সম্ভাবনার চামড়াশিল্পে দুর্দিন

জহির রায়হান
| আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০১৯, ১৯:৪০ | প্রকাশিত : ১৭ আগস্ট ২০১৯, ১০:০২
  • সাভারের শিল্পনগরীতে সিইটিপি নির্মাণ শেষ হয়নি, বর্জ্য পড়ছে নদীতে
  • দূষণের কারণে এলডব্লিউজির ছড়পত্র না থাকায় ইউরোপে রপ্তানি বন্ধ
  • সাভারের প্লটের কাগজ বুঝে না পাওয়ায় ব্যাংক ঋণ পাচ্ছেন না মালিকরা

চামড়াজাত পণ্য বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি পণ্য হওয়া সত্ত্বেও নানা সংকটে পড়েছে শিল্পটি। গত দুই বছর ধরে রপ্তানি কমছে। 

এবার চামড়ার অস্বাভাবিক দরপতনের পর এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে গোটা শিল্পের বেকায়দায় পড়ে যাওয়ার তথ্য মিলেছে। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সাভারের শিল্পনগরীতে সরিয়ে নিলেও সেই নগরী এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি।

এখনো সেখানে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য পরিবেশ তৈরি হয়নি। ফলে চামড়ার আন্তর্জাতিক ক্রেতাজোট লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ-এলডব্লিউজির ছাড়পত্র পাচ্ছে না ট্যানারি মালিকরা। ফলে ইউরোপের বাজারে ও বড় ব্রান্ডের কাছে পণ্য বিক্রি করতে পারছে না তারা। 

কেন্দ্রীয় বর্র্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা বা সিইটিপির কাজ শেষ হয়নি। আবার সিইটিপি সব কারখানার বর্জ্য পরিশোধনের মতো যথেষ্ট বড় নয়। ফলে সেখানেও বুড়িগঙ্গার মতোই পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। যেসব কারখানা চলছে, সেগুলোর বর্জ্য পড়েছে পাশের নদীতে। আর বিদেশি ক্রেতাজোট পরিবেশের দিকে নজর দেয়। তারা এই পরিস্থিতিতে পণ্য নিতে রাজি নয়।

প্রতিটি কারখানাই নতুন করে তৈরি করতে হচ্ছে। হাজারীবাগ থেকে স্থানান্তরের সময় অনেক যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে গেছে। নতুন করে কিনতে হচ্ছে। এ জন্যও বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু টাকার সংস্থান একটি বড় সমস্যা। সাভারে কারখানা নিয়ে গেলেও প্লটের দলিলও বুঝে পাননি মালিকরা। এ কারণে ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় ঋণও নিতে পারছেন না। 

সাভারে স্থানান্তর হওয়া ১৫৪টি কারখানার মধ্যে ৩৪টি এখনো উৎপাদনে যেতে পারেনি। আর যে ১২০টি উৎপাদনে আছে, সেগুলোও পুরোদমে উৎপাদন করতে পারছে না। 

এর মধ্যে গত বছরের কেনা চামড়াও এখনো মজুদ হয়ে আছে বহু কারখানায়। ফলে নতুন চামড়া কেনায় আগ্রহ কম বহুজনের।

এর বাইরে আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পণ্যের আধুনিকায়নে ব্যর্থতা, বিশ্ববাজারে চামড়ার জুতার বদলে সিনথেটিক বা কাপড়ের জুতার আগ্রহ বৃদ্ধি, আগের বছরের সংগৃহীত কাঁচা চামড়ার গুণগত মান কমে যাওয়ার সংকটেও পড়েছে দেশের চামড়শিল্প। 

এর মধ্যে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম পড়ে যাওয়ার পর দায়টা পুরোপুরি নিতে হচ্ছে ট্যানারি মালিকদের। যদিও তারা বলছেন, এর পেছনের কারণগুলোর সুরাহা করতে হবে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, যে সিন্ডিকেটের কথা বলা হচ্ছে, সেটা আদৌ সম্ভব নয়। সারা দেশে যে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া কেনে, তারা হাজার হাজার। তাদের সঙ্গে আগেই যোগাযোগ করে নির্ধারিত দামের কথা বলে দেওয়া সম্ভব নয়। কাজেই এর পেছনে যে অন্য সমস্যা আছে, সেটা শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।  

ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন-বিটিএর সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা আছে। কিন্তু আমরা আমাদের সক্ষমতার অভাবে তা দিতে পারছি না।’

‘সাভারে শিল্পনগরী এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। আমাদের চ্যালেঞ্জ আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম কমে যাওয়া। এর পর রয়েছে আমাদের আর্থিক সমস্যা।  আমাদের কাছে পর্যাপ্ত টাকা নেই। এবার ব্যাংক থেকে আমরা ঋণ পাইনি। ৬০০ কোটি টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু ১৫০ কোটি টাকার বেশি পাইনি।’

‘আমরা সাভারের ট্যানারি পল্লীর কারখানার প্লটের মালিকানা কাগজ বুঝে পাইনি। কিন্তু ব্যাংক ঋণ নিতে গেলে মালিকানার কাগজ চায়। গতবার চামড়া কেনার ভিত্তিতে ব্যাংক যে ঋণ দিয়েছিল এবার সেটাও দেয়নি আমাদের।’

‘আগে আমাদের কাছে ব্যাংকের প্রতিনিধি এসে দেখত। ধরেন, আমরা এক হাজার চামড়া কিনেছি। তার ভিত্তিতে তারা ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ ঋণ দিত। এবার সেটাও দেয়নি।’ 

বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যও বলছে, চামড়াশিল্প চাপে রয়েছে। এই খাতে ব্যবসাও কমছে বছর বছর। ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে আয় হয় ১১৩ কোটি ডলার। ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে রপ্তানি আয় সামান্য বেড়ে দাঁড়ায় ১১৬ কোটি ডলারে। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে এই আয়ের পরিমাণ আরও বেড়ে হয় ১২৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার।

কিন্তু উচ্চ আদালতের নির্দেশে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি স্থানান্তরের পর থেকে ব্যবসায় মন্দাবস্থা দেখা দেয়। ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে রপ্তানি আয় কমে ১০৮ কোটি ৫৪ লাখ ডলারে দাঁড়ায়। ওই অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য খাতে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১২ কোটি ডলার। 

২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে চামড়া খাত থেকে ৮৩ কোটি ৭১ লাখ ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ। যদিও এ সময়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯১ কোটি ৯৬ লাখ ডলার। এ হিসাবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৯ শতাংশ এবং আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৮ দশমিক ৬৯ শতাংশ আয় কমেছে। 
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘পরিবেশগত মানদ- ঠিক না থাকায় আমরা ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করতে পারি না।  এর ওপর বিগত অর্থ বছরই প্রচুর পরিমাণে অবিক্রিত চামড়া মজুদ রয়েছে। রপ্তানির ক্ষেত্রে নেগেটিভ গ্রোথ হয়েছে।’ 

‘এবার চামড়ার দাম কমার আরেকটি কারণ হলো গত কয়েক বছর ফিনিস চামড়া আমদানি বেড়ে গেছে। গত অর্থ বছররে ১১১ মিলিয়ন ডলারের ফিনিস চামড়া আমদানি হয়েছে। আবার সেইসঙ্গে সিনথেটিকের ব্যবহার বাড়ছে।’ 

ট্যানারি মালিকরা বলেন, সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরে বড় ধরনের বিনিয়োগের ধাক্কায় পড়েছে অনেক ট্যানারি। এ ধাক্কা কটিয়ে এখনো তারা উঠতে পারেনি। তার ওপর ব্যবসা ভালো না থাকায় ট্যানারি গতবার চামড়া কিনতে নেয়া ঋণের অর্ধেকও পরিশোধ করতে পারেনি। 

ট্যানারি শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, ‘২০১৭ সালে হাইকোর্টের নির্দেশে আমরা একদিনের ভেতরে হাজারীবাগ থেকে সব সরিয়ে করে সাভারে স্থানাস্তর করেছিলাম। তখন আমরা বলেছি, সাভারে শিল্পনগরী প্রস্তুত হয়নি। অথচ বিসিক সেই সময় বলেছে সেটা পুরোপুরি প্রস্তুত।’ 

‘অধিকাংশ ট্যানারি উৎপাদনে যেতে পারেনি। এর ফলে তারা ক্রেতা হারিয়েছে। ব্যাংকের যে ঋণ, সেটাও পরিশোধ করতে পারেনি।’ 
‘আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের লেদারের খুবই ডিমান্ড। এর পরেও আমাদের কমপ্লায়েন্সের ইস্যুতে বাজার হারিয়েছি। চীন-আমেরিকা বাণিজ্য যুদ্ধের ফলেও চীনের বায়ারা আমাদের থেকে এখন কেনা কমিয়ে দিয়েছে।’ 

কমপ্লায়েন্স ইস্যুতে বিসিকের দায় রয়েছে জানিয়ে শাহীন আহমেদ বলেন, ‘আমার কারখানা আমি কমপ্লায়েন্স করেছি। কিন্তু আন্তর্জাতিক মার্কেটে সেল করতে হলে এলডব্লিউজির সার্টিফিকেট লাগে। কিন্তু তারা জানিয়েছে, সিইটিপি বা ডাম্পিং ইয়ার্ড এখনো প্রস্তু হয়নি। এটা বাস্তবায়ন করছে বিসিক। তাদের কারণেই আমরা সার্টিফিকেটের মানদ- ফুলফিল করতে পারছি না।’

‘এলডব্লিউয়ের ও পরিবেশ অধিদপ্তরের মানদ- অনুযায়ী হয়নি সাভারের ট্যানারি পল্লীর পরিবেশ। তার উপর সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট হয়নি। আমাদের তো ব্যবসা দিন দিন কমছে। এর ওপর আমরা হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেও তার সুফল পাচ্ছি না।’

১৮ বছর ধরে চামড়া ব্যবসা করছেন শাহদাত হোসেন।  তিনি ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আগে ইউরোপের বাজার ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় বাজার। কিন্ত এখন এলডব্লিউজির ছাড়পত্র না থাকায় আমরা সেখানে পণ্য রপ্তানি করতে পারছি না। চায়না আমাদের থেকে পণ্য কিনে বেশি দামে তারা ইউরোপের বাজারে সেটা বিক্রি করছে। এর সমাধানে নীতিনির্ধারণ পর্যায়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।’ 

শিল্পসচিব সচিব আবদুল হালিম অবশ্য আগামী জুনের মধ্যে সাভারের চামড়া শিল্পনগরী শতভাগ চালুর আশ্বাস দিয়েছেন। বলেছেন, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি), ডাম্পিংসহ বেশি কিছু কাজ শেষের পর্যায়ে।’

আর সিইটিপি হয়ে গেলে চামড়া শিল্পনগরীর সমস্যার অনেকটাই সমাধান হবে বলে আশাবাদী সচিব।

ঢাকাটাইমস/১৭আগস্ট/জেআর/ডব্লিউবি

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :