ওমানে চার ভাইয়ের মৃত্যু: প্রবাসীদের নিরাপত্তায় সরকারের মানবিক দায়িত্ব জরুরি

রাঙ্গুনিয়ার লালানগর যেন হঠাৎ করেই থমকে গেছে। গ্রামের পথঘাট, চায়ের দোকান, মসজিদের বারান্দা, স্কুল মাঠ—সবখানে এখন একটাই আলোচনা। চার ভাই একসঙ্গে চলে গেছে না ফেরার দেশে। একটি পরিবার, একটি মা, একটি গ্রামের বুক থেকে একসঙ্গে নিভে গেছে চারটি প্রদীপ। এমন শোক শুধু একটি পরিবারের নয়, এটি যেন পুরো সমাজের, পুরো দেশের। মানুষ মৃত্যুকে মেনে নেয়, কিন্তু একই পরিবারের চার ভাইয়ের একসঙ্গে চলে যাওয়া—এমন নির্মম বাস্তবতা সহজে মেনে নেওয়া কঠিন।
বুধবার (২০ মে) বেলা ১১টার দিকে রাঙ্গুনিয়া লালানগর স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত হয় চার ভাইয়ের জানাজা। জানাজায় অংশ নিতে আশপাশের গ্রাম থেকে হাজারো মানুষ ছুটে আসে। মানুষের চোখে তখন অশ্রু, কণ্ঠে দীর্ঘশ্বাস। কেউ কেউ নির্বাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন চারটি কফিনের দিকে। মনে হচ্ছিল, পুরো মাঠ যেন এক অদৃশ্য বেদনায় স্তব্ধ হয়ে আছে। জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি চারটি কবর। একসঙ্গে চার ভাইয়ের দাফন—এ দৃশ্য অনেকের জীবনে প্রথম। মাটির নিচে পাশাপাশি শুয়ে পড়লেন রাশেদুল ইসলাম, শাহেদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম ও শহিদুল ইসলাম। যাদের হাসি, কোলাহল, স্বপ্নে ভরা ছিল বাড়ির আঙিনা, তারা আজ নীরব।
জানাজার সবচেয়ে হৃদয়বিদারক মুহূর্ত ছিল ইমামতির সময়। জানাজায় ইমামতি করেন নিহতদের একমাত্র জীবিত ভাই এনামুল হক। তিনি স্থানীয় একটি মাদরাসার শিক্ষক। ভাইদের জানাজা পড়াতে দাঁড়িয়ে তার কণ্ঠ বারবার কেঁপে উঠছিল। অশ্রুসিক্ত চোখে তিনি মানুষের কাছে ভাইদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। একজন ভাই যখন আরেক ভাইয়ের জানাজা পড়ান, সেটি যেমন কষ্টের, সেখানে একসঙ্গে চার ভাইয়ের জানাজা পড়ানো—এ যেন ভাষার বাইরে এক যন্ত্রণা। উপস্থিত মানুষদের অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। কেউ বলছিলেন, “এমন দৃশ্য যেন আর কখনও দেখতে না হয়।” জানাজার মাঠে তখন শুধু কান্না আর কান্না।
গ্রামের বৃদ্ধ থেকে শুরু করে তরুণ, শিশু—সবাই যেন বুঝতে পারছিল, এই মৃত্যু শুধুমাত্র চারজন মানুষের মৃত্যু নয়; এটি একটি পরিবারের ভরসা হারানোর গল্প।
মঙ্গলবার (১৯ মে) রাত ৯টার দিকে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে চার ভাইয়ের মরদেহ। কফিনবন্দি মরদেহ গ্রহণ করেন চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনের সংসদ সদস্য হুম্মান কাদের চৌধুরী। বিমানবন্দর থেকে মরদেহগুলো গাড়িতে করে নেওয়া হয় রাঙ্গুনিয়ার লালানগরের বাড়িতে। সেই পথযাত্রা ছিল অত্যন্ত বেদনাময়। যে ছেলেরা জীবনের স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে গিয়েছিল, তারা ফিরল নিথর দেহ হয়ে। স্বজনেরা অপেক্ষা করছিলেন, কিন্তু কেউ কল্পনাও করেননি এইভাবে তাদের ফিরে আসতে হবে।
আজ ভোরে মরদেহ বাড়িতে পৌঁছালে পুরো এলাকা ভারী হয়ে ওঠে আহাজারিতে। বাড়ির আঙিনায় কান্নার শব্দ শুনে আশপাশের মানুষ ছুটে আসেন। মা বারবার অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিলেন। আত্মীয়স্বজন তাকে সামলানোর চেষ্টা করছিলেন। আগে তাকে জানানো হয়েছিল তার চার সন্তান অসুস্থ হয়ে ফিরে এসেছে। কিন্তু তা আর কত গোপন থাকে!
বাংলাদেশের অসংখ্য তরুণের মতো এই চার ভাইও জীবনের উন্নতির আশায় পাড়ি জমিয়েছিলেন মধ্যপ্রাচ্যে। পরিবারকে ভালো রাখবেন, ঘরের অভাব দূর করবেন, ভাইবোনদের মুখে হাসি ফোটাবেন—এই স্বপ্ন নিয়েই তারা বিদেশে গিয়েছিলেন। প্রবাসজীবন কখনও সহজ নয়। নিজের দেশ, পরিবার, প্রিয়জন ছেড়ে হাজার মাইল দূরে কঠোর পরিশ্রমের জীবন বেছে নিতে হয়। অনেকেই দিনের পর দিন কষ্ট সহ্য করেন শুধু পরিবারের মুখের হাসির জন্য। এই চার ভাইও ছিলেন সেই সংগ্রামী মানুষের প্রতীক। তারা একসঙ্গে থেকেছেন, একসঙ্গে কাজ করেছেন, একসঙ্গে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখেছেন। অথচ নিয়তির নির্মম পরিহাস—একসঙ্গে তাদের জীবনাবসান ঘটল।
পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, দুই ভাইয়ের গত ১৫ মে দেশে ফেরার কথা ছিল। সে উপলক্ষে তারা চার ভাই একসঙ্গে কেনাকাটা করতে বের হয়েছিলেন। হয়তো পরিবারের জন্য উপহার কিনছিলেন, হয়তো মায়ের জন্য কাপড়, শিশুদের জন্য খেলনা কিংবা আত্মীয়দের জন্য কিছু সামগ্রী। কে জানত, সেটিই হবে তাদের জীবনের শেষ যাত্রা!
গত বুধবার মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানের মুলাদ্দাহ এলাকায় একটি গাড়ির ভেতর থেকে চার ভাইয়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। রয়্যাল ওমান পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, গাড়ি চালু থাকা অবস্থায় এসির এক্সহস্ট থেকে নির্গত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসে শ্বাসরোধ হয়ে তাদের মৃত্যু হয়েছে। কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। এই গ্যাসের কোনো রং নেই, গন্ধ নেই। মানুষ বুঝে ওঠার আগেই এটি শরীরকে অচেতন করে ফেলে। অনেক সময় গাড়ির ভেতরে দীর্ঘসময় অবস্থান করলে বা বদ্ধ পরিবেশে ইঞ্জিন চালু থাকলে এই গ্যাস জমে প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়। কিন্তু একই পরিবারের চার ভাই একসঙ্গে এমন দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন—এটি বিরল এবং অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
রাঙ্গুনিয়ার লালানগর এলাকার মানুষ বলছেন, চার ভাইই ছিলেন ভদ্র, পরিশ্রমী ও হাসিখুশি স্বভাবের। গ্রামের মানুষের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিল আন্তরিক। বিদেশে থাকলেও পরিবারের খোঁজখবর রাখতেন নিয়মিত। এলাকায় এলে সবাইকে নিয়ে আনন্দ করতেন। স্থানীয় এক বৃদ্ধ বলেন, “ওদের ছোটবেলা থেকে দেখেছি। খুব ভালো ছেলে ছিল। কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করত না। একসঙ্গে চারজন চলে যাবে—এটা এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না।”
আরেকজন বলেন, “ওরা বিদেশে গিয়েছিল সংসারের হাল ধরতে। আজ সেই সংসারই ভেঙে গেল।”
এই চার ভাইয়ের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো এলাকার মানুষকে নাড়িয়ে দিয়েছে। অনেকে বলছেন, এই ঘটনা তাদের বুঝিয়ে দিয়েছে জীবন কত অনিশ্চিত। একজন মা তার সন্তানের মৃত্যু কখনও সহজে মেনে নিতে পারেন না। সেখানে একসঙ্গে চার সন্তান হারানোর বেদনা কেমন হতে পারে, তা কি কোনো ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব?
স্বজনদের ভাষ্য, সন্তানদের মৃত্যুসংবাদ শোনার পর থেকেই তাদের মা অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ঘুম কি একজন মায়ের বুকের আগুন নিভিয়ে দিতে পারে? তিনি হয়তো বারবার মনে করছেন, সেই ছোট্ট শিশুদের কথা, যাদের তিনি নিজের হাতে বড় করেছেন। হয়তো মনে পড়ছে, বিদেশ যাওয়ার আগে ছেলেদের বিদায়ের মুহূর্ত। হয়তো এখনো তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না, তার চার সন্তান আর কখনও ফিরে আসবে না।
মায়ের এই কান্না শুধু একটি পরিবারের কান্না নয়; এটি এক অসীম বেদনার গল্প।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের লাখো পরিবার প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই আয়ের পেছনে কত ত্যাগ, কত কষ্ট, কত ঝুঁকি লুকিয়ে থাকে, তা অনেক সময় চোখে পড়ে না। প্রবাসজীবনে অনেক শ্রমিককে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতে হয়। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, মানসিক চাপ, নিরাপত্তাহীনতা—সবকিছু মিলিয়ে তাদের জীবন অনেক সময় হয়ে ওঠে কঠিন। অনেকেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন নন। আবার অনেক ক্ষেত্রে কর্মপরিবেশও নিরাপদ থাকে না।
ওমানে চার ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আর কী করা প্রয়োজন? বিদেশে থাকা শ্রমিকদের জন্য সচেতনতা, নিরাপদ আবাসন এবং জরুরি সহায়তা ব্যবস্থার উন্নয়ন কতটা জরুরি—এই ঘটনাই তার বড় উদাহরণ।
চার ভাইকে একসঙ্গে পাশাপাশি কবরে চিরশয্যায় শোয়ানো হয়। উপস্থিত কেউ কেউ আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, যেন এই নির্মম বাস্তবতাকে মেনে নিতে পারছিলেন না। চারটি কবর যেন শুধু চারটি মানুষের দাফনের স্থান নয়; এটি একটি পরিবারের ভেঙে পড়া স্বপ্নের প্রতীক।
এমন ঘটনায় মানুষ বুঝতে পারে, মৃত্যুর পর মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসাই সবচেয়ে বড়। গ্রামের মানুষজন পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে এই মানবিক বন্ধন এখনও টিকে আছে। মানুষের দুঃসময়ে মানুষ পাশে দাঁড়ায়—এই ঘটনাও তার একটি প্রমাণ।
সরকারের পক্ষ থেকে পরিবারটিকে দাফন ও মরদেহ পরিবহনের জন্য তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নিহত প্রত্যেক প্রবাসীর পরিবার তিন লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাবে বলে জানানো হয়েছে। এই সহায়তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অর্থ কি কখনও চার সন্তানের শূন্যতা পূরণ করতে পারে? একটি পরিবার যে মানসিক ধাক্কার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তার কোনো আর্থিক মূল্য নেই।
তবু রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো প্রবাসী পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো। শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, মানসিক সহায়তা, আইনি সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের হাজারো পরিবার প্রতিদিন অপেক্ষা করে প্রবাসী স্বজনদের ফোনের জন্য। মা অপেক্ষা করেন সন্তানের কণ্ঠ শোনার জন্য, স্ত্রী অপেক্ষা করেন স্বামীর ফেরার জন্য, সন্তান অপেক্ষা করে বাবার আনা উপহারের জন্য। এই চার ভাইয়ের পরিবারও হয়তো অপেক্ষা করছিল আনন্দের দিনের জন্য। দেশে ফেরার কথা ছিল দুই ভাইয়ের। বাড়িতে হয়তো প্রস্তুতি চলছিল। কিন্তু সেই আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হলো শোকে।
প্রবাসীদের পরিবারগুলোর জীবন এমনই অনিশ্চয়তায় ভরা। কখন কোন খবর আসে, কেউ জানে না। তাই প্রতিটি প্রবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি সরকারের মানবিক দায়িত্বও।
ওমানের এই ঘটনা হয়তো সাময়িকভাবে আলোচনায় থাকবে, কিন্তু এর শিক্ষা দীর্ঘস্থায়ী হওয়া প্রয়োজন। বিদেশে অবস্থানরত শ্রমিকদের নিরাপত্তা বিষয়ে আরও কার্যকর উদ্যোগ জরুরি। কার্বন মনোক্সাইডের মতো ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। গাড়িতে দীর্ঘসময় অবস্থান, বদ্ধ পরিবেশে ইঞ্জিন চালু রাখা, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল না থাকা—এসব বিষয়ে প্রবাসীদের সচেতন করা জরুরি। বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোও এ বিষয়ে প্রচারমূলক কার্যক্রম নিতে পারে। প্রবাসীদের জন্য নিয়মিত নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, জরুরি সহায়তা নম্বর এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা কার্যক্রম চালু করা প্রয়োজন।
লেখক: সংবাদকর্মী।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












































