অতি সাধারণ এক সাংবাদিকের কথা-২৭

আলম রায়হান
 | প্রকাশিত : ০৮ জুন ২০১৭, ১৫:০১

দলবল নিয়ে সুগন্ধা ছেড়ে মোজাম্মেল ভাইয়ের হঠাৎ চলে যাওয়ার ধকল কোনো রকম কাটিয়ে জোড়াতালি দিয়ে সুগন্ধা মার্কেটে দিলাম। এরপর প্রধান সমস্যা হিসেবে সামনে চলে এলো ম্যানপাওয়ার সঙ্কটের বিষয়টি। এ বিষয় করণীয় নিয়ে মোয়াজ্জেম সাহেবের সঙ্গে আলাপ করতে চাইলাম। কিন্তু তিনি এ প্রসঙ্গে কোনো কথা বলতে চাইলেন না। বরং খুবই আবেগপ্রবণ কণ্ঠে বললেন, ‘ভাই আমি কিছু জানি না, যা করার আপনে করেন; পত্রিকা আপনার।’  বলে কি; পত্রিকা আমার! আসলে মালিকরা ঠেকলে পরকীয়া প্রেমে নিমজ্জিত অক্ষম পুরুষের চেয়েও বেশি উদার হয়ে যায়! আবার উল্টাটা হয় বিপদ কেটে গেলে। দু’রকম অভিজ্ঞতা আমার সুগন্ধায়ই হয়েছে।

মোজাম্মেল ভাই চলে যাবার ধকল কাটিয়ে প্রথম সংখ্যা মার্কেটে দেবার পর শুরু হলো সুগন্ধার জন্য লোক অনুসন্ধান। কিন্তু গরু খোঁজার চেয়েও কাজের লোক খোঁজা কঠিন। আর আমি সব সময়ই মনে করি, লোক বাছাই করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য; মিডিয়ার জন্য তো প্রধান গুরুত্বের ও জটিল কর্ম এটি। ভাঙ্গা হাট সুগন্ধা আবার জমজমাট করার জন্য জনশক্তি সংগ্রহের কাজে প্রথম সংগ্রহ মাসুদ কামাল।

সাপ্তাহিক সুগন্ধার পাশাপাশি আমি দৈনিক নবঅভিযানেও কাজ করতাম। পত্রিকাটি তখন প্রায় ভাঙ্গা হাট; আমি চিফ রিপোর্টার। পত্রিকার নেপথ্য  মালিকানায় সে সময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদুল হাসান; প্রকাশ্যে তার স্ত্রীর বড় ভাই এস এম রেজাউল হক। অব্যবস্থাপনার কারণে পত্রিকাটি শেষ দিকে একরকম এতিমখানা ও ফোরকানিয়া মাদ্রাসার মতো হয়ে গিয়েছিল। অথচ শুরুতে এ পত্রিকাটি ছিল খুবই সম্ভাবনাময়। এটিই আমার প্রথম দৈনিক পত্রিকা, পত্রিকার মধ্য যৌবনে শুরু করেছিলাম সাব-এডিটর হিসেবে। পরে রিপোর্টিং বিভাগে আসি নির্বাহী সম্পাদক খন্দকার আতাউল হকের বদান্যতায়। তখন আমরা মালিবাগে এক বিল্ডিংয়ে থাকতাম। এ বাড়ির মালিক ছিলেন স্ত্রী সালেহা হত্যা মামলায় ফাঁসি হওয়া ডা. ইকবালের বাবা। আমার জীবনে এত ভদ্র মানুষ আমি আর দেখিনি। দোতলায় কবি মুকিত চৌধুরীর ফ্লাটের এক রুমে সাবলেট থাকতাম। আমার সঙ্গে থাকতো রাজ্জাক নামে এক বন্ধু। দুজনই ব্যাচেলর। কিন্তু এ নিয়ে বাড়ির মালিকের কোনো আপত্তির কথা শুনিনি। তবে শুনেছি, রাগের মাথায় স্ত্রীর হত্যার দায়ে সামরিক আদালতে ডা. ইকবালের ফাঁসির রায় ক্রয় করা হয়েছিল। উল্লেখ্য, এ আদালতে তিন বিচারকের মধ্যে পেশাদার বিচারক আসামিকে দিয়েছিলেন দশ বছরের কারাদ-। কিন্তু সামরিক বাহিনীর দুই সদস্য দিলেন মৃত্যুদ-। এবং  শেষতক ফাঁসি কার্যকর হয়, তখন প্রেসিডেন্ট সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমান। যে রুমে সালেহার হত্যাকা- হয়েছিল আমি সেই রুমেই সাবলেট থাকতাম।

দৈনিক নবঅভিযানের মরণ বেলায় মাসুদ কামালের সঙ্গে আমার দেখা। পত্রিকার চাকরির পাশাপাশি সে টিউশনিও করতো। তাকে কেবল মুখ চেনা চিনতাম; কোনো রকম ঘনিষ্ঠতা ছিল না। তবে খেয়াল করেছি, খুবই সুদর্শন একটি ছেলে অফিসে আসে; নীরবে কাজ করে চলে যায়; কারো সঙ্গে গল্পগুজব করতে দেখিনি কখনো। আবার সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজমের ছাত্র, সদ্য পাস করে বেরিয়ছে। আমার প্রয়োজনে তাকে সুগন্ধায় নেবার আগে অনেকটা গায়ে পড়ে তার উপকার করার চেষ্টা করেছি, সাপ্তাহিক সন্দ্বীপে পাঠিয়েছিলাম পারভেজ আলম চৌধুরীর কাছে। ততদিনে নবঅভিযানে তার চাকরীর মেয়াদ চার মাস পেরিয়ে গেছে। তবে বেতন পায়নি এক মাসেরও। মোট ছয় মাসের চাকরী জীবনে সে বেতন পেয়েছিল সম্ভবত মাস দুয়েকের। মানে সকলেই চার মাসের বেতন বকেয়া ছিল। যা আর কখনই উসুল হয়নি। এ বাস্তবতায় দৈনিক নবঅভিযানে মাসুদ কামালের ছয় মাসের চাকরির চার মাসের বেতন হারিয়ে গেছে কর্তৃপক্ষের অদক্ষতার ব্লাক হোলে। এই মাসুদ কামাল হলো সুগন্ধায় আমার প্রথম সংগ্রহ।

নবঅভিযানে অনেকে  আমার ঘনিষ্ঠ থাকা সত্ত্বেও মাসুদ কামালকে নেয়ায় কেউ কেউ আমার উপর খুবই অসন্তষ্ট হয়েছিল। এদের মধ্যে সবচেয়ে বিক্ষুব্ধ মোদাব্বের আদি রসাত্মক রসিকতাও করেছে দু’একবার। এখন সে দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনে ভালো অবস্থানে আছে; তবু সেই সময়ে তার প্রতি আমার ‘চরম অবিচার’ এখনো ভুলেনি মোদাব্বের!

মাসুদ কামালকে উদ্দেশ্য করে দুপুর বেলা শান্তিবাগের নবঅভিযান অফিসে গেলাম; যেটা সে সময় রিপোর্টারদের জন্য ছিল খুবই অসময়। সে আমলে রিপোর্টারদের অফিস শুরু হতো সন্ধ্যার পর। দেখলাম মাসুদ কামাল যথারীতি নীরবে কাজ করছে। তাকে নীচে ডেকে নিয়ে এলাম। একত্রে চাকরি করার চার মাসের মাথায় সে আমার নাম জেনেছিলো, তাও আমি বলার কারণে। এরপরও নীচে ডাকায় সে ভেবেছিলো তাকে চা খেতে ডেকেছি; যা তার এক স্মৃতিকথায় সে লিখেছে বছর দুই আগে। নীচে নেমে তাকে রিকশায় উঠতে বলায় সে একটু হোচট খেলো। বললো, কোথায় যাবো?
ঃ এই তো কাছেই! ওঠেন..
ঃ কখন ফিরবো?

তার প্রশ্নের উত্তর দেবার আগেই আমরা রিকশায় চেপে বসলাম। এর পর তাকে দিলাম নতুন চাকরির প্রস্তাব। এবং বলতে গেলে সিদ্ধান্তও আমি দিয়ে দিলাম, এখনকার অনেক টেলিভিশন অ্যাংকরের মতো। এরপরও সে আধা শেষ করা হাতের আইটেমের প্রসঙ্গ তুললো। শেষ করে আসার প্রস্তাব দিলো। ততক্ষণে আমাদের রিকশা কাকরাইল মোড় ছাড়িয়েছে। আমি বললাম, কোনো প্রয়োজন নেই; আপনি তো ওখানে আর যাবেন না। তাই ওই কাজটা অর্ধেক হলো কি পুরোটা হলো- তাতে কি আসে যায়?  কথা বলতে বলতে আমরা মতিঝিলে সুগন্ধা অফিসে পৌঁছে গেলাম।

অফিসে ঢুকেই তার বসার টেবিল দেখিয়ে দিলাম। এরপর সুগন্ধার কয়েকটি কপি দিলাম পত্রিকার ধরন বোঝার জন্য। অনেক টেশনের মধ্যেও আমার পুরো বিবেচনায় ছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জার্নালিজমে সদ্য পাস করা একটি  ছেলের পক্ষে চট করে সুগন্ধার মানের একটি পত্রিকা মেনে নেয়া প্রায় অসম্ভব; কাজ করার মতো আকর্ষণীয় মনে করা তো অনেক দূরের কথা। এটি সকল ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ছাত্রজীবনে যে উচ্চতায় স্বপ্নে জাল বোনা হয় কর্মজীবনের সূচনায় তার প্রতিফলন প্রায় ক্ষেত্রেই ঘটে না। ফলে কাজের প্রতি যে অনীহা সৃষ্টি হয় তাতে ব্যক্তির ও প্রতিষ্ঠানের সমান সর্বনাশ হয়। এটা বিবেচনায় রেখেইে মাসুদ কামালকে সতর্কতার সাথে হ্যান্ডেল করলাম যাতে সে শুরুতেই বিরক্ত হয়ে হেঁটে না যায়!

ভাগ্য সহায় ছিল। এক বলে এক রানে ম্যাস জেতার মতো মাসুদ কামাল ছিল সুগন্ধার জন্য আমার সেরা সংগ্রহ। প্রায় পাঁচ বছর দাপটের সঙ্গে সুগন্ধা চালাবার সাফল্যের ক্ষেত্রে বলতে গেলে মেরুদ- ছিল মাসুদ কামাল। সম্পাদনা থেকে শুরু করে নিজের প্রোডাকশন- সব ক্ষেত্রেই মাসুদ কামাল সমান পারদর্শী ছিল। আর কঠিন পরিস্থিতি হজম করার ক্ষেত্রেও তার ক্ষমতা ছিলা অসাধারণ। কঠিন হলেও সত্য কথা অতি সহজে বলার প্রবণতা তার তখনও ছিল। যে প্রবণতার কারণে সুগন্ধার আমল থেকে তাকে আমি ‘সক্রেটিস’ বলে আসছি। এতে সে খুশি না হলেও খুব একটা বিরক্ত হতে দেখিনি কখনো।

সুগন্ধায় শুরু হওয়া মাসুদ কামালের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক অবিশ্বাস্য দ্রুততায় বিকশিত হয়েছে। সেই সম্পর্কের জেরেই সে আমাকে দৈনিক যায়যায়দিন-এ নিয়েছিল স্পেশাল করোসপন্ডেন্ট হিসেবে। তখন সে বার্তা বিভাগের সর্বময় ক্ষমতাধর চিফ রিপোর্টার। যায়যায়দিন ছাড়ার কিছু দিন পর নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে সে দায়িত্ব নেয় সংবাদপত্র নামে একটি দৈনিকের। সুগন্ধায় আমি গভীর আস্থার নির্ভর করতাম তার উপর; সংবাদপত্রে সে অনেকটা বিশ্বাস রেখেছে আমার উপর। তবে শেষতক এ পত্রিকাটি টেকেনি। ২০০৮  সালের নির্বাচনে রাজনৈতিক ধারায় তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন আসায় পত্রিকাটির মালিকপক্ষ পিছটান দেয়। ট্রেনের কাঠামো থেকে পত্রিকাটি মাসুদ কামালের মাধ্যমেই টেম্পুর অবস্তায় নিয়ে আসা হয়। ফলে আবার আমাদের পেশাগত বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয়। তবে এ বিচ্ছিন্নতা দীর্ঘমেদায়ী ছিল না। মাস কয়েক পর আমি বাংলাভিশনে সংযুক্ত হই কান্ট্রি এডিটর হিসেবে। এর দুই মাসের মধ্যে মাসুদ কামাল বাংলাভিশনের বার্তা সম্পাদক হয় আমার জোর লবিংয়ে।

সে সময় বাংলাভিশনে মোস্তফা ফিরোজ দিপু-আমিরুর ইসলাম টোকন-মাসুদ কামালের ত্রিরতœ টিম তৈরি হয়েছিল; তারা তিনজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজমের ছাত্র এবং ক্লাসমেট। সে সময় অভ্যন্তীণ গোলযোগে অনুষ্ঠান বিভাগ থেকে শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম বাংলাভিশন ছাড়তে বাধ্য হন; বার্তা বিভাগে আমি। বাংলাভিশন ছাড়ার মাস কয়েক পর আমি মাইটিভিতে যুক্ত হওয়ায় আমাদের মধ্যে হাউজের দূরত্ব সৃষ্টি হয়; কিন্তু অটুট থাকে ব্যক্তিগত সম্পর্ক। এবং এখনো যে কোনো সঙ্কটে পরামর্শের জন্য আমি মাসুদ কামালের দ্বারস্থ হই সর্বপ্রথম। এবং তাৎক্ষণিকভাবে আমার পছন্দ হোক বা নাই হোক- সৎপরামর্শই দেয় মাসুদ কামাল। যা সে করে সকলের বেলায়ই।

সুগন্ধার মাধ্যমে তৈরি হওয়া আমাদের পেশাগত সম্পর্ক পারিবারিক পর্যায়ে পৌঁছেছিল অল্প সময়ের মধ্যে। তবে অতি সম্প্রতি তার দ্বিতীয় বিয়ের খবর জেনেছি ফেসবুকের কল্যাণে। অবশ্য দাওয়াত পেলেও মাসুদ কামালের দ্বিতীয় বিয়েতে আমি যেতাম না। কারণ শাহানার সঙ্গে তার বিবাহ বিচ্ছেদ আমার কাছে কখনই গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। এবং এ জন্য বরাবরই মাসুদ কামালকেই দায়ী মনে করে আসছি আমি। এরপরও দোষ যারই হোক আমার ধারণা ছিল, বিচ্ছেদের জীবনে যে যতই নীচে নামু, দোহের মিলন আবার হবেই। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এতো সমঝোতা আমি আর দেখিনি যা দেখেছি মাসুদ কামাল-শাহানার মধ্যে। বিশেষ করে বিচ্ছেদ হবার পরও সাবেক স্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার ক্ষেত্রে মাসুদ কামাল সম্ভবত ইউনিক। সব মিলিয়ে শাহানার স্থানে মাসুদ কামালের পাশে আর কাউকে মেনে নেয়া আমার মতো কিঞ্চিত পশ্চাৎপদ সাধারণ মানসিকতার মানুষের পক্ষে খুই কঠিন। আর আমি স্বভাবগত কারণে কঠিন কাজ এড়িয়ে চলি।  যে প্রবণতা আমার অনেক অনিষ্টের কারণ বলে মনে করেন অনেকে!

লেখক: জেষ্ঠ্য সাংবাদিক
e-mail: [email protected]

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত