১৯৪৭ পরবর্তী বাংলা সাহিত্যে মোবাশ্বের আলী

মোবাশ্বের আলীর প্রথম দিকের সাহিত্য-কর্ম -এদেশের প্রবন্ধ সাহিত্যে মোবাশ্বের আলী এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব ও সুপরিচিত একটি নাম। তার প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থ মধুসূদন ও নব জাগৃতির মধ্যেই তার প্রবন্ধের উপযোগিতা ও আবেদন পরিস্ফুট। তার জ্ঞান-বুদ্ধি, কল্পনা ও হৃদয় বৃত্তির সমন্বয়ে তিনি যে শব্দিত নীবিবন্ধন সৃষ্টির মাধ্যমে সুশৃঙ্খল ভাব-সমৃদ্ধ সহজ সরল রচনা শৈলীর উদ্বোধন করেছেন তার প্রাথমিক প্রবন্ধে- তাতেই বিধৃত তার নিজস্ব গদ্যরীতির বিশিষ্টতা ও মৌলিকত্ব। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রবন্ধ-সাহিত্য যদেও আধুনিককালের সৃষ্টি, এর গুরুত্ব সাহিত্যের অন্যান্য শাখা অপেক্ষা সর্বাধিকরূপে বিবেচিত সাম্প্রতিক সাহিত্য পরিমন্ডলে। পাঠক ও লেখকের মধ্যে প্রত্যক্ষ সেতুবন্ধ রচনায় উপন্যাস, কবিতা, ছোট গল্প, নাটিকা, গল্প, নাটক ইত্যাদি অপেক্ষা প্রবন্ধের আবেদন সর্বাধিক। বিধায় সৌন্দর্য সৃষ্টি, আনন্দদান এবং জ্ঞান বিতরণের প্রেক্ষিতে একজন প্রাবন্ধিক পাঠকের অন্তরে অবলীলাক্রমে সহজে আসন লাভ করতে সক্ষম তার সৃষ্ট ভাষার বেগবান ও প্রাণস্পর্শী মোহিনী শক্তির বলে। মোবাশ্বের আলীর ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম ঘটেনি বলেই তার প্রবন্ধ বলয়ে নিজ পান্ডিত্যের গভীরতায়, বুদ্ধির দীপ্তিতে, সমলোচনার উদ্ভাবনী প্রক্রিয়ায় ও বিশ্লেষণের জন্য ‘বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার-৭৪ লাভ করেন বাংলা সাহিত্যে তার অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ। ভাষা আন্দোলনে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ তার মানব গঠনে বিশাল ভূমিকা রেখেছে। [মোহাম্মদ লিয়াকতউল্লাহ : ২০১১ : ১৬৬]
বর্তমানকালে পৃথিবীর যে কো সাহিত্যে প্রবন্ধের মূল্যবান ভূমিকার বিষয় সর্বজনস্বীকৃত। যে যুগে শুধু কবিতাই ছিল সাহিত্যের প্রাণবস্তু, সে যুগ এখন বিগত। বাস্তব প্রয়োজনে ও সভ্যতার বিকাশে প্রবন্ধ সাহিত্য আজকাল সাহিত্যের অন্যান্য শাখার শীর্ষে অধিষ্ঠিত। তাই একজন প্রতিভাবান প্রাবন্ধিকের ভূমিকা পৃথিবীর যে কোন অঞ্চলের সাহিত্যে আর নিছক ভাবাবেগের বিষয় নয়-বরং তথ্য ও তত্ত্বের পরিবেশনা ও তার তুলনামূলক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের জন্য একজন বিখ্যাত কবির চেয়ে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। মোবাশ্বের আলীর প্রাবন্ধিক তার প্রধান বৈশিষ্ট: তার বক্তব্য প্রকাশের সরলতা, শব্দ ব্যবহারের নিপুণতা, বাণী ভঙ্গির অন্তরঙ্গতা, লালিত ভাবের প্রবহমানতা, ঘটনা বিন্যারে তুলনামূলক বিশ্লেষণের দক্ষতা, পর্যায়ক্রমিক বক্তব্য বিন্যাসে সচেতনতা ও সহজ শব্দ নির্বাচনের ঐকান্তিকতা ইত্যাদি। [মোহাম্মদ লিয়াকতউল্লাহ : ২০১১ : ১৬৬]
এ প্রসঙ্গে তার প্রথম গ্রন্থের প্রথম প্রবন্ধের প্রথম পংক্তি ও অদ্যাবধি প্রকাশিত সর্বশেষ প্রবন্ধের শেষ পংক্তি উল্লেখ করা যেতে পারে- উনিশ শতকে ইংরেজী শিক্ষার মাধ্যমে য়ুরোপীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হবার ফলে অকস্মাৎ বাঙ্গালি জীবনের প্রচণ্ড আলোড়ন ঘটে এবং এর ফল সুদূর প্রসারী হয়। একেই রেনেসাস বা নবজাগরণ বলে। (উনিশ শতকে নবজাগরণ/মধুসূদন ও নবজাগৃতি/প্রথম সংস্করণ কার্তিক ১৩৭০ বাংলা)
“অরেষ্টিয়ার নিয়তি কর্তৃক নির্দেশিত পাপের দরুন দুঃখ ভোগ, ফলে অজ্ঞানতা হতে জ্ঞান লাভ বা আত্মোপলব্ধি এবং পরিণামে মুক্তি বা পরিত্রাণ লাভ করতে দেখা যায়। ইস্কিলাস দুঃখকে এমন মহিমময় করে তুলেছেন বলেই তার ট্র্যাজেডী আমাদের জীবনের প্রতি এতখানি প্রত্যয় এনে দেয়”Ñ (ইস্কিলাস ও অরেস্টিয়া/পাণ্ডুলিপি/চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা সাহিত্য সমিতির বার্ষিক গবেষণা পত্রিকা ১৩৮০ সংখ্যা)। তার প্রবন্ধ রীতির এ সকল গুণের জন্য পাঠক মহলে তাঁর রচনার আবেদন এত গভীর ও তীব্রভাবে অনুভূত এবং তিনি সুপরিচিত। অবশ্য এ অনুষঙ্গে তাঁর প্রবন্ধ-গ্রন্থনায় মাঝে মধ্যে লক্ষ্যভ্রষ্টতা ও প্রবন্ধ রচনায় ক্ষেত্র বিশেষে পুনরুক্তি প্রসঙ্গ বর্জনের ত্রুটিও পরিদৃশ্যমান। [মোহাম্মদ লিয়াকতউল্লাহ : ২০১১ : ১৬৬-১৬৭]
মোবাশ্বের আলীর প্রথম গ্রন্থ ‘মধুসূদন ও নবজাগৃতি’ প্রকাশিত হয়-কুমিল্লা হ’তে ১৩৭০ বাংলা সনের কার্তিক তথা ১৯৬৩ সালের অক্টোবর মাসে। এই গ্রন্থে মুদ্রিত প্রবন্ধগুলোর মধ্যে ‘উনিশ শতকের নব জাগরণ; ‘জীবন-শিল্পী মধুসূদন’ ও ‘মধুসূদনের মানস’ প্রবন্ধত্রয় গজনফর আলী সম্পাদিত ‘অবশেষে’ পত্রিকায় এবং ‘মধুসূদনের বিশ্ব’ ‘মেঘনাদবধ কাব্যে বিধি ও বিশ্ববিধান ; প্রবন্ধদ্বয় সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল পত্রিকায় ইতিপূর্বে প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থটির দ্বিতীয় সংস্করণ বর্ধিতাকারে প্রকাশিত হয় ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে। পরিবর্ধিত সংস্করণে সংযোজিত হয় আরো কয়েকটি প্রবন্ধ: ‘নবজাগরণ ও মধুসূদন’ ‘মেঘনাদবধ কাব্যে পুরুষ চরিত্র’ ‘মেঘনাদবধ কাব্যে নারী চরিত্র’, ‘মধুসূদনের দেবদেবী’ ‘মহাকাব্যঃ মেঘনাদবধ কাব্য’ এবং ‘ঐতিহ্য ও মেঘনাদবধ কাব্য’। ঊনসত্তর সালে আকাশ আণীর কলকাতা কেন্দ্র হতে বিশিষ্ট কথা সাহিত্যিক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের মূল্যবান আলোচনার ফলে গ্রন্থটি দেশে বিদেশে সমাদৃত এর প্রস্তাব এল আরো কয়েকটি আলোচনা সংযোজনের। এবং এ সংযোজন তারই ফলশ্রুতি। [মোহাম্মদ লিয়াকতউল্লাহ : ২০১১ : ১৬৭]
প্রাবন্ধিক মোবাশ্বের আলী এ গ্রন্থের প্রবন্ধগুলোতে তাঁর বিশ্লেষণী দক্ষতার গুণে উজ্জ্বল-বাঙালি জাতির চিত্তমুক্তির দীপ্ত প্রবক্তা মাইকেল মধুসূদনের প্রতিভা অনুশীলনের প্রাণাবেগে উদ্বোধিত। “গ্রন্থটিতে লেখক তাঁর বিশ্লেষণ ধর্মী শক্তির পরিচয় দিতে সমর্থ হয়েছেন এবং মধুসূদনের মত একজন আন্তর্জাতিক এবং সেই সঙ্গে বিশ্বধ্রুপদ সাহিত্যের গভীর পাঠকের লিখিত গ্রন্থ বিচারে নিজের পাঠ্য সীমাকে তিনি যতদূর সম্ভব বিস্তৃত করার শ্রম সাধনাকে অক্লান্ত রাখতে বিরত থাকেন নি বলা যায়”।Ñশাহাবুদ্দীন আহম্মদ দৈনিক বাংলা ১০.১১.৭৪। অবশ্য মধুসূদনের প্রতিভা বিচারে তিনি শুধু ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’ আত্মমগ্ন। এ প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য-“মধুসূদনের প্রতিভা যেন মেঘাবৃত আকাশে বিদ্যুৎ এর মতো মুহূর্তের জন্য দীপ্ত হয়ে মুহূর্তের মর্ধেই আকাশে মিলয়ে গেল। সেই দীপ্ত মুহূর্তের প্রকাশ ঘটেছে ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’ ..... তাঁর অপরাপর রচনাগুলো নিছক পরীক্ষা নিরীক্ষামূলক”। ‘মধুসূদনের প্রতিভা’ প্রবন্ধের পাদটীকায় একস্থানে তিনি উল্লেখ করেনÑসাহিত্যিকের প্রতিভার পূর্ণাঙ্গ পরিচয় তাঁর সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে নয়, কোন বিশেষ রচনার মধ্যে লক্ষিত হয়। যেমন- গ্যেটের ‘ফাউষ্ট’, দস্তয়েভস্কির ‘ব্রাদার্স কেরামজভ’, হেমিংওয়ের ‘বুড়ো মানুষটি ও সমুদ্র’। মোবাশ্বের আলী মধুসূদনের নবজাগৃতি ভাষ্যে উদ্বেল-মোহিতলাল-যোগীন্দ্রনাথ-শশাঙ্ক মোহন প্রমুখ লেখক সৃষ্ট মধুসূদন মানসোদ্যানে পরিভ্রমিত এবং তুলনামূলক সাহিত্য বিচারে পরিশ্রমী; নিম্নোক্ত বাক্যগুলোতে এর স্বাক্ষর জাজ্বল্যমান- “ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র ঋষির ভূমিকাতে অবতীর্ণ হওয়াতেই মানববাদ বিপর্যস্ত হয়েছে। তিনি কবি রবীন্দ্রনাথ গুরুর আসনে অভিষিক্ত হয়েই মধুসূদন প্রবর্তিত সরল, সুস্থ ও স্বাভাবিক মানববাদকে বিমূর্ত করে তুললেন। এখানেই মানববাদের চূড়ান্ত পরাজয় এবং এ ভাবেই নবজাগরণের পরিণতি দেখা দিল।” [মোহাম্মদ লিয়াকতউল্লাহ : ২০১১ : ১৬৭-১৬৮]
(নবজাগরণের শেষ অধ্যায়)। প্রবন্ধিকের চিন্তার স্বচ্ছতা, বর্ণনার সমর্থনে যুক্তি স্থাপন এবং বক্তব্য বিশ্লেষণে শৃঙ্খলাবোধ এ গ্রন্থের প্রবন্ধগুলোকে বিশেষভাবে বিধৃত। এই গ্রন্থে পূর্বসূরীদের উদ্ধৃতি সংকলনে বিরত থাকায় তাঁর বক্তব্যের প্রবাহ গতিশীল, কিন্তু উদ্ধৃতির সমর্থন পেলে অনেক স্থলে বক্তব্য আরো মেধাবী হয়ে উঠত। তবে তাঁর পূর্ববর্তী লেখকদের মত তিনিও হোমার ভার্জিল মিলটনের রাজ্যে আত্মস্থ। “এতে তাঁর পড়াশোনার ছাপ আছে। সাহিত্য ও সমালোচনা তত্ত্বের স্বীকরণ সাধন করে তিনি ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’র যে রস ব্যাখ্যা করেছেন তা জটিল হয়ে উঠেনি। এটাই এ গ্রন্থের প্রধান গুণ”। - (ভূমিকা মুহাম্মদ আবদুল হাই ৭-১০-১৯৬৩ মধুসূদন ও নবজাগৃতি ১ম সংস্করণ)। উনিশ শতকের নবজাগরণের পটভূমিতে এ গ্রন্থটি রচিত। এ সম্পর্কে ত্রৈমাসিক চতুরঙ্গ পত্রিকায় ড. প্রণয় কুমার কুণ্ড লিখেছেন- “বইটির নামকরণের দিকে লক্ষ্য রাখলেই লেখকের অন্বিষ্ট সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায়। উনিশ শতকের বাংলায় য়ুরোপিয় সংস্কৃতিও সাহিত্যের স্পর্শে যে নবজাগরণ ঘটেছিল তারই যোগ্য প্রতিনিধি মধুসূদন এবং তার মূর্ত প্রকাশ তার সাহিত্যে, মোবাশ্বের আলী এই ধারণার উপর ভিত্তি করে পর্যায়ক্রমে মধুসূদনের কবি প্রতিভা, তার ব্যক্তিমানস ও সর্বোপরি তার কাব্যের মূল্যায়ন করেছেন। তার আগে তিনি নবজাগরণের স্বরূপ ব্যাখ্যা করেছেন। খণ্ডিতরূপে নয়, তার গ্রন্থে মধুসূদনের একটি সার্বিক পরিচয় দেবার প্রয়াস স্পষ্ট। মধুসূদনের সমগ্র সত্ত্বাকে তুলে ধরার জন্য তিনি মূলত নির্ভর করেছেন “মেঘনাদবধ কাব্যের’ উপর”।-(চতুরঙ্গ/কার্তিকÑপৌষ ১৩৮১ বাং/বর্ষ-৩৬)। শুধুমাত্র ‘মেঘনাদধ কাব্যের আলোকে এ গ্রন্থে মধুসূদনকে নবজাগরণের নায়করূপে চিত্রিত করার প্রয়াসবশত জাগৃতির পূর্ণাঙ্গরূপে উদঘাটিত। ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ মধুসূদনের সার্থক কাব্যরূপে বিবেচিত হলেও নবজাগরণের সেন্টিমেন্ট (Sentiment) তার অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যেও প্রকটিত। প্রাচীন সংস্কৃত নাটকের নিয়মবন্ধরীতি পরিত্যাগ করে পাশ্চাত্য রীতিতে ১৮৫৮ সালে প্রকাশিত ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটকের মাধ্যমে মধুসূদনের প্রাণ প্রাচুর্যময় জাগরণের উদ্বোধন। ১৮৫৯ সালে ‘পদ্মাবতী,’ নাটক রচনার পর তার রচিত সামাজিক প্রহসন ‘একেই কি বলে সভ্যতা,’ ও ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ এর মধ্যেও মধুসূদনের সজীব নামের দীপ্ত ঘোষণা এবং ১৮৬২ সালে প্রকাশিত ‘বীরাঙ্গনা’ কাব্যেও অসাধারণ প্রাণচাঞ্চল্যে তিনি আবিষ্কৃত। কাজেই মোবাশ্বের আলী নবজাগরণের চিত্রায়নে সম্পূর্ণ সার্থক নন। তবে একথা ঠিক যে, এ গ্রন্থে তিনি অনেক মৌলিক মন্তব্য রেখেছেন যেগুলো তুলনামূলক সাহিত্য বিচারে নিখুঁত। বাঙ্গালির নবজাগরণের অগ্রদূত হিসেবে মধুসূদনকে মোবাশ্বের আলী যুক্তিসঙ্গতভাবেই চিহ্নিত করেছেন। বাংলা সাহিত্যে মধুসূদনের মত এমন বিপ্লবী জীবন সচেতন প্রাণ প্রতিভার জন্ম না হলে আজকের বাঙ্গালি জাতি ও বাংলা সাহিত্য কতটুকু পশ্চাতে থাকতÑ তা সত্যি অভাবনীয় ব্যাপার। “কেননা আমাদের সাহিত্যিককে চিন্তা ও চেতনায় মধুসূদনই প্রথম আমাদের মুক্তির পথ দেখিয়েছিলেন। তিনি আমাদের অন্ধকার গহ্বর থেকে আলোর রাজ্যে টেনে তুলেছিলেন একক ক্ষমতায়।” (Ñশাহাবুদ্দিন আহম্মদ/দৈনিক বাংলা ১০/১১/৭৪ ইং)। [মোহাম্মদ লিয়াকতউল্লাহ : ২০১১ : ১৬৮-১৬৯]
মোবাশ্বের আলীর দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘নজরুল প্রতিভা’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। এ গ্রন্থে মুদ্রিত প্রবন্ধ সংখ্যা দাশঃ ‘জীবন শিল্পী নজরুল’ ‘নজরুল কাব্যে পটভূমি’ ‘নজরুল মানস’ ‘নজরুলের রোমান্টিক’ ‘ঐতিহ্য এবং নজরুল কাব্যে’ ‘নজরুল কাব্যে প্রেম’ ‘প্রকৃতির কবি নজরুল’ ‘নজরুল কাব্যে নারী’ ‘নজরুলের মরমীবাদ’ ও ‘নজরুল প্রতিভা’। মাসিক ‘মাহে-নও’ পত্রিকায় ইতিপূর্বে প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থে মুদ্রিত ‘নজরুল মানস ও নজরুলের রোমান্টিকতা’ প্রবন্ধ দু’টো। ‘নজরুল মানস’ প্রবন্ধটিতে প্রাবন্ধিক মোবাশ্বের আলী নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে নজরুলের কবি মানসিকতার মূল্যায়নের জন্য প্রয়াসী। তাঁর সহজ বক্তব্যের সুষম বিন্যাসে তিনি নজরুল মানসের ব্যাখ্যায় যত্নশীল এ প্রবন্ধের প্রথম হ’তে শেষাব্দি। এ গ্রন্থে সন্নিবেশিত প্রবন্ধগুলোর সমন্বিত আলোকে কিংবা ‘নজরুল প্রতিভা’ নামক প্রবন্ধ অনুসারে গ্রন্থটির নাম ‘নজরুল প্রতিভা’ হলেও প্রাবন্ধিক এখানে মূলত নজরুল মানসের স্বরূপ সন্ধানে প্রয়াস পেয়েছেন এবং তাঁর বিশ্লেষণ একান্তভাবে অভিনব। ‘নজরুলের রোমাণ্টিকতা প্রবন্ধটি বিশেষভাবে সমাদৃত ‘মাহে-নও’ পত্রিকার তৎকালীন সম্পাদক জনাব আবদুল কাদিরের ভাষ্যে- “নজরুলের রচনায় উপচেতন মনের রসরূপ প্রাণময়, তাতে সচেতন মনের ক্রিয়া সুগোচর হলে বিশ্লেষণীবুদ্ধি হয়তো খুশী হ’তো, কিন্তু রসগ্রাহী চিত্ত তৃপ্ত হ’তো কিনা কে বলবে! বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধটি পড়ে এ সকল প্রশ্ন পাঠকের মনে জাগবে এবং এখানেই আলোচনাটির বড় সার্থকতা। এ গ্রন্থের আরো কয়েকটি প্রবন্ধেই আলোচনার এরূপ সার্থকতা প্রমাণিত; তথাপি সামগ্রিকভাবে মোবাশ্বের আলী নজরুলের প্রতিভা মূল্যায়ণে অতিশয় অসংযত। নজরুলকে তিনি একজন কবি হিসেবেই বিশেষভাবে দেখাতে প্রয়াসী। অথচ নজরুল একাধারে কবি, গীতিকার, প্রাবন্ধিক, গল্পকার, ছড়াকার, ঔপন্যাসিক ও নাট্যকার ইত্যাদি। তাঁর বহুমুখী প্রতিভার অনন্য ও উজ্জ্বল প্রতিভার স্বরূপ উদ্ঘাটনের অপরাপর বিষয়ের বিশ্লেষণ অনুশীলনও একান্ত প্রয়োজন। [মোহাম্মদ লিয়াকতউল্লাহ : ২০১১ : ১৬৯-১৭০]
‘নজরুল প্রতিভা’ নামক প্রবন্ধেও প্রাবন্ধিকের এমন কতকগুলো মন্তব্য বিদ্যমানÑযেগুলো নজরুল প্রতিভার স্বরূপ নির্ণয়ের বক্তব্যে প্রাবন্ধিকের স্ব-বিরোধিতারই পরিচায়ক। “এই প্রতিভাকে শ্রদ্ধা না করা যেতে পারে, কিন্তু অস্বীকার করার যো নেই।” অথচ রবীন্দ্রনাথের মতে শ্রদ্ধা ব্যতীত সমালোচনা অসম্ভব। একস্থানে তাঁর মন্তব্যÑ “যেখানে কবি প্রেরণার উপর আস্থাবান, অর্থাৎ দিব্য আবেশের বশবর্তী হয়ে কাব্য রচনা করেনÑ সেখানে কাব্য সৃষ্টি ব্যাহত ও অসার্থক হতে বাধ্য” অথচ একই প্রবন্ধে অন্যত্র তাঁর ভাষ্য “তাঁর বহু কবিতা বাংলা কাব্য ধারায় অক্ষয় সম্পদরূপে বিবেচিত হবে। যেন দিব্য আবেশের বশীভূত হয়েই আকস্মিকভাবে তিনি এমন সব কবিতা লিখেছেন, যা আমাদের মুগ্ধ ও বিমোহিত করে এবং অনাগতকালের পাঠক চিত্তেও আবেদন জাবানে।” কোন কোন ক্ষেত্রে তিনি কবি মানসিকতার ব্যাখ্যা দিয়েছেন নতুনতর; যেমন, নজরুল যে অর্থে নিজকে ‘হুজুগের কবি’ বলে কৈফিয়তের ভাষায়, আত্ম-শ্লেষ ব্যক্ত করেছেনÑপ্রাবন্ধিক মোবাশ্বের আলীর ভাষায় ‘এই ধরনের বিদ্রুপ মারাত্মক বলে চিহ্নিত-এটা সমর্থনযোগ্য নয়। সংক্ষেপে বলতে গেলে প্রাবন্ধিক মোবাশ্বের আলী নজরুলের বহুমুখী প্রতিভার বিভিন্ন দিক যেমন, কবি নজরুল, গীতিকার নজরুল, প্রাবন্ধিক নজরুল, গল্পকার নজরুল, শিশু সাহিত্যিক নজরুল, নাট্যকার নজরুল, ঔপন্যাসিক নজরুল ইত্যাদিতে সার্থক। [মোহাম্মদ লিয়াকতউল্লাহ : ২০১১ : ১৭০]
১৯৭৪ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত মোবাশ্বের আলীর তৃতীয় গ্রন্থ ‘বিশ্ব সাহিত্য বাংলা সাহিত্য একটি চমৎকার সংযোজন। এই গ্রন্থে তিনি সাহিত্যকে বিশ্বজনীন পটভূমিকায় দেখতে প্রয়াসী, যা ইতিপূর্বে প্রায় দুর্লক্ষ্য। তিনি শুরু করেছেন তিন হাজার বছর আগের সুদূর গ্রীস দেশের হোমার থেকে এবং শেষ করেছেন সাম্প্রতিক কালের রুশ সাহিত্যিক বরিস পাস্তেরনাকে; আর মাঝখানে রয়েছে আড়াই হাজার বছর আগের গ্রীক ট্র্যাজেডীয়ান ইস্কিলাস ও সফোক্লিস, দু’হাজার বছর আগের রোমান সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠতম কবি ভার্জিল, একাদশ-দ্বাদশ শতকের জীবন-রস-রসিক কবি ওমর খইয়াম, তারপর ইউরোপীয় রেনেসাঁসের অন্যতম ফসল কবি ও নাট্যকার সেক্সপীয়ার, বিশ্বের দু’জন শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক তলস্তয় ও দস্তয়েভস্কি। অন্যতম শ্রেষ্ঠ রুশ নাট্যকার চেখভ্ এবং দ্বান্দ্বিক বাস্তববাদের প্রতিষ্ঠাতা ম্যাক্সিম গোর্কি। [মোহাম্মদ লিয়াকতউল্লাহ : ২০১১ : ১৭০]
বাংলাদেশের যে কজন বিদ্বান, গ্রীক সাহিত্য ও সভ্যতা সম্বন্ধে গভীরতম অনুসন্ধানে আত্মনিয়োগ করেছেন, তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। গ্রীসের গল্প উপাখ্যান, গ্রীসের ঐতিহাসিক, গ্রীসের দশটি গল্প, আলেকজান্ডার এবং আরো অনেক গ্রাসীয় প্রসঙ্গ নিয়ে লিখেছেন। বড়োদের জন্য যেমন লিখেছেন, তেমনি ছোটদের জন্যও লিখেছেন। গ্রীসের দশটি গল্প, গ্রীসের আরো গল্প। তিনি ঘুটাত রচিত জীবনীমালা তিনখণ্ডে প্রকাশ করেছেন। আমি একদিন অবাক হয়ে দেখলাম একটি যশু তিনি আমার নামাঙ্কিত করে। মুদ্রণ করেছেন। 'গ্রীক ট্র্যাজেডি'র লেখক হিসেবে তিনি যে সম্মান পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন, আকস্মিক প্রয়াণ তাকে সে সম্মান থেকে বঞ্চিত করেছে। এমনকি তার
কবরটি নিয়ে যে অবহেলা করা হয়েছে, তা দুঃখজনক। গ্রীক ট্র্যাজেডি, গ্রীসের ঐতিহাসিক, গ্রীক উপাখ্যান প্রভৃতি ছাত্রপাঠ্য গ্রন্থ হিসেবে তিনি লেখেননি। লিখেছেন, গ্রীক সভ্যতার বিশ্লেষণ হিসেবে। মোবাশ্বের আলীর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।
লেখক: ভিসি, উত্তরা ইউনিভার্সিটি
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































