গ্যাস সংকটে ধুঁকছে শিল্প, উৎপাদন কমে বন্ধের পথে বহু কারখানা

মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর দেশের গ্যাস সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। দৈনিক প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে সরবরাহ নেমে এসেছে মাত্র ২১৫ কোটি ঘনফুটে। এতে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে এবং আবাসিক গ্রাহকরা চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত পেট্রোবাংলার ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে গত সপ্তাহে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে টার্মিনালের গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ ও একটি বয়লার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুর্ঘটনার পর থেকেই টার্মিনালটি বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে।
বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ থেকে ৪১০ কোটি ঘনফুট হলেও সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২১৫ থেকে ২২০ কোটি ঘনফুটে। ফলে চাহিদার প্রায় অর্ধেক ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব শিল্প, বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং আবাসিক খাতজুড়ে পড়ছে।
পেট্রোবাংলার একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল মেরামতে যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসা বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীরা কাজ করছেন। আগামী পাঁচ থেকে আট দিনের মধ্যে একটি বয়লার চালু করা সম্ভব হলে দৈনিক প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়তে পারে। তবে টার্মিনালটি পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে আরও ৭ থেকে ১০ দিন সময় লাগতে পারে।
গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক কারখানা ডিজেল বা এলপিজি দিয়ে উৎপাদন চালানোর চেষ্টা করছে। তবে এতে উৎপাদন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় ছোট ও মাঝারি অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল জানিয়েছেন, তীব্র গ্যাস সংকটসহ বিভিন্ন কারণে দেশের ১২১টি স্পিনিং মিল উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে ডায়িং, ফিনিশিং ও আয়রনের কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এতে সময়মতো রপ্তানি আদেশ সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে বিদেশি ক্রেতারা ক্রয়াদেশ স্থগিত বা বাতিল করতে পারেন।
দেশের বৃহত্তম শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে প্রয়োজনীয় ১০ থেকে ১৫ পিএসআই গ্যাসচাপের বিপরীতে মিলছে মাত্র ১ থেকে ৩ পিএসআই। অনেক সময় চাপ একেবারে শূন্যে নেমে যাচ্ছে।
এর ফলে কোনাবাড়ী, মৌচাক, চন্দ্রা, টঙ্গী, শ্রীপুর, কালিয়াকৈর ও বোর্ডবাজার এলাকার অন্তত অর্ধশত ছোট ও মাঝারি কারখানা উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কমে গেছে।
গোমতী টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদুর রহমান আনিস বলেন, কয়েক দিন বিকল্প ব্যবস্থায় উৎপাদন চালানোর চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছে।
সাদমা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল রানা জানান, ন্যূনতম ৪ পিএসআই চাপ প্রয়োজন হলেও অনেক সময় ১ পিএসআইও পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁর কারখানার সাত হাজার শ্রমিক কার্যত অলস সময় পার করছেন।
তুসুকা গ্রুপ ডিজেলচালিত জেনারেটরের মাধ্যমে উৎপাদন চালালেও প্রতিদিন অতিরিক্ত প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক তারেক হাসান।
সাভার ও আশুলিয়ার রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানাগুলোতেও গ্যাস সংকটে উৎপাদন কমে গেছে। অনেক কারখানায় দুপুরের পর গ্যাসের চাপ একেবারে কমে যায়।
লুসাকা কারখানার প্রশাসনিক কর্মকর্তা মেজর (অব.) মনিরুজ্জামান জানান, ডিজেল দিয়ে জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে হচ্ছে। এতে ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, সাভার-আশুলিয়া এলাকায় ইতোমধ্যে প্রায় ৫২টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
নারায়ণগঞ্জের ডাইং শিল্পেও সংকট চরমে পৌঁছেছে। আগে সিএনজি স্টেশন থেকে সিলিন্ডারে গ্যাস এনে উৎপাদন চালানো হলেও তিতাসের নির্দেশে সেই ব্যবস্থাও বন্ধ হয়েছে।
বাংলাদেশ নিট ডাইং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আমজাদ হোসেন বলেন, ডাইং একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। মাঝপথে গ্যাস চলে গেলে পুরো কাপড় নষ্ট হয়ে যায়। বর্তমানে সমিতিভুক্ত প্রায় দেড়শ কারখানার উৎপাদন ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তারা জানান, তাদের দৈনিক প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে আগে পাওয়া যেত প্রায় ১৫০ কোটি ঘনফুট। বর্তমানে তা নেমে এসেছে মাত্র ১১৫ কোটি ঘনফুটে।
গাজীপুর জোনের ব্যবস্থাপক (অপারেশন) প্রকৌশলী মো. গোলাম ফারুক জানান, জেলা ও মহানগরে দৈনিক প্রায় ৫৯ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও বর্তমানে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩০ কোটি ঘনফুট।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও। রাজধানী থেকে জেলা শহর—সবখানেই প্রয়োজনীয় চাপ না থাকায় অনেক স্টেশন দিনের বড় অংশ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। যেগুলো চালু রয়েছে, সেখানেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের।
সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর বলেন, একটি স্টেশন স্বাভাবিকভাবে পরিচালনার জন্য অন্তত ১৫ পিএসআই চাপ প্রয়োজন। কিন্তু অনেক এলাকায় এখন ৪ থেকে ৫ পিএসআই, কোথাও ২ পিএসআইয়েরও কম চাপ পাওয়া যাচ্ছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, কলাবাগান, কাঁঠালবাগান, মিরপুর, বাড্ডা, রামপুরা, বাসাবোসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় চুলায় গ্যাস থাকছে না। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে এলপিজি, ইন্ডাকশন কুকার বা বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছে। কেউ কেউ গভীর রাতে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লে তখন রান্না সেরে রাখছেন।
ইস্কাটন গার্ডেনের বাসিন্দা ফরিদা বেগম বলেন, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনাল পুরোপুরি সচল না হওয়া পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ফলে শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে সংকট নিরসনে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান বৃদ্ধি, এলএনজি অবকাঠামোর নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
(ঢাকাটাইমস/২৮ জুলাই/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












































