গর্ভাবস্থায় নারীর দাঁতের যত্ন

ডা. হাসিনা আখতার বেগ
 | প্রকাশিত : ১০ জানুয়ারি ২০২২, ১৯:২৮

আমাদের মতো অনেক উন্নয়নশীল দেশেই গর্ভবতী মায়েরা তাদের মুখগহ্বরের তেমন যত্ন নেন না। এই কারণে তাদের মধ্যে অনেক বেশি দাঁতের সমস্যার দেখা দেয়। ঠিক মতো চিকিৎসা না নিলে পরবর্তীতে তারা নানান রকমের দাতেঁর সমস্যায় ভোগেন।

গর্ভাবস্থায় দাঁতের রোগ কীভাবে সৃষ্টি হয়?

গর্ভাবস্থায় একজন মাকে সন্তান প্রসবের জন্য তিনটি ত্রৈমাসিক অতিক্রম করতে হয়। এই চক্রে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং মাড়িতে রক্তপ্রবাহ বৃদ্ধি করে জিঞ্জিভাইটিসে পরিবর্তিত হয়।

এছাড়া রোগীর যদি চিকিৎসা না করা হয় তাহলে দাঁত ঢিলে হয়ে যাওয়ার সমস্যা হতে পারে। মাড়ি ফুলে যাওয়ার কারণে রোগী দাঁত ব্রাশ বা ফ্লস করার পরেও মাড়ি থেকে রক্তপাত অনুভব করেন। শক্ত খাবার খাওয়ার সময় মাড়িতে অশুষ্টি হতে পারে।

এসব সমস্যা দেখা দেওয়ার পরেও যদি রোগী ডেন্টাল সার্জনের কাছে না যান তবে এই সমস্যা পেরিওডন্টাল রোগে পরিণত হতে পারে। আর এই সমস্যা ডেন্টাল ইনফেকশন সৃষ্টি করে এবং দাঁত শিথিল করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

গর্ভবতী মায়েদের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হতে পারে যা সংক্রমণ সুস্থ করতে বিলম্ব করে। গর্ভবতী মহিলাদের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আসে। বিশেষ করে মিষ্টি খাবারের খাদ্যাভাস থাকলে সঠিকভাবে দাতেঁর যত্ন না নিলে প্রচুর ক্যাভিটির সৃষ্টি হয়।

উপরন্তু এটি প্রেগন্যান্সি গ্রানুলোমা, জিনজিভাইটিস, প্রেগন্যান্সি এপুলিস, দুর্বল দাঁত, মুখের শুষ্কতা ও দাঁতের ক্ষয়ের মতন সমস্যা সৃষ্টি করে থাকে। এই সমস্যাগুলো সাংঘাতিক সমস্যা, যেমন অকালপ্রসব, বাচ্চার কম ওজন ও প্রি-ইকলম্পসিয়াতে পরিণত হতে পারে।

যেভাবে এসব সমস্যা মোকাবেলা করতে হবে

গর্ভবতী রোগী যেকোনো সময় সুপারফিসিয়াল ক্লিনিং এবং কাউন্সেলিংয়ের জন্য ডেন্টালসার্জনের কাছে যেতে পারেন। তবে কিছু নির্দিষ্ট সময়ের পর দাঁতের রোগের চিকিৎসা করানো উচিত না। গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের অর্থাৎ ১৪ সপ্তাহ থেকে ২০ সপ্তাহের মধ্যে দাঁতের রোগের চিকিৎসা নেওয়া উচিত।

বিশেষ দ্রষ্টব্য:

গাইনোকোলজিস্টকে অবশ্যই গর্ভবতী মায়েদের দাঁতের অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করতে হবে। যাতে করে বিশেষজ্ঞ দাঁতের জরুরি চিকিৎসা অনুমোদন করতে পারেন।

এই সময়ের মধ্যে দাঁতের যে ধরনের চিকিৎসা নেওয়া যেতে পারে

ক) দাঁত পরিষ্কার করানো

খ) লোকাল অ্যানেস্থেসিয়ার মাধ্যমে দাঁত সরিয়ে নেওয়া

গ) রুট ক্যানাল ট্রিটমেন্ট (গাইনোকোলজিস্তের থেকে মায়ের অবস্থা জানার পর)

ঘ) ক্যাভিটি ফিলিং করানো

গর্ভাবস্থায় মৌখিক পরিছন্নতা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য টিপস

গর্ভবতী মা যদি সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে এই ধরনের ঝুঁকি এড়াতে চান তবে তার এই পদক্ষেপগুলি অনুসরণ করা উচিত:

১) প্রতিদিন দুইবার নরম ব্রিসল টুথব্রাশ দিয়ে দাঁত ভালোভাবে পরিষ্কার করা। রাতের খাবারের পরে ঘুমাতে যাওয়ার ঠিক আগে এবং সকালের নাস্তা করার ঠিক ১৫ মিনিট পরে।

২) সঠিকভাবে দাঁত ফ্লস করা; ভারী খাবার খাওয়ার পর যে দাঁতগুলো কাছাকাছি থাকে সেগুলো ফ্লস করা উচিত।

৩) ক্লোরোহেক্সিডিন মাউথওয়াশ ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে গন্ধ যদি গর্ভবতী মহিলাদের জন্য সহনীয় হয়। অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল মাউথওয়াশ লালা থেকে ব্যাকটেরিয়া অপসারণ করে দাঁতের সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারে।

৪) ইন্টারডেন্টাল ব্রাশ ব্যবহার। এটি দাঁতের মধ্যে খাবারের আটকে থাকা কনা পরিষ্কার করতে সহায়তা করবে যদি দাঁতের ফাঁক থাকে। এফডিএ এক্ষেত্রে এই ব্রাশ প্রযোজ্য বলে স্বীকৃতি দিয়েছে।

৫) রঙিন মিষ্টি খাবার খাওয়ার পর দাগ পড়লে স্টেইন রিমুভার ব্যবহার করা যেতে পারে।

৬) ফ্লোরাইড টুথপেস্ট দাঁতের ক্ষয় দূর করতে সহায়তা করে।

৭) নোনাজল মুখের ভেতরে পিএইচ ভারসাম্য বৃদ্ধি করে কাজ করে। আরো অনেক বেশি ক্ষারীয় মৌখিক পরিবেশ তৈরী করে।এর ফলে ব্যাকটেরিয়া বিকাশ করতে সক্ষম হয় না। তাই গর্ভবতী মায়ের কুসুম গরম পানিতে লবণ পরিমাণ মতো মিশিয়ে কুলকুচি করা উচিত।

৮) ভিটামিন সি-যুক্ত খাবার এবং শাকসবজি মাড়ির ফোলা ভাব প্রতিরোধ করতে পারে এবং রক্তপাত বন্ধ করতে পারে।

৯) ভিটামিন ডি এবং ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার দাঁতের হাড় মজবুত করতে সহায়তা করে।

১০) পানি পান করা দাঁতে প্লাক তৈরি প্রতিরোধ করতে সহায়তা করে এবং মুখের লালা থেকে ব্যাক্টেরিয়া সরাতে সহায়তা করে।

দাঁতের চিকিৎসার সময় গর্ভবতী রোগীর অঙ্গস্থিতি বজায় রাখা

ডেন্টাল ইউনিটে গর্ভবতী মায়েদের জন্য কাৎ করে আধা-সোজা অঙ্গস্থিতিতে বসানোর পদ্ধতি সবচেয়ে ভালো। গর্ভবতী মায়েরা সবসময় ডেন্টাল সার্জনের কাছে যেতে ভয় পান। তবে ভাল ব্যাবহারের সঙ্গে সঠিক কাউন্সেলিং এবং ডেন্টাল ইউনিটে কাৎ ও আধা-সোজা অঙ্গস্থিতি রোগীকে উপশম করবে। রোগীর আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সহায়তা করবে। এর ফলে রোগীর দাঁতের চিকিৎসা নিখুঁতভাবে করা যাবে।

লেখক: বিডিএস (ঢাবি), পিজিটি (শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল) এবং এমপিএইচ (স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন) ডিগ্রিধারী। বর্তমানে ওরাল ও ডেন্টাল সার্জন হিসেবে ঢাকার বারিধারায় ফরাজী হাসপাতালে কর্মরত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :