আমাজনের গহিন অরণ্যে

সৈয়দ রশিদ আলম
 | প্রকাশিত : ০১ অক্টোবর ২০১৬, ০৮:৩১

পৃথিবীর একাধিক গহিন অরণ্যের মধ্যে গবেষকরা, পর্যটকরা, বিভিন্ন টিভি চ্যানেল, আলোকচিত্র সাংবাদিকরা পৌঁছাতে পারলেও এখনো এমন কিছু গহিন অরণ্য রয়েছে যেখানে সবার পক্ষে আজও যাওয়া সম্ভব হয়নি। যেমন কঙ্গো রেইন ফরেস্ট, বর্ণিও রেইন ফরেস্ট ও আমাজন রেইন ফরেস্ট। এর মধ্যে আমাজন রেইন ফরেস্ট সবার জন্য অত্যন্ত কঠিন প্রবেশ করা। যারাই প্রবেশ করেছেন সবাই জীবন নিয়ে ফিরে আসতে পারেননি। এমন কিছু অঞ্চল রয়েছে আমাজনে যেখানে সূর্যের আলো পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না।

মাথার ওপর দিয়ে যখন বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের হেলিকপ্টার আমাজনে প্রবেশ করে তখন আমাজনের গহিন অরণ্যের আদিবাসীরা হেলিকপ্টার লক্ষ করে তীর ছুড়তে থাকেন। তারা হয়ত জানেন না তাদের তীর দ্বারা হেলিকপ্টারকে নামানো সম্ভব নয়। পুরোপুরি বুনো জীবনে অভ্যস্ত আমাজনের আদিবাসীরা তাদের অঞ্চলে কাউকে প্রবেশ করতে দিতে চান না। তারা চান নিজেদের অরণ্যের মধ্যে লুকিয়ে রাখতে। আর ব্রাজিলসহ আমাজন অঞ্চলের নৃতাত্ত্বিক গবেষকরাও চান আমাজনের গহিনে যেন সবাই যেতে না পারেন। এই আমাজনকে নিয়ে একাধিক হলিউডের ব্লক বাস্টার ছায়াছবি নির্মিত হয়েছে। যেমন অ্যানাকোন্ডা। এই ছায়াছবিটি দেখার পর সারা পৃথিবী থেকে লাখ লাখ পর্যটক-গবেষক আমাজনের গহিনে ছুটে যাচ্ছেন।

অ্যানাকোন্ডা হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ আকারের সাপ। এই সাপ ছোট হরিণসহ ছোট আকারের সব ধরনের প্রাণীকে গিলে খেয়ে ফেলে। যে কারণে অ্যানাকোন্ডাকে আমাজন জঙ্গলে প্রহরী বলা হয়। এছাড়া রয়েছে বিশাল আকৃতির কুমির। যাদের ভয়ে বনের পশুরা নদীতে পানি পান করতে ভয় পায়। ব্রাজিল সরকার আমাজন জঙ্গল ভ্রমণকারীর কাছ থেকে কোটি কোটি ডলার আয় করছেন। আমাজনের মোট আয়তন হচ্ছে ৫৫ লাখ বর্গকিলোমিটার। এই গহিন অরণ্যে প্রায় ১০ মিলিয়ন অর্থাৎ ১০০ কোটি নানা শ্রেণির প্রাণীর ও উদ্ভিদের অস্তিত্ব রয়েছে, যা আর পৃথিবীর কোথাও তাদের খুঁজে পাওয়া যাবে না। পাওয়া যাবে শুধু আমাজনের চির নির্জন বনে।

আমাজনে রয়েছে ১২০ ফিট উচ্চতার গাছ, এই গাছটি কতদিনের পুরনো গবেষকরাও সে তথ্য বের করতে পারেন নি। কলম্বাস যখন আমেরিকা আবিষ্কার করেন তার আগে থেকেই আমাজনের গহিনে আদিবাসীদের অস্তিত্ব ছিল। এখানে আরো রয়েছে ৪০ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ, ২.৫ মিলিয়ন প্রজাতির কীটপতঙ্গ, ১,২৯৪ প্রজাতির পাখি। এমন কিছু পাখি যা আজ পর্যন্ত পাখি বিশেষজ্ঞরা যাদের ছবি তুলে নিতে পারেননি, ৩৭৮ প্রজাতির সরীসৃপ, ৪২৮ প্রজাতির উভচর এবং ৪২৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী। এছাড়া এমন সব ভয়ংকর মাছ আমাজনের নদীতে বসবাস করে যাদের কারণে কোনো প্রাণী আমাজনের পানি পান করতেও ভয় পায়। যেমন পিরানহা মাছ। এই মাছ এক সঙ্গে ঝাঁকে ঝাঁকে ঘুরে বেড়ায়।

এক একটি ঝাঁকে কমপক্ষে ৫ হাজার পিরানহা মাছ থাকে। যেকোনো প্রাণী যেমন বিশাল আকৃতির শূকর, টাপির, বুনো বাঘ যদি ভুলক্রমে আমাজনের পানিতে নেমে আসে আর যদি তখন পিরানহাদের চোখে পড়ে যায় তাহলে সেই প্রাণী আর ৫ মিনিটও বেঁচে থাকতে পারবে না। আমরা ন্যাশনাল জিওগ্রাফী চ্যানেলে দেখেছি পিরানহা মাছের ভয়াবহতা। এছাড়া এখানে রয়েছে পিয়ারুকু মাছ। এই মাছের ওজন ১৫০ কেজি পর্যন্ত হয়। এদের সামনে যারাই পড়ে যায় তারাই তাদের পেটে চলে যায়। আমাজন গহিনের বন্য প্রাণীর উল্লেখ্যযোগ্য কিছু অংশ হলো জাগুয়ার, দেখতে অনেকটা বাঘের মতো, কিন্তু হিংস্রতায় বাঘের চেয়ে ভয়ংকর।

এছাড়া রয়েছে জলের বানর, ওল বানর, এরো ব্যাঙ। এই এরো ব্যাঙ মুখে বিষ বহন করে থাকে। যেই তাকে হামলা করতে আসে তখন মুখের বিষ তার ওপর সে নিক্ষেপ করে। মাকড়সা বানর। এই বানরটি দেখতে মাকড়সার মতো বলেই এই নাম। চরিত্রটা অনেকটা মাকড়সার মতো। সেই সঙ্গে এই বনে রয়েছে টাপির, টারানটুলা, টাউকান, টাকুসি ডলফিন, বোটো ডলফিন। এই বনে এমন কিছু বানর রয়েছে যাদের ব্যাপারে প্রাণী বিশেষজ্ঞরা এখনো অজ্ঞাত রয়েছেন। আমাজনকে নিয়ে যেসব তথ্য ন্যাশনাল জিওগ্রাফীতে পাওয়া গেছে তার উল্লেখ্যযোগ্য হচ্ছে, নিউইয়র্ক শহরে ১২ বছর যত পানি ব্যবহার হয় আমাজন নদীতে তার চেয়েও বেশি পানি প্রবাহিত হয় প্রতিদিন।

গোটা পৃথিবীর ২০ ভাগ পানি বয়ে চলে এই নদীতে। এখানে রয়েছে ২০০ প্রকার খাওয়ার উপযোগী ফল। আর ২ হাজার ৮০০ ধরনের ফল রয়েছে যা শুধু বনের পশুপাখিরা খেয়ে থাকে। পৃথিবীর অক্সিজেনের বিশ ভাগ আসে আমাজন বন থেকে। এই বনের জলে রয়েছে ৩০০ পাউন্ড ওজনের আরাপাইমাম মাছ। বিশাল আকৃতির এই মাছকে দেখলে বনের সবাই কেঁপে উঠে। এর গায়ের চামড়া অত্যন্ত শক্ত। যার কারণে শত শত পিরানহা মাছ হামলা করেও এই মাছকে কাবু করতে পারে না। এই বনে রয়েছে রং-বেরঙের নানা প্রজাতির পাখি, যা পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না। যে কারণে পাখিপ্রেমীরা আমাজনের গহিনে ছুটে যান। আমাজন বনের ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীতে কয়েক প্রজাতির চিংড়ি মাছ, বিশাল আকৃতির কাছিম, কয়েক প্রজাতির কাকড়া পাওয়া যায়।

এসব জলজ প্রাণীর ওপর আমাজনের আদিবাসী সমাজ ও প্রাণী জগৎ নির্ভরশীল। সেই সঙ্গে সেখানকার বিশুদ্ধ জল মানুষ ও জীবজন্তুকে সুস্থ রাখে। হঠাৎ করে যদি বিশাল আকৃতির গাছের দিক তাকান তাহলে দেখতে পাবেন নানা শ্রেণির পাখি। এমন সব পাখি যা আর পৃথিবীর কোনো বনে পাওয়া যায় না। চড়–ই আকৃতির পাখি যেমন এই বনে দেখতে পাবেন তেমনি বিশাল আকৃতির শকুনের সাক্ষাৎ পেয়ে যাবেন। এই শকুনগুলো হরিণ ও শূকর ছানাদের ধরে নিয়ে যায় ও গাছের মধ্যে ছিড়ে খেয়ে ফেলে । ভাগ্য ভালো থাকলে সেই দৃশ্যও দেখতে পাবেন। তবে পর্যটকদের অত্যাধুনিক অস্ত্র সজ্জিত নিরাপত্তারক্ষী দ্বারা সর্বাত্মক নিরাপত্তা দেওয়া হয়। আমাজনের গহিনে এমন সব আদিবাসী রয়েছে যারা এখনো আদিম জীবনযাপনে অভ্যস্ত।

এদের মধ্যে কয়েকটি হলোÑ আইকানা, আইমোরে, আজুরু, আনাক, আনাম্বি, অ্যাপারাই, আরারা, আরুরা, বাকাইরি, বানাওয়া, বারা, বারাসানা, বারে, বারোরা, কানেলা, দেনী, দেসানো, দাও, ফুলনিও, গুয়াজা, হুপদা, ইরানজে, জাবুতি, জারুয়ারা, জুমা, জারুনা, কাপড়, কাম্বা, কামবেবা, কানামারি, কারাজা। উল্লিখিত বিবরণ অতি ক্ষুদ্র বিবরণ। কারণ আমাজনের গহিনে এমন সব আদিবাসীরা বসবাস করছেন যাদের কাছে সভ্য জগতের বাসিন্দারা কোনো দিনই যেতে পারেনি। বাংলাদেশ থেকে যারা আমাজন গিয়েছেন তাদের সংখ্যা খুবই কম। ঢাকা থেকে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজযোগে ব্রাজিলের রাজধানী রিওডি জেনেরিওতে প্রথমে গিয়ে নামতে হবে। তারপর সেখান থেকে একাধিক ভ্রমণ সংস্থা আপনাকে আমাজনের গহিনে নিয়ে যাবে।

যারা পেরুর ভিতর দিয়ে আমাজনের গহিনে যাবেন তারা প্রথমেই বুনো জীবনযাপনে অভ্যস্ত আদিবাসীদের সাক্ষাৎ পেয়ে যাবেন। প্রথমেই আপনাকে স্বাগত জানাবে বিশাল আকৃতির নতুন প্রজাতির বিষাক্ত ব্যাঙ। এদের আকৃতি দেখে ভয় পেয়ে যাবেন। স্থানীয় আদিবাসীরাও এদের এড়িয়ে চলেন। বলা হয় এখানে প্রাচীন যুগের গুপ্তধন লুকিয়ে আছে। আর একদল পর্যটক বলিভিয়ার ভিতর দিয়ে আমাজনের গহিনে প্রবেশ করেন। বলিভিয়ার ভিতর দিয়ে যারা আমাজন যাবেন তাদের প্রথমেই স্বাগত জানাবে চার মিটার লম্বা ভয়ংকর সুন্দর অ্যানাকোন্ডা সাপ। এই সাপকে নিয়ে অনেক ধরনের আজগুবী গল্প রয়েছে। প্রকৃত অর্থে অ্যানাকোন্ডা সাপ অত্যন্ত নিরীহ প্রকৃতির। খুব সহজেই কাউকে আক্রমণ করে না। শুধু ক্ষুধার্ত অবস্থায় জলের বা স্থলের প্রাণীর ওপর আক্রমণ চালিয়ে থাকে। কিন্তু তার আকৃতি দেখে পর্যটকরা ভয় পেয়ে যান। সেই সঙ্গে বলিভিয়া থেকে আমাজনে প্রবেশকারী পর্যটকরা পিংক ডলফিন দেখতে পাবেন। এক একটি ঝাঁকে বিশ থেকে পঁচিশটি পিংক ডলফিন ঘুরে বেড়ায়।

আমাজন রেইন ফরেস্ট ও নদী প্রবাহিত জল স্থানীয় আদিবাসী ও লক্ষ কোটি জীবজন্তুকে বিশুদ্ধ অক্সিজেন ও জল দিয়ে যাচ্ছে। পর্যটকরা ইচ্ছা করলে নৌভ্রমণ করতে পারবেন। চার ঘণ্টা থেকে ৮ ঘণ্টার চুক্তিতে নদীতে ঘুরে বেড়াতে পারবেন। হঠাৎ করে দেখবেন নদীতে ছোট আকৃতির কুমির, ডলফিন, পিরানহা ও অ্যানাকোন্ডা। আর চার পাশের বুনো জঙ্গলে দেখতে পাবেন বিশাল আকৃতির জাগুয়ার, শূকর, টাপির, হরিণসহ ভয়ংকর সুন্দর নানা প্রজাতির জীবজন্তু ও শত শত নাম না জানা পাখি। বাংলাদেশ থেকে যে সব পর্যটক আগামীতে আমাজনের গহিনে যাবেন তারা ঢাকাস্থ ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের পরামর্শ নিয়ে যাবেন। প্রয়োজনীয় ভিসা ও হোটেলের ব্যবস্থা তারাই প্যাকেজের আওতায় করে দিবেন। একজন বাংলাদেশি পর্যটকের ৮-১০ দিন আমাজন ভ্রমণের সর্বোচ্চ খরচ পড়বে ৫ লাখ টাকা।

লেখক: পর্যটক, মুদ্রা গবেষক।

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত