পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন শুভেন্দু অধিকারী, রাজনীতিতে যেভাবে উঠে এলেন

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতা শুভেন্দু অধিকারী। এর মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করল বিজেপি। শপথ নিয়েছেন নতুন সরকারের মন্ত্রীরা। এর মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ৫৯ বছর পর ফিরে এলো ১৯৬৭ সালের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। মেদিনীপুরের ভূমিপুত্র অজয় কুমার মুখোপাধ্যায়ের পর দ্বিতীয় কোনো নেতা হিসেবে ক্ষমতাসীন মুখ্যমন্ত্রীকে পরাজিত করে রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করলেন শুভেন্দু অধিকারী। আজ শনিবার (৯ মে) ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে বাংলার নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন তিনি। বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি এক বিরল ঘটনা।
ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-সহ বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবং বিজেপিশাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের উপস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর পদে শপথ নিলেন শুভেন্দু অধিকারী। শুভেন্দুর মন্ত্রিসভায় পাঁচ জনের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। তাঁরা হলেন, দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল, অশোক কীর্তনিয়া, নিশীথ প্রামাণিক এবং ক্ষুদিরাম টুডু। শুভেন্দুর পর শপথ নেন দিলীপ ঘোষ। তার পর অগ্নিমিত্রা, অশোক কীর্তনিয়া, নিশীথ প্রামাণিক এবং ক্ষুদিরাম টুডু।
শুভেন্দু অধিকারী বিজেপির প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হলেন, কিন্তু ঘটনাচক্রে কলকাতার ভবানীপুর আসন থেকে জয়ী দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী তিনি।
সদ্য প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী ওই আসন থেকে তিনবার ভোটে লড়ে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন।
মমতা ব্যানার্জীর একসময়ের সতীর্থ বা রাজনৈতিক সহকর্মী থেকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। তার কাছেই পর পর দুটো বিধানসভা নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন মিজ. ব্যানার্জী - প্রথমবার ২০২১ সালে নন্দীগ্রামে, আবার এ বছর তার ঘরের মাঠ বলে পরিচিত ভবানীপুর আসনে।
তাই শুভেন্দু অধিকারীকে 'জায়ান্ট কিলার'ও বলা হচ্ছে ভারতের অনেক গণমাধ্যমে, যিনি মুখ্যমন্ত্রীকে দুবার পরাজিত করেছেন।
সোমবারের ভোট গণনায় বিজেপি রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ২০৭টিতে জয়লাভ করে, যার ফলে ব্যানার্জীর সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে এবং এই হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলটি রাজ্যে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসে।
এর আগে ১৯৬৭ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল চন্দ্র সেনকে তার নিজের কেন্দ্র আরামবাগে পরাজিত করেছিলেন অজয় মুখোপাধ্যায়। ঠিক একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল ২০২৬-এ। শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভবানীপুরে ১৫,৫০৫ ভোটে পরাজিত করেছেন। শুধু তাই নয়, অজয় মুখোপাধ্যায়ের মতো তিনিও মেদিনীপুরের নিজস্ব গড় এবং মুখ্যমন্ত্রীর কেন্দ্র—এই দুই আসনেই জয়লাভ করে বিধানসভায় প্রবেশ করেছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দুই নেতার উত্থান ও কৌশলের মধ্যে রয়েছে অদ্ভুত মিল। অজয় মুখোপাধ্যায় কংগ্রেস ত্যাগের আগে সেচমন্ত্রী ছিলেন। শুভেন্দু অধিকারীও তৃণমূল ত্যাগের আগে সেচ দপ্তরের দায়িত্বেই ছিলেন। ১৯৬৭ সালে খাদ্যসংকট ও ‘কাঁচকলা মন্ত্রিসভা’র বিরুদ্ধে জনরোষকে কাজে লাগিয়েছিলেন অজয় বাবু।
অন্যদিকে, ২০২৬-এ দুর্নীতির অভিযোগ ও পরিবর্তনের আবেগকে হাতিয়ার করেছেন শুভেন্দু। শুক্রবার (৮ মে) বিজেপির পরিষদীয় দলের বৈঠকে শুভেন্দুকে সর্বসম্মতিতে নেতা নির্বাচিত করা হয়। ইতিহাস বলছে, অজয় মুখোপাধ্যায়ের জোট সরকার (যুক্তফ্রন্ট) অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। তবে শুভেন্দু অধিকারীর সামনে সেই সংকট নেই। ২০৭টি আসন নিয়ে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে একক শক্তিতে সরকার গড়তে চলেছে বিজেপি।
নিজের নতুন দায়িত্ব নিয়ে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘আমি নয়, আমরা’—এই মন্ত্রেই কাজ হবে। কথা কম, কাজ বেশি করবে নতুন সরকার। ভয়ের পরিবেশ কাটিয়ে রাজ্যে ‘ভরসার পরিবেশ’ গড়ে তোলাই তার প্রধান লক্ষ্য বলে তিনি জানান।
উল্লেখ্য, শুভেন্দু অধিকারী (জন্ম: ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭০) একজন ভারতীয় রাজনীতিবিদ, যিনি ভারতীয় জনতা পার্টির সদস্য। তিনি ২০২১ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও, তিনি ২০২১ সাল থেকে নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক এবং ২০০৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত কাঁথি দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক ছিলেন।
তিনি এর আগে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পরিবহণ মন্ত্রী হিসেবে ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত এবং ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সেচ ও জলসম্পদ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তমলুক লোকসভা কেন্দ্রের সংসদ সদস্য ছিলেন এবং ২০২০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ভারতীয় পাট নিগমের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি ১৯৯৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্য এবং ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সদস্য ছিলেন। তিনি শিশির অধিকারীর পুত্র, যিনি একজন সংসদ সদস্য এবং মনমোহন সিং সরকারের পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের প্রাক্তন কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন।
শুভেন্দু অধিকারী ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭০ সালে পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কাঁকুলিতে মাহিষ্য ক্ষত্রিয় জনগোষ্ঠীর শিশির অধিকারী ও গায়ত্রী অধিকারীর ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। শিশির অধিকারী একজন রাজনীতিবিদ এবং দ্বিতীয় মনমোহন সিং মন্ত্রিসভায় প্রাক্তন রাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। তিনি ২০১৯ সালে কাঁথি লোকসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হন। শুভেন্দু অধিকারী অবিবাহিত।
শুভেন্দুর ভাইদের মধ্যে একজন সৌমেন্দু অধিকারী কাঁথি পৌরসভার চেয়ারম্যান। দিব্যেন্দু অধিকারী, যিনি ২০১৯ সালে তমলুক লোকসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হন, তিনিও তার ভাই।
অধিকারী নেতাজি সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার অব আর্টস (এম.এ.) ডিগ্রি অর্জন করেছেন।
পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কাঁথি শহরের বাসিন্দা শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক জীবন পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীঘার নিকটবর্তী এই অঞ্চল থেকে উঠে আসা অধিকারী পরিবার দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।
শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক পটভূমি মূলত কংগ্রেস ঘরানার। তাঁর বাবা শিশির অধিকারী একসময় মেদিনীপুর জেলার প্রভাবশালী কংগ্রেস নেতা ছিলেন এবং পরবর্তীতে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন। তৃণমূল গঠনের পর তিনি দলীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
বাবার পথ অনুসরণ করে শুভেন্দু অধিকারীও রাজনৈতিক জীবনের সূচনা করেন কংগ্রেসের মাধ্যমে। ছাত্র রাজনীতি থেকে শুরু করে তিনি কাঁথি পৌরসভার কাউন্সিলর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন এবং দলের সংগঠনে দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান অর্জন করেন।
২০০৬ সালে তিনি কাঁথি দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হন। ওই সময় থেকেই নন্দীগ্রাম আন্দোলনের মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক পরিচিতি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। শিল্পায়ন ও জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, যা রাজ্য রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে।
২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তিনি সিপিআই(এম)-এর প্রভাবশালী নেতা লক্ষ্মণ শেঠকে পরাজিত করে সাংসদ নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে তিনি পরিবহন ও সেচ দপ্তরের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি দলের যুব সংগঠনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তবে দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে মতপার্থক্য এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে ২০২০ সালে তিনি তৃণমূল কংগ্রেস ত্যাগ করে ভারতীয় জনতা পার্টিতে (বিজেপি) যোগ দেন। এরপর ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হন এবং রাজ্য বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, অধিকারীর উত্থান পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। প্রশাসনিক ইস্যু, দুর্নীতি অভিযোগ, আইন-শৃঙ্খলা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে তিনি নিয়মিতভাবে শাসক দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।
তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন বিতর্কমুক্ত নয়। বিভিন্ন সময়ে তাঁর বক্তব্য ও অবস্থানকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। বিরোধীরা তাঁকে বিভাজনমূলক রাজনীতির প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করলেও সমর্থকরা তাঁকে পরিবর্তনের মুখ হিসেবে দেখেন।
সম্প্রতি রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়। একই সঙ্গে প্রশাসনিক দায়িত্ব, উন্নয়ন ও রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জও বৃদ্ধি পেয়েছে।
(ঢাকাটাইমস/৯ মে/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












