শিমুলিয়া ঘাটে ‘স্পেশাল’ টাকার নামে চাঁদাবাজি

নাদিম মাহমুদ, শিমুলিয়া ঘাট থেকে ফিরে
 | প্রকাশিত : ০৪ মার্চ ২০১৭, ০৮:৫৪
ফাইল ছবি

মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার শিমুলিয়া ঘাটে ফেরিতে ট্রাকের ভাড়া নিয়ে ব্যাপক চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরকারের নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা ‘স্পেশাল’ নিচ্ছে বিআইডব্লিউটিসির কর্তব্যরত কাউন্টার স্টাফরা।

ট্রাকচালকের দাবি, তারা হয়রানি এড়াতে বাধ্য হয়ে প্রতিদিন ‘স্পেশাল’ টাকা দিয়ে ফেরি পারাপার হচ্ছেন। কিন্তু এই ‘স্পেশাল’ টাকা কার কাছে যায়- সেই প্রশ্ন তুলছেন চালকরা।

অভিযোগের তির শিমুলিয়া ঘাটের বিআইডব্লিউটিসির কর্তব্যরত কাউন্টার স্টাফদের বিরুদ্ধে। পুলিশের নাকের ডগায় চলছে এই অনিয়ম। পুলিশও এই চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়েছে বলে জানান চালকরা।

দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার ছোট-বড় সব মালবাহী ট্রাক শিমুলিয়ার এ ঘাটে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে বছরের পর বছর-এই অভিযোগ অনেক পুরনো।  ফেরিতে উঠতে হলে টাকা দিতে হয় এসব চাঁদাবাজ বাহিনীকে। ট্রাকচালকদের ভাষ্য, তা না হলে চার-পাঁচ দিনও ঘাটেই পড়ে থাকার আশঙ্কা পণ্যবাহী ট্রাক নিয়ে। এতে করে কাঁচামালের ব্যাপক পচন ধরে ট্রাকের মধ্যেই। দিনের চেয়ে রাতে চাঁদাবাজি বেশি হয়।

গত কয়েক দিন সরেজমিন ঘুরে চালকদের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। ছোট-বড় সব ধরনের ট্রাক থেকে লাগামহীনভাবে টাকা তুলছেন বিআইডব্লিউটিসির কাউন্টারের লোকজন। সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি ‘স্পেশাল’ দেখিয়ে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে।

ট্রাকের ঢাকনা খোলা থাকলে (ট্রাকের পেছনের দিকে কোনো ধরনের মালামাল বেরিয়ে থাকলে) সরকারিভাবে নির্ধারিত রয়েছে সাড়ে ৪০০ টাকা করে আদায়ের। কিন্তু বিআইডব্লিউটিসির কাউন্টারের লোকজন কোনো রশিদ ছাড়া ওই টাকা তুলছেন। সরকারের ঘরে সেই টাকা জমা হচ্ছে কি না সেই প্রশ্ন উঠছে চালকদের মধ্যে।

চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গাড়ির সিরিয়াল পেতে দিতে হয় অতিরিক্ত অর্থ। যানজটে আটকা পড়া মাওয়া ঘাটে গাড়ির সিরিয়াল আগে পেতে ১০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয় ফেরি কর্তৃপক্ষ, পুলিশ ও আনসারকে। কাঁচামাল কিংবা মাছ ও বরফ বহন করা ট্রাকের ক্ষেত্রে দিতে হয় আরও বেশি টাকা।

পরিবহন চালকরা জানান, কাউন্টারে সরকার-নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা না দিলে ফেরিতে থাকা কাউন্টারের লোকজন মারধর করে। তাই চালকরা বিড়ম্বনা এড়াতে অতিরিক্ত টাকা দিতে বাধ্য হন।

এই প্রতিবেদক সরেজমিনে দেখেন, একটি গাড়ি প্রথমে ঘাটে যাওয়ার পথে পন্টুন ব্যবহারের জন্য বিআইডব্লিউটিএকে ১৫-২০ টাকা টোল দেয়। গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য দিতে হয় আরও অতিরিক্ত ১৫ টাকা। কিন্তু দেখা গেছে, অধিকাংশ গাড়ি পার্কিং না করে সরাসরি ফেরিতে ওঠে। তার পরও দিতে হচ্ছে এই পার্কিং ফি। এরপর ফেরিতে প্রতি ট্রাকের ভাড়া এক হাজার ৪০০ টাকার পরিবর্তে এক হাজার ৫৫০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন ট্রাকচালকরা। এই টাকা তোলা হচ্ছে রশিদের বাইরে।

তিন থেকে পাঁচ টনের গাড়ির ভাড়া এক হাজার ৪০০ টাকা হলেও কাউন্টার কর্তৃপক্ষ নিচ্ছে এক হাজার ৫৫০ টাকা। আর  ১৫ থেকে ১৬ ও ২৩ টনের গাড়ির নির্ধারিত ভাড়া এক হাজার ৮০০ টাকার জায়গায় নেয়া হচ্ছে দুই হাজার টাকা করে। এভাবে শত শত ট্রাকচালকের কাছ থেকে ‘স্পেশাল’ খরচ হিসেবে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন কাউন্টারের লোকজন।

মো. জামান হোসেন নামের একজন ট্রাকচালাক রসিদ দেখিয়ে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘ট্রাক নিয়ে ফেরিতে ওঠার পরে কাউন্টারে টিকেট কেটে আসলাম। টিকেটের গায়ে ১৪০০ টাকা ভাড়া লেখা, আর দিতে হয়েছে ১৫৫০ টাকা।’

ট্রাকে থাকা আমিনুর রহমান জানান, তার ট্রাকে বরফ থাকায় তাকে দ্রুত সিরিয়াল পেতে ৩০০ টাকা বেশি দিতে হয়েছে। তবে তার কাছে দাবি করা হয়েছিল ৫০০ টাকা।

ফেরিতে সারি অনুযায়ী ট্রাক রাখার জন্যও গুনতে হয় টাকা।

মো. নাজিম নামের আরেক ট্রাকচালক জানান, এ জন্য লস্করদের দিতে হয়  ২০ থেকে ১০০ টাকা। এই টাকা না দিলে ফেরি থেকে গাড়ি নামিয়ে দেয়ার হুমকি দেয় তারা। এ কারণে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে আমাদের।’

এমনই খোলামেলা চাঁদাবাজি চলছে শিমুলিয়া ঘাটের ফেরিতে। কিছু বললেই মারধর করে তারা- এমন অভিযোগ করে ট্রাকচালক মো. আজিত বলেন, ‘তাই ভয়ে আমরা টাকা দেই।’ এমন হাজারো ট্রাকচালক প্রতিদিন অতিরিক্ত টাকা দিয়ে আসছেন ফেরিতে।

ট্রাক থেকে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে এই অতিরিক্ত টাকা নেয়া অন্যায় বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থার (বিআইডব্লিউটিসির) মাওয়া ঘাটের ব্যবস্থাপক শেখর চন্দ্র।

তবে এই প্রতিবেদকের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি দাবি করেন, ট্রাকচালকরা খুশি হয়ে ফেরি স্টাফদের কিছু টাকা দিয়ে যায় চা-পান খাওয়ার জন্য। এই টাকা নেয়াও অন্যায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

শেখর চন্দ্র বলেন, যারা ট্রাকচালকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। এর পরই মোবাইল ফোনের সংযোগ কেটে দেন তিনি।

(ঢাকাটাইমস/৪মার্চ/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত