ব্যাংকিং সেক্টরে সংস্কার ও আস্থার প্রশ্ন

মো. আবদুল মান্নান
  প্রকাশিত : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৭:৪৩
অ- অ+

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কালে বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরে তারল্য সংকট, আমানত প্রত্যাহারের হিড়িক, ব্যাংকভিত্তিক বৈষম্য এবং হঠাৎ করে নেওয়া কাঠামোগত সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে এই খাতে একটা অস্থিরতা তৈরি করেছিল। এই সংকটের পেছনে বহুদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা, রাজনৈতিক প্রভাব, খেলাপি ঋণ সংস্কৃতি এবং তদারকির ঘাটতি—এ কথাগুলো সামনে এসেছে। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে যে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটেছে, তার জন্য বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্র্তৃপক্ষের প্রকাশ্য মন্তব্য, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন এবং সংকট ব্যবস্থাপনার কৌশল নিয়ে প্রশ্ন উঠছে সর্বত্র।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক কেবল একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা নয়; এটি পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার অভিভাবক। তার প্রধান যখন প্রকাশ্যে বলেন, অমুক ব্যাংকের অবস্থা ভালো নয়, তমুক ব্যাংক ঝুঁকিপূর্ণ—তখন সেই বক্তব্য নিছক বিশ্লেষণ থাকে না, তা হয়ে ওঠে বাজারের জন্য সরাসরি সংকেত।

ব্যাংকিং ব্যবস্থা মূলত আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে। একজন আমানতকারী ব্যাংকে টাকা রাখেন এই বিশ্বাসে যে, প্রয়োজন হলে তিনি তার অর্থ ফেরত পাবেন। এই বিশ্বাসে চিড় ধরলেই শুরু হয় ‘রান অন ব্যাংক’। বাস্তবে হয়তো একটি ব্যাংক এখনো দেউলিয়া হয়নি, কিন্তু যদি আমানতকারীরা একসঙ্গে টাকা তুলতে শুরু করেন, তাহলে সবচেয়ে সুস্থ ব্যাংকও বিপদে পড়তে পারে। এই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারকের প্রকাশ্য মন্তব্যের প্রভাব ভয়াবহ হতে বাধ্য।

দুর্বল ব্যাংকের নাম করে তাদের অবস্থা ‘ভালো নয়’—এ ধরনের বক্তব্য স্বাভাবিকভাবেই সেই ব্যাংকের আমানতকারীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। ফলাফল হিসেবে তারা হুমড়ি খেয়ে পড়ে টাকা তুলতে। এরপর সেই টাকা গিয়ে জমা পড়ে তথাকথিত ‘সবল’ ব্যাংকে। এতে করে একদিকে দুর্বল ব্যাংক আরও দুর্বল হয়, অন্যদিকে সবল ব্যাংক আরও সবল হয়ে ওঠে। এই বৈষম্যমূলক গতিশীলতা পুরো সেক্টরের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়।

প্রশ্ন হলো—কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব কি এই বৈষম্য ত্বরান্বিত করা, নাকি ঝুঁকি কমিয়ে আনা? দরকার ছিল একটি স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার হবে ধীরে, পরিকল্পিতভাবে এবং সর্বোপরি আস্থা রক্ষা করে। কিন্তু ব্যাংকিং সেক্টরে যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোই এসেছে হঠাৎ, প্রস্তুতিহীন এবং পর্যাপ্ত যোগাযোগ ছাড়াই। পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্ত তার বড় উদাহরণ।

একীভূতকরণ নিজেই খারাপ নীতি নয়—বিশ্বজুড়েই দুর্বল ব্যাংকগুলোকে রক্ষা করতে বা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই একীভূতকরণের প্রক্রিয়া কতটা ন্যায্য, স্বচ্ছ ও অংশীজনবান্ধব ছিল। বাস্তবে দেখা গেছে, একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর শেয়ারহোল্ডারদের পোর্টফোলিও কার্যত শূন্য হয়ে গেছে। যারা বৈধভাবে শেয়ার কিনেছিলেন,তাদের কোনো দায় ছিল না ব্যাংক পরিচালনার অনিয়মে। অন্যায় করেছেন পরিচালনা পর্ষদ, অন্যায় করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাও—যারা সময়মতো ব্যবস্থা নেয়নি। অথচ শাস্তি দেওয়া হলো সবচেয়ে দুর্বল পক্ষকে—শেয়ারহোল্ডারদের। এটি কি ন্যায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থার পেছনে যে পরিচালনা পর্ষদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ, তা নতুন কিছু নয়। রাজনৈতিক নিয়োগ, স্বার্থের সংঘাত, ঋণ বিতরণে অনিয়ম—এসব বিষয়ে বহুদিন ধরেই আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু এসব অনিয়ম বছরের পর বছর চলতে দিল কে? কেন্দ্রীয় ব্যাংক কি তার তদারকির দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছে?

যদি একটি ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল হয়ে পড়ে, খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকে, মূলধন ঘাটতি তৈরি হয়—তাহলে সেটি একদিনে হয়নি। এর মানে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ব্যর্থ হয়েছে সময়মতো হস্তক্ষেপ করতে। সেই ব্যর্থতার দায় শেয়ারহোল্ডারদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হলে তা নৈতিক ও নীতিগত—দুই দিক থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ।

বিশ্বের অধিকাংশ দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকটের সময় অত্যন্ত সংযত ভাষায় কথা বলে। তারা ঝুঁকি স্বীকার করে নেয়, কিন্তু প্রকাশ্যে কোনো নির্দিষ্ট ব্যাংককে ‘দুর্বল’ বলে চিহ্নিত করতে সচরাচর বিরত থাকে। কারণ তারা জানে—একটি বাক্যই বাজারকে কাঁপিয়ে দিতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঠিক উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। সংস্কার যদি করতেই হয়, তা করতে হয় নীরবে, ধাপে ধাপে এবং সবচেয়ে বড় কথা—আস্থা অক্ষুণ্ন রেখে।

এই সংকট থেকে বের হতে হলে দোষারোপের রাজনীতি নয়, প্রয়োজন দায়িত্বশীল আত্মসমালোচনা। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বুঝতে হবে—তারা বাজারের খেলোয়াড় নন, তারা রেফারি। রেফারি যদি নিজেই মাঠে নেমে একপক্ষের বিপক্ষে মন্তব্য করেন, তাহলে খেলা ন্যায্য থাকে না।

প্রয়োজন কয়েকটি মৌলিক পদক্ষেপ: প্রথমত, যোগাযোগ নীতি সংস্কার—কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বক্তব্য হতে হবে পরিমিত, তথ্যভিত্তিক এবং আতঙ্কমুক্ত। দ্বিতীয়ত, পরিচালনা পর্ষদের দায় নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, শেয়ারহোল্ডার ও আমানতকারীদের সুরক্ষা—সংস্কারের বোঝা যেন দুর্বল পক্ষের ওপর না পড়ে। চতুর্থত, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি—কেন কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, তার ব্যাখ্যা জনগণের সামনে আসতে হবে।

লেখক: সংবাদকর্মী। (ঢাকাটাইমস/১ফেব্রুয়ারি/মোআ)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আবারও আগুন
গণতন্ত্র ধ্বংসের গভীর চক্রান্ত চলছে: ফখরুল
হাম ও উপসর্গে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু
ভারতকে সীমান্তে ‘পুশইন’ বন্ধ করতে হবে, বিদ্যুতের দাম দুই বছর না বাড়ানোর আহ্বান সাইফুল হকের
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা