কুর্দিদের ভবিষ্যৎ কী?

এ এস এম আলী কবীর
| আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:১৮ | প্রকাশিত : ০৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৮:১৬
এ এস এম আলী কবীর

দুই বছর আগে পত্রিকায় প্রকাশিত একটি ছবি সারা পৃথিবীর মানুষকে নাড়া দিয়েছিল। তুরস্কের উপকূল থেকে নৌযানে করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পলায়ন করে একটি কুর্দি পরিবার। তাদের ছোট্ট শিশুপুত্র আয়লান কুর্দি নৌ দুর্ঘটনায় মারা গেলে তার মৃতদেহ সৈকতে ভেসে এসেছিল। বলাই বাহুল্য, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আয়লানের পরিবার ইউরোপে পালাচ্ছিল।

শুধু আয়লান নয় সকল কুর্দিই বিগত বহু বছর যাবৎ ধারাবাহিক দুর্ভাগ্যের শিকার। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, পৃথিবীতে এখন কুর্দিদের সংখ্যা প্রায় দুই কোটি পঞ্চান্ন লাখ। তাদের মধ্যে প্রায় দুই কোটি চল্লিশ লাখ পশ্চিম এশিয়ার পাঁচটি দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসবাস করে। এই দেশগুলো হচ্ছে তুরস্ক, ইরাক, ইরান, সিরিয়া ও আজারবাইজান। তুরস্কে সবচেয়ে বেশি কুর্দি বসবাস করে। তারা দীর্ঘকাল ধরে স্বায়ত্তশাসনের জন্য লড়াই করে আসছে। তুরস্কের কুর্দিদের সশস্ত্র রাজনৈতিক দল পিকেকে এই লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। এছাড়া ইউরোপে প্রায় ১৫ লাখ কুর্দি বসবাস করে। যারা অধিকাংশই জার্মানির অভিবাসী।

যেখানে মাত্র ৫০ লাখের মতো প্যালেস্টাইনির জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্নে সারা পৃথিবী আলোড়িত সেখানে এর প্রায় ৫ গুণ জনসংখ্যার কুর্দিদের নিয়ে বিশ্ববাসীর তেমন কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু কুর্দিরা প্রথম মহাযুদ্ধের (১৯১৪-১৮) পর থেকেই নিজেদের পৃথক রাষ্ট্র গঠনের জন্য দাবি তুলতে শুরু করেন। প্রথম মহাযুদ্ধে বিজয়ীরা মধ্যপ্রাচ্যে তথা পশ্চিম এশিয়ায় নতুন নতুন রাষ্ট্র গঠন করতে শুরু করেন। তারা অবিভক্ত প্যালেস্টাইনকে অনেকটা বলপ্রয়োগে বিভক্ত করেন। ইসরাইল রাষ্ট্র গঠন করেন (১৯৪৮)।  তাছাড়া তাদের রাষ্ট্রচিন্তার মধ্যে ছিল আর্মেনীয় আজেরী ও কুর্দিদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র গঠন করা। পশ্চিমা শক্তিগুলো আর্মেনীয় ও আজেরীদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র গঠন করলেও ১৯২৩ সাল নাগাদ এটি পরিষ্কার হয়ে যায় যে, কুর্দিদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র গঠনের ব্যাপারে তারা আগ্রহী নন।

কুর্দিদের ভাগ্য বিপর্যয় সেই থেকে শুরু। এরপর বিগত প্রায় এক শতাব্দীব্যাপী মাঝেমধ্যে আশার আলো দেখতে পেলেও কুর্দিদের পৃথক রাষ্ট্র কুর্দিস্তান গঠনের স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেছে। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে দুর্ভাগ্য ও বিপর্যয়ে কুর্দিদের স্বতন্ত্র রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। অথচ কুর্দি জনগণের রয়েছে অত্যন্ত সমৃদ্ধ ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিগত পরিচিতি, যা নিয়ে তারা গর্ব করতে পারে।

এবারে কুর্দিদের ভাগ্য নিয়ে উথাল পাতাল শুরু হয় ২০১২ সালে। যে বছর সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। সিরিয়ার ওই গৃহযুদ্ধে এ পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ নিহত ও লাখ লাখ মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছে। যাদের অনেকেই কুর্দি। সিরিয়ার অভ্যন্তরে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার কুর্দি নিজেদের বসতবাড়ি থেকে যুদ্ধের কারণে উচ্ছেদ হয়ে অভ্যন্তরীণ শরণার্থীতে পরিণত হয়েছে। ইরাকে এমন উদ্বাস্তুর সংখ্যা ১৫ হাজার।

সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরুর পর সিরীয় কুর্দিরা খুব সহজেই কোনো পক্ষাবলম্বন করা থেকে বিরত থাকে। বিশেষ করে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে কোনো লড়াইয়ে তারা অংশগ্রহণ করেনি। কারণ রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তির বিরোধিতা করলে কী ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে এ ব্যাপারে তাদের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের বিরোধিতা করায় ১৯৮০ দশকের শেষ দিকে প্রায় ৬০ হাজার কুর্দিকে হত্যা করা হয়। সেই গণহত্যার স্মৃতি আজও ইরাক ও সিরিয়ার কুর্দিদের স্মৃতিতে ভাস্বর।

সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে তারা বরং আইএসআই এবং আর বোগদাদীর নেতৃত্বাধীন খেলাফতের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেন। এর ফলে আইএসআইয়ের সিরিয়ায় অধিকৃত এলাকা ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকে এবং চূড়ান্তভাবে তারা ইরাক থেকে উচ্ছেদ হয়ে গেলে তার অভিঘাত সিরিয়ায় এসে পড়ে। এ পর্যায়ে সিরীয় কুর্দিরা আইএসআইয়ের ওপর চূড়ান্ত আঘাত হানে। মার্কিন বিমান বহরের বোমা বর্ষণের সহায়তায় তারা আইএসআইয়ের ওপর ব্যাপক হামলা পরিচালনা করে। এর ফলে সবাই ধরে নিয়েছিল যে, আমেরিকা কখনো সিরীয় কুর্দিদের পরিত্যাগ করবে না। কিন্তু ৬ অক্টোবর ২০১৯ তারিখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগানের মধ্যে টেলিফোনে সিরিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। এর পরই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় মোতায়েন তাদের সেনাদের প্রত্যাহার করার কথা ঘোষণা করে।

আমেরিকার এই সিদ্ধান্ত ছিল সিরিয়ার কুর্দিদের ওপর সরাসরি আঘাতস্বরূপ। আইএসআই প্রধান আবু বকর আল বোগদাদীর অবস্থান সম্পর্কে মার্কিন বাহিনীকে কুর্দিরাই অবহিত করেছিল। আমেরিকার সঙ্গে সহযোগিতার বিপরীতে তারা পেল এক ধরনের প্রতারণামূলক আচরণ। আমেরিকার সৈন্য প্রত্যাহারের ফলে সিরিয়ার কুর্দি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে তুরস্কের ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করার পথ প্রশস্ত হয়।

সিরিয়ার আক্রমণের মুখে কুর্দিরা বীরোচিত প্রতিরোধ গড়ে তুললেও অসামরিক কুর্দিরা ব্যাপকভাবে ঘরবাড়ি ছেড়ে সিরিয়ার অভ্যন্তরে সরে যেতে বাধ্য হয়। ব্যাপক ও উন্নত সমরসজ্জায় সজ্জিত তুরস্কের সামরিক বাহিনীর আক্রমণ ও বোমাবর্ষণে বহু কুর্দি হতাহত হয়। এর ফলে ২০১২ সালে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে কুর্দিদের নিহতের সংখ্যা প্রায় ১১ হাজারে পৌঁছায়।

আমেরিকা সিরীয় কুর্দিদের সঙ্গে তাদের সহযোগিতার বিপরীতে যে আচরণ করেছে তা প্রতারণার পর্যায়ে পড়ে বলেই কুর্দি নেতারা মনে করেন। ১৯২৩ সালে যে প্রতারণা ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের সূচনা হয় সিরিয়ায় সর্বশেষ মার্কিন ভূমিকা তারই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে বলেও তারা মনে করেন। এ জন্যই কুর্দিদের মধ্যে একটি কথা প্রচলিত রয়েছেÑ শুধুমাত্র পাহাড় পর্বত ছাড়া কুর্দিদের কোনো মিত্র নেই।

মধ্যপ্রাচ্য ও ইসলামের ইতিহাসে কুর্দিদের রয়েছে এক গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। ইসলাম ধর্মের অভ্যুদয়ের প্রথম দিকে জেরুজালেমের ওপর অধিকার নিয়ে খ্রিষ্টানদের সঙ্গে যে যুদ্ধ হয় যা ইতিহাসে ক্রুসেড নামে পরিচিত। তাতে কুর্দি যোদ্ধাগণ অত্যন্ত বীরোচিত ভূমিকা পালন করে। কুর্দি বীর গাজী সালাউদ্দিনের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী ইউরোপীয় শক্তিগুলোর সঙ্গে চূড়ান্ত লড়াইয়ে জয়লাভ করে এবং জেরুজালেমের ওপর তাদের অধিকার পুনরুদ্ধার করে। বিশ্বের সকল মুসলমান এই যুদ্ধ সম্পর্কে অবহিত আছেন এবং ইউরোপের দেশগুলোও ইংল্যান্ডের রাজার নেতৃত্বে পরিচালিত ক্রুসেডে তাদের পরাজয়ের কথা কখনো ভুলবে না। আর তাদের এই পরাজয় এসেছিল একজন কুর্দি বীরের হাত ধরে।

কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোও কুর্দিদের ভাগ্য সম্পর্কে উদাসীন। তারা ধর্মীয়, রাজনৈতিক এবং ভাষা ও সংস্কৃতিগত পার্থক্যের কারণে কুর্দিদের সঙ্গে একাত্মবোধ করেন না। বিশেষ করে যেসব দেশে বহু সংখ্যক কুর্দি বসবাস করেন সেই পাঁচটি দেশই বলতে গেলে কুর্দিদের ওপর খড়গহস্ত।

ইতিপূর্বে বলা হয়েছে যে, কুর্দিরা পশ্চিম এশিয়ার পাঁচটি দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এদের মধ্যে তুরস্কেই সর্বাধিক সংখ্যক কুর্দি বসবাস করেন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, গণতান্ত্রিক দেশ তুরস্ক স্বাধীনতা দূরে থাকুক কুর্দিদের স্বায়ত্তশাসনের দাবিও মানতে রাজি নয়। তুরস্ক বহু বছর ধরে কুর্দি অদিবাসী এবং তাদের রাজনৈতিক দল পিকেকের ওপর ব্যাপক নিপীড়ন চালিয়ে আসছে। এ ব্যাপারে তুরস্কের সকল রাজনৈতিক দল একমত। সম্প্রতি মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের ফলে সৃষ্ট শূন্যতায় তুরস্ক যে ভয়াবহ সামরিক হামলা পরিচালনা করে তার প্রধান লক্ষ ছিল কুর্দিরা এবং সিরীয় কুর্দিদের ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তি। তুরস্কের সন্দেহ যে, তার সীমান্তের নিকটবর্তী সিরিয়ার কুর্দি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় এরূপ তুরস্কবিরোধী শক্তির সমাবেশ তুরস্কের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। কিন্তু পর্যবেক্ষকরা মনে করেন যে, তুরস্ক তুর্কি কুর্দিদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির আশঙ্কাই এই হামলা পরিচালনা করেছে।

ইরানে ১৯৭৯ সালে সংঘটিত ইসলামী বিপ্লবের পর বিভিন্ন সংখ্যালঘুর ওপর নিপীড়নমূলক আচরণ শুরু হয়। এর প্রধান শিকার ছিল কুর্দিরা। ইরানে কুর্দিদের সংখ্যা তুরস্কের পরই এবং তাদের সাথে অধিকাংশ ইরানীর ধর্মীয় পার্থক্য বিরাজমান। ব্যাপকভাবে শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইরানে কুর্দিরাই হলো একমাত্র সুন্নি। সুতরাং শিয়া ও সুন্নিদের মধ্যে বিদ্যমান বিরোধ ইরানকে কুর্দিদের ওপর নিপীড়ন করতে উৎসাহী করেছে বলে মনে হয়।

ইরানের ন্যায় ইরাকও শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। তাছাড়া ইরাকের জনগণ আরবি ভাষী। অপরদিকে কুর্দিদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা এবং তারা সুন্নি মতাদর্শের অনুসারী। তাছাড়া রাজনৈতিকভাবে কুর্দিদের সাদ্দাম হোসেনের সরকারের বিরোধী মনে করা হতো। এ কারণে ইরাকি কুর্দিদের ওপর সাদ্দাম আমলে ভয়াবহ নিপীড়ন ও গণহত্যা পরিচালিত হয়। এতে বিপুলসংখ্যক কুর্দি আহত ও নিহত হয়। সাদ্দাম আমলের অবসানের পর ইরাকে নতুন সংবিধানের আওতায় নির্বাচন ও সরকার গঠন করা হয়। নতুন সংবিধানের আওতায় ইরাকের প্রথম রাষ্ট্রপতি হন জালাল তালাবানি নামে একজন কুর্দি রাজনীতিবিদ। কিন্তু তার এই নির্বাচন ইরাকের রাজনীতিতে কুর্দিদের ক্ষমতায়ন বুঝায় না। তবুও কুর্দিদের ওপর সাদ্দাম আমলে যে জাতিগত নিপীড়ন চলছিল সেটির অবসান হওয়ায় ইরাকি কুর্দিস্তানে আপাতত শান্তি বিরাজ করছে।

কুর্দিদের ভবিষ্যৎ কী এ ব্যাপারে কেউ নিশ্চিত নয়। কারণ বিশ্বরাজনীতির মোড়ল পরাশক্তিগুলো কুর্দিদের ভাগ্য সম্পর্কে এখনো উদাসীন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো কুর্দিদের ওপর প্রয়োজনমতো নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে।  সুতরাং স্বাধীনতা নয়, নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই কুর্দিদের লড়াই অব্যাহত রাখতে হচ্ছে। তারা চাইলেও সংঘাত ও যুদ্ধ থেকে তাদের রেহাই নেই। এটাই কুদিস্তানের বাস্তবতা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :