বাসভাড়া বৃদ্ধিতে জনমনে ক্ষোভ

মোয়াজ্জেম হোসেন, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২২, ১৩:৩০ | প্রকাশিত : ০৮ আগস্ট ২০২২, ১১:৪৮

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বেড়েছে বাসভাড়া। শনিবার রাতে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং পরিবহন নেতাদের বৈঠকে নতুন এ ভাড়া নির্ধারণ হওয়ার পর রবিবার বাস ও মিনিবাসের সর্বোচ্চ ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে সড়ক পরিবহন বিভাগ। দূরপাল্লার বাসে এক লাফে ৪০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, করোনাভাইরাস মহামারির কারণে মানুষের আর্থিক সংকট গভীর হয়েছে, মূল্যস্ফীতির চাপ সহ্য করতে হচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি তো আছেই। এক ধাপে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বড় একটা বোঝা হয়ে দাঁড়াল। কেননা জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় কৃষি, পরিবহন, উৎপাদন, আমদানি, রপ্তানিসহ সব খাতেই প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে মধ্যবিত্তরা খুব বাজেভাবেই চাপে পড়বে।

রবিবার সরেজমিনে গাবতলী, সায়েদাবাদ, মহাখালী, কলাবাগান, কমলাপুর ঘুরে দেখা যায়, সব বাস কোম্পানিই বাড়তি ভাড়া নিয়ে যাত্রী ওঠাচ্ছে। বিভিন্ন গন্তব্যে ভাড়া বেড়েছে ৪০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত। যাত্রীরা বলছেন, বাস কোম্পানিগুলো সরকার নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে গিয়ে বেশি টাকা আদায় করছে।

গাবতলীতে হানিফ এন্টারপ্রাইজের কাউন্টার থেকে জানা যায়, রাজধানী ঢাকা থেকে কুড়িগ্রামের ভাড়া ছিল ৮০০ টাকা, এখন নেওয়া হচ্ছে এক হাজার টাকা। রংপুরে ছিল ৭০০ টাকা, এখন ৮৫০ টাকা। নওগাঁয় এখন নেওয়া হচ্ছে ৭০০ টাকা, আগে ভাড়া ছিল ৫৫০ টাকা। পঞ্চগড় রুটে ভাড়া ছিল ৯৫০ টাকা, এখন এক হাজার ৪০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। ঠাকুরগাঁওয়ের ভাড়া ছিল ৯০০ টাকা, এখন নেওয়া হচ্ছে এক হাজার টাকা। ঢাকা থেকে খুলনার ভাড়া ছিল ৬৯০ টাকা, এখন ৮০০ টাকা। যশোরে ভাড়া ছিল ৫৫০ টাকা, এখন ৬৫০ টাকা। বরিশালে নেওয়া হচ্ছে ৭০০ টাকা, আগে ভাড়া ছিল ৬০০ টাকা। বরগুনার ভাড়া ছিল ৮০০ টাকা, এখন ৮৫০ টাকা। কুয়াকাটার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৯২০ টাকা, আগে ছিল ৮৫০ টাকা। এছাড়া ঝালকাঠির ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৭৫০ টাকা, যা আগে ছিল ৬৫০ টাকা।

সরকার কিলোমিটার প্রতি ভাড়া ঘোষণা করার পর মালিকরা নিজেরাই প্রত্যেকটি গন্তব্যের জন্য ভাড়া ঠিক করেছেন বলে জানিয়েছেন কাউন্টার ম্যানেজাররা।

গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে ঠাকুরগাঁওগামী যাত্রী মুকুল দাস বলেন, ‘আমি গত সপ্তাহে ঢাকা এসেছি। তখন ভাড়া নিয়েছে ৯০০ টাকা। আজ (গতকাল রবিবার) রাতে যাওয়ার জন্য টিকিট কাটলাম। ভাড়া নিল এক হাজার টাকা। আমি ঢাকায় চাকরি করি। আমার পরিবার গ্রামে থাকে। ব্যয়বহুল এই শহরে পরিবার নিয়ে থাকার সামর্থ্য নেই। তাই এক সপ্তাহ পরপর বাড়ি যাই। মাত্র কয়েকমাস আগে এক দফা ভাড়া বেড়েছে। এখন আবার বাড়লো। আমার মতো ছোটখাটো চাকরিজীবীর জন্য বড় চাপ হয়ে গেল।’

