রমনা পার্কে একদিন

হামিদুর রহমান লিটন
| আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ১০:৫৭ | প্রকাশিত : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ১০:৫১

গোড়াপত্তনের ইতিহাস রাজধানী ঢাকার প্রধান অক্সিজেন সরবরাহকারী হিসেবে পরিচিত রমনা পার্ক। যার গোড়াপত্তন হয়েছিল ১৬১০ সালে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে। মোট আয়তন ৬৮.৫ একর। বাগান অনুরাগী তখনকার মোগল সম্রাট ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা নাম দিয়েছিল বাগ-ই-বাদশাহী। পরবর্তী সময়ে মোগলরাই আবার এর নাম রাখে রমনা। তখন এর আয়তনও ছিল বিশাল এলাকাজুড়ে। একপর্যায়ে ঢাকা থেকে রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত হলে রমনা এলাকা ক্রমে জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে পড়ে। মোগল আমলে গড়ে ওঠা রমনা উদ্যান সাম্রাজ্যের পতনের সঙ্গে তার সৌন্দর্য হারায়। তবে ১৮২৫ সাল থেকে ব্রিটিশ কালেক্টর ডাউইজের সময় ঢাকা নগর উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়, যার অন্যতম ছিল রমনা এলাকার উন্নয়ন। এরপর ১৯০৮ সালে কারাগারের বন্দিদের দিয়ে জঙ্গল পরিষ্কার করে ঘোড়দৌড়ের জায়গা করা হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে রমনা পার্কের উদ্বোধন করা হয় ১৯৪৯ সালে। মূলত তখন থেকেই রমনা পার্ক হয়ে উঠে বিভিন্ন মেলা-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু।

বিভিন্ন প্রকারের গাছগাছালি পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার গাছ আছে রমনা পার্কে। এর মধ্যে ৭১ প্রজাতির ফুল, ৩৬ প্রজাতির ফল, ৩৩ প্রজাতির ঔষধি, ৪১ প্রজাতির বনায়ন এবং ১১ অন্যান্য প্রজাতির গাছ আছে। দেশীয় নানা প্রজাতির পরিচিত গাছ ছাড়াও রয়েছে পলাশ, পীতপাটলা, কাউয়াতুতি, আগর, জ্যাকারান্ডা, তমাল, বাওবাব, গিরিসিডিয়া, কর্পূর, স্কারলেট কর্ডিয়া, জহুরিচাঁপা, লালসোনাইল, মাধবী, মালতী, আফ্রিকান টিউলিপ, অশোক, পাখিফুল, কফি, উদয়পদ্ম, সহস্রবেলী, গোল্ডেন শাওয়ার, পালাম, ঝুমকো, লতাপারুল, স্থলপদ্ম, কুর্চি, বনআসরা, চন্দন, মাকড়িশাল, দুলিচাঁপা, কনকচাঁপা, মণিমালা, আরও নাম না জানা কিছু গাছও দেখা যায়। বিভিন্ন প্রকারের ফুল থাকার ফলে সারা বছরই কোনো না কোনো ফুল দেখা যায় রমনা পার্কে।

পাখির কলকাকলী ঢাকা শহরে একমাত্র কাক ছাড়া কোনো পাখির ডাক শোনা যায় না বললেই চলে। কিন্তু রমনা পার্ক ব্যতিক্রম। এখানে অসংখ্য ছোট-বড় গাছ থাকায় হরেক রকমের পাখি বাস করে। যেমন কাঠবিড়ালী, বক, ময়না, টিয়ে, চড়ুই এসব পাখির দেখা মেলে হরহামেশাই। যারা প্রকৃতিপ্রেমী বা সবুজ অরণ্য ভালোবাসেন রমনা পার্কে গেলে পাখির কলকাকলীতে তাদের প্রাণ নেচে উঠে।

গাছ লাগাতে হবে নান্দনিকভাবে কিছু গাছ আছে প্রকৃতিবান্ধব নয়। যেমন রেইনট্রি গাছ। এ গাছের পাতা পুকুরের পানিতে পড়লে ওই পুকুরের মাছের চাষ হয় না। আর যেসব গাছ আমরা মাঠে ঘাটে সচরাচর দেখি সেগুলো পার্কে লাগানোর কোনো মানে হয় না। পার্কে থাকবে দুর্লভ প্রকৃতির গাছ যা সহজে দেখা যায় না। বর্তমানে মেহগনি, রেইনট্রি জাতীয় গাছে ভরে গেছে রমনা পার্ক। কিছু গাছ আছে দেখলে বুঝা যায় এগুলো খুবই অপরিকল্পিতভাবে লাগানো হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় গাছ কেটে এক্সপার্টের পরামর্শ নিয়ে সারিবদ্ধভাবে গাছ লাগাতে হবে যেখানে থাকবে নান্দনিকাতার ছোঁয়া।

পরিচিতি লিখে রাখা বর্তমানে রমনা পার্কের কোনো গাছেই পরিচিতি লেখা নেই। এক সময় তা চোখে পড়ত। শহরের লোকজন অনেক গাছেরই নাম জানে না। আর এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা তো সাধারণ কোনো গাছের নামও জানে না। তাই কোন গাছের কি নাম, কোথায় বেশি জন্মে অথবা বয়স কত এগুলো লিখে রাখা দরকার।

প্রধান আকর্ষণ রমনা পার্কের প্রধান আকর্ষণ রমনার বটমূল। রমনার বটমূলে রয়েছে পাথরের উপরে বসার স্থান। যে কেউ এখানে প্রিয়জনের সঙ্গে একান্তে সময় কাটাতে পারেন। এই বটমূলকে কেন্দ্র করেই পয়লা বৈশাখে লাখো মানুষের অংশগ্রহণে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান হয়।

অনুষ্ঠানাদি নিষিদ্ধ করা পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠান ছাড়াও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং পেশাজীবী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের বছরজুড়ে নানা অনুষ্ঠানের ফলে রমনা পার্কের সৌন্দর্য নষ্ট হয়। এতে অনেক দুর্লভ বৃক্ষ ও তরুলতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং পার্কের ঐতিহ্য হারাচ্ছে। এসব অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে অস্থায়ী ও ভ্রাম্যমাণ হকারদের উপদ্রবে রমনা পার্কের জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়েছে। রমনা পার্কের সৌন্দর্য বৃদ্ধি, ঐতিহ্য সুরক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য পয়লা বৈশাখে ছায়ানটের বর্ষবরণ ছাড়া অন্য কোনো সংগঠনকে এদিন বা অন্য সময়ে অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ করা উচিত।

লেকের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা শহরের বাস্তুহারা কিছু মানুষ লেকের পানিতে প্রায় গোসল করতে দেখা যায়। এতে পানি দূষিত হয়ে মাছের বেড়ে উঠা ব্যাহত হয়। প্রয়োজনে তাদের জন্য স্থান নির্দিষ্ট করে পাকা ঘাট করে দেওয়া যেতে পারে। লেকের পানিতে ধানমন্ডি লেকের ন্যায় প্যাডেল বোট নামানো যেতে পারে। দর্শনার্থীরা টাকার বিনিময়ে বোটে চড়ে আনন্দ পাবে। সরকারেরও কিছু আয় হবে। পারগুলোতে ইটের বাঁধানো রাস্তা ভেঙে নষ্ট হয়ে আছে অনেক দিন ধরে। এগুলোকে আরো আধুনিকভাবে সিরামিক ইট দিয়ে বাঁধানো যেতে পারে।

রাজধানীর পার্কগুলোকে ঢেলে সাজানো, আধুনিক, উন্নত করা হবে এসব কথা মন্ত্রী অথবা মেয়রদের কাছে অনেক শুনেছি, পত্রপত্রিকায় দেখেছি। আদতে কোনো প্রতিশ্রুতিই রক্ষা হয়নি। ঢাকার বহু মানুষের জন্য পার্ক রয়েছে হাতেগোনা কয়েকটি। তার মধ্যে রমনা পার্ক অন্যতম। কিন্তু এই পার্ক ঠিকমতো দেখভাল না করায় তা শ্রীহীন হয়ে পড়ছে দিন দিন। অবহেলা ও অনাদরের কারণেই বেদখল হয়েছে কোনো কোন ক্ষেত্রে। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, একটি ছিমছাম ও সুন্দর নগরীর জন্য নগরের মোট আয়তনের ১০ শতাংশ খোলা মাঠ ও পার্ক থাকা আবশ্যক। অথচ আমাদের আছে মাত্র ৪ শতাংশ জায়গা। যেটুকু আছে, তাও ধরে রাখা যাচ্ছে না। যে কোনো মূল্যেই হোক রাজধানীবাসীর জন্য অন্যতম অক্সিজেন সরবরাহকারী এই পার্ককে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

(ঢাকাটাইমস/১৫ডিসেম্বর/এজেড)

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :