অগ্রযাত্রার দীপশিখা

সেলিনা হোসেন
 | প্রকাশিত : ১৪ জুন ২০১৮, ১০:২৪

শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির বোধে ভারতবর্ষের বাঙালি মুসলিম সমাজ নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে সময় নিয়েছে। ধর্মীয় গোঁড়ামির অনুশাসন থেকে তাঁদের বেরিয়ে আসতে সময় লেগেছে। শিক্ষার আলো গ্রহণ না করে ব্রিটিশ ভারতের বাঙালি মুসলমান সমাজ সামাজিক রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ থেকে নিজেদের দূরে রেখেছিল। কিন্তু এ অবস্থা কাটিয়ে ওঠার জন্য সক্রিয় হয়ে উঠেছিলেন সমাজের অগ্রগণ্য মানুষরা। লেখক মীর মশাররফ হোসেন তাঁর আত্মজীবনী বইয়ে লিখেছিলেন, ‘চার বৎসর চারমাস চারদিন পর আমার হাতে তাক্তি (হাতে খড়ি) হইয়াছিল। গ্রাম্য শিক্ষক মুন্সী ভিন্ন পাশ করা মৌলভী আমাদের দেশে কেহ ছিল না। বাঙ্গাল বিদ্যা গুরু মহাশয়ের পাঠশালায় সীমাবদ্ধ ছিল। পুণ্যের জন্য আরবি শিক্ষা। কোরাণ শরীফ পাঠ। সে পাঠ বড়ই আশ্চর্য। অক্ষর পরিচয় হইলেই কোরাণ শরীফ পড়ার নিয়ম। সে পড়া পড়িয়ে যাওয়া মাত্র, আরবি কোরাণ শরীফের অর্থ কেহই আমাদের দেশে জানিতেন না। মুন্সী সাহেব বাঙ্গালার অক্ষর লিখিতে জানিতেন না। বাঙ্গালা বিদ্যাকেও নিতান্ত ঘৃণার চক্ষে দেখিতেন। আমার পূজনীয় পিতা একটি অক্ষরও লিখিতে পারিতেন না।’

এই ছিল সামাজিক পরিস্থিতির চিত্র। জনগোষ্ঠী যদি সঠিক পথের দিকনির্দেশনা গ্রহণ না করে উল্টো পথে হাঁটে তবে তার দীনতার শেষ থাকে না। তবে এটা ঠিক যে সময়ের অগ্রগামী মানুষরা এ পরিস্থিতি কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়ার দীপশিখা নিয়ে সমাজের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। এই সূচনা হয়েছিল এখন থেকে চারশ বছর আগে। তখন নিজেদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ বাংলা ভাষায় অনুবাদের দাবি উত্থাপন করেছিলেন বাঙালি লেখকবৃন্দ। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বাংলা ভাষার কবি আবদুল হাকিম। গবেষকগণ অনুমান করেছেন, ‘আমরা তাঁহার আবির্ভাবকালকে ১৬২০ হইতে ১৬৯০ খ্রিস্টাব্দ বলিয়া ধরিয়া লইলাম।’ কবি আবদুল হাকিমের রচিত গ্রন্থের নাম ‘নূরনামা’। এই বইয়ের শুরুতে একটি অধ্যায় আছে যার শিরোনাম ‘বাংলা ভাষার বিতর্ক।’ এখানে লেখা হয়েছে : ‘মধ্যযুগীয় মুসলিম কবিদের মধ্যে কয়েকজনের গ্রন্থ পাঠে জানা যায় যে, ধর্মীয় গ্রন্থ বঙ্গভাষায় লিখিত হইবে কি না এই বিষয়ে একটি বিতর্কের উদ্ভব হইয়াছিল। কবি সৈয়দ সুলতানের লেখায় প্রকাশ পায় যে, এক শ্রেণির লোক ধর্মীয় গ্রন্থ বঙ্গভাষায় লেখার পক্ষপাতী ছিলেন না। কবি সৈয়দ সুলতান বঙ্গভাষার গ্রন্থ প্রণয়নের পক্ষে থাকিয়া যুক্তি দ্বারা বিরুদ্ধবাদীদের মত খ-ন করিতে প্রয়াস পান।’ তিনি তাঁহার বিরুদ্ধবাদীদিগকে মুনাফিক আখ্যায় আখ্যায়িত করিয়াছিলেন :

