সহযোগিতা একটি কার্যকর অংশীদারিত্বের দৃষ্টান্ত।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রশিক্ষণ দপ্তরের পরিচালক সালমা পারভীনের সঞ্চালনায় কর্মশালায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং ইউনিসেফ বাংলাদেশের চিফ অব এডুকেশন দীপা শংকর। স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম উন্নয়ন ও মূল্যায়ন কেন্দ্রের ডিন অধ্যাপক ড. এ.এইচ.এম. রুহুল কুদ্দুস। এ কর্মশালায় বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ, কারিকুলাম বিশেষজ্ঞ, পেডাগজি ও প্রশিক্ষণ বিশেষজ্ঞ, অনলাইন কোর্স ডিজাইন বিশেষজ্ঞ, ফ্যাসিলিটেটর এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেছেন।

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
শিরোপার মহারণে মুখোমুখি আর্জেন্টিনা-স্পেন
বিশ্বকাপ জিতলেই দাড়ি রাখবেন ইয়ামাল
আর্জেন্টিনা-স্পেনের ফাইনাল ম্যাচ মোবাইলে দেখবেন যেভাবে
তেল সংকটের গুজব: মিরপুরে শত শত যানবাহনের ভিড়
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা