গ্রাহকের শতকোটি টাকা হাতিয়ে জসিম গড়েছেন বিপুল সম্পদ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২১, ১৭:০০ | প্রকাশিত : ২৬ অক্টোবর ২০২১, ১৫:০২

কাগজে কলমে কর্ণফুলী মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির সদস্য সংখ্যা ৫১৮। কিন্তু র‌্যাবের অভিযানে প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহক সংখ্যা মিলেছে ২০ থেকে ২৫ হাজার। প্রতিষ্ঠানটিতে গ্রাহকদের শত কোটি টাকা লেনদেন করেছে। যা প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে নিয়েছেন। গড়েছেন নামে-বেনামে প্লট-ফ্ল্যাট, জমি, ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ ৮টি প্রতিষ্ঠান।

র‌্যাব বলছে, সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধনভুক্ত হলেও প্রতিষ্ঠানটির সকল কার্যক্রম প্রতারণামূলক। নিয়ম অনুযায়ী সমিতি পরিচালনার জন্য অনুমোদন থাকলেও আর্থিক লেনদেন অনুমোদিত নয় এবং এনজিও হিসাবে বা মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরির আর্থিক লেনদেনের জন্য অনুমোদিত নয়।

সোমবার বিকাল থেকে মঙ্গলবার রাজধানীর মিরপুরে অভিযান চালিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। একইদিন দুপুরে রাজধানীর কারওয়ানবাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করে এসব তথ্য জানান, র‌্যাব-৪ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল হক।

র‌্যাব জানায়, সমবায়ভিত্তিক দারিদ্র‍্য নিরসনের দায়িত্বে নিয়োজিত সমবায় অধিদফতরের অনুমোদন ছিল কর্ণফুলী মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির। ২০১৯-২০ সালে সমবায় অধিদপ্তর অডিটও করে। অডিটে দেখানো হয় মাত্র ৫১৮ জন সদস্য। লেনদেন মাত্র ৮২ লাখ টাকা। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহক সংখ্যা ২০ থেকে ২৫ হাজার। শত কোটি টাকারও বেশি প্রতিষ্ঠানটিতে লেনদেন হয়েছে। যা প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার জসিম উদ্দিন ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে মানি লন্ডারিংয়ের মতো অপরাধ করেছেন।

অভিযানে ১৭টি মুদারাবা সঞ্চয়ী বই, ২৬টি চেক বই, দুটি ডিপোজিট বই, তিনটি সিল, ১২০ টি ডিপিএস বই, একটি ডিভিআর মেশিন এবং নগদ ৪ লাখ ২২ হাজার টাকা জব্দ করা হয়। অভিযানের আগে থেকে প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি জসিমসহ সমিতির কার্যকরী কমিটির অন্যান্য সদস্যরা পলাতক রয়েছেন।

অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল হক বলেন, মূল অভিযুক্ত জসিম নিজেই সমিতির সভাপতি, সহ-সভাপতি তার শ্বশুর মোতালেব সরকার, সাধারণ সম্পাদক তার প্রথম স্ত্রী লাকী আক্তার এবং কোষাধ্যক্ষ তার শ্যালিকা শাহেলা নাজনীন, এমনকি যুগ্ম সম্পাদকও নিকট আত্মীয় লাভলী আক্তার। এক রকম পারিবারিক একটি সমিতি। প্রতিষ্ঠানটি সমবায় অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধিত। সরকারি হিসাবে প্রতিষ্ঠানটিতে ৫১৮ জন গ্রাহক উল্লেখ করা হলেও গ্রাহকদের অভিযোগ মতে ও র‌্যাবের তদন্ত তথ্যে উঠে এসেছে অন্তত ২০ থেকে ২৫ হাজার গ্রাহক শত কোটির বেশি টাকা লেনদেন করেছেন প্রতিষ্ঠানটিতে।

র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, প্রতিষ্ঠানে কেউ যদি একটি ডিপিএস মাসে এক হাজার টাকা করে বছরে ১২ হাজার টাকা জমা দেয় তবে পাঁচ বছরের ৬০ হাজার টাকা জমা হবে। মেয়াদ শেষে তাকে ৯০ হাজার টাকা প্রদান করা হবে। টার্গেট সংগ্রহকারী ব্যক্তি প্রথম এক বছর প্রতিমাসে দুই শ’ টাকা এবং পরবর্তী ৪ বছর প্রতিমাসে ১০০ টাকা করে লভ্যাংশ পাবে। আবার কোম্পানির কোনো সদস্য যদি নতুন কোনো সদস্যকে এক লাখ টাকার এফডিআর করাতে পারে তাহলে টার্গেট সংগ্রকারীকে মাসে এক হাজার টাকা এবং এফডিআরকারী সদস্যকে মাসে দুই হাজার টাকা প্রদানের প্রলোভন দিতো। প্রকৃতপক্ষে যা বাংলাদেশে কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান দিতে পারেনা।

৫ বছরে ৫০ শতাংশ লভ্যাংশ মুনাফার ফাঁদ

গ্রেপ্তার শাকিল আহম্মেদ ও চাঁন মিয়া ভুক্তভোগীদের বিভিন্নভাবে প্রলোভন দেখিয়ে স্বল্প সময়ে অধিক মুনাফা প্রদানের নিশ্চয়তা দিয়ে ‘কর্ণফুলী মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লি.’ এ বিনিয়োগ বা ডিপিএস করতে আগ্রহী করতেন। এভাবে প্রলুব্ধ হয়ে বস্তি এলাকার গার্মেন্টসকর্মী, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, অটোচালক, সবজি ব্যবসায়ী, ফল ব্যবসায়ী, গৃহকর্মী ও নিম্নআয়ের মানুষেরা বিনিয়োগ করত। প্রতি সদস্য মাসিক এক’শ থেকে এক হাজার টাকা করে কথিত ডিপিএস জমা করতেন। যা ৩ বছরে ৩০ শতাংশ এবং ৫ বছরে ৫০ শতাংশ মুনাফা প্রদানের শর্তে টাকা গ্রহণ করতো। কিন্তু ভুক্তভোগীদের বক্তব্য অনুযায়ী তাদের নিয়মিত লভ্যাংশ দেওয়া হতো না। ডিপিএস এর মেয়াদ পূর্ণ হলেও পাওনা টাকা পরিশোধ করা হতো না। অধিক মুনাফার লোভে করোনাকালেও ভুক্তভোগীরা সঠিক সময়ে ডিপিএস এর টাকা জমা দিলেও লভ্যাংশ পায়নি।

ভুক্তভোগীরা লাভের টাকা চাইতে গেলে হুমকি-ধমকি প্রদর্শন করা হতো। নারী গ্রাহকদের প্রতি অশালীন মন্তব্য, পুরুষ সদস্যদের টর্চারসেলে নিয়ে মারধর করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযান পরিচালনা কালে শাকিলের অফিসের টর্চারশেল হতে মারধরের সরঞ্জামাদি উদ্ধার করা হয়েছে।

বিচিত্র ধূর্ত জসিম সব সময়েই ছিলেন আড়ালে

মূল অভিযুক্ত পলাতক আসামি জসিম উদ্দিন নিজ জেলা মুন্সিগঞ্জ। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাশ করেন। পূর্বে একটি ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে রিপ্রেজেন্টিটিভ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে ২০০৩ সালে তিনি অল্প সময়ে অধিক মুনাফা লাভের আশায় কর্ণফুলী মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লি. প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০৬ সালে সমবায় অধিদফতর কর্তৃক কর্ণফুলী মাল্টিপারপাস নিবন্ধন লাভ করে, ২০১৩ সালে সমিতিটির পূণ:নিবন্ধন পায়।

র‌্যাব-৪ অধিনায়ক বলেন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাকিল আহম্মেদ নিজ জেলা নরসিংদি। তিনি টঙ্গী কলেজ থেকে অনার্স পাশ করেন। ২০১৫ সালে তিনি কর্ণফুলী মাল্টিপারপাসে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন। শাকিল যোগদান করার পর গ্রাহকের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। তিনি গ্রাহকদেরকে লোভনীয় অফার দিয়ে সমিতিতে ডিপিএস বা এফডিআর এ টাকা রাখতে প্রলুব্ধ করত।

গ্রাহকদের টাকা ফেরতের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মানি লন্ডারিং মামলার পর গ্রাহকদের টাকা ফেরত পাওয়ার একটি সম্ভাবনা রয়েছে।

সমবায় অধিদপ্তরের যেসব কর্মকর্তা অডিট করেছিলেন তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল হক বলেন, ২০১৯-২০২০ সালে সমবায় অধিদপ্তরের অডিট করে। অডিটে দেখানো হয় মাত্র ৫১৮ জন সদস্য। আর লেনদেন দেখানো হয় মাত্র ৮২ লাখ টাকা। অথচ র‌্যাবের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে লেনদেন হয়েছে শত কোটির বেশি টাকা। বাকি টাকা মানি লন্ডারিং হয়েছে। মামলার প্রেক্ষিতে তদন্তকারী কর্মকর্তা যদি মনে করেন তাহলে সমবায় অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

জসিম দেশেই আছেন জানিয়ে মোজাম্মেল হক বলেন, জসিম যাতে দেশত্যাগ না করতে পারে সেই বিষয়টি দেখা হচ্ছে। বর্ডার ও বিমানবন্দরে চিঠি পাঠানো হবে।

(ঢাকাটাইমস/২৬অক্টোবর/এসএস/কেআর)

সংবাদটি শেয়ার করুন

অপরাধ ও দুর্নীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :