কোন খুঁটির জোরে একই হাসপাতালে ৬ বছর ডা. মাহফুজ

ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও জামালপুর জেনারেল হাসপাতালেই বহাল রয়েছেন সহকারী পরিচালক ডা. মুহাম্মদ মাহফুজুর রহমান। ২০২০ সালের ৫ এপ্রিল এই পদে যোগ দেওয়ার পর থেকে একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
দীর্ঘ এই সময়ে বদলি না হওয়ায় তার দীর্ঘদিনের পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একই পদে দীর্ঘদিন থাকার সুযোগে হাসপাতালের প্রশাসনিক কার্যক্রম, খাবার ও ওষুধ সরবরাহসহ বিভিন্ন ঠিকাদারি কাজে তার প্রভাব তৈরি হয়েছে।
শুধু দীর্ঘদিনের পদায়ন নয়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন জামালপুর পৌরসভার মেয়র ও পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছানোয়ার হোসেন ছানুর সঙ্গে মাহফুজুর রহমানের ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও সামনে এসেছে।
স্থানীয়দের দাবি, ওই সময় হাসপাতালের বিভিন্ন বিষয়ে তার প্রভাব ছিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও একই কর্মস্থলে বহাল থাকায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তার দীর্ঘমেয়াদি পদায়নের পেছনে কী কারণ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, সরকারি একটি গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতালে একজন কর্মকর্তার ছয় বছরের বেশি সময় একই পদে থাকার প্রশাসনিক ভিত্তি কী। তাকে বদলি না করার বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের কোনো বিশেষ সিদ্ধান্ত, অনুমোদন বা ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা রয়েছে কি না, সেটিও পরিষ্কার নয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাংবাদিক বলেন, ২০২৩ সালে হাসপাতালের খাবারের দাম ও পরিমাণসহ বিভিন্ন তথ্য জানতে তিনি সহকারী পরিচালক মাহফুজুর রহমানের কাছে যান।
তার ভাষ্য, ‘তিনি আমাকে তথ্য দেন। পরে তার চেম্বার থেকে বের হতে না হতেই মেয়রের ফোন। এমন গভীর সখ্যতা ছিল ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সাথে সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ মাহফুজুর রহমানের।’
স্থানীয় কয়েকজনের মতে, একজন কর্মকর্তা দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকলে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের নিরপেক্ষতা, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। তাদের দাবি, মাহফুজুর রহমানের দীর্ঘদিনের পদায়ন এবং তার দায়িত্বকালের প্রশাসনিক কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পর্যালোচনা করা উচিত।
সরকারি চাকরিতে একই কর্মস্থলে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বদলি বা কর্মস্থল পরিবর্তনের কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা প্রযোজ্য কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় সাড়ে ছয় বছর একই হাসপাতালে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বদলি না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী পরিচালক ডা. মুহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘বদলি তো সরকারের কাজ। আমাকে কেন বদলি করছেন না, এটা তারাই ভালো বলতে পারবেন। তবে আমি বদলির জন্য কাগজপত্র দিয়ে রেখেছি। আর আমি এখানকার চেয়ারে কাগজপত্র নিয়েই বসে আছি।’
তবে হাসপাতালের খাবার ও ওষুধ সরবরাহের ঠিকাদারি কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার এবং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের বিষয়ে তার কাছ থেকে পৃথক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জামালপুরের সিভিল সার্জন ডা. আজিজুল হক বলেন, ‘তিন বছরের অধিক সময় একই কর্মস্থলে থাকতে পারবেন কি না, বিষয়টা আমার জানা নেই। এ সংক্রান্ত কোনো পরিপত্র আমার কাছে নেই। তবে তার বদলি বা পদায়ন করতে পারেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এখানে সিভিল সার্জনের কিছু করনীয় নেই।’
এর মধ্যে গত শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) জামালপুর জেনারেল হাসপাতাল পরিদর্শন করেন জামালপুর-১ (দেওয়ানগঞ্জ-বকশীগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ও বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। হাসপাতালের সার্বিক পরিস্থিতি দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। রোগীদের জন্য বরাদ্দ অর্থ ও সরঞ্জাম যথাযথভাবে ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা তদন্ত করার কথাও জানান মন্ত্রী।
মন্ত্রীর ভাষ্য, ‘এখানে আমার কাছে একটি সন্দেহ আছে, সেটা আমি তদন্ত করবো। এখানে ২৫০ শয্যার হাসপাতাল। সেখানে ৭৫০ রোগীর খাবার-দাবার, সরাঞ্জম সরবরাহ করা হয়। এখানকার ২৫০ আর ওইখানের (জামালপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল) ৫০০ শয্যা। এই ৭৫০ শয্যার জন্য সরকার থেকে দেওয়া হয়। এই টাকাগুলি রোগীদের জন্য সঠিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে কি না তদন্ত করে দেখবো।’
স্থানীয়দের দাবি, ছয় বছরের বেশি সময় একই হাসপাতালে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিকভাবে পর্যালোচনা করা উচিত। একই সঙ্গে হাসপাতালের খাবার ও ওষুধ সরবরাহসহ বিভিন্ন ঠিকাদারি কার্যক্রমে মাহফুজুর রহমানের কোনো প্রভাব, অনিয়ম বা স্বার্থসংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, তা সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই ও প্রয়োজনীয় তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
(ঢাকা টাইমস/১৬সেপ্টেম্বর/এসএ)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন











