একুশ মানে মাথা নত না করা

প্রভাষ আমিন
 | প্রকাশিত : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:১৬

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ, শেষ হয়েছিল ১৬ ডিসেম্বর। মুক্তির যুদ্ধটা ৯ মাসের হলেও মুক্তির সংগ্রামটা ছিল ২৩ বছরের। ’৪৭ সালে অনেক প্রত্যাশার পাকিস্তান গঠিত হলেও আমাদের হতাশ করতে পশ্চিমারা বেশি সময় নেয়নি। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল অদ্ভুততম রাষ্ট্র পাকিস্তান। পশ্চিম আর পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্ব ছিল এগারো শ মাইল, কিন্তু মানসিক দূরত্ব ছিল অনতিক্রম্য। ভাষা, সংস্কৃতি কোনো কিছুতেই মিল ছিল না। ধর্ম যে পাকিস্তানকে এক সূত্রে গাঁথতে পারতো, সেটাও পারলো না পশ্চিমাদের প্রভুসুলভ মানসিকতায়। পূর্ব পাকিস্তানে মানুষ বেশি। তাই শাসনের অধিকারও তাদেরই থাকার কথা। পাকিস্তানে বাংলাভাষী মানুষ বেশি। তাই বাংলাই হওয়ার কথা রাষ্ট্রভাষা। কিন্তু স্বাধীনতার মাত্র এক বছরের মাথায় পশ্চিমারা আমাদের চেতনায়, আমাদের ভাষায় ছুরি মারলো। ১৯৪৮ সালে ঢাকায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জানিয়ে দিলেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। তাৎক্ষণিকভাবে কায়েদে আজমের মুখের ওপর ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্ররা বলে দিয়েছিলেন, না, না। এই ছোট্ট একটি শব্দেই লুকিয়ে ছিল স্বাধীনতার স্ফুলিঙ্গ। তখনও কেউ বুঝতে পারেননি, এই একটি প্রতিবাদ জ্বালিয়ে দিতে পারে বিপ্লবের আগুন। ভাষা আন্দোলন চূড়ান্ত পরিণতি পায় ’৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। আর সেই ২১ ফেব্রুয়ারিই যেন চূড়ান্ত গতি পায় মুক্তিসংগ্রাম। আরো স্পষ্ট হয়, ‘না’।

’৫২ সালের ভাষা আন্দোলন নিছক একটি রাজনৈতিক আন্দোলন নয়। সে আন্দোলনেই রোপিত হয়েছিল ভাষাভিত্তিক জাতি গঠনের বীজ, ঘটেছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনার উন্মেষ। ধর্ম নয়, একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার রাষ্ট্র গঠনের আকাক্সক্ষার শুরুটা হয়েছিল সেদিন, যার সুন্দরতম পরিণতি একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদারদের আত্মসমর্পণে।

একুশ আমাদের দারুণ এক আবেগের নাম। এখনো যতবার ঢাকা মেডিকেলে যাই, ততবার সেই তোরণটি দেখে শিহরিত হই। যতবার শহীদ মিনারে যাই, ততবার আপ্লুত হই। ৬৬ বছরেও সে আবেগে একটুও ধুলো জমেনি। বরং দিনে দিনে সে আবেগ আরো সংহত হচ্ছে, যুক্ত হচ্ছে নতুন মাত্রা। একুশ মানে এখন আর নিছক একটি আন্দোলন, ভাষার জন্য রক্ত দেওয়ার দিন নয়; একুশ মানে প্রেরণা, একুশ মানে মাথা নত না করা। একুশ মানে নিছক বাংলা ভাষার লড়াই নয়, একুশ মানে আজ সারা বিশে^র মানুষের মায়ের ভাষার লড়াইয়ের দিন। আমরা যেমন মাকে ভালোবাসি, দেশ মাকে ভালোবাসি; তেমনি ভালোবাসি মায়ের ভাষাকেও। যার যার মায়ের ভাষাকে সে সে ভালোবাসবে। কারো মুখের ভাষা যেন কেউ কেড়ে নিতে না পারে, একুশ এখন সেই বৈশি^ক লড়াইয়ের প্রেরণা। বিশ^জুড়ে আদিবাসীদের অনেক ভাষা আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। যাতে হারিয়ে না যায়, সেই লড়াইটা চালিয়ে যেতে হবে সবাইকে। আমরা বাংলা ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছি। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে যেন আমরা কোনো আদিবাসীর কণ্ঠ চেপে না ধরি, তার মুখের ভাষা কেড়ে না নেই। বৈচিত্র্যেই যে আসল সৌন্দর্য, সেটা যেন আমরা সবাই অনুভব করি এবং বৈচিত্র্য রক্ষায় যেন লড়াই করি সবাই মিলে।

বাংলাদেশকে আমি ভালোবাসি, বাংলা ভাষাকে আমি ভালোবাসি। কিন্তু ভালোবাসাটা যেন নিছক আবেগের না হয়, বাগাড়ম্বর না হয়। ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি...’ যতবার শুনি ততবার চোখ জলে ভরে আসে। কিন্তু জলভরা চোখ দেশের কোনো কাজে আসবে না। দেশকে সত্যিকারের ভালোবাসতে হলে, দেশকে এগিয়ে নিতে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে। বাংলা ভাষাকে ভালোবাসলেই হবে না, সেই ভাষাকে বিশ^ দরবারে মর্যাদার আসনে বসাতে নিরন্তর কাজ করতে হবে। কিন্তু বিশ^ তো দূরে থাক, বাংলাদেশেই সর্বস্তরে বাংলা চালু করা যায়নি। যায় তো নিই, উল্টো বাংলা ভাষাকে কতভাবে অমর্যাদা করা যায়, তা নিয়ে প্রতিযোগিতায় মাতি। আমাদের সন্তানরা ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে। আমার ছেলে যখন ফটাফট ইংরেজি বলে, ‘আই লাভ মাই মাদার টাং’, আমরা গর্বিত হই। আবুল মনসুর আহমেদের নাতনি ইংরেজিতে উপন্যাস লেখেন, তা নিয়ে আমাদের কত আদিখ্যেতা।

ফেব্রুয়ারি এলেই আমরা বাংলা নিয়ে মেতে উঠি। কত প্রেম, কত আবেগ। কিন্তু এফএম রেডিওতে প্রতিদিন রীতিমতো নির্যাতন করা হচ্ছে বাংলা ভাষাকে। আমাদের ভ্রুক্ষেপ নেই। এই যেমন আমিও ফেব্রুয়ারি গেলেই ভুলে যাই বাংলাকে। বাংলা নিয়ে যত আক্ষেপ, যত লেখালেখি সব ফেব্রুয়ারি এলেই। আমি কিন্তু বলছি না, শুধু বাংলা ভাষাই শিখতে হবে, অন্য ভাষাকে অবহেলা করতে হবে। তবে আগে বাংলা ভাষাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে হবে। মর্যাদা দিতে হবে। তারপর অন্য ভাষা; সেটা ইংরেজি হোক, স্প্যানিশ হোক, জার্মানি হোক। রবিঠাকুর অনেক আগেই লিখে গেছেন, ‘আগে চাই বাংলা ভাষার গাঁথুনি, পরে ইংরেজি শেখার পত্তন।’ এটা যেন আমরা ভুলে না যাই।

প্রভাষ আমিন: বার্তাপ্রধান, এটিএন নিউজ

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত