‘জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়ে বিশ্বকে তিনটি বার্তা দেন বঙ্গবন্ধু’

সৈয়দ ঋয়াদ, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৬:০৩ | প্রকাশিত : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৫:৪৭

স্বাধীন হওয়ার চার বছর পরও বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়া নিয়ে বিশ্বের অনেক প্রভাবশালী দেশ যখন গড়িমসি করছিল তেমন একটি প্রতিকূল পরিবেশে জাতিসংঘে প্রথমবারের মতো বক্তৃতা করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের ২৯তম অধিবেশনে বাংলায় দেয়া সেই ভাষণে তিনি গোটা বিশ্বের প্রতি তিনটি বার্তা দেন বলে মনে করেন শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম।

জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই ভাষণ দেয়ার মাত্র ছয়দিন আগে অর্থাৎ ১৯৭৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সর্বসম্মত অনুমোদনক্রমে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণটি ছিল সমগ্র বিশ্বের অধিকারহারা শোষিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার ভাষণ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠার একটি বলিষ্ঠ উচ্চারণ ও সাহসী পদক্ষেপ।

বঙ্গবন্ধুর ওই ভাষণে ‘সবাই একটা নতুন শুরুর বিষয়ে’ আশাবাদী হয়ে ওঠে মন্তব্য করে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘জাতিসংঘের কাঠামোতে যে পাঁচটি স্থায়ী সদস্য আছে তারাই এটা নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে এই সংস্থাটি নিয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে উৎসাহিত বা মোটেও আশাবাদী না।’

‘তবে বঙ্গবন্ধু যখন জাতিসংঘে ভাষণ দেন তখন সবাই একটা নতুন শুরুর বিষয়ে আশাবাদী হয়েছিলো। একটি আশা হলো─ জাতিসংঘ সবগুলো দেশকে সমমর্যাদা দেবে। এছাড়া সেসময় অনেক রকমের আশা ছিলো। ওরকম একটা পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু যখন জাতিসংঘে যান তখন বাংলাদেশকে নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছিলো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হেনরি কিসিঞ্জারতো ছিলেনই’─ যোগ করেন এই শিক্ষাবিদ।

বাংলাদেশের বাইরে সারাবিশ্বে সেসময় বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও সংকট ছিলো উল্লেখ করে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘একদিকে অনেকগুলো রাষ্ট্র আমাদের স্বাধীনতাকে স্বাগত জানাচ্ছে, সহযোগিতা করছে। আবার অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা চীন তখনও আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র ছিল না। তারা করেছে বিরোধীতা।’

‘বর্তমান বিশে^ বাংলাদেশের একটা ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে বা অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। তখন কিন্তু পরিবেশটা এমন ছিল না। আর এই মুহূর্তে নানা কারণে বাংলাদেশের এই ভাবমূর্তিটা আরো বেশি পরিচ্ছন্ন বা উজ্জ্বল হয়েছে বহির্বিশ্বে, তখন এমন পরিস্থিতি ছিল না। বঙ্গবন্ধু যখন জাতিসংঘে যান তখন বৈশি^ক অবস্থা আমাদের অনুকূলে ছিল না, ছিলো প্রতিকূলে। ওই রকম একটা অবস্থাতেই তিনি জাতিসংঘে যোগ দিতে গিয়েছিলেন।’

জাতিসংঘে প্রথমবারের মতো বাংলায় ভাষণ দিয়ে বঙ্গবন্ধু তিনটি খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন মন্তব্য করে শিক্ষাবিদ ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘একটি হলো তিনি প্রথমইে আমাদের (বাংলাদেশের) ভাবমূর্তিটা উজ্জ্বল করলেন। জানান দিলেন এটি এমনই একটি দেশ যারা নিজের ভাষা ও নিজের ভবিষ্যতে বিশ্বাস করে। এটি তিনি খুব পরিষ্কার বোঝাতে পেরেছিলেন। ক্ষুদ্র একটা দেশ অথচ তিনি তার মাতৃভাষায় বক্তৃতা দিলেন। এটাই প্রথম, বাংলাদেশকে তিনি এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেলেন।’

‘বঙ্গবন্ধু দেখালেন আমরা যুদ্ধ করে স্বাধীন করেছি। স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে আমরা আমাদের কৃষ্টি, ঐতিহ্য, ইতিহাস, সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী। বঙ্গবন্ধু সেখানে যাওয়ার পর আমাদের বিরোধীতা করা মধ্যপ্রাচ্যও একটা বার্তা পেলো─ যারা বাংলাদেশের বিরোধীতা করছিলো।

‘দ্বিতীয় কাজটি হলো─ ছোট ছোট রাষ্ট্রগুলো বঙ্গবন্ধুর ভাষণ থেকে অনুপ্রাণিত হলো। তারা বুঝতে পারলো একটা ছোট রাষ্ট্র যারা সদ্য স্বাধীন হয়েছে তারা যদি পারে আমরা কেন পারবো না? তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি তিনি দিলেন ছোট রাষ্ট্রগুলোকে। সেটি হলোÑ আপনারা যদি নিজেরা আত্মঅধিকার নিয়ে না দাঁড়ান তাহলে বড় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে পেরে উঠবেন না।’

বঙ্গবন্ধু সবসময় মানুষের অধিকারের কথা বলেছেন উল্লেখ করে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘সেখানে ছোট রাষ্ট্রগুলো তার ভাষণ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছে। শক্তি পেয়েছে। এরপরই কিন্তু অনেকগুলো রাষ্ট্র কিন্তু নিজের মাতৃভাষা ব্যবহার করতে শুরু করে জাতিসংঘে।’

বাংলা যখন অন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদা পেলো তখন বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি যেমন গুরুত্বপর্ণ হয়ে উঠেছে তেমনই অন্যান্য ছোট ছোট ভাষাও তাদের মর্যাদা পেয়েছে বলে মনে করেন সাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম।

তিনি বলেন, ‘বেশি মানুষের কথা বলা ভাষার বেশি অধিকার বা কম মানুষের কথা বলা ভাষার কম অধিকার এমন কিছু বলা হয়নি। বরং সব মাতৃভাষার মর্যাদাই সমান। এক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি দারুন গুরুত্বপূর্ণ।’

তবে জাতিসংঘকে বঙ্গবন্ধু যে বার্তা দিয়েছিলেন তারা সেদিকে যায়নি উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সাবেক শিক্ষক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘তারা তাদের স্বার্থের বাইরে কখনও যায় না। সে কারণেই ছোট রাষ্টগুলোকে গুরুত্ব দিতে বঙ্গবন্ধুর সেই আহ্বানে তারা সাড়া দেয়নি।’

(ঢাকাটাইমস/২৪সেপ্টেম্বর/ডিএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :