বইঃ আমার কথা...

`বিজয়চিহ্ন 'V' প্রকাশে ভিন্নতা'

অনলাইন ডেস্ক
 | প্রকাশিত : ২২ নভেম্বর ২০১৬, ১২:৩৭

সৈয়দ আবুল হোসেন বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে আমার কথা। এই বইয়ে তিনি নিজের চিন্তা, কর্মকান্ড, মূল্যবোধ, নানা অভিজ্ঞতা ও পরিকল্পনা সম্পর্কে লিখেছেন।

এটি পড়লে তাকে যারা পুরোপুরি চিনেন না তাদের সুবিধা হবে। বইটি ঢাকাটাইমস২৪ডটকম ধারাবাহিকভাবে ছাপছে। বইটির আজকের পর্বে থাকছে  `বিজয়চিহ্ন 'V' প্রকাশে ভিন্নতা'

আমার একটি ব্যক্তিগত কিন্তু প্রথাবিরোধী হাতের অঙ্গভঙ্গিমূলক বিজয়চিহ্ন আছে, যা আমি প্রকাশে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি এবং প্রায়শ এ চিহ্নের মাধ্যমে আমি আনন্দ প্রকাশ করি এবং জনগণকে আমার মনোভাব জানাই। লোকজন আমার কাছে এ অস্বাভাবিক বিজয়চিহ্নের গোপন রহস্য জানতে চান। এ অধ্যায়ে আমি সে সম্পর্কে কিছু বলব। সাধারণত সবাই তর্জনী ও মধ্যমার সমন্বয়ে ইংরেজি শব্দ ‘ভিক্টরি’র প্রথম অক্ষর ‘V’ দেখিয়ে বিজয় প্রকাশ করে। আমার দেখানো বিজয়চিহ্নটি একটু ভিন্নরকম। প্রথাগত দুই আঙুলের ‘ভি’ চিহ্নের পরিবর্তে আমি ‘বিজয়-প্রকাশে’ পাঁচ আঙুল ব্যবহার করি। আমি একসঙ্গে বৃদ্ধাঙুলসহ, তর্জনী, মধ্যমা, অনামিকা ও কনিষ্ঠ আঙুল উত্তোলন করে বিজয়বার্তা দিই। এই পাঁচ আঙুলের অভিবাদন সম্পূর্ণ আমার নিজস্ব স্টাইল। তবে এটি অর্থবিহীন নয়। অনেক চিন্তা-ভাবনা করে আমি এ বিজয়চিহ্ন প্রকাশের সমধিক যৌক্তিকতা খুঁজে পেয়েছি।


বিশ্বজুড়ে সর্বজনীন চিরাচরিত বিজয়ের চিহ্ন হচ্ছে অনামিকা ও মধ্যমা দিয়ে প্রকাশ করা ইংরেজি ‘V’ চিহ্ন। আমাদের দেশেও একই রকম ‘ভি’ চিহ্ন দেখিয়ে বিজয়বার্তা জ্ঞাপন করা হয়। আমার ব্যক্তিগত অভিমত, কেন আমরা সবসময় আমাদের সুখ ও আনন্দ অন্যের ভাষায় বা অন্যের চিহ্নে প্রকাশ করব? আমাদের বাঙালিদের রয়েছে ঐতিহ্যময় সভ্যতা, সমৃদ্ধ ভাষা এবং অপরিসীম সৃজনশীলতা। পাঁচটি বিষয়কে ইঙ্গিত করার জন্য বিজয়চিহ্নে আমি পাঁচ আঙুল একসঙ্গে উত্তোলন করি। প্রথমত ঐক্য, দ্বিতীয়ত বিজয়, তৃতীয়ত সুখ, চতুর্থত সমৃদ্ধি এবং পঞ্চমত সাফল্য। এ পাঁচটি বিষয়: ঐক্য, বিজয়, সুখ, সমৃদ্ধি ও সাফল্য অর্জিত হলে একটি জাতির উন্নতি হবেই। আর পাঁচ আঙুল উঠালে একসঙ্গে চারটা ‘V’ হয়। প্রথম ‘V’ জাতীয় বিজয়, দ্বিতীয় ‘V’ সামষ্টিক বিজয়, তৃতীয় ‘V’ ব্যক্তিগত বিজয় এবং চতুর্থ ‘V’ বৈশ্বিক বিজয়। এ চারটি ক্ষেত্রে জয়ী হতে পারলে সে জাতির প্রতিটি মানুষ পরিপূর্ণ সমৃদ্ধি ও স্থায়ী শক্তির অধিকারী হতে সক্ষম হয়।


‘‘একজন মানুষ শত বছর হয়তো বাঁচবে না, তবে আমরা মরে গেলেও আমাদের সৃজনশীল কাজগুলো উত্তরাধিকার হিসাবে বেঁচে থাকবে দীর্ঘদিন এবং সেটাই হবে অন্যদের কাছে অনুসরণীয়। অনুসরণীয় কাজই মানুষকে স্মরণীয় করে রাখে।


আমার বিজয়চিহ্ন এখনও কারও কারও কাছে মনে হবে অস্বাভাবিক। সাধারণ প্রতীকী অঙ্গভঙ্গি মনে হতে পারে। তা হলেও তাতে আমাদের রয়েছে স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তা। আমাদের যে সমৃদ্ধ ভাষা এবং ঐতিহ্য রয়েছে, তা গর্ব করার মতো বিষয়। অতীতকালে আমাদের বিজয়ের ইতিহাস এবং আমাদের বর্তমানের প্রত্যাশার সোনালি ঝলক। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে নতুন বাংলাদেশের জন্ম বিশ্ব-ইতিহাসের একটি অনন্য মাইলফলক। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ভাষা-আন্দোলনও একটি গৌরবময় ইতিহাস। আমরা অনেক কিছুই করেছি যা ব্যতিক্রমী। এ কারণে আমরা যা করি সবই সৃজনশীল হওয়া উচিত। সৃজনশীলতা আমাদের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে জাতিসত্তার সংঙ্গে মিশে থাকা উচিত। এই গুণটা থাকা দরকার এবং এই গুণটা থাকলে যেকোনো বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।


কয়েক বছর আগের একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। পদ্মা সেতুর কথা- যে সেতু নির্মাণ করতে পারলে দেশের জিডিপি বেড়ে যাবে প্রায় এক দশমিক ৫০ ভাগ। আর দক্ষিণাঞ্চলের মানুষেরও ভাগ্যের পরিবর্তন হবে। পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব যখন আমার ওপর ন্যস্ত হয়, তখন সত্যি নিজেকে অনেক ভাগ্যবান ও গর্বিত মনে হয়েছে। সারা দেশের মানুষের সঙ্গে এ এলাকার মানুষের যোগাযোগ বাড়বে। সবদিক থেকে ইতিবাচক হবে। সে লক্ষ্যে আমি যোগাযোগ মন্ত্রী হিসেবে কাজটা শুরু করি। কিন্তু আমি তা করতে পারিনি, ঈর্ষাপরায়ণ কিছু লোক আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনে পদ্মা সেতুর কাজ হতে আমাকে সরে যেতে বাধ্য করেছে। এখন প্রমাণিত হয়েছে, আমি একবিন্দু অন্যায় করিনি।


আমাদের কক্সবাজার পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত। এ কক্সবাজারের সমুদ্রতীর ধরে তৈরি করা হয়েছে মেরিন ড্রাইভ। এ মেরিন ড্রাইভ তৈরির অভিজ্ঞতাও কম নয়। তবে আমার ইচ্ছে ছিল এই মেরিন ড্রাইভকে ব্যবহার করে আরও বেশি করে পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঘটানো এবং পর্যটনমুখী বৈচিত্র্যময় ব্যবসায়-বাণিজ্যের প্রসার ঘটানো। এ নিয়ে কেউ কেউ আমার কাছে প্রস্তাবও দিয়েছেন। এর মধ্যে একটি কোম্পানির কথা মনে পড়ে। তারা নতুন ও অদ্ভুত পরিকল্পনার কথা আমাকে জানায়। তারা পর্যটকদের জন্য সমুদ্রের বুকে অত্যাধুনিক আকর্ষণীয় দ্বীপ, বিলাসবহুল হোটেল ও পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ করতে চেয়েছিল। বিশ্বের নানা দেশে এমন হোটেল ও পর্যটনকেন্দ্র রয়েছে। কিন্তু এখনও এটা করা সম্ভব হয়নি।


‘‘যেকোনো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে সৃজনশীল কিছু তৈরি করা গেলে সেটা এক-একটা অনন্য স্থাপত্য নিদর্শন হয়ে উঠতে পারে। কারণ সৃজনশীলতা জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করে এবং জীবনের নিষ্ক্রিয় অংশকে সক্রিয় করে তোলে।”


আমাদের বাংলাদেশে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারকে কাজে লাগানো গেলে পর্যটন শিল্পের মাধ্যমেও বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে সক্ষম হবে। আমার প্রস্তাব, যেকোনো মূল্যে এটা আমাদের করতে হবে। এটা করতে পারলে আমাদের অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি সম্পূর্ণ বদলে যাবে। আমাদের সমুদ্রসৈকত পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ, সবচেয়ে নিরাপদ এবং সবচেয়ে সুন্দর। আমাদের উচিত এর মধ্যে এমন কিছু যোগ করা, যাতে আমাদের ঐতিহ্যের ছাপ থাকে। কেননা এটা তো আর আট-দশটা সাধারণ আকৃতির মতো নয়। যাতে আমাদের ঐতিহ্যের ছাপ স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে এবং দ্বীপটি যেন আমাদের সংস্কৃতির সাক্ষ্য দেয় এমন একটা কিছু করা। তবে সেটা সম্ভব হয়নি। আশা করি আগামীতে কেউ-না-কেউ এটি করবে। তখন পর্যটকদের আগমন বেড়ে যাবে কয়েকশ গুণ। বাংলাদেশ হয়ে উঠবে এশিয়ার সুইজারল্যান্ড।


সে স্বপ্ন একদিন বাস্তব হবে, পৃথিবীর বিখ্যাত ও সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টিগুলোর মধ্যে অন্যতম হবে কক্সবাজার- যা হবে আমাদের কাছে গৌরবের প্রতীক এবং গর্বের বিষয়। যেকোনো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে সৃজনশীল কিছু তৈরি করা গেলে সেটা অনন্য স্থাপত্য নিদর্শন হয়ে উঠতে পারে। কারণ সৃজনশীলতা জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করে এবং জীবনের নিষ্ক্রিয় অংশকে সক্রিয় করে তোলে। শুধু তাই নয়, অন্যান্য স্থাপত্য-নিদর্শনও জীবনকে সক্রিয় করে তোলে।


আশার কথা, সরকার কক্সবাজারকে বিশ্বমানের পর্যটনশহর হিসাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে মাস্টার প্লান গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এ মাস্টার প্লান বাস্তবায়ন করা গেলে বিশাল সৃষ্টিকর্ম, যা আকাশ থেকে দৃশ্যমান হবে। এটা হবে আমাদের উচ্চাকাক্সক্ষার প্রতীক, শক্তির প্রতীক এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতীক। কক্সবাজারে অনুপম ও অসাধারণ কৌশলে প্রকাশিত হবে আমাদের সৃজনশীলতা, নতুনত্ব এবং ঐতিহ্য। সেন্ট মার্টিনকে ঘিরেও গড়ে তোলা যেতে পারে এমন কিছু, যা হবে দেশের একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। সেখানে আমাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে মিল রেখে পর্যটকদের জন্য স্থাপনা তৈরি করা দরকার। তবে যেটাই করা হোক না কেন, তা যেন পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে না দাঁড়ায় সেটি খেয়াল রাখতে হবে।


আমি আমার সহকর্মী, বন্ধু ও পরিচিতজনদের বলি- যদি আপনি ছোট বিষয়ে আপনার সৃজনশীলতাকে অভ্যস্ত করাতে পারেন, তাহলে সৃজনশীলতা বড় আকারে বিমূর্ত হয়ে আপনাকে অনুসরণ করবে। সৃজনশীলতা একটা সহজাত প্রতিভা, যা মানুষের চিন্তাশৈলীতে অবস্থান করে। একটু উদ্দীপনা পেলে তা সুপ্ত অবস্থা ত্যাগ করে বের হয়ে আসে। সৃজনশীলতা জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করে এবং জীবনের নিষ্ক্রিয় অংশকে সক্রিয় করে তোলে। মানুষ শত বছর হয়তো বাঁচবে না, তবে আমরা মরে গেলেও আমাদের সৃজনশীল ক্রিয়াকর্ম উত্তরাধিকার হিসাবে বেঁচে থাকবে দীর্ঘদিন।


সৃজনশীলতা এমন একটি প্রত্যয় যা ব্যক্তিবিশেষের প্রতিভা কোথায় লুকিয়ে আছে তা বের করে এবং কাজে লাগায়। সৃজনশীলতা প্রকাশের জন্য সাহস প্রয়োজন। অনেক লোক সৃজনশীল হলেও ভীরুতা তার সৃজনশীলতাকে আজীবন সুপ্ত করে রাখে। কারন, ভীরুতা বা ভয় মানুষকে দমিয়ে রাখে, আদর্শ পথে, সঠিক পথে এবং নিজের সৃজনশীলতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এমন ভয়ের খোলস ছেড়ে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। ভয়কে পরিহার করতে হবে। ঐক্য, বিশ্বাস, ধৈর্য ও সহনশীলতা প্রদর্শনের মাধ্যমে নতুনকে গ্রহণ করতে হবে, প্রকাশ করতে হবে। পরিবর্তনকে মেনে নেওয়ার মানসিকতা থাকলে আমাদের বিকাশ অবশ্যই হবে। সুনিশ্চিত হবে বিজয়।

 

আগামীকাল কাল থাকছে - ​‘পদ্মা সেতু’

আরও পড়ুন -‘উন্নয়ন ও অগ্রাধিকার’ ​‘ইতিবাচক ভাবনা সাফল্যের চাবিকাঠি’ , ‘ভবিষ্যতের সরকার কেমন হবে’   ‘মাতৃভাষার প্রতি মমতা’‘সুখ ও শান্তি : আমাদের করণীয়’ , ‘নেতৃত্বের শক্তি’ ‘আদর্শ জীবন গঠনে মূল্যবোধ’, ‘আমার প্রাত্যহিক জীবন’​, 'আমার অনুভব'

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত