ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে কার্যকরী ভেষজ আমলকী

প্রাকৃতিক ভেষজ গুণে অনন্য একটি ফল আমলকী। শতাব্দী প্রাচীন আয়ুর্বেদ অনুযায়ী আমলকী হলো মহাঔষধি। এর ফল ও পাতা দুটিই ওষুধরূপে ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন অসুখ সারানো ছাড়াও আমলকী রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে দারুণ সাহায্য করে। আমলকীর গুণাগুণের জন্য আয়ুর্বেদিক ওষুধেও এখন আমলকীর নির্যাস ব্যবহার করা হয়।
সকাল বেলা খালি পেটে একটু আমলকীর রস বা নাশতা খাওয়ার পর এক টুকরো আমলকীর গুণে অনেক রোগ নিরাময় হয়ে যায়। বাইরে থেকে ওষুধ খেলে সাময়িক লাভ হয় ঠিকই। কিন্তু আমলকী ভিতর থেকে শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করে। আয়ুর্বেদে ভোজনের আরম্ভে, মধ্যভাগে এবং শেষে নিয়মিত আমলকী খেতে বলা হয়েছে। এই ফলের গুণ অমৃত সমান-সেই জন্য একে অমৃতফলও বলা হয়।
আমলকী গাছের বৈজ্ঞানিক নাম ফাইলান্থাস অ্যামব্লিকা। ছোট বা মাঝারি আকারের পাতাঝরা বৃক্ষ। এ গাছ ১০-২০ ফুট পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। গাছের বাকল স্তরবিশিষ্ট। শীতকালে আমলকীর পাতা ঝরে যায়।
আমলকীর জন্মস্থান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। পাহাড়ের প্রায় এক হাজার ৫০০ মিটার উচ্চতায়ও এ গাছ জন্মে থাকে। পাতা পক্ষল ও যৌগিক। বোঁটার দুই পাশে চিরুনির দাঁতের মতো সাজানো থাকে। আমলকী ফুল একলৈঙ্গিক। পুরুষ ফুল বোঁটাযুক্ত। এ ফুল ডালের ওপরের দিকে ধরে, আগে আসে এবং সংখ্যায় অনেক বেশি। স্ত্রী ফুল বোঁটাহীন ও ডালের নিচের দিকে ধরে। ফুল আকারে খুবই ছোট, খালি চোখে দেখা কষ্টসাধ্য। স্ত্রী ও পুরুষ ফুল একই শাখায় প্রস্ফুটিত হয়। আমলকী বায়ুপরাগায়িত।
আমলকী ফল মৃদু শিরাবিশিষ্ট, গোলাকৃতি, মাংসল ও রসাল। ফলের রং হালকা সবুজ বা হলুদ। ভেতরে ছয়টি বীজের সমষ্টির একটি কঠিন আঁটি থাকে। এ উপমহাদেশে আমলকীর বেনারসি জাতটি সবচেয়ে ভালো। ফল পাকে শীতকালে। আমলকি ফলের প্রতি ১০০ গ্রামে ৮১ গ্রাম পানি, ০.৫ গ্রাম আমিষ, ১৪ গ্রাম শ্বেতসার, ০.১ গ্রাম স্নেহ, ০.৭ গ্রাম খনিজ পদার্থ, ৩.৫ গ্রাম আঁশ, ০.০৫ গ্রাম ক্যালসিয়াম, ০.০২ গ্রাম ফসফরাস, ১.৫ গ্রাম আয়রন, ৩০ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি এবং ১৪০০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি আছে। প্রতি ১০০ গ্রামে ৫৯ কিলোক্যালরি তাপশক্তি বিদ্যমান।
১০০ গ্রাম আমলকীতে ভিটামিন সি আছে ৪৬৩ মিলিগ্রাম। আমলকীতে পেয়ারার তিন গুণ ও কাগজি লেবুর চেয়ে ১০ গুণ বেশি ভিটামিন সি রয়েছে। এ ছাড়া কমলার চেয়ে ১৫, আপেলের চেয়ে ১২০, আমের চেয়ে ২৪ ও কলার চেয়ে ৬০ গুণ বেশি ভিটামিন সি রয়েছে এতে।
আমলকী প্রক্রিয়াজাত করলে ভিটামিন সি-এর পরিমাণ কমে যায়, তবে আমলকীর অ্যাসকরবিক এসিড স্থায়ী। কেননা, এটা ট্যানিন ও অ্যান্থোসায়ানিন দিয়ে আবৃত থাকায় সহজে অক্সিডেশন হয় না। নিষ্কাশিত ফলের রসের ভিটামিন এক সপ্তাহ পর্যন্ত অবিকৃত থাকে। একটু সচেতন হলে প্রতিটি বাড়িতে একটি আমলকী গাছ রোপণ করলে ভবিষ্যৎ বংশধরের জন্য ভিটামিন সি-এর ভালো উৎস আমরা রেখে যেতে পারি। আমলকীর জেলি, মোরব্বা বেশ সুস্বাদু। ফল ফালি করে কেটে রোদে শুকিয়ে লবণ, জোয়ান ইত্যাদির সঙ্গে মিশিয়ে মুখশুদ্ধি হিসেবে ব্যবহার হয়।
প্রতিদিন দুটো করে আমলকী খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। ভেষজ যত ফল রয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে উপরেই আছে এই ছোট্ট ফলটি। চুলের জেল্লা বৃদ্ধি, রুক্ষতা কমানো, ত্বকের উজ্জ্বলতা, পেটের গোলযোগ দূর, শরীর চাঙ্গা এমন হাজারও সমস্যার সমাধান করে আমলকী। সকালে কাঁচা আমলকী, বা ভাতে সিদ্ধ করে আমলকী খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। জেনে নিন ভেষজ আমলকীর স্বাস্থ্য উপকারিতা-
রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়। আমলকী কেটে কাঁচা খেতে পারলে খুবই ভাল। তবে এখন আমলকীর রসও পাওয়া যায়। ভাল মানের আমলকীর রস খেতে পারলেও একই কাজ হবে। সাধারণ ঠান্ডা লাগা, সর্দি-কাশি, সংক্রমণ ছাড়াও ডায়াবেটিস, হার্টের সমস্যা, ক্যানসারের মতো রোগও ঠেকিয়ে রাখা যায় নিয়মিত আমলকীর ব্যবহারে।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আমলকী খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। আমলকী এমনই একটি ভেষজ, যা খেলে রক্তে চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে। বেশিরভাগ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করতে আমলকী খাওয়ার পরামর্শ দেন। আমলকী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করে এবং ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এটি অন্যতম সেরা ভেষজ।
ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ড মেডিকেল সেন্টারের মতে, আমলা খাওয়া অগ্ন্যাশয়ের উপর কার্যকর প্রভাব দেখায়। ইনসুলিন, যা অগ্ন্যাশয়ে উৎপাদিত হয়, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ। আমলায় ক্রোমিয়াম উপাদান পাওয়া যায় যা একটি খনিজ এবং কার্বোহাইড্রেট বিপাক নিয়ন্ত্রণ করে। এটি ইনসুলিন হরমোনকে শক্তিশালী করে রক্তে চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে কার্যকরী। এতে উপস্থিত অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমায়, এটি রক্তে শর্করার পরিমাণও নিয়ন্ত্রণে রাখে। আমলার উপকারিতা সম্পর্কে বলতে গেলে, ভিটামিন সি সমৃদ্ধ আমলা একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। আর্কাইভস অফ ইন্টারনাল মেডিসিনে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে যে ভিটামিন সি স্তর এবং ডায়াবেটিসের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক রয়েছে।
কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর করে। গরম থেকে ঠান্ডা এবং ঠান্ডা থেকে গরম পড়ার মুখে অনেকেই কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় ভোগেন। ইসবগুল, ওষুধ খেয়েও অনেক সময়ে উপকার হয় না। সেই সময়ে আমলকী কিন্তু বিশেষ ভাবে কাজে আসে। হজম সংক্রান্ত সমস্যা দূর করে কোষ্ঠ পরিষ্কার রাখে আমলকী।
নিয়মিত আমলকী খেলে ত্বক সুস্থ থাকে। নানা রকমের চর্মরোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। এছাড়াও এটি ত্বকের উজ্জ্বলতা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।
প্রতিদিন সকালে আমলকীর রসের সঙ্গে মধু মিশে খাওয়া যেতে পারে। এতে ত্বকের কালো দাগ দূর হবে ও ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়বে।
দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধিতে আমলকী খুবই উপকারী। এছাড়া চোখ লাল হওয়া, চুলকানো ও চোখ দিয়ে পানি পড়া রোধেও আমলকী বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
আমলকী শরীরের কর্মক্ষমতা বাড়িয়ে ব্যাথা বেদনা কমিয়ে দেয়। এক গ্লাস পানিতে দু চামচ আমলকী বেটে, দু’চামচ মধু দিয়ে খেলে সর্দি কাশিতে খুব আরাম হয়। এছাড়া দেহের অতিরিক্ত মেদ দূর করতে আমলকী বেশ কার্যকরী।
আমলকীতে ভিটামিন সি ও অ্যামিনো অ্যাসিড যা চুল পড়া কমানোর পাশাপাশি বাড়ায় চুলের বৃদ্ধি। খুশকি দূর করতেও এর জুড়ি নেই। চুল এবং ত্বকের স্বাস্থ্য মজবুত রাখে আমলকী।
আয়ুবের্দিক হেয়ার টনিক হিসবে আমলকীর জুড়ি নেই। অকালপক্বতা দূর করে নতুন চুল গজাতে এটি বেশ কার্যকর। এক্ষেত্রে আধা কাপ আমলকীর সঙ্গে ১ কাপ পানি ও ১ টেবিল চামচ মধু মিশিয়ে একঘণ্টা রেখে দিন। তারপর চুল শ্যাম্পু করে দ্রবণটি দিয়ে ধুয়ে নিন। ৫ মিনিট অপেক্ষা করে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এতে আপনার চুল পড়া বন্ধ হবে।
চুলের উজ্জ্বলতা বাড়াতে ১ টেবিল চামচ আমলকীর সঙ্গে ১ চা চামচ লেবুর রস মিশিয়ে নিন। এবার পেস্টটি ভেজা চুলে ম্যাসাজ করুন। ৩০ মিনিট পর শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এতে আপনার চুল হয়ে ওঠবে ঝলমলে।
গরম পানিতে মধুর সঙ্গে প্রতিদিন আমলকীর গুঁড়া মিশিয়ে খেতে পারেন। আমলকী ছেঁচে তার থেকে রস বার করে প্রতিদিন সকালে খালি পেটে খেতে পারেন। আমলকী দিয়ে বানিয়ে নিতে পারেন আচার। চিনি খেতে যদি সমস্যা না থাকে, সে ক্ষেত্রে বানিয়ে নিতে পারেন আমলকীর মোরোব্বা। আমলকী কেটে রোদে শুকিয়েও খাওয়া যেতে পারে।
আমলকী বেশি খেলে হতে পারে হীতে বিপরীত। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, যাদের অম্বলের সমস্যা খুব বেশি, নিয়মিত আমলকী খেলে তাদের সেই সমস্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকে। যাদের রক্ত পাতলা হয়ে যাওয়ার সমস্যা আছে, তাদের আমলকী না খাওয়াই ভালো। রক্ত আরও পাতলা হয়ে যেতে পারে। আমলকীতে রক্ত বন্ধ না হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। রক্তপাত বন্ধ না হলে টিস্যু হাইপক্সেমিয়ার মতো সমস্যা হতে পারে।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












































