আগস্টে এপিবিএনের নানা অভিযান
মাদক, অস্ত্র ও মানব পাচার ঠেকাতে এপিবিএনের বিশেষ পরিকল্পনা

নতুন আইনের আওতায় মামলা তদন্তের ক্ষমতা পেয়েছে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)। তবে বাহিনীটি স্বতন্ত্রভাবে সব মামলার তদন্ত করবে না। সরকার, আদালত বা পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) যেসব মামলা এপিবিএনের কাছে ন্যস্ত করবেন, সেসব মামলারই তদন্ত করবে বাহিনীটি।
বৃহস্পতিবার বিকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় এ তথ্য জানান এপিবিএনের ডিআইজি (প্রশাসন) মোহাম্মদ শাহজাহান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন— অতিরিক্ত ডিআইজি (অপারেশনস ও ইন্টেলিজেন্স) নুরুল ইসলাম, পুলিশ সুপার (ইন্টেলিজেন্স) আসমা বেগম রিটা এবং পুলিশ সুপার (ট্রেনিং, ল’ অ্যান্ড মিডিয়া) মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, নতুন আইনের ফলে এপিবিএনের তদন্ত কার্যক্রমের আইনগত ভিত্তি আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও পার্বত্য এলাকার মতো ভৌগোলিকভাবে দুর্গম স্থানে যেসব অপরাধের তদন্তে জেলা পুলিশের সীমাবদ্ধতা রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে এপিবিএনকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।
তিনি বলেন, এপিবিএন সব মামলা তদন্ত করবে না। সরকার, আদালত বা আইজিপি যেসব মামলা বাহিনীটির কাছে ন্যস্ত করবেন, শুধু সেসব মামলাই তদন্ত করা হবে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে এপিবিএন। বাহিনীটির হিসাবে, ক্যাম্পে প্রায় ১৮ লাখ মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন প্রায় ২ হাজার ২০০ সদস্য। এত বড় জনগোষ্ঠীর তুলনায় জনবলের এই অনুপাতকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন ডিআইজি।
তিনি জানান, ক্যাম্প এলাকায় আরও জনবল বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন একটি ব্যাটালিয়ন স্থাপনের জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
ক্যাম্প এলাকায় মাদক, অস্ত্র, অপহরণ, নারী নির্যাতন ও মানবতাবিরোধী অপরাধকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। এর পাশাপাশি মানব পাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণেও এপিবিএন কাজ করছে।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আগমনের পর ক্যাম্প এলাকায় বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সূত্রপাত হয়েছে উল্লেখ করে মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, দুর্গম এলাকায় গিয়ে এসব অপরাধের তদন্ত জেলা পুলিশের জন্য অনেক ক্ষেত্রে জটিল হয়ে ওঠে। এ কারণে আগে সরকারের অনুমতি নিয়ে এপিবিএনের নিরস্ত্র সাব-ইনস্পেক্টরদের তদন্তকাজে যুক্ত করা হয়েছিল। নতুন আইনে এ কার্যক্রমের আইনগত ভিত্তি আরও পরিষ্কার হয়েছে।
সাইবার অপরাধে আলাদা সেলের সুযোগ
নতুন আইনে সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এপিবিএনের আলাদা সেল গঠনের সুযোগ রাখা হয়েছে বলেও জানান ডিআইজি। পাশাপাশি বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও অপরাধ দমনে এপিবিএনের ভূমিকা আইনে আরও স্পষ্ট করা হয়েছে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিমানবন্দর বাংলাদেশের ভূখণ্ডের অংশ হওয়ায় সেখানে পুলিশের এখতিয়ার রয়েছে। তবে নিরাপত্তা ও অপরাধ দমনের বিষয়টি আলাদাভাবে দেখতে হবে। বিমানবন্দরে বিভিন্ন সংস্থা নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করবে।
বিমানবন্দরে সংঘটিত কোনো অপরাধের তদন্ত এপিবিএন করতে পারবে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, নতুন আইনে এতে বাধা নেই। কোনো অপরাধের তদন্ত এপিবিএন করবে বলে মনে করলে আইন অনুযায়ী তা করার সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, বিমানবন্দরের এপ্রন, আউটারসহ বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় থাকবে। আইনে যে দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে, প্রত্যেক সংস্থা সে অনুযায়ী কাজ করবে।
আগস্টে ৭৮৪ হারানো মুঠোফোন উদ্ধার
মতবিনিময় সভায় আগস্ট মাসে এপিবিএনের বিভিন্ন কার্যক্রম ও সাফল্যের তথ্য তুলে ধরেন ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান।
তিনি জানান, প্রযুক্তির সহায়তায় ওই মাসে ৭৮৪টি হারানো মুঠোফোন উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া তিনটি হ্যাকড ফেসবুক আইডি, দুটি হোয়াটসঅ্যাপ, দুটি ই-মেইল ও একটি টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্ট উদ্ধার করা হয়েছে। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে ৫৭২ জনকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। বিকাশ ও নগদ প্রতারণার ঘটনায় ৭ লাখ ৪৯ হাজার ৭১৮ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।
মাদকবিরোধী অভিযানে ৬ হাজার ৬৫২টি ইয়াবা, ৩ দশমিক ৪৯ কেজি গাঁজা, ৪৩ দশমিক ৭৫ লিটার মদ, ৩৮৭ কার্টন সিগারেট ও ২০৯টি ভেপ উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ১১টি মামলা হয়েছে এবং ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অস্ত্রবিরোধী অভিযানে দুটি ওয়ান শুটার গান, তিন রাউন্ড গুলি ও দুটি গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
প্রায় ১০ কোটি টাকার স্বর্ণ উদ্ধার
চোরাচালানবিরোধী অভিযানে আগস্টে ৪ হাজার ৯২৯ গ্রাম স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানান ডিআইজি। তার দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, উদ্ধার করা স্বর্ণের আনুমানিক মূল্য ৯ কোটি ৭৯ লাখ ৮৮ হাজার ৩৮৫ টাকা। এসব ঘটনায় ১৭টি মামলা হয়েছে এবং ২৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের মুদ্রা ও ২ লাখ ৬৪ হাজার ৯৭৬ টাকা বাংলাদেশি মুদ্রা উদ্ধার করা হয়েছে। ট্রাফিক আইন ভঙ্গের ঘটনায় ৪৮৩টি মামলা করে ১৪ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। বিভিন্ন আইনগত ব্যবস্থা ও অভিযানে আরও কয়েক শ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে সভায় জানানো হয়।
ক্যাম্প থেকে শিশু ও ভুক্তভোগী উদ্ধার
রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় অভিযানের তথ্য তুলে ধরে মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে ২৩টি যানবাহন আটক করে শাহপরীর দ্বীপ হাইওয়ে থানায় পাঠানো হয়েছে। বিক্রয় নিষিদ্ধ রেশন সামগ্রী উদ্ধারের ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে এবং একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এ ছাড়া ক্যাম্প এলাকা থেকে বিভিন্ন চোরাচালানি ও অবৈধ পণ্য উদ্ধার করা হয়েছে। ওই সময়ে তিনটি নিখোঁজ শিশু ও ১৯ জন ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করা হয়েছে।
আগস্ট মাসে ৮, ১৪ ও ১৬ এপিবিএন মিলে মোট ৪৩টি জিআর ও সিআর মামলা করেছে বলে জানান এপিবিএনের ডিআইজি।
তিনি বলেন, শান্তিকালীন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্যান্য ইউনিটকে সহযোগিতা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যুদ্ধকালীন সময়ে ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়ন হিসেবে দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাও এপিবিএনের মৌলিক বৈশিষ্ট্যের অংশ।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