                    জে সবে আপোনা বোল না পারে বুঝিতে

                    পাঁচালি রচিলাম করি আছএ দুসিতে॥

                    মুনাফিকে বোলে আমি কিবাবেত কাড়ি।...

                    আল্লাএ বোলিছে মুঞি জে দেশে জে ভাষ।

                    সে দেশে সে ভাষে কৈলুম রছুল প্রকাশ॥

                                                ওফাতে রসুল- পৃ. ৫

কবি সৈয়দ সুলতানের আরও কয়েকটি পঙ্ক্তি এমন :

বঙ্গদেশী সকলেরে কিভাবে বুঝাইবে।

বাখানি আরবভাষা এ বুঝাইতে নারিব॥

যারে যেই ভাষে প্রভু করেছে সৃজন।

 সেই ভাষ তাহার অমূল্য সেই ধন॥

                             কবি সৈয়দ সুলতান-ওফাতে রসুল

কবি আবদুল হাকিম একই বক্তব্য সমর্থন করেছেন। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, ‘বিভিন্ন ভাষার যখন বিভিন্ন পয়গম্বরদিগের নিকট তাঁহাদের কিতাব অবতীর্ণ হইয়াছে, তখন আমাদের বাংলা ভাষায় ধর্মগ্রন্থ লিখিলে কেন দোষ হইবে? আল্লাহতালা ত সকল ভাষাই বুঝেন।

                    জেই দেশে জেই বাক্য কহে নরগণ।

                    সেই বাক্য বুঝে প্রভু আপে নিরঞ্জন।

                                                 নূরনামা ৪৯-৫০ পঙ্ক্তি

সে সময়ের বিরুদ্ধবাদীরা বাংলা ভাষাকে হিন্দুয়ানি বলে প্রচার করেছিল। আবদুল হাকিম এর উত্তর দিয়েছিলেন নিজ কাব্যগ্রন্থে। বলেছেন

                    সর্ব বাক্য বুঝে প্রভু কিবা হিন্দুয়ানি।

                   বঙ্গদেশী বাক্য কিবা জত ইতি বাণী॥

                                                নূরনামা ৫১-৫২ পঙ্ক্তি

নিজের মাতৃভাষায় ধর্মগ্রন্থ না থাকার কারণে আক্ষেপ করেছেন। আরও বলেছেন, ভাষা যদি হিন্দুয়ানি হয় তাতে কী আসে যায়? বিষয় তো মুসলমানি। শেষ পর্যন্ত যারা নিজের ভাষাকে শ্রদ্ধা করতে পারে না তাদের প্রতি তিনি কটূক্তি করেছেন। জšে§র ঠিক নেই বলে বলেছেন। তাদেরকে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার উপদেশ দিয়েছেন

                    জে সবে বঙ্গেত জন্মে হিংসে বঙ্গবাণী।

                    সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় না জানি॥

                   দেশীভাষা বিদ্যা জার মনে না জুয়াএ।

নিজ দেশ ত্যাগি কেন বিদেশে না জাএ॥

                             নূরনামা ৮৫-৮৮ পঙ্ক্তি

সময়ের নিয়মে সময় গড়িয়েছে। সময় সমাজের অব্যবস্থা অগ্রাহ্য করে সঠিক পথে মোড় নিয়েছে। ১৯১১ সালের ৪ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই প্রসঙ্গে ২০১৫ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি ‘কলম’ পত্রিকায় শফিকুল ইসলাম ‘শতবর্ষ স্মরণ, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’ শিরোনামে লিখেছিলেন, ‘বাংলার ব্রিটিশ অধিকারের অভিঘাতে বাঙালি মুসলমান সমাজে যে সর্বব্যাপী অধঃপতন ঘটে তা থেকে মুক্তির এষণায় উনিশ শতকের শেষ চতুর্থাংশে এই সমাজে বিবিধ কর্মপ্রচেষ্টা শুরু হয়। মুক্তির উপায় হিসেবে যেসব পন্থাবলম্বন অত্যাবশ্যকীয় বিবেচিত হয়, মাতৃভাষা বাংলায় সাহিত্যচর্চা সেগুলোর অন্যতম।’

নিঃসন্দেহে এই যাত্রা ছিল বাঙালি মুসলমানের ব্যাপকহারে সাহিত্যচর্চার একটি বড় পাটাতন। এই সমিতি থেকে প্রকাশিত হতো ত্রৈমাসিক ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা।’ সম্পাদক ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক। ১৯১৮ থেকে ১৯২২ পর্যন্ত পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। এই সমিতি বেশ কয়েকটি অধিবেশনের আয়োজন করেছিল। ১৯১৭ সালের ২৭শে ডিসেম্বর কলকাতার মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে সমিতির দ্বিতীয় অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। সভাপতি ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। সভাপতির ভাষণে তিনি মাতৃভাষা প্রসঙ্গে প্রশ্ন উঠিয়ে বলেছিলেন : ‘পৃথিবীর ইতিহাস আলোচনা করিয়া দেখ, মাতৃভাষার উন্নতি ব্যতীত কোন জাতি কখনও কি বড় হইতে পারিয়াছে? আরব পারস্যকে জয় করিয়াছিল। পারস্য আরবের ধর্ম্মের নিকট মাথা নত করিয়াছিল, কিন্তু আরবের ভাষা লয় নাই।... অনেকদিন পূর্ব্বে উর্দ্দু বনাম বাংলা মোকদ্দমা বাংলার মুসলমান সমাজের ভিতর উঠিয়াছিল, তাহাতে বাংলার ডিক্রী হইয়া যায়। বর্ত্তমানে আবার সেই মোকদ্দমার ছানি বিচারের জন্য উর্দ্দু পক্ষকে সওয়াল জওয়াব করিতে শুনিতেছি।... দখল বাংলারই থাকিবে তবে উর্দ্দু বাংলার অধীনে উপযুক্ত করে ইচ্ছাধীন প্রজাই স্বত্ত্বে কিছু ভূমি বন্দোবস্ত পাইতে পারে।’

বাংলা ভাষার মর্যাদার প্রশ্নে উত্থাপিত কথা বাঙালি মুসলমানের শিক্ষা, সাংস্কৃতিক চেতনা ইত্যাদি প্রশ্নে একটি সুনির্দিষ্ট বিবেচনা। নিজের মাতৃভাষার প্রশ্নে বাঙলা ছাড়া বাঙালি মুসলমানের দ্বিতীয় কোনো চিন্তা থাকতে পারে না। বিষয়টি সেই সময়ে মীমাংসিত হয়েছিল। সেই সময়ে মাতৃভাষার মর্যাদার বিষয়টি কঠিন সিদ্ধান্তে সুস্পষ্ট করেছিলেন সে সময়ের লেখকবৃন্দ। তাঁরা মাতৃভাষার প্রশ্নে নিজেদের অবস্থানকে সিদ্ধান্তহীনতার যাঁতাকলে নিমজ্জিত করেননি।

প্রাবন্ধিক এয়াকুব আলী চৌধুরী তাঁর ‘বাঙ্গালী মুসলমানের ভাষা ও সাহিত্য’ প্রবন্ধে স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, ‘বাঙ্গালী মুসলমানের মাতৃভাষা বাঙ্গালা, ইহা দিনের আলোর মত সত্য। ভারতব্যাপী জাতীয়তা সৃষ্টির অনুরোধে বঙ্গদেশে উর্দ্দু চালাইবার প্রয়োজন যতই অভিপ্রেত হউক না কেন, সে চেষ্টা আকাশে ঘর বাঁধিবার ন্যায় নিষ্ফল। বাঙ্গালা ভাষায় জ্ঞানহীন মৌলবী সাহেবগণের বিদ্যা ও বঙ্গদেশে উর্দ্দু পত্রিকার বিফলতা তাহার জ্বলন্ত প্রমাণ।’

আর একজন অসাধারণ লেখক কবি বদিউদ্দিন গভীর প্রত্যয়ে মাতৃভাষার মাধ্যমে ধর্মগ্রন্থ পড়ার কথা বলেছেন। তিনি লিখেছেন:

                   দিন ইসলামের কথা শুন দিয়া মন।

                    দেশী ভাষা রচিলে বুঝিব সর্বজন॥

                                                কবি বদিউদ্দীন, ছিকতে ইমান

যে সাহিত্যচর্চার সূচনা হয়েছিল প্রবীণ লেখকদের মাঝে তারা বাংলা ভাষার প্রশ্নে সস্পষ্ট সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় বাহান্নোর ভাষা আন্দোলনে মাতৃভাষার মর্যাদার প্রশ্নে জীবন উৎসর্গ করেছিল বাঙালি মুসলিম তরুণরা। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই মাতৃভাষার মর্যাদার প্রশ্নে জীবন বাজি রেখে লড়াই করেছে। পরবর্তী সময়ে বাঙালির অগ্রগণ্য চিন্তার মানুষেরা কানাডার ভ্যাঙ্কুবারে অবস্থান করে ‘মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভার অব দ্য ওয়ার্ল্ড সোসাইটি’ গঠন করে। ২১শে ফেব্রুয়ারির শহীদ দিবসকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব করেছিল টঘঊঝঈঙ-র কাছে। ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর টঘঊঝঈঙ এই প্রতীকী দিবসের ঘোষণা দেয়। বিশ্বের মানুষের সামনে মাতৃভাষার জন্য জীবনদানকারী দিনটি অপার মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বিষয়টি নির্ধারিত করে দিয়েছিল ইতিহাসের বিবর্তিত সময়। বাঙালি মুসলমান মাতৃভাষার প্রশ্নে আপোহ করেনি কখনও।

পরবর্তী ধাপ মুসলিম লেখকদের রচিত সাহিত্য। ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তাঁর ‘মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য’ গ্রন্থে বলেছেন : ‘এ যুগের সাহিত্যস্রষ্টাদের মধ্যে (আমি মুসলমান লেখকদের কথা বলছি) মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৮-১৯১১) নিঃসন্দেহে সর্বশ্রেষ্ঠ। রচনার আধিক্যে ও প্রতিভার গৌরবে তিনি বাংলার সকল শ্রেণীর পাঠকের কাছে সুপরিচিত হয়েছেন। তাঁর চল্লিশ বছরের সাহিত্যসাধনায় আমরা পঁচিশটি প্রকাশিত গ্রন্থ ও সাময়িকপত্রের পৃষ্ঠায় ছড়ানো আরো অনেক রচনা লাভ করেছি। বিষয় ও আঙ্গিকের দিক দিয়েও এগুলো বিচিত্র : এর মধ্যে উপন্যাস, নাটক, প্রহসন, কবিতা, প্রবন্ধ জীবনচরিত, ধর্মবিষয়ক রচনা, সবই আছে।’

‘অনল প্রবাহ’ মহাকাব্যের রচয়িতা ইসমাইল হোসেন সিরাজীর কাব্য থেকে উদ্ধৃতি:

উঠ তবে ভাই! উঠ মুসলমান,

জাগ তবে সবে ধরি নবপ্রাণ-

সাধহ কর্তব্য রাখিবারে মান,

এখনি নিশার হবে অবসান।

এখনি ভাতিবে আলোক রাশি।

                   ইসমাইল হোসেন সিরাজি, অনল প্রবাহ (২৪)

সাহিত্য রচনার এ যাত্রা পরবর্তী সময়ে অব্যাহত থেকেছে। লেখকবৃন্দ সৃজনশীল যাত্রা অব্যাহত রেখেছেন স্বমহিমায়। পাশাপাশি ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’ গঠন করে এর বিস্তার ঘটানো হয়েছে বাংলাভাষী জনগণের মাঝে। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় এবং পূর্ববঙ্গের চট্টগ্রামে এই সমিতি আয়োজিত সাহিত্য অধিবেশন লেখকদের অসাম্প্রদায়িক চেতনার সাহিত্যবোধে উদ্বুদ্ধ করেছে। মুসলিম লেখকদের মনন-চিন্তায় ধর্মীয় গোঁড়ামির চিন্তা ছাপ ফেলতে পারেনি। মীর মশাররফ হোসেনের কবিতার বই ‘গোরাই ব্রিজ অথবা গৌরী সেতু’ প্রকাশিত হয় ১৮৭৩ সালে। সেই সময়ে ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় এই বইয়ের সমালোচনায় লেখা হয়েছিল: ‘গ্রন্থখানি পদ্য। পদ্য মন্দ নহে। এই গ্রন্থকার আরও বাঙ্গালা গ্রন্থপ্রকাশ করিয়াছেন। তাঁহার রচনার ন্যায় বিশুদ্ধ বাঙ্গালা অনেক হিন্দুতে লিখিতে পারে না। ইঁহার দৃষ্টান্ত আদরণীয়। বাঙ্গালা হিন্দু-মুসলমানের দেশ-একা হিন্দুর দেশ নহে। কিন্তু হিন্দু-মুসলমান এক্ষণে পৃথক পরস্পরের সহিত সহƒদয়তাশূন্য। বাঙ্গালার প্রকৃত উন্নতির জন্য নিতান্ত প্রয়োজনীয় যে হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য জন্মে। যতদিন উচ্চ শ্রেণীর মুসলমানদিগের মধ্যে এমত গর্ব্ব থাকিবে, যে তাঁহারা ভিন্ন দেশীয়, বাঙ্গালা তাঁহাদের ভাষা নহে, তাঁহারা বাঙ্গালা লিখিবেন না বা বাঙ্গালা শিখিবেন না, কেবল উর্দু ফারসীর চালনা করিবেন, ততদিন সে ঐক্য জন্মিবেনা। কেননা জাতীয় ঐক্যের মূল ভাষার একতা। অতএব মীর মশাররফ হোসেন সাহেবের বাঙ্গালা ভাষানুরাগিতা বাঙ্গালীর পক্ষে বড় প্রীতিকর। ভরসা করি, অন্যান্য সুশিক্ষিত মুসলমান তাঁহার দৃষ্টান্তের অনুবর্তী হইবেন।’

‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার এমন উক্তি বাঙালি মুসলমান লেখকদের সামনে একটি বড় দৃষ্টান্ত ছিল। তাঁরা সময়ের দাবি মিটিয়ে যে সাহিত্য স্রোত তৈরি করেছিলেন সেটা কোনো চড়ায় আটকে যায়নি। প্রবহমান স্রোত বয়ে এসেছে বাংলাদেশের জমিনে। প্লাবিত করেছে দুইকূল। প্রবন্ধ রচনার পাশাপাশি রচিত হয়েছে কবিতা, উপন্যাস, গল্প, নাটক, শিশুসাহিত্যসহ সব ধারা।

গবেষক আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ একজন প্রজ্ঞাবান মানুষ। নিজস্ব সংস্কৃতিকে সংগ্রহ করে বাঁচিয়ে রাখার কাজে ব্রতী ছিলেন। গ্রাম-গ্রামান্তরে ঘুরে কয়েক শ পুঁথি সংগ্রহ করেছেন। পুঁথিকেন্দ্রিক প্রবন্ধ লিখেছেন। আজীবন এই সাধনা করে গেছেন। মাতৃভাষার প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপোসহীন। লিখেছেন:

                   আমার এই বিশ্বাস আছে যে, আমার দেশের মৃত্যু নাই,

                   আমার দেশের আছে যে জনগণ, তারও মৃত্যু নাই,

তেমনই অমর আমার এই বাঙলা ভাষা।

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন এখনও প্রবল দৃষ্টান্তে উপস্থাপিত হন বাংলাদেশের লেখকদের সামনে। কবি সুফিয়া কামাল সামনে এসে দাঁড়ান। তিনি তাঁর কবিতা-গল্পের জন্য নন্দিত হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের কাছে। ‘আবদুল্লাহ’ উপন্যাস নিয়ে নন্দিত হয়েছেন ইমদাদুল হক। সমালোচকের ভাষায় ‘স্বাধীন চিত্তের ও মৌলিক পর্যবেক্ষণ শক্তির পরিচয় দিয়েছেন ‘আবদুল্লাহ’ উপন্যাসে। এ বইটি বাঙালি মুসলমান সমাজের ক্ষয়িষ্ণু আদর্শ ও পরিহার্য রীতিনীতি সমালোচনার এক স্মরণীয় প্রচেষ্টা।’ ১৯১৪ সালে প্রকাশিত হয় মোহাম্মদ মজিবর রহমানের ‘আনোয়ারা’ উপন্যাস। এই উপন্যাসটি একটি জনপ্রিয় বই ছিল। ১৯২৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর ‘গরীবের মেয়ে’ উপন্যাস।

এমন আরও অনেক উদাহরণ যোগ হতে পারে বাঙালি মুসলিম রচিত সাহিত্য সাধনার উল্লেখ করে। এতে প্রতীয়মান হয় যে একটি সাহিত্যিক রূপরেখা তৈরি হয়েছিল এবং ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’ সাহিত্যের চর্চার সামাজিকীকরণ করেছিলেন। যুক্ত করেছিলেন লেখকদের একই ছায়াতলে। এই সত্য নিয়ে দাঁড়িয়েছে আজকের বাংলাদেশের সাহিত্য। শফিকুল ইসলামের লেখার শেষাংশের উদ্ধৃতি এমন : ‘১৯৪৩ সালের মে মাসে সাহিত্য-সমিতির শেষ অর্থাৎ সপ্তম সম্মেলন যখন অনুষ্ঠিত হয়, তখন দেশের রাজনৈতিক অবস্থা ছিল অশান্ত-অস্থির। এ অবস্থা ক্রমঘনীভূত হয়ে ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগ ঘটায়। সমিতির অধিকাংশ সদস্য ‘অপশন’ দিয়ে পূর্ব-বাংলায় চলে যান। ফলে সমিতির অবস্থা খুবই দুর্বল হয়ে পড়ে।’ এই বছরে সমিতির শেষ সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি ছিলেন সে সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার এ এফ রহমান। তিনি তাঁর ভাষণে বলেছিলেন : ‘... নবীন মুসলমান সাহিত্যিকদের উৎসাহ দেবার জন্য, তাঁদের রচিত জিনিসগুলো জনসাধারণের সম্মুখে ফুটিয়ে তুলবার জন্য মুসলিম সাহিত্য সমিতির প্রয়োজন হয়। এই সমিতি অনেকটা সফলতা লাভ করেছে। নবীন সাহিত্যিকেরা আজ বঙ্গ সাহিত্যে উচ্চস্থান অধিকার করে যে সমাজের মুখোজ্জ্বল করেছেন, সেটা কতকটা এই সমিতির অক্লান্ত পরিশ্রম, চেষ্টা ও একনিষ্ঠ সেবার ফল, তা আপনাদের অবিদিত নেই। যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই ‘সমিতি’র গঠন, তা সফল হয়েছে। এর অক্লান্ত কর্মীদের কাছে আমাদের সমাজের ও বঙ্গ সাহিত্যের ঋণ অপূরণীয়।’

১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পরে বাংলা-উর্দু ভাষা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক উঠলে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাঙালি জাতিসত্তার প্রশ্নে পরিষ্কার করে বলেছেন:

                   আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য তার চেয়ে বেশি

                   সত্য আমরা বাঙালী। এটি কোন আদর্শের কথা নয়, এটি

                   একটি বাস্তব কথা। মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের

                   চেহারায় ও ভাষায় বাঙালীত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছেন

                   যে তা মালা-তিলক-টিকিতে কিংবা টুপি-লুংগি-দাড়িতে

                   ঢাকবার জো নেই।

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে পুলিশের গুলি বর্ষণের প্রতিবাদে কবি মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী তীব্র ভাষায় উচ্চারণ করেছিলেন :

                   এখানে যারা

                   প্রাণ দিয়েছে

                   রমনার ঊর্ধ্বমুখী কৃষ্ণচূড়ার তলায়

                   যেখানে আগুনের ফুলকির মতো

                   এখানে ওখানে জ্বলছে অসংখ্য রক্তের ছাপ

                   সেখানে আমি কাঁদতে আসিনি

                   ... আজ আমি প্রতিজ্ঞায় অবিচল

                   এখানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে উš§ুক্ত প্রাঙ্গণে

আমি তাদের ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি।’

এই কবিতার পাশাপাশি জাতির সামনে জেগে থাকে একটি গান, ‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি। আমি কি ভুলিতে পারি।’ রচনা আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। গানের সুরকার আলতাফ মাহমুদ শহিদ হন স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়। দুজনে বেঁচে আছেন ইতিহাসের পৃষ্ঠায়। তাঁরা মানুষ তৈরি করতে পারেননি এমন ধারণা মুছে যায় বর্তমান প্রজšে§র কণ্ঠে এই গানের বাণী ও সুরে।

এভাবে মাতৃভাষার মর্যাদা অর্জনের জন্য বাঙালি মুসলমান লড়েছিলেন দীর্ঘ সময় ধরে। বলতে হবে কয়েক শতাব্দী ধরে। তাঁরা আপন মাটি থেকে পা সরাননি। অক্ষুণœ রেখেছেন জাতিসত্তার জমিন। সমুন্নত রেখেছেন মাতৃভাষার মর্যাদা। আপোসহীনতায় দৃঢ় থাকাই ছিল তাদের যৌবনের জয়গানে।

দেশভাগের পরে পূর্ব পাকিস্তানে সাহিত্যের প্রবল স্রোত গড়ে তোলেন লেখকরা সৃজনশীল রচনার শিল্পমাধ্যমে। সে সময়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন আবুল ফজল, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শওকত ওসমান প্রমুখ। আজকের বাংলাদেশের সাহিত্য অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ভাস্বর সব ধর্মের লেখকের রচনায়। মিলনের ঐকতানে বাজে জয়ের সুরধ্বনি।

১৯৭১ সালে অর্জিত স্বাধীনতা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা করেছে বাংলাকে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের প্রথম ভাগে উল্লিখিত হয়েছে: ‘রাষ্ট্রভাষা। ৩। প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা।’

বাংলাভাষা ও সাহিত্যের যে যাত্রা শুরু হয়েছিল। তার গৌরবময় অর্জন হয়েছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের বাংলা ভাষায় ভাষণ দিয়েছিলেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার পেয়ে বাঙালি ও বাংলার গৌরবকে বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা ও বাংলা সাহিত্য বাঙালিকে মর্যাদার আসন দিয়েছে। ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’র অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা বাঙালির প্রাণের উৎস। স্মরণ না করলে ঐতিহ্যের গৌরব বাঙালি জাতিসত্তাকে বিব্রত করবে।

সেলিনা হোসেন: কথাসাহিত্যিক, শিশু একাডেমির চেয়ারম্যান

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত