পণ্য ও সেবার প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিতই প্রধান লক্ষ্য: মফিজুল ইসলাম

হাবিবুল্লাহ ফাহাদ ও আল আমিন রাজু
| আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০২০, ১৬:১৮ | প্রকাশিত : ২০ ডিসেম্বর ২০২০, ১১:৫৪

বাজারে পণ্যের দাম নিয়ে কারসাজি নিয়ন্ত্রণ করে সুস্থ প্রতিযোগিতা বজায় রাখতে ২০১২ সালে সরকার ‘বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন’ গঠন করে।

ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ উৎসাহিত করতে ষড়যন্ত্রমূলক, যোগসাজশ, মনোপলি ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা বজায় রাখাই কমিশনের লক্ষ্য।

প্রতিযোগিতা কমিশনের সর্বশেষ অগ্রগতি ও কর্মপরিকল্পনা নিয়ে ঢাকা টাইমসের সঙ্গে কথা বলেছেন কমিশনের চেয়ারপারসন মো. মফিজুল ইসলাম। জানিয়েছেন সংস্থার কর্মপরিকল্পনা ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে।

প্রতিযোগিতা কমিশন সম্পর্কে তিনি বলেন, বাজারকে সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক করাই হচ্ছে প্রতিযোগিতা কমিশনের কাজ। কমিশনের নিজস্ব আইন আছে। বাজারে প্রতিযোগিতাবিরোধী যদি কোনো কাজ হয় তাহলে সেই আইনের আওতায় শাস্তি দেওয়া হয়। আমরা জরিমানা করতে পারি। প্রতিযোগিতা কমিশন থেকে যে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে সেটি না মানলে বা কমিশনের কাজে অসহযোগিতা করলে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে মামলা করার সুযোগ রয়েছে। বাজারে যেসব পণ্য ও সেবা রয়েছে সেগুলোর ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কাজ করে প্রতিযোগিতা কমিশন। বাজারে প্রতিযোগিতা থাকলে সাধারণ মানুষ ন্যায্যমূল্যে ভালো পণ্য ও সেবা পাবে। কিন্তু যদি কোনো প্রতিষ্ঠান একা কোনো পণ্য তৈরি করে বাজারজাত করে তা হলে সে অনেক সময় সুযোগ বুঝে নিজের ইচ্ছেমতো দাম বাড়িয়ে দিতে পারবে। কিন্তু প্রতিযোগিতা কমিশন ক্রেতার অধিকার রক্ষায় ওই প্রতিষ্ঠানকে বাধ্য করবে ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি করতে। এছাড়া কয়েকটি প্রতিষ্ঠান মিলে সিন্ডিকেট তৈরি করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে বিক্রি করতে পারে। ফলে দেখা যায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে এমন কোনো অবস্থা তৈরি করে যা প্রতিযোগিতাবিরোধী। এক্ষেত্রেও প্রতিযোগিতা কমিশন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান তার উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে সর্বোচ্চ শতকরা ১০ ভাগ লাভ করতে পারবে। প্রতিযোগিতা কমিশনের পক্ষ থেকে সেটিই নিশ্চিত করা হবে।

প্রতিযোগিতা কমিশনে ভুক্তভোগীরা কীভাবে অভিযোগ দিতে পারেন সে বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বলেন, প্রতিযোগিতা কমিশনে ভুক্তভোগী ক্রেতাদের অভিযোগ করার সুযোগ আছে। প্রতিযোগিতা কমিশনের নিজস্ব ওয়েবসাইট ও সরাসরি অফিসে এসে অভিযোগ করা যায়। ২০১২ সালে বর্তমান সরকার প্রতিযোগিতা কমিশন আইন করে এবং ২০১৬ সালে প্রতিযোগিতা কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে গঠন করা হয়। একজন চেয়ারপারসন ও চারজন সদস্য নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে প্রতিযোগিতা কমিশন। যাত্রার পাঁচ বছরের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো গোছানোর পাশাপাশি বেশ কিছু অভিযোগের নিষ্পত্তি করেছে কমিশন।

তিনি জানান, গত পাঁচ বছরে ১৩টি লিখিত অভিযোগ এসেছে। যার মধ্যে ৩টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করা হয়েছে। বেশ কিছু অভিযোগ নিষ্পত্তির পথে। তবে প্রতিযোগিতা কমিশন সম্পর্কে মানুষ তেমন কিছু জানে না। প্রতিযোগিতা কমিশনের কাজ সম্পর্কে জানানোর জন্য কমিশনের পক্ষ থেকে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মাঠ পর্যায়ে প্রচারণা, সেমিনার, সংবাদ সম্মেলন ও গণমাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা।

ঢাকার বাইরে প্রতিযোগিতা কমিশনের কার্যক্রম আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে মফিজুল ইসলাম বলেন, আমাদের ঢাকার বাইরে অল্প কিছু কাজ চলছে। তবে আরও কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিযোগিতা কমিশনের আইনে ঢাকার বাইরে প্রচার-প্রচারণা করার সুযোগ আছে।

প্রতিযোগিতা কমিশনের কাজের আওতার বিষয়ে সংস্থাটির চেয়ারপারসন বলেন, প্রতিযোগিতা কমিশনের কাজের আওতা উৎপাদন থেকে ক্রেতার হাত পর্যন্ত। অর্থাৎ একটি পণ্য প্রতিষ্ঠানের উৎপাদক, মূল্য নির্ধারণ, বিপণন ও বাজারে ক্রেতার কাছে ন্যায্যমূল্যে বিক্রি নিশ্চিত করা পর্যন্ত কমিশনের কাজ। এমনকি সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পণ্য কেনাবেচাতেও কমিশনের নজর থাকবে। যেহেতু সরকার সরাসরি সাধারণ মানুষের সঙ্গে ব্যবসা করে না। কিন্তু বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। এক্ষেত্রেও যদি সরকার এমন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যা বাজারে প্রভাব ফেলছে তখন প্রতিযোগিতা কমিশন সরকারকে সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেবে।

সংস্থাটির কাজের অগ্রগতির বিষয়ে তিনি বলেন, আমি দায়িত্ব নিয়েছি মাত্র এক বছর হলো। এর মধ্যে আমরা বেশ কিছু অভিযোগের নিষ্পত্তি করেছি। বাজার যাচাইয়ের জন্য প্রতিযোগিতা কমিশনের বাজার গোয়েন্দা শাখা রয়েছে। যদিও এখনো পুরোপুরি এই শাখাটি কাজ শুরু করতে পারেনি। নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে। এই শাখার কাজ হচ্ছে বাজার যাচাই করা। বাজার কেমন আছে সেটি দেখা। এই শাখাকে আমরা আরও শক্তিশালী করব। তবে ভ্রাম্যমাণ আদালত চালানোর ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। তারা শুধু তথ্য সংগ্রহ করবে। পরে সে অনুযায়ী কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে।

বাংলাদেশে এমন প্রতিষ্ঠান পরিচিত না হলেও বিশ্বের প্রায় দেড় শতাধিক দেশে এমন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যারা দেশের উন্নয়নে সরাসরি ভূমিকা রাখছে উল্লেখ করে এই দক্ষ প্রশাসক বলেন, প্রতিযোগিতা কমিশন বা বাজার প্রতিযোগিতা নামের কমিশন দেশের ১৫০টি দেশে রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতিযোগিতা কমিশন পুরোপুরি কাজ করতে পারলে দেশের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি বা জিডিপিতে ২ থেকে ৩ ভাগ ভূমিকা রাখতে পারে। এতে দেশ লাভবান হবে।

ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা কমিশনের কাজের সঙ্গে মিল-অমিল দুটোই আছে উল্লেখ করে সাবেক এই সিনিয়র সচিব বলেন, ভোক্তা অধিকারের কাজের সঙ্গে আমাদের কাজের মিল নেই। ভোক্তা অধিকার শুধুমাত্র বাজারে ভোক্তার জন্য কাজ করে। অর্থাৎ একজন ক্রেতা পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে ঠকলে বা ন্যায্যমূল্য না পেলে তখন তার জন্য ভোক্তা অধিকার কাজ করে। অথবা বলা চলে বিক্রির ক্ষেত্রে কাজ করে। কিন্তু প্রতিযোগিতা কমিশন বাজার ব্যবস্থার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কাজ করে। অর্থাৎ উৎপাদন, বিপণন এবং বাজারে ক্রেতার হাতে ন্যায্যমূল্যে পৌঁছানোর নিশ্চিত করা পর্যন্ত। এমনকি দুটি প্রতিষ্ঠান একত্রে ব্যবসা করতে চাইলে বা একটি বড় প্রতিষ্ঠান কোনো ছোট প্রতিষ্ঠানকে কিনে নিতে চাইলে প্রতিযোগিতা কমিশনের অনুমতি লাগবে।

তবে খাতা-কলমে প্রতিযোগিতা কমিশনের অনেক বড় কর্ম পরিকল্পনা ও কাজের ক্ষেত্র থাকলেও জনবল সংকটের কারণে থমকে আছে কার্যক্রম। বর্তমানে ৫ সদস্যের কমিশন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রেষণে ক্যাডার সার্ভিসের ১১জন কর্মকর্তা ও হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তাসহ আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে পাওয়া ২২ জন কর্মী দিয়ে সীমিত আকারে কার্যক্রম চলছে। স্থায়ী কর্মী না পাওয়ায় কাজের কিছু সমস্যা হচ্ছে। কারণ আউট সোর্সিং থেকে কর্মী আসার কারণে তারা কিছু দিন পর চলে যান। ফলে নতুন কর্মী আসায় দক্ষতা কমে যায়।কাজের গতিও থেমে থাকে। যদিও নিয়োগ চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। সব কিছু দ্রুত শেষ করে নিয়োগ হলে পুরোদমে কাজ করতে পারবে প্রতিযোগিতা কমিশন। এছাড়া প্রতিযোগিতা কমিশনের আইনের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। কিছু সংশোধন আছে। এগুলোর কাজও চলছে।

মফিজুল ইসলাম বলেন, প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারপারসন হিসেবে আমার এক বছর হয়েছে। যদিও এই সময়ের বড় একটি অংশ করোনা মহামারির কারণে কাজ করা যায়নি। তবু চেষ্টা করেছি কাজ এগিয়ে নেওয়ার।প্রতিযোগিতা কমিশন সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে জানানোর জন্য মন্ত্রণালয়, বিভাগকে সঙ্গে নিয়ে আলোচনা সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম করেছি। প্রচারণার পাশাপাশি গণমাধ্যমকর্মীদের নিয়ে প্রেস কনফারেন্স করেছি। আমরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি গণমাধ্যমকে। কারণ বাজার নিয়ে গণমাধ্যমে উঠে আসা বিভিন্ন নিউজ নিয়ে আমরা কাজ করছি। এমনকি আমাদের কাজের বড় একটি সোর্স গণমাধ্যম। সাধারণ মানুষের অভিযোগের পাশাপাশি সংবাদমাধ্যম আমাদের কাছে কাজের একটি ক্ষেত্র। সাংবাদিকদের সঙ্গে নিয়মিত তথ্য আদান-প্রদানের পাশাপাশি প্রতি তিন মাস পরপর আমাদের কার্যক্রম নিয়ে একটি সাময়িকী প্রকাশ করা হয়। এছাড়া বাজার প্রতিযোগিতা নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের অনলাইন কনফারেন্সেও অংশগ্রহণ করেছি। চলতি বছরের ১৭ জুলাই প্যারিসে অনুষ্ঠিত ওইসিডি-কেপিসি ওয়েভ ওয়ার্কশপে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের পক্ষ থেকে আমি স্বাস্থ্য খাতের বিষয়ে একটি পাওয়ারপয়েন্ট উপস্থাপন করেছি।এছাড়া সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে ভ্রমণ করে ওইসিডি, আইসিএন, কার্টস, সিসিআইয়ের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করেছি। গত ১৬ ডিসেম্বর ফ্রান্সের প্যারিসে কোভিড-১৯ পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রতিযোগিতা কমিশনগুলোর ভূমিকা শীর্ষক জুম মিটিংয়ে আমরা বাংলাদেশ থেকে অংশ নিয়েছি।

কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সাজা ও জরিমানার বিধান রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আমরা অভিযোগ পেলে দুইভাবে সেটির নিষ্পত্তি করি। একটি হলো শুনানি। আর অপরটি হলো তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ। বড় ধরনের জরিমানা এমনকি ফৌজদারি আইনে মামলা করার এখতিয়ার রয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি কমিশনের দেওয়া নির্দেশনা না মানে সেক্ষেত্রে ওই প্রতিষ্ঠানের বিগত তিন বছরের মোট লাভের ১০ শতাংশ জরিমানা করা হবে।

এমনকি বাজার ব্যবস্থার দিকে নজর রাখার পাশাপাশি বাজার গবেষণায় কাজও করবে প্রতিযোগিতা কমিশন। ইতোমধ্যে চাল ও পেঁয়াজ নিয়ে গবেষণা করেছেন। এই গবেষণা থেকে পাওয়া যে তথ্য ও সুপারিশগুলো এসেছে সেগুলো সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। সামনে স্বাস্থ্য সেবা ও চামড়া নিয়ে গবেষণা করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

(ঢাকাটাইমস/২০ডিসেম্বর/এইচএফ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাক্ষাৎকার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :