রমজানে সিন্ডিকেটের কারসাজিতে ঊর্ধ্বমুখী বাজারদর, ক্রেতাদের দুর্ভোগ

পবিত্র রমজান মাসে অসাধু সিন্ডিকেটের কারসাজিতে নিত্যপণ্যের বাজারদর অস্বাভাবিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী, যা সাধারণ ক্রেতাদের দুর্ভোগ চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম লাগামহীনভাবে বাড়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছে। বাজারের এই অস্থিরতা তাদের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলেছে। অতিরিক্ত মুনাফার লোভে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ছে।
ক্রেতাদের অভিযোগ, গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দাম কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার শুরুতেই ব্যবসায়ীরা পুরোনো কৌশল খুঁজছেন। নির্বাচনের কারণে যথাযথ বাজার তদারকি না থাকায় এ অবস্থা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। নতুন সরকার দ্রুত বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর না হলে পরিস্থিতি আয়ত্তের বাইরে চলে যেতে পারে। তবে বিক্রেতাদের দাবি, চাহিদা অনুযায়ী কিছু পণ্যের সরবরাহে টান আছে। যার প্রভাব পড়েছে দামে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সিন্ডিকেট এবং মজুতদারির কারণে পণ্যের দাম বাড়ছে। সরকারের পক্ষ থেকে বাজার নিয়ন্ত্রণে যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়ায় এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, হাতিরপুলসহ কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি শসা বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ১০০ টাকায়, যা দুদিন আগে ছিল ৭০ থেকে ৮০ টাকা।
এ ছাড়া কেজিতে ৩০ থেকে ৫০ টাকা বেড়ে বেগুন বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকায়। বিক্রেতারা গোল বেগুন ১০০ টাকা এবং লম্বা বেগুন ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি করছেন। ইফতারে বেগুনি বানানোর জন্য লম্বা বেগুন ব্যবহার করা হয়। সপ্তাহখানেক আগে এ বেগুনের কেজি ছিল ৬০ থেকে ৭০ টাকা। সেই হিসাবে এক সপ্তাহে প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে সবজিটির দর।
এ ছাড়া কেজিতে ৪০ টাকা বেড়ে কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৮০ টাকায়। কাঁচা পেঁপের কেজি ৮০ থেকে ১২০ ও উচ্ছে কেজিপ্রতি ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগে এই দুটি সবজি অন্তত ২০ থেকে ৩০ টাকা কমে কেনা গেছে।
গত সপ্তাহের চেয়ে বাজারে লেবুর সরবরাহ বাড়লেও দর কমেনি। এখনও মাঝারি আকারের প্রতি হালি লেবু বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা।
হাতিরপুল বাজারে সবজি কিনতে আসা সাইফুল ইসলাম বলেন, বেগুনের কেজি ১৫০ টাকা চায়। প্রতিবছরই রোজার আগে এভাবে ব্যবসায়ীরা বেগুনের ‘ডাকাতি’ দাম নেন। ১০০ টাকার কমে লেবুর হালি পাওয়া যাচ্ছে না।
নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের ভরসা ব্রয়লার মুরগির বাজার এখনও চড়া। দুই-আড়াই মাস ধরে ১৫০ টাকার কিছু বেশি ছিল ব্রয়লারের কেজি। সপ্তাহদুয়েক আগে দর বেড়ে ১৮০ টাকার ঘর স্পর্শ করে। এখন আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। গতকাল প্রতিকেজি ব্রয়লার বিক্রি হয়েছে ১৯০ থেকে ২০০ টাকা। এ ছাড়া সোনালি জাতের মুরগির দর ঠেকেছে ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা।
কারওয়ান বাজারের নুরজাহান ব্রয়লার হাউসের বিক্রয়কর্মী এরশাদ মিয়া বলেন, পাইকারি বাজারে মুরগির দাম বাড়ার কারণে খুচরায় বেড়েছে। তবে এই দাম সর্বোচ্চ ১০ রমজান পর্যন্ত থাকতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
অন্যদিকে এবারও রোজার আগে বাজারে খেজুরের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে দাম হয়ে উঠেছে লাগামহীন। চাহিদার তুলনায় মজুতে কোনো ঘাটতি না থাকলেও সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ ক্রেতাদের বাড়তি দামে খেজুর কিনতে হচ্ছে। খুচরা বাজারে জাতভেদে খেজুরের দাম ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বাজারে এখন প্রতিকেজি খেজুর ৪০০ টাকা থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
দুই-তিন দিন ধরে বাজারে কলার সরবরাহে ঘাটতি দেখা গেছে। এই সুযোগে অস্বাভাবিকভাবে দাম বেড়েছে। প্রতি ডজন বাংলা কলা কিনতে ক্রেতাকে খরচ করতে হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা। সপ্তাহখানেক আগে এই কলা কেনা গেছে ৭০ থেকে ৮০ টাকায়। একইভাবে ১০০ থেকে ১২০ টাকা দামের সবরি কলা বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা। এভাবে ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা দামের বরইয়ের কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায়।
এ ব্যাপারে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, বাজারে ঠিকমতো তদারকি হচ্ছে না। মূলত ক্ষমতা বদলের এই ট্রানজিট সময়ে সুযোগ নিয়ে সরকারি কর্মকর্তারা এক ধরনের স্থবির ও গা-ছাড়া ভাব দেখাচ্ছেন। কোনো ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে ইচ্ছেমতো দাম বাড়িয়েছেন।
এদিকে বগুড়ায় নিত্যপণ্যের দাম কেজিতে ৭ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে। হঠাৎ দাম বাড়ার সুনির্দিষ্ট কারণ কেউ বলতে পারছেন না। পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাইকারিতে দাম বাড়েনি, খুচরা ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়েছেন। খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি, পাইকারি ব্যবসায়ীদের কারণেই দাম বেড়েছে।
জেলা কৃষি বিপণন বিভাগের মাঠ ও বাজার পরিদর্শক আবু তাহের বলেন, প্রতিবছর রোজার নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে। এবারও বেড়েছে, তবে গতবারের চেয়ে একটু কম। জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান বলেন, কয়েকটি বাজার পরিদর্শন করে দাম না বাড়াতে সতর্ক করা হয়েছে। তার পরও দাম বাড়ালে ভ্রাম্যমাণ অভিযান চালানো হবে।
কিশোরগঞ্জে লেবুর দাম বেড়েছে তিন গুণ। আর বেগুনের দাম বেড়েছে আড়াই গুণ। সেখানে সপ্তাহখানেক আগে ৪০ টাকায় বিক্রি হওয়া বেগুনের কেজি এখন শতক ছুঁয়েছে।
সিলেটের খুচরা বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম এক সপ্তাহের ব্যবধানে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়েছে। সংকট দেখা দিয়েছে ভোজ্যতেলের। ব্যবসায়ীরা জানান, এক মাস ধরে কোম্পানিগুলো চাহিদামতো তেল সরবরাহ করছে না। নওগাঁয় নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। মুরগি, সবজি ও খেজুরে বাড়তি দাম নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
বিক্রেতারা বলছেন, রমজানের শুরুতে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক ভোক্তা একসঙ্গে বেশি পণ্য কিনছেন। ফলে কিছু পণ্যের অতিরিক্ত চাহিদার কারণে দাম বেড়েছে।
ময়মনসিংহের বাজারে ব্রয়লার মুরগি ১৮০ থেকে ১৮৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জানান, শীতে মুরগি মারা যাওয়া এবং বাজারে গরুর সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে রমজান মাসে বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন ক্রেতা ও অর্থনীতিবিদরা।
(ঢাকাটাইমস/১৮ ফেব্রুয়ারি/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












































