অ্যাসাইনমেন্ট থেকে লেদার পণ্যের উদ্যোগ কুবি শিক্ষার্থীদের

কুবি প্রতিনিধি, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১:২২
অ- অ+

একটি বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাসাইনমেন্ট; সাধারণ একাডেমিক কাজ হিসেবেই যার যাত্রা শুরু। কিন্তু সেই কাজই যখন ভাবনার দুয়ার খুলে দেয় বাস্তব উদ্যোগের, তখন অ্যাসাইনমেন্ট আর শুধু খাতার পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) মার্কেটিং বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের তিন শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রেও ঘটেছে তেমনই। প্রিন্সিপলস অব মার্কেটিং (এমকেটি-২২১) কোর্সের ‘নিউ প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট’ অ্যাসাইনমেন্টে লেদারের জুতা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের সম্ভাবনা ও ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের বাস্তব প্রয়োজনকে সামনে রেখে তারা শুরু করেছেন ‘মোডেক্স লেদার অ্যান্ড ফুটওয়্যার’।

একাডেমিক চিন্তা থেকে উদ্যোক্তা হওয়ার এই যাত্রায় বিভাগের মো. ইয়ামিন আহমেদ, মো. আশরাফুল ইসলাম, মো. পারভেজ সরকারের লক্ষ্য- সাশ্রয়ী দামে মানসম্মত লেদার পণ্য শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। এই ভাবনা থেকেই শুরু হয় ‘মোডেক্স লেদার অ্যান্ড ফুটওয়্যার’- এর পথচলা। বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যে চামড়া, চামড়াজাত পণ্য ও ফুটওয়্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। ২০১৮–১৯ অর্থবছরে লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যারকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ২০২৩–২৪ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, ওই অর্থবছরে ফুটওয়্যার থেকে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৯৬০.৮৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এছাড়া ফুটওয়্যার বাদে লেদার ও লেদার প্রোডাক্টস থেকে রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৪৯৯.১৩ মিলিয়ন ডলার।

শিক্ষার্থীদের মতে, বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের সম্ভাবনা শুধু কাঁচা চামড়া রপ্তানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে জুতা, ব্যাগ, বেল্টসহ বিভিন্ন ফিনিশড লেদার প্রোডাক্ট তৈরির মাধ্যমে এ খাতে আরও বড় সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা, দক্ষতা উন্নয়ন, কমপ্লায়েন্স ও পরিবেশগত ব্যবস্থাপনাসহ বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে এই শিল্পে।

অ্যাসাইনমেন্টের কাজ করতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের সম্ভাবনার পাশাপাশি নিজেদের ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক কিছু বাস্তব সমস্যাও চিহ্নিত করেন। তাদের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের আশপাশে মানসম্মত লেদার জুতার পর্যাপ্ত সংগ্রহ বা বিক্রয়কেন্দ্র নেই। ফলে প্রয়োজনের সময় শিক্ষার্থীদের শহরে গিয়ে পণ্য কিনতে হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যস্ত একাডেমিক জীবনে প্রতিটি শিক্ষার্থীর হাতে সবসময় শহরে গিয়ে কেনাকাটা করার মতো সময় থাকে না। আবার সময় থাকলেও ভালো মানের জুতা কিনতে গেলে অনেক সময় শিক্ষার্থীদের বাজেটের বাইরে চলে যায় পণ্যের দাম। এই বাস্তবতা থেকেই শিক্ষার্থীদের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়—কোয়ালিটি ও বাজেট, দুটির কোনোটির সঙ্গেই আপস না করে যদি শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত লেদার পণ্য সহজলভ্য করা যায়, তাহলে কেমন হয়? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ‘মোডেক্স লেদার অ্যান্ড ফুটওয়্যার’- নিয়ে তাদের কাজ শুরু হয়।

উদ্যোগটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরা জানান, তাদের উদ্দেশ্য শুধু পণ্য বিক্রি করা নয়; বরং বাংলাদেশের চামড়া শিল্পকে কাছ থেকে বোঝার চেষ্টা করা। চামড়া কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়, কীভাবে প্রক্রিয়াজাত করা হয় এবং একটি চামড়ার টুকরো কীভাবে ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ জুতায় রূপ নেয়—এসব বিষয় নিয়েও তারা কাজ করছেন।

ইতোমধ্যে তারা কয়েকটি ছোট কারখানা পরিদর্শন করেছেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে শিল্পটির উৎপাদন প্রক্রিয়া ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছেন। সামনে আরও বিভিন্ন ছোট-বড় কারখানা পরিদর্শন করে এ খাত সম্পর্কে বিস্তৃত ধারণা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

শিক্ষার্থীদের মতে, তাদের উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো ক্যাম্পাসের একজন শিক্ষার্থীর প্রয়োজনের সময় তার সাধ্যের মধ্যে মানসম্মত লেদার জুতা পৌঁছে দেওয়া। একই সঙ্গে পণ্যের কমফোর্ট, ডিউরেবিলিটি এবং কনফিডেন্স—এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিতে চান তারা।

একদিকে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় রপ্তানিমুখী চামড়া শিল্প সম্পর্কে জানা, অন্যদিকে সেই শিল্পের মূল্য সংযোজনের অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীদের জন্য সাশ্রয়ী ও মানসম্মত লেদার ফুটওয়্যারের সুযোগ তৈরি করা—এই দুই লক্ষ্যকে সামনে রেখে এগিয়ে যাচ্ছে ‘মোডক্স লেদার অ্যান্ড ফুটওয়্যার’।

উদ্যোক্তারা মনে করেন, এটি এখনো একটি ছোট পদক্ষেপ। ভবিষ্যতে আরও অভিজ্ঞতা, গবেষণা ও বাস্তব কাজের মাধ্যমে নিজেদের উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে চান তারা। একটি বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাসাইনমেন্ট থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে তাদের স্বপ্নের শুরুটা হয়েছে খুব সাধারণ একটি জায়গা থেকে—ক্যাম্পাসের একজন শিক্ষার্থীর প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে।

এ বিষয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী মো. পারভেজ সরকার বলেন, “আমাদের মোডেক্স ফুটওয়্যার অ্যান্ড লেদার- এর যাত্রা শুরুটা কোনো ব্যবসায়িক পরিকল্পনা দিয়ে নয়; বরং একটি বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাসাইনমেন্টের হাত ধরে। প্রিন্সিপলস অব মার্কেটিং- কোর্সের নিউ প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যাসাইনমেন্ট করতে গিয়ে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প সম্পর্কে জানার আগ্রহ তৈরি হয়। পরে আমরা ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের বাস্তব প্রয়োজনগুলো পর্যবেক্ষণ করি।”

তিনি আরো বলেন, “এখানে মানসম্মত লেদার জুতা সহজে পাওয়া যায় না, আবার ভালো ব্র্যান্ডের পণ্য অনেক সময় শিক্ষার্থীদের বাজেটের বাইরে চলে যায়। তাই আমরা এমন একটি উদ্যোগের কথা ভাবি, যেখানে শিক্ষার্থীরা স্টুডেন্ট-ফ্রেন্ডলি বাজেটের মধ্যে মানসম্মত পণ্য পাবে। আমরা শুধু পণ্য বিক্রি করতে চাই না। বাংলাদেশের চামড়া শিল্পকে কাছ থেকে বুঝতে চাই এবং ভবিষ্যতে এই উদ্যোগকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে চাই। আমাদের জন্য এটি একটি ছোট শুরু, তবে আমরা বিশ্বাস করি বড় স্বপ্নের শুরু সবসময় ছোট জায়গা থেকেই হয়।”

(ঢাকা টাইমস/১৬সেপ্টেম্বর/এসএ)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
কুমিল্লা নগরীতে নকশা ও নির্মাণ অনিয়ম, ৯ ভবনের কাজ বন্ধের নির্দেশ
গাজীপুরে প্রথম কমিউনিটি পুলিশ কাবাডি চ্যাম্পিয়নশিপ অনুষ্ঠিত
রাজশাহী জেলার শ্রেষ্ঠ ওসি চারঘাট মডেল থানার মাহাবুবুর রহমান
একাদশে ভর্তির প্রথম ধাপের ফল প্রকাশ