৬০টি সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব
নির্বাচনের আগে ডিআইজি পদোন্নতি ঘিরে বিতর্ক, ‘অর্থ লেনদেন ও পুনর্বাসনের অভিযোগ’

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে পুলিশে উপমহাপরিদর্শক— ডিআইজি পদে ব্যাপক পদোন্নতির উদ্যোগ ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। পুলিশের ভেতরের একাধিক সূত্রের দাবি, বিতর্কিত ও রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকার অভিযোগ থাকা কিছু কর্মকর্তাকে পদোন্নতির মাধ্যমে পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে। এর নেপথ্যে বড় অংকের অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। এসব কারণে বিভিন্ন ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ ও হতাশা বাড়ছে বলে জানা গেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ জানুয়ারি পুলিশ সদর দপ্তরের ওঅ্যান্ডএম শাখা থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়। এতে ১৫তম থেকে ২১তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের ডিআইজি পদে পদোন্নতির জন্য ৬০টি সুপারনিউমারারি ডিআইজি (গ্রেড–৩) পদ সৃষ্টির সুপারিশ করা হয়।
পদোন্নতি ঘিরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার ছেলে ও পুলিশ সদর দপ্তরের একটি প্রভাবশালী চক্র অর্থের বিনিময়ে পদোন্নতি ও পদায়নের কাজ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
বর্তমানে পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোতে অনুমোদিত ডিআইজি পদের সংখ্যা ৮৭টি হলেও বাস্তবে ১৩৭ জন কর্মকর্তা ডিআইজি পদে দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে ৫০ জন সুপারনিউমারারি পদে রয়েছেন। বিদ্যমান এসব পদ স্থায়ী না করে নতুন করে আরও সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব সাংগঠনিক জটিলতা বাড়াবে বলে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করছেন।
প্রেরিত প্রস্তাবে ১০২ জন কর্মকর্তার তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তারা চাকরিকাল ও গ্রেড বিবেচনায় ডিআইজি পদে পদোন্নতির যোগ্য। তবে বিভাগীয় বা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে ৪২ জনকে বাদ দিয়ে ৬০ জনের পদোন্নতির সুপারিশ করা হয়েছে। এ তালিকায় ২০তম ও ২১তম ব্যাচের কর্মকর্তার সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।
দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত তালিকায় এমন কর্মকর্তারাও রয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে অতীতে গায়েবি মামলা, বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের হয়রানি, গুম-খুন ও অপহরণের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে পদোন্নতির তালিকায় সদ্য প্রয়াত তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তারে নেতৃত্ব দিয়ে ভাইরাল হওয়া আলোচিত ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তা রেবেকা সুলতানা ও জেসমিন আক্তারের নাম রয়েছেন। শুধু তাই নয়— এই তালিকায় রয়েছেন সাবেক একজন প্রভাবশালী আইজিপির ক্যাশিয়ার, রাতের ভোটের কারিগর সাবেক এক আইজিপির অত্যন্ত আস্থাভাজন এলআইসি’র মাধ্যমে আড়িপাতা পুলিশ কর্মকর্তাও।
অভিযোগ আছে, ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে বিতর্কিত এসব কর্মকর্তা শুধু নিজেরাই অপকর্মে জড়িত ছিলেন না; তারা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিতে অধস্তনদের তা বাস্তবায়নে বাধ্য করেছেন। তালিকায় আলোচিত কিছু কর্মকর্তার নামও রয়েছে, যারা অতীতে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল অভিযানে যুক্ত ছিলেন।
পুলিশের একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নির্বাচনের আর অল্প সময় বাকি থাকতে ডিআইজি পদে এ ধরনের তড়িঘড়ি পদোন্নতি কাম্য নয়। তাদের ভাষ্য, এতে বাহিনীর নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে এবং নির্বাচনী পরিবেশেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তারা আরও বলেন, কিছু প্রভাবশালী মহল ও একটি চক্রের মাধ্যমে পদোন্নতি প্রক্রিয়া প্রভাবিত করার অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস রিক্রুটমেন্ট রুলস, ১৯৮১ অনুযায়ী ডিআইজি পদে পদোন্নতির জন্য ন্যূনতম ১৫ বছরের সন্তোষজনক চাকরিকাল এবং এর মধ্যে ৭ বছর পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালনের শর্ত রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও ২২তম ও ২৪তম ব্যাচের কিছু কর্মকর্তাকে কৌশলে বাদ দেওয়া হয়েছে, যা বিধিমালার লঙ্ঘন।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, পুলিশের ডিআইজি ও ঊর্ধ্বতন পদে পদোন্নতি সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) মাধ্যমে হয়ে থাকে। পুলিশ সদর দপ্তর শুধু প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত করে পাঠায়। ‘এ ক্ষেত্রে অনিয়মের সুযোগ নেই,’ বলেন তিনি।
তবে পুলিশের ভেতরের একটি বড় অংশের আশঙ্কা, এই সময়ে বিতর্কিত পদোন্নতি দেওয়া হলে বাহিনীর মনোবল ও নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাদের মতে, বিষয়টি নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের জন্য রেখে দিলে পেশাদার, সৎ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পুলিশকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












