শুক্রবার রাতে হঠাৎ করে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা দেয় সরকার। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রলের মূল্য ভোক্তা পর্যায়ে পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। রাত ১২টার পর থেকে ডিপোর ৪০ কিলোমিটারের ভেতর ভোক্তা পর্যায়ে খুচরা মূল্য লিটারপ্রতি ডিজেল ও কেরোসিন ১১৪ টাকা, লিটারপ্রতি অকটেন ১৩৫ টাকা ও পেট্রল ১৩০ টাকা হবে। শুক্রবার রাত ১২টা থেকে এই দাম কার্যকর হয়েছে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে শনিবার রাত পৌনে ১০টার দিকে নতুন বাসভাড়া ঘোষণা করা হয়। নতুন ভাড়া অনুযায়ী আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লা রুটে বাস ও মিনিবাসে প্রতি কিলোমিটার ভাড়া ৪০ পয়সা বেড়ে দুই টাকা ২০ পয়সা হয়েছে, যা এতদিন ছিল এক টাকা ৮০ পয়সা। অর্থাৎ দূরপাল্লার রুটে বাসভাড়া বেড়েছে ২২ শতাংশ।

এছাড়া ঢাকাসহ সব মহানগরে চলাচলকারী বাসগুলোতে ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ৩৫ পয়সা বেড়ে দুই টাকা ৫০ পয়সা করা হয়েছে, যা এতদিন ছিল দুই টাকা ১৫ পয়সা। অর্থাৎ মহানগরে বাসভাড়া বেড়েছে প্রায় সাড়ে ১৬ শতাংশ।

রবিবার সরজমিনে সায়েদাবাদে গিয়ে দেখা যায়, হানিফ পরিবহনের ঢাকা থেকে মৌলভীবাজার ও শায়েস্তাগঞ্জের ভাড়া বেড়েছে ১০০ টাকা। ১৩০ টাকা বেড়ে সিলেটের ভাড়া এখন ৭০০ টাকা। আর সুনামগঞ্জ রুটে আগে ছিল ৬৫০ টাকা। সেটা ২০০ টাকা বাড়িয়ে এখন ৮৫০ টাকা নেওয়া হচ্ছে।

শ্যামলী পরিবহনে দেখা গেছে, সিলেটে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৬৫০ টাকা। ঈগল পরিবহনের কাউন্টার থেকে জানা যায়, বরিশাল রুটে যাত্রী হিসাব করে আপাতত ১০০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম বলেন, ‘করোনাভাইরাস মহামারির কারণে মানুষের আর্থিক সংকট গভীর হয়েছে, মূল্যস্ফীতির চাপ সহ্য করতে হচ্ছে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি তো আছেই। এক ধাপে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি অতিরিক্ত বড় একটা বোঝা হয়ে দাঁড়াল। ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধিতে বেশি সমস্যা তৈরি হবে। আমাদের কৃষকরা সেচের জন্য ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। আবার পরিবহন, শিল্প উৎপাদন এসব ক্ষেত্রেও প্রভাব তৈরি করবে।’

এদিকে ফেনীর ছাগলনাইয়ার দিকে চলাচল করা স্টার লাইন পরিবহনে আগে ভাড়া নেওয়া হতো ৩৫০ টাকা। এখন নেওয়া হচ্ছে ৪২০ টাকা করে। ফেনীর ভাড়া ৩২০ টাকা ছিল, এখন নেওয়া হচ্ছে ৩৮০ টাকা।

শনিবার জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় কৃষি, পরিবহন, উৎপাদন, আমদানি, রপ্তানিসহ সব খাতেই প্রভাব পড়বে। জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে স্বাভাবিকভাবেই অন্যান্য জিনিসপত্রের দাম বাড়বে। বিশেষ করে মধ্যবিত্তরা খুব বাজেভাবেই চাপে পড়বে।’

জসিম উদ্দিন আরও বলেন, ‘একবারেই ৪২ থেকে ৫০ শতাংশ দাম বাড়ানো ঠিক হয়নি। এটা না করে আস্তে আস্তে বাড়ালে তা সহনীয় হতো। আমাদের কথা হচ্ছে, এখন দাম বাড়লে, পরে যখন দাম কমবে, তখন যেন সমন্বয় করা হয়। এর আগে যখন দাম কম ছিল, তখন ৪৮ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা সরকার লাভ করেছিল। ওই টাকা দিয়ে এখন ভর্তুকি দিতে পারত সরকার। সেটা কিন্তু করেনি।’

মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখা যায়, শেরপুর, জামালপুর, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জ রুটে যাত্রী প্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। ময়মনসিংহ রুটে চলাচলকারী এনা পরিবহনের কাউন্টারে গিয়ে দেখা গেছে, কাউন্টারের সামনে লেখা আছে ‘বাস ভাড়া ৩২০ টাকা’। এনা বাসের হেল্পার আলম নামে একজন জানান, আগে এই বাসের ভাড়া ছিল ২৬০ টাকা।

কলাবাগানে শ্যামলী পরিবহনের কাউন্টারের শাওন আহমেদ রবিবার রাত আটটার দিকে বলেন, ‘আমরা এখনো পূর্ণাঙ্গ লিস্ট পাইনি। আমাদের প্যানেলে কাজ চলছে। ফাইনাল ভাড়া সেটআপ করা হচ্ছে।’

সকাল থেকে বিভিন্ন রুটে কত টাকা করে ভাড়া নেওয়া হয়েছে- জানতে চাইলে তিনি ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘কক্সবাজার রুটে আজ টিকিট বিক্রি করা হয়েছে এক হাজার টাকা করে। কক্সবাজারে আগে ভাড়া ছিল ৯০০ টাকা। আর টেকনাফের টিকিট বিক্রি হয়েছে এক হাজার ১০০ টাকা করে। আগে ছিল এক হাজার টাকা। রাঙ্গামাটিতে নেওয়া হচ্ছে ৯০০ টাকা করে। আগে ছিল ৭৫০ টাকা। খাগড়াছড়িতে নেওয়া হচ্ছে ৭৫০ টাকা করে, যা আগে ছিল ৬৫০ টাকা। আর বন্দরবানের টিকিট বিক্রি হচ্ছে ৯০০ টাকা করে। এ রুটে আগে ভাড়া ছিল ৭৫০ টাকা। এছাড়া চট্টগ্রামের প্রায় সব গাড়িই টিকিট বিক্রি করছে ৭০০ টাকা করে। চট্টগ্রামে আগে ভাড়া ছিল ৫৮০ টাকা।

কলাবাগান কাউন্টারে টিকিট কাটতে আসা ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবসা করা তামিম আহমেদ ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘সামনের সপ্তাহে ১৫ জন গেস্ট যাবে রাঙ্গামাটি। তাদের সঙ্গে গত সপ্তাহে কথাবার্তা সম্পন্ন হয়েছে। আমি আগের দামে সবকিছু হিসাব করে প্যাকেজ দিয়েছি। এখন হঠাৎ করে ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় বিপদে পড়ে গেলাম। এই ট্যুর প্যাকেজে লোকসানও হতে পারে। কেননা গেস্টরা এখন বেশি টাকা দিতে চাচ্ছে না।’

রাজধানীর কমলাপুর রেল স্টেশনের সামনে থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চলাচল করে রয়েল কোচ, সোহাগ এন্টারপ্রাইজ, তিশা গ্রুপ নামে নন এসি বাস। এই রুটে আগে ভাড়া ছিল ২৫০ টাকা। এখন নিচ্ছে ৩০০ টাকা করে। এই রুটে বি-বাড়িয়া এক্সপ্রেস নামে এসি বাস চলে। এই বাস কোম্পানিটি আগে ভাড়া নিত ৩০০ টাকা করে। এখন নিচ্ছে ৩৫০ টাকা করে।

ভৈরবে কাপড়ের ব্যবসা করা রিপন আহমেদ ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘সপ্তাহে প্রতি রবিবার আমাদের ভৈরব বাজার বন্ধ থাকে। বন্ধের দিন আমরা মালামাল কিনতে প্রতি সপ্তাহে ঢাকা আসি। এখন ভাড়াসহ সব খরচ বেড়ে গেছে। এই প্রভাব এখন কাপড়ের ওপর দিয়ে যাবে। কেনা এবং খরচ বেশি পড়বে তাই একটু বেশি দামে বিক্রিও করতে হবে।’

(ঢাকাটাইমস/০৮আগস্ট/এমএইচ/এফএ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :