সামাজিক অসুস্থতা ও তার চিকিৎসা

আবু তালেব
 | প্রকাশিত : ২৬ জুলাই ২০২০, ১১:৫৩

শারীরিক সমস্যা নিশ্চয়ই একটা অসুস্থতা। সেজন্য আমরা ডাক্তারের শরণাপন্ন হই, ওষুধ সেবন করি, প্রয়োজনে অস্ত্রোপচার করি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে একসময় সেরেও যায়।

ঘুণে ধরা এ সমাজ ও সমাজব্যবস্থাকে আজ আমরা কী নামে ডাকব- সামাজিক অসুস্থতা, না সামাজিক ব্যাধি? যে নামেই ডাকা হোক না কেন এটি আজ মারাত্মক সামাজিক সমস্যা যা ক্যান্সারের চেয়ে কোনো অংশেই কম মারাত্মক ও ক্ষতিকর নয়। এ অবস্থায় এ রোগ সারানোর চিকিৎসা কী, আর চিকিৎসক কারা? নিশ্চয়ই এ রোগের চিকিৎসক শারীরিক রোগ চিকিৎসার ডাক্তাররা নন। কারণ এ রোগে তারাও আজ প্রকটভাবে আক্রান্ত।

দেশের প্রতিটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে শিক্ষার্থীর মাসিক খরচ পাঁচ হাজার টাকার উপরে। চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ খরচের হার আরও অনেক বেশি। দেশের খেটে খাওয়া কৃষক ও শ্রমিকের ঘামের টাকা দিয়ে এ খরচ মেটানো হয়। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেশের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে নানাবিধ পেশাজীবী হিসেবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ি। কেউ প্রশাসনিক কর্মকর্তা, কেউ চিকিৎসক, কেউ প্রকৌশলী, কেউ কৃষিবিদ, কেউ শিক্ষাবিদ, কেউ রাজনীতিবিদ, কেউ আইনবিদ, আবার কেউ ব্যবসায়ী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করি।

কেউ সরকারি, কেউ স্বায়ত্তশাসিত, কেউ বেসরকারি আবার কেউ ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিই কিংবা কাজ করি। সবাই আমরা নিবেদিতপ্রাণ। নিজেকে নিয়ে, নিজের পরিবারকে নিয়ে কিংবা বৃহত্তর অর্থে দেশকে নিয়ে। আসলে হওয়া উচিত ছিল দেশটাই সবকিছুর ওপরে ও আগে। দেশ মানে ভূখণ্ড, মানচিত্র, দেশ মানে দেশের নাগরিক। ওই যে খেটে খাওয়া মানুষগুলো, যারা আমাদের উচ্চশিক্ষিত বানাতে তাদের সবকিছু অকাতরে বিলিয়ে দিয়ে যাচ্ছেন। তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে আমরা শিক্ষিত সমাজই এ সমাজ ও দেশটাকে ভালোভাবে গড়ব ও মনের মাধুরী দিয়ে সাজাব, সকল অসুস্থতাকে সারিয়ে তুলব।

কিন্তু শিক্ষিত সমাজের অধিকাংশ মানুষ আজ চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। কারণ অধিকাংশ উচ্চ শিক্ষিত মানুষ একখানা সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেছেন শুধু একটা চাকরি লাভের উদ্দেশ্যে ও অর্থ উপার্জনের জন্য। এজন্য আজ আমাদের উচ্চশিক্ষার মান ক্রমাবনতিশীল। বিশ্বের দরবারে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান একদম তলানিতে। ফলে আমরা আজ উচ্চ শিক্ষিত বটে তবে সুশিক্ষিত ও সুমানুষ হতে পারিনি।

দুর্নীতিই আজ এক নম্বর সামাজিক ব্যাধি। আঠারো কোটি জনসংখ্যার এ প্রিয় মাতৃভূমিতে দুর্নীতি করে এরকম জনসংখ্যা মোট কত? দেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা কত ভাগ কিংবা দেশের টাকা সুইজারল্যান্ড, ভারত কিংবা মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য দেশে পাচারকারীর সংখ্যাই বা কত? তারা কি অধিকাংশ শিক্ষিত সমাজের, না অশিক্ষিত জনগোষ্ঠী এর হিসেব-নিকেশ মেলানো দায়।

মাঝে মাঝে শুনি একদল অন্য দলকে দোষারোপ করে যে সুইস ব্যাংকে অমুক দলের নেতাদের টাকাই বেশি। তাই তারা দুর্নীতিবাজ। ফলাফল কেউ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সত্যিকার অর্থে সচেষ্ট নয়। তাহলে এদের নিয়ন্ত্রণের মূল দায়িত্ব কাদের?

দেশে দুর্নীতিপরায়ণ মানুষের সংখ্যা খুব বেশি নয়। সাধারণ কৃষক কিংবা শ্রমিকরা দুর্নীতি পরায়ণ নন। তারা অল্পতেই তুষ্ট। একজন কৃষক মৌসুম শেষে ভালো ফলন আর পণ্যের ভালো বাজারমূল্য পেলে মন খুলে হাসি দেন, আর শ্রমিক বেলা শেষে পাওনা বুঝে পেলে তৃপ্তির ঢেকুর তোলেন। কিন্তু দেশের শিক্ষিত সমাজ আজ দিশেহারা। তারা যেন লেখাপড়াই করেন সম্পদের পাহাড় গড়ার উদ্দেশ্যে। এটা করতে গিয়ে তারা নেশাগ্রস্ত হয়ে যান পাওয়ার নেশায়, শুধু চাই আর চাই। অবশ্য ব্যতিক্রমও আছেন। তারা আজ কোণঠাসা।

অসুস্থতার বিস্তৃতিটা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। কিছুদিন আগে বিশিষ্ট অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেছেন যে, ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি ও সরকারি কর্মচারীদের ওপর সরকারের একচ্ছত্র নির্ভরশীলতাই চাকরি প্রত্যাশীদের বিসিএস পরীক্ষার প্রতি আকর্ষণের মূল কারণ।

আমার কর্মক্ষেত্র সুপ্রিম কোর্ট কিংবা জজ কোর্টের লোকজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে অনেকে বলেন কোর্টের ইট-পাথরও ঘুষ খায়! তখন লজ্জা লাগে। আমরা উত্তর দিতে চেষ্টা করলেও বাস্তবতা ও বিবেকের দংশনে থেমে যাই। আদালতে দুদক কিংবা কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রবেশের সুযোগ নেই। এই সুযোগটা কাজে লাগাচ্ছেন অসাধু কিছু কর্মকর্তা। এ জন্যই দরকার ছিল ক্ষমতার ভারসাম্য নীতির প্রয়োগ করা। আবার এটাও তো সত্য যে, দুদক দুর্নীতির ঊর্ধ্বে কোনো সংস্থা নয়। সেটির দুর্নীতি দূর করার জন্য আবার ভিন্ন সংগঠন বানাতে হবে।

মানুষের জীবনে এমন একটা সময় আসে যখন নিজের জন্য চাওয়া-পাওয়ার আর কিছু থাকে না। তখন শুধু দেওয়ার সময়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ডা. আবুল কালাম আজাদের কথা। তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পদত্যাগী মহাপরিচালক। চাকরির মেয়াদ শেষে সরকারের সুনজরে এসে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়ে তিনি কাজ করেছেন। তার দেয়ার ছিল অনেক, নেওয়ার কিছুই ছিল না। তিনি যত দিতে পারতেন, ততই তিনি ধনী হতেন। কিন্তু বেলা শেষে আজ তিনি নিঃস্ব ও রিক্ত। তার মতো অনেকেই আজ কাড়ি-কাড়ি টাকা-পয়সার মালিক হয়েও মানসিকভাবে নিঃস্ব ও সামাজিকভাবে দেউলিয়া হয়ে গেছেন। তারা আজ মানসিক ও সামাজিক রোগী।

মানুষ টাকার অভাবে মানসিক ও সামাজিক রোগী হন না। বরং অধিক টাকা মানুষকে 'সাইকো সোমাটিক' রোগী বানিয়ে ফেলে। তারা যত পান, তত চান। ফলে তারা সামাজিকভাবে অহংকারী হয়ে যান। কি বাজারে, কি মাজারে, কি সংসারে তারা বেপরোয়া আচরণ ও বাজে ব্যবহার করেন। এগুলো করতে করতে একদিন নিজের পতন নিজেই ডেকে আনেন।

আমার জনৈক আইনজীবী বন্ধু বলেছেন, একসময় মানুষ যখন ঘরে টাকা রাখতেন তখন মাঝে মাঝে টাকা দেখার সুযোগ হতো। হাতে নাড়াচাড়া করা যেত। মানুষ টাকা চোখে দেখতে পেলে, নাড়া-চাড়া করতে পারলে মনে হয় তার কাছে টাকা আছে। আর বর্তমানে টাকা-পয়সা, সোনা-গয়না ব্যাংকে জমা রাখার ব্যবস্থা থাকায় টাকা-পয়সা ও সোনা-গয়না থাকার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়েছে। এটি এরকম যে 'গ্রন্থগত বিদ্যা আর পর হস্তে ধন, নহে বিদ্যা নহে, ধন হলে প্রয়োজন।' টাকা মানুষ কামাই করে খরচের জন্য আর সোনা কেনে ব্যবহারের জন্য। খরচ ও ব্যবহার না করতে পারার অর্থ টাকা ও সোনার কোনো কাজে না আসা। এ টাকা ও সম্পত্তি তাকে মানসিক অশান্তি ছাড়া কিছুই দিতে পারে না। এটা শুধু কবর পর্যন্তই নয় বরং রোজ কেয়ামতেও সম্পত্তির মালিককে নিশ্চয়ই ভোগাবে।

কী হলো এ সমাজটার? 'ইত্যাদি'র জনপ্রিয় উপস্থাপক হানিফ সংকেত তার একটি আলোচনায় বলেছেন যে, দেশে একটা নতুন 'শো'র আবিষ্কার হয়েছে যার নাম 'টকশো'। এখানে যারা আলোচক তারা জানেন না এমন কোনো বিষয় বাকি নেই। রাজনীতি, অর্থনীতি, চিকিৎসাবিজ্ঞান, পররাষ্ট্রনীতি ইত্যাদি সবকিছুরই তারা ছবকদাতা আর সব দর্শক-শ্রোতা তাদের ছাত্র। তারা যেন সর্বজান্তা! গুটিকয়েক মানুষ ঘুরে-ফিরে এই টিভি থেকে সেই টিভির আলোচক।

সমসাময়িক সময়ে তাদের কাটতি কম। কারণ সাহেদ এখন জেলে আর সাহসী ও বিরোধী কাউকে এখন আর কেউ ডাকে না, তাই তাদের দেখা যায় না। গুটিকয়েক গেলেও তারা টিকে থাকার জন্য মরিয়া। এ কারণেই কম্প্রোমাইজ করেন। বেসরকারি টিভিগুলো যেন বিটিভিরই বি-টিম। তাই এখন আর দেখা হয় না।

পৃথিবীর ২১৩টি দেশ ও অঞ্চলে মরণঘাতী করোনা ভাইরাসের বিস্তৃতি ঘটেছে। কিন্তু করোনার রিপোর্ট নেগেটিভকে পজেটিভ আর পজেটিভকে নেগেটিভ বানিয়েছে এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। এটা ঘটেছে শুধু আমাদের কষ্টার্জিত মাতৃভূমি বাংলাদেশে। যারা এর সাথে জড়িত তারা সবাই স্ব-স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ও নীতি নির্ধারক।

টাকার অভাবে এগুলো তারা করেননি বরং অধিক লোভে করেছেন। ডা. আবুল কালাম আজাদ সাহেবরা প্রতারক সাহেদ ও ডা. সাবরিনাদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে দেশের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন। বিশ্বের আনাচে-কানাচে আমাদের বদনাম। আল-জাজিরা থেকে শুরু করে নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয়তে মহামারি চলাকালে আমাদের দুর্নীতির খবর!

একজন সাহেদ কিংবা একজন জি কে শামীমকে নিয়ে আমরা এখন মহাব্যস্ত, কিন্তু এ রকম লক্ষ সাহেদ ও শামীম আজ ঘরে ঘরে। তাই আমাদের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে। এখনই উপযুক্ত সময় দুর্নীতি ও দুর্নীতিবাজ দমনের। তবে তাদের আইনের আওতায় আনতে দরকার সত্যিকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়েই দেশটাকে স্বাধীন করা হয়েছিলো লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে। আজ সে স্বপ্ন যেন ফিকে হতে চলেছে!

নতুন প্রজন্মের অনেকেই আজ রাজনীতিকে ভয় পায়, কেউ কেউ ঘৃণাও করে। আসলে এটা ঠিক নয়। রাজনীতি ব্যতীত সুন্দর রাষ্ট্রব্যবস্থা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি ভালো রাজনৈতিক নেতা ছাড়া উন্নত রাজনীতিও সম্ভব নয়। একজন বঙ্গবন্ধু না হলে আমরা যেমন স্বাধীন বাংলাদেশ পেতাম না, ঠিক তেমনি দুর্নীতি দমনের জন্য সুদীপ্ত কণ্ঠটি আজও আমরা শুনতে পেতাম না। তাই আমাদের রাজনীতিবিমুখ হলে চলবে না। আজকের শিশুই আগামী দিনের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী কিংবা সাংসদ।

একটি ভালো আইনি ব্যবস্থাপনা, আইনি কাঠামো ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ তথা আইনের শাসনই পারে সামাজিকভাবে সম্পূর্ণ অসুস্থ সমাজ এ সমাজব্যবস্থাকে আস্তে আস্তে হলেও সুস্থতার দিকে নিয়ে যেতে। কিন্তু শুধু আইনের ওপর ভরসা করলেই হবে না। আমাদের নিজেদের বদলাতে হবে- নেশার জগত থেকে, টাকার নেশা তথা কাড়ি কাড়ি টাকা কামানোর নেশা থেকে। সামাজিক ব্যাধি। সেটা ঘরের হোক কিংবা বাইরের হোক, আইন দিয়ে অনেক সময় সারানো সম্ভব নয়। অল্প স্বল্প নীতি নৈতিকতা থাকলেও চলে।

দিন শেষে নিজেকে প্রশ্ন করা শুরু করতে হবে- আজ সারা দিন ভালো কাজ কতগুলো আর খারাপ কাজ কতগুলো করেছি। খারাপ থেকে দূরে সরে আসার নামই কিন্তু সামাজিক চিকিৎসা। আমি আমারটা শুরু করতে পারি। এজন্য অল্পতে তুষ্ট থাকার নীতি অবলম্বন করতে হবে।

আসুন, আমরা একটু খেয়াল করি আর চিন্তা করি যে আমাদের দেশ থেকে সম্প্রতি অতি ধনী যারা না-ফেরার দেশে চলে গেলেন, তারা কী নিয়ে যেতে পারলেন আর কী রেখে গেলেন। ত্রিশ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে বই বিলি করা একুশে পদকপ্রাপ্ত 'পলান সরকার' আমাদের মাঝে যে দৃষ্টান্ত রেখে গেলেন, নামীদামি শিল্পপতি ব্যক্তিরা তার সিকিভাগও রেখে যেতে পারেননি। আমার অবস্থাও একই হবে। আমাদের ভালো কিছু থেকে যাবে যার ফল পরকালেও পাব, আবার খারাপও থেকে যাবে যার ফলও ভোগ করতে হবে। আসুন, প্রস্তুতি নেই।

লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

(ঢাকাটাইমস/২৬জুলাই/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

পাঠকের অভিমত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :