উত্তরা ফাইন্যান্সের অনিয়ম তদন্তে বিশেষ নিরীক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বিএসইসি

রহমান আজিজ, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২০:৩১ | প্রকাশিত : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২০:২৯

উত্তরা ফাইন্যান্সের অনিয়ম তদন্তে বিশেষ নিরীক্ষা কার্যক্রম শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিশেষ নিরীক্ষা চালাতে শিগগির অডিটর নিয়োগে কার্যাদেশ জারি করবে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিএসইসি। অর্থাৎ বিশেষ নিরীক্ষায় অনিয়ম উঠে এলে উত্তরা ফাইন্যান্সের বিরুদ্ধে ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এর আগে বড় ধরনের আর্থিক কেলেংকারিতে জড়িয়ে পড়ে বেসরকারি খাতের আর্থিক প্রতিষ্ঠান উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টস। অনুমোদন ছাড়াই ঋণ নিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকরা। নামে-বেনামে করেছেন অর্থ আত্মসাৎ। ঋণ-আমানতের তথ্যে রয়েছে গরমিল। বারবার সতর্ক করার পরও টনক নড়েনি। নানা অজুহাত দেখিয়ে আর্থিক প্রতিবেদন দিতে কালক্ষেপণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তাই এবার বাধ্য হয়ে অনিয়ম খুঁজে বের করতে উত্তরা ফাইন্যান্সে বিশেষ নিরীক্ষক নিয়োগ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম ঢাকা টাইমসকে বলেন, উত্তরা ফাইন্যান্সের আর্থিক প্রতিবেদনে কিছু অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে তাদের আর্থিক প্রতিবেদন পাঠাতে বলা হয়। কিন্তু তারা সেটা না পাঠিয়ে বারবার সময় চাচ্ছে। তাই তাদের আর্থিক প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই করতে বিশেষ নিরীক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা নিরীক্ষা কার্যক্রম শুরু করেছে। নিরীক্ষায় কোনো অনিয়ম উঠে এলে ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন থেকে জানা যায়, উত্তরা ফাইন্যান্সের লেজার ব্যালেন্সে ১ হাজার ২০১ কোটি টাকা ছাড় দেখানো হলেও আর্থিক বিবরণীতে ৩৩১ কোটি ৬৯ লাখ টাকার কোনও ব্যাখ্যা নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী নগদ লেনদেনের সুযোগ না থাকলেও অনৈতিকভাবে চেয়ারম্যান নিয়েছেন বিপুল পরমাণ নগদ অর্থ। শুধু তাই নয়, এক টাকা আমান ছাড়াই ২৩৬ কোটি টাকার মেয়াদি আমানত টিডিআর ইস্যু করা হয়েছে। যা প্রতিষ্ঠানের ট্রেজারি হেড মো. মাইনউদ্দীনের কাছে ২০০টি টিডিআর ইস্যুর বই পাওয়া গেছে।

কিন্তু প্রতিষ্ঠানের রেজিস্টার বা নথিতে এর কোনও হিসাব নেই। পরিদর্শনে উত্তরা ফিন্যান্সের ব্যাংক হিসাব থেকে ১১৮টি অনুমোদনহীন উত্তোলনের মাধ্যমে উত্তরা মোটরস ও উত্তরা গ্রুপের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ দেখিয়ে ৩৩৬ কোটি বের করে নেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।

জানা গেছে, ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে উত্তরা ফাইন্যান্সকে ১৯৯৫ সালে অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর থেকে প্রতিষ্ঠানটি নিয়মবহির্ভূত আর্থিক লেনদেন, অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়। যার প্রকৃত তথ্য ইতোমধ্যে বেরিয়ে এসেছে। ২০১৯ সালে কলমানি থেকে উত্তরা ফাইন্যান্সের নেওয়া ঋণের পরিমাণ ৩৯৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকা দেখানো হয়।

তবে প্রতিষ্ঠানটির নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীতে মাত্র ১৬ কোটি টাকার তথ্য পাওয়া গেছে। কলমানি থেকে নেওয়া ৩৮১ কোটি৫৯ লাখ টাকার কোনও তথ্য নেই। কলমানি, লেজার ব্যালেন্সে অর্থ নয়ছয় করা ছাড়াও প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) গাড়ি, বাড়ি ও বিদেশ ভ্রমণে ২৪ কোটি টাকা নিয়েছেন।

ব্যবস্থাপনা ব্যয় নামে উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের এমডি শামসুল আরেফীন ২৪ কোটি ২২ লাখ টাকা নিয়েছেন। এই তথ্যও ব্যাংকের আর্থিক বিবরণীতে উল্লেখ নেই। আবার তার নামে প্রতিষ্ঠানটিতে কোনো ঋণও নেই।

উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের ২০১৯ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীর ওপর পরিদর্শন করে বাংলাদেশ ব্যাংকের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শকরা দেখতে পেয়েছে যে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকেরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া বিপুল পরিমাণ ঋণ বের করে নিয়েছেন।

আবার ব্যবস্থাপনা পরিচালকও (এমডি) গাড়ি-বাড়ি কিনতে অনুমোদন ছাড়া ঋণ নিয়েছেন। অনিয়মের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক উত্তরা ফিন্যান্সের ২০১৯ ও ২০২০ সালের আর্থিক প্রতিবেদন সংশোধনের নির্দেশ দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে পাওয়া আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে লিখিতভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জবাব দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়। সেখানে উত্তরা ফাইন্যান্সের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, করোনায় প্রতিষ্ঠানটির প্রধান অর্থ কর্মকর্তার (সিএফও) হঠাৎ মৃত্যুর কারণে কিছু লেনদেনের নথিপত্র খুঁজে পেতে সমস্যা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সেগুলো খুঁজে বের করে জমা দেওয়া হয়েছে।

উত্তরা ফাইন্যান্সের ২০১৯ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মার্চেন্ট ব্যাংকিং ও শেয়ারবাজারের মার্জিন ঋণের পরিমাণ ছিল ৫৯৭ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এরমধ্যে কোনও ধরনের অনুমোদন ছাড়া ৩৫০ কোটি টাকা জমা হয়েছে উত্তরা ফাইন্যান্সের বিভিন্ন পরিচালকের ব্যাংক হিসাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা উত্তরা ফাইন্যান্স পরিদর্শনে দেখেছেন, প্রতিষ্ঠানটির এমডি এস এম শামসুল আরেফিন কোনো অনুমোদন ছাড়াই ব্যবস্থাপনা ব্যয় শিরোনামে ২৪ কোটি টাকা উত্তোলন করেছেন। এর মধ্যে এমডির পক্ষে সাউথ ব্রিজ হাউজিংকে ৬ কোটি ২৪ লাখ টাকা, বে ডেভেলপমেন্টকে ১ কোটি টাকা, ব্যক্তিগত গাড়ি কিনতে ডিএইচএসকে ৫০ লাখ টাকা ও উত্তরা মোটরসকে ৪৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। এমডির টাকা উত্তোলনে প্রতিষ্ঠানটির কোনো ধরনের অনুমোদন ছিল না। এর বাইরে উত্তরা মোটরস ও উত্তরা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ৩৩৫ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে, যার কোনো অনুমোদন নেই।

তবে উত্তরা ফাইন্যান্স বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে যে ব্যাখ্যা পাঠিয়েছে সেখানে বলা হয়েছে, আর্থিক সংকটে পড়ে তারল্যসংকট মেটাতে উত্তরা গ্রুপ থেকে কিছু টাকা ধার করতে হয়েছিল। পরে সেই অর্থ ফেরত দেওয়া হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মুজিবুর রহমান ব্লু চিপস সিকিউরিটিজের কর্ণধার। এই প্রতিষ্ঠানের ২৩৬ কোটি টাকা আমানত জমা করা হয়েছে। তবে এর বিপরীতে কোনো বৈধ নথিপত্র সংরক্ষণ নেই। ফলে আদৌ এই টাকা জমা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়। যদি কোনো ব্যাংক এই আমানতের বিপরীতে ঋণ দেয়, তার পুরো দায় উত্তরা ফাইন্যান্সের ওপর বর্তাবে।

উত্তরা ফাইন্যান্স নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সারমর্ম টেনে প্রতিবেদনে বলেছে, লেনদেনের প্রকৃত তথ্য আড়াল করে উত্তরা ফাইন্যান্স আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ আর্থিক কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছেন।

তবে উত্তরা ফাইন্যান্সের বক্তব্য হচ্ছে, কোম্পানির পক্ষ থেকে পরিদর্শক দলের কাছে এসব অনিয়মের দায়ভার চাপানো হয়েছে উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) উত্তম কুমারের ওপর, যিনি সম্প্রতি মারা গেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকৃত সত্য আড়াল করতে সব অনিয়মের দায়ভার মৃত উত্তম কুমারের ওপর চাপানো হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সিকিউরটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম ঢাকা টাইমসকে জানান, উত্তরা ফিন্যান্সের অনিয়ম অনুসন্ধানে বিশেষ নিরীক্ষা করার জন্য কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিগগির অডিটর নিয়োগে কার্যাদেশ জারি করা হবে।

(ঢাকাটাইমস/১৪সেপ্টেম্বর/আরএ/ডিএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

অর্থনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :