বিশ্ব সাদাছড়ি নিরাপত্তা দিবস

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা আমাদেরই সন্তান

ইসরাত জাহান
 | প্রকাশিত : ১৫ অক্টোবর ২০১৬, ০৮:৫৫

পৃথিবীর সব দেশেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, শিশু রয়েছে। এটা স্বীকৃত যে, কোনো দেশের জনসংখ্যার শতকরা ১০ ভাগ কোনো-না-কোনোভাবে শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধিতার শিকার। আমাদের দেশে ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশ প্রতিবন্ধী রয়েছে। তবে প্রতিবন্ধিতার হিসাব দেওয়া খুব সহজ বিষয় নয়।

সর্বপ্রথম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের নিয়ে একটি দিবসের সূচনা করে। এটিই ১৯৬৪ সালে ‘সাদাছড়ি নিরাপত্তা দিবস’ হিসেবে পালন শুরু হয়। প্রতিবছর ১৫ অক্টোবর সাদাছড়ি দিবস পালন করা হয়। ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঋবফবৎধঃরড়হ ড়ভ ইষরহফ বর্তমানে ডড়ৎষফ ইষরহফ টহরড়হ ১৯৬৯ সালে শ্রীলঙ্কার কলম্বোয় প্রথম বিশ্ব অন্ধ সম্মেলনের আয়োজন করে যা ওই বছর ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ২ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনে বাংলাদেশে প্রতিনিধিও উপস্থিত ছিলেন। ১৯৭০ সালের ১৫ অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্ব সাদাছড়ি দিবস পালন করা হচ্ছে যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে।

দৃষ্টির সমস্যা নানান কারণে হয়ে থাকে। তবে আমরা যদি প্রথম থেকেই সচেতন থাকি, নিজেকে ভালোবাসতে শিখি, চোখের যতœ করি, প্রতিবন্ধিতার হাত থেকে বাঁচা সম্ভব। আমাদের ৮০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করে। অজ্ঞতা, অন্ধকারাচ্ছন্নতা, অশিক্ষা কিংবা অসচেতনতা যাই বলি না কেনÑ সুদৃষ্টি পেলে এ ধরনের বিপদের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া কিংবা সমস্যা নিয়ন্ত্রণে থাকা সম্ভব।

বিশ্বে ক্রমাগত উন্নয়ন ঘটছে, হোক অর্থনৈতিক, হোক প্রযুক্তিগত। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতাকে জয় করা সম্ভব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করা যায়-  সম্পূর্ণ অন্ধ বা স্বল্প বা তীব্র মাত্রায় দৃষ্টিজনিত সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তি যারা চশমা বা লেন্স ব্যবহার করে ভালোভাবে দেখতে পায় না - তারা সবাই দৃষ্টিপ্রতিবান্ধী হিসেবে পরিচিত। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য, চলাচলের সুবিধার্থে এষড়নধষ চড়ংরঃরড়হ ঘধারমধঃরড়হ ঝুংঃবস চালু আছে। এর মাধ্যমে তাদের চলাচল হয়েছে আধুনিক ও সহজ। এ ছাড়া এর চেয়ে আরেকটা ব্যয়বহুল যন্ত্র ঊষবপঃৎড়হরপ ঝড়হরপ এঁরফব। তবে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের সাহায্য করার ক্ষেত্রে মানুষের সাহায্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। মানুষই পারে মানুষের নিারপদ চলাচলে সাহায্য করতে।

বিশ্বব্যাপী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা চলার ক্ষেত্রে সাদাছড়ি ব্যবহার করে থাকে, এটিই তাদের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। বিষয়টি আরো গতিশীল করতে ১৯৭৫ সাল থেকে প্রতি বছর ১৫ অক্টোবর ‘বিশ্ব সাদাছড়ি নিরাপত্তা দিবস’ পালিত হয়ে আসছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে বিশ্বের প্রায় ২৮.৫ কোটি মানুষ এখন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। এদের মধ্যে প্রায় ৪ কোটি মানুষ সম্পূর্ণ অন্ধ। ২৪.৫ কোটি মানুষ কোনো-না-কোনো মাত্রায় দৃষ্টি সমস্যায় জর্জরিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাথমিক পর্যায়ের স্বল্প মাত্রায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতাই প্রতিরোধ বা প্রতিকারের অভাবে মানুষ অন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অথচ যদি একটু সচেতন থেকে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে প্রতিবন্ধীদের প্রায় ৮০ শতাংশকেই সুস্থ করে তোলা সম্ভব।

সাদাছড়ির গুরুত্ব অনেক, সবার মধ্যে সাদা ছড়ির সহজ-সুন্দর একটা ইমেজ আছে। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ধরনের সাদাছড়ি ব্যবহার হয়ে থাকে। কাঠ, বাঁশ, বেত, এলুমিনিয়াম দিয়ে সাধারণত সাদাছড়ি তৈরি হয়ে থাকে। কোনোটা আছে হাতল বাঁকানো, কোনোটা লম্বা, রাবারের তৈরি। অনেকগুলো আবার ফোল্ডিং করা যায়। গ্রামে কিংবা কিছু প্রত্যন্ত এলাকায় অনেকে বাঁশ, বেত, বা কাঠের ছড়িতে সাদা রঙ লাগিয়ে ব্যবহার করে থাকে।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা আমাদের সমাজেরই অংশ। তাদের জন্য সহজতর উন্নত জীবনমানের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের সাথে সাথে আমাদের সবার দায়িত্ব। সরকার ইতোমধ্যে দেশের ১৭টি জেলায় একটি করে উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় নির্বাচন করে সেখানে তাদের সুবিধার্থে ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ করার সাথে সাথে শিক্ষা প্রদান কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ব্রেইল উপকরণ বিতরণ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ব্রেইল উপকরণটি ব্যয়বহুল এবং ইলেক্ট্রনিক রেকর্ডিং ডিভাইসও সহজলভ্য নয়। তাই বিভিন্ন এনজিও, ধনী ব্যক্তিদেরও  সরকারের পাশাপাশি কাজ করতে হবে। সাদাছড়ি ব্যবহারের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রতিবন্ধীদের নিরাপদে চলাচল। ছড়িটি চলার পথে আশপাশের পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, ছড়ি ব্যবহার করার ফলে পার্শ¦বর্তী জনসাধারণও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন।

সাদাছড়ির বিষয়টি এখন মোটামুটি সবাই জানে। সাদাছড়ির গুরুত্ব সম্পর্কে যানবাহন চালককে সাবধান করে তুলতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বেশ আন্তরিক। তারা ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার সময় শর্তারোপ করার সাথে সাথে তাদের প্রতিরক্ষা কর্মসূচিতে বিষয়টি আন্তর্ভুক্ত করতে পারে। জাতিসংঘে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সনদের ১৮ নম্বর ধারায় চলাচল ও জাতীয়তার স্বাধীনতার বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষের নিকট এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব দেওয়া যেতে পারে। এছাড়া রাস্তায় জেব্রা ক্রসিং-এ পারাপারের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও পারে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের সহায়তা করতে।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের প্রায় ৯০ ভাগ ঘটনা ঘটে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। অপুষ্টি, চোখের স্বাস্থ্য সম্পর্কে অসচেতনতা এবং চিকিৎসার অভাবে সমস্যাগুলো বেশি পরিলক্ষিত হয়। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা পিছিয়ে পড়ছে, তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন স্থবির হয়ে যাচ্ছে। একসময় রাষ্ট্রই তাদের ‘বোঝা’ হিসেবে দেখবে যেটা উন্নয়নের পথে বাধা।

২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ৬৬তম অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে প্রতিরোধযোগ্য অন্ধত্ব ও দৃষ্টিজনিত সমস্যা সমাধানকল্পে ২০১৪-১৯ সাল পর্যন্ত ৫ বছর মেয়াদি গ্লোবাল অ্যাকশন প্লান গ্রহণ করা হয়। যেখানে ডঐঙ এর সব সদস্য সার্বজনীন চক্ষুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা হয়।

গ্লোবাল অ্যাকশন প্লান অনুযায়ী ২০১৯ সালের মধ্যে প্রতিরোধযোগ্য দৃষ্টিজনিত সমস্যা বর্তমান অবস্থা থেকে ২৫ শতাংশে কমিয়ে আনতে দৃষ্টি সমস্যার নানান মাত্রা ও এর কারণ নির্ণয় করার সাথে সাথে চিকিৎসক ও ডাক্তারদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সকলের জন্য চক্ষুসেবা নিশ্চিত করবে।

উন্নত প্রযুক্তি ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে পশ্চিমা দেশগুলো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জীবনযাত্রা অনেক সহজ করে তুলেছে। আমরা উন্নয়নশীল দেশের নাগরিক হিসেবে হয়তো সব সুবিধা পাওয়া কঠিন। তবে সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়, সহানুভূতিশীল আচরণের মাধ্যমে এসব সমস্যা কমিয়ে আনা সম্ভব।

সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠনগুলোর উদ্যোগে প্রতিবন্ধীদের বিনামূল্যে বা প্রতীকী মূল্যে সাদাছড়ি সরবরাহ করতে হবে। রাস্তা, র‌্যাম্প, ফুটপাত ও যাবতীয় সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নিমার্ণের ক্ষেত্রে সর্বজনীন পরিকল্পনা অনুসরণ করা প্রয়োজন। সরকারের বিল্ডিং কোড সংশোধন ও প্রণয়নের ক্ষেত্রে তাদের বিশেষ চাহিদাগুলো পূরণের নির্দেশনা ও তাদের ব্যবহার উপযোগী করার জন্য অনুকূল বিধানের ব্যবস্থা করা একান্ত জরুরি। স্থানীয় সরকারের সব পরিকল্পনায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাদের পাশে আমাদের দাঁড়াতে হবে, কারণ তারা আমাদেরই সন্তান  ও  দেশের ভবিষ্যৎ ।- পিআইডি ফিচার

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত