‘আসল’ না ‘নকল’ ধরতে ইনসেপ্টার এক ব্যাচের সব ‘প্যানটোনিক্স’ বড়ি পরীক্ষার নির্দেশ

সিরাজুম সালেকীন, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২০ মে ২০২৩, ১৭:৪৪ | প্রকাশিত : ২০ মে ২০২৩, ১৬:৩২

আসল না নকল ধরতে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ প্যানটোনিক্স ২০ মিলিগ্রাম ল্যাব পরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। ট্যাবলেটটির একটি ব্যাচের সব বড়ি পরীক্ষা করে দ্রুত প্রতিবেদন দিতে অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের এই নির্দেশ দেওয়া হয়।

প্যানটোনিক্স তৈরি করে ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড। এই ওষুধটির বাজারে থাকা একটি ব্যাচ নিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের এক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর এই নির্দেশনা দিল।

জানা গেছে, সম্প্রতি প্যানটোনিক্স ২০ মিলিগ্রাম ওষুধের একটি ব্যাচের (ব্যাচ-এম০৯২১) ট্যাবলেটের নমুনা পরীক্ষা করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের মতিঝিল বিভাগ। নমুনা পরীক্ষা ও বিশ্লেষণ করার পর তা মান-বহির্ভূত বলে জানতে পারেন গোয়েন্দারা।

বিষয়টি ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর অবহিত হওয়ার পর তা (ওই ব্যাচের ট্যাবলেট) মাঠ থেকে সংগ্রহ করে মিনি ল্যাবে পরীক্ষার নির্দেশ দেয়। সেই রিপোর্ট সংশ্লিষ্ট পরিচালক বরাবর পাঠাতে বলা হয়।

২০২২ সালের জুনে দেশি-বিদেশি অন্তত নয়টি ব্রান্ডের প্রচলিত ও বহুল ব্যবহৃত ওষুধের নকল ও ভেজাল চালান জব্দ করে ডিবি পুলিশ। সেই ওষুধের মধ্যে প্যানটোনিক্স, ন্যাপ্রোক্সেন প্লাস, গরু মোটাতাজার নিষিদ্ধ ওষুধ পেরিএকটিন, খোলা মাইজিদ-৫০০ ট্যাবলেট ছিল। এসব ওষুধের পরিমাণ ছিল প্রায় ২২ লাখ পিস।

এর মধ্যে প্যানটোনিক্স-২০ এমজি ছিল ৯ লাখ ১৮ হাজার ৪৫৬ পিস। এই চালানের এমন আরও অনেক ওষুধ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দেয় চক্রটি। এ কারণে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর তাদের মাঠ পর্যায়ের সকল কর্মকর্তাকে চিঠি দিয়েছে।

গোয়েন্দা পুলিশ জানিয়েছে, নকল এসব ওষুধ তারা ফয়েল পেপার দিয়ে সুন্দর করে মোড়কজাত করে। এসব ওষুধ আসল না নকল তা বোঝার কোনো উপায় নেই। আটা বা ময়দার সঙ্গে কেমিক্যাল মিশিয়ে তৈরি এসব নকল ওষুধ প্যাকেজিং করে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে ঢাকাসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে।

এসব ওষুধের গুণগতমান বলতে কিছুই থাকে না। প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রে অত্যাধুনিক স্ট্রিপ লাগায় নকলকারীরা। আর বাজারে যেসব গ্যাস্ট্রিকের ওষুধের বেশি চাহিদা রয়েছে সেগুলো টার্গেট করেই নকল করা হচ্ছে।

জানতে চাইলে ডিএমপির গোয়েন্দা পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. রাজীব আল মাসুদ ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আমরা নকল ও ভেজাল ওষুধের চালান জব্দের পর সেগুলো ল্যাব টেস্ট করেছিলাম। এর মধ্যে প্যানটোনিক্স ওষুধও ছিল। পরীক্ষা করা ওষুধগুলোর কোনো মানই ছিল না। বেশির ভাগের মধ্যেই আটা-ময়দা পাওয়া গেছে। এই রিপোর্ট আমরা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠিয়েছিলাম। এরপরই ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে।’

ডিবি পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আমরা যে ফ্যাক্টরি ধরেছি তাদের ওষুধ তৈরি করার অনুমোদন নেই। সেখান থেকে আমরা যে উপাদান পেয়েছি এবং তাদের যে বক্তব্য পেয়েছি তাতে বোঝা যায় প্যানটোনিক্স তৈরির কোনো উপাদানই তাদের নেই।’

চিঠিতে যা বলা হয়েছে:

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের সকল কর্মকর্তাকে পরিচালক (হেড অব মার্কেট সার্ভিল্যান্স অ্যান্ড কন্ট্রোল) মো. আসলাম হোসেন স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে নির্দেশনা দেওয়া হয়।

সেখানে বলা হয়েছে, ন্যাশনাল কন্ট্রোল ল্যাবরেটরী জানিয়েছে গোয়েন্দা মতিঝিল বিভাগ, ডিএমপি, ঢাকা থেকে পাঠানো Incepta Pharmaceuticals Ltd. কর্তৃক উৎপাদিত ট্যাবলেট Pantonix 20 (Pantoprazole 20mg), ব্যাচ-M0921 (Strip), 21156 (Box) মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ 08/25-এর নমুনা পরীক্ষা ও বিশ্লেষণ করা হলে তা মান-বহির্ভূত হয়।

এমতাবস্থায় উল্লেখিত Incepta Pharmaceuticals Ltd. কর্তৃক উৎপাদিত ট্যাবলেট Pantonix 20 (Pantoprazole 20mg), ব্যাচ নং-M0921 (Strip), 21156 (Box) এর নমুনা বাজারে পাওয়া গেলে তা উত্তোলন পূর্বক মিনি ল্যাবে পরীক্ষা করে অতি দ্রুত রিপোর্ট প্রেরণ করতে এতদ্বারা নির্দেশ প্রদান করা গেল।

জানা গেছে, প্যানটোনিক্স একটি প্রতিস্থাপিত বেনজিমিডাজোল জাতীয় ওষুধ। এটি ট্রিক এসিড নিঃসরণে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে। প্যানটোনিক্স ট্রিক প্যারাইটাল কোষের ‘প্রোটন-পাম্প’ হিসেবে পরিচিত হাইড্রোজেন-পটাশিয়াম-এডিনোসিন ট্রাইফসফেটেজ এনজাইম সিস্টেমকে বাধা দিয়ে গ্যাস্ট্রিক এসিড নিঃসরণে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের চিঠির বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলেও ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালের কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নকল ওষুধ বন্ধে যা বলছে অধিদপ্তর:

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, এটা কঠিন সিন্ডিকেট। প্রতিনিয়ত কোনো না কোনো জায়গায় অভিযান পরিচালনা করা হলেও প্রতিদিনই নকল ওষুধ না পেলেও মানহীন, মেয়াদোত্তীর্ণ, সরকারি ওষুধ জব্দ করা হচ্ছে।

তবে ভেজাল ওষুধ শনাক্ত করা বেশ কঠিন। এগুলো প্যাকেজিং একটি বিশেষ পদ্ধতিতে করা হয়। তাই সাধারণ মানুষ খালি চোখে আসল ওষুধের সঙ্গে এর পার্থক্য ধরতে পারে না।

অভিযানে সন্দেহ হলে সেগুলো মিনি ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। সেখানেই পাওয়া যায় আটা-ময়দার দলা পাকানো একটা কিছু। যেগুলোতে ওষুধের ন্যূনতম উপাদানও নেই। যা খেলে মানুষের শরীর সুস্থ হওয়া দূরে থাক বরং খারাপ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলন, ‘আমাদের বেশকিছু সীমাবদ্ধতা আছে। অনেক দিন ধরেই আমরা চাচ্ছি প্রত্যেকটি ওষুধের একটি ইউনিট নম্বর বা সিরিয়াল নম্বর দিতে। কোম্পানিগুলোর সঙ্গেও কথা বলেছি। তবে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এর অন্যতম প্রতিবন্ধক।’

‘যত দ্রুত সম্ভব সব ওষুধের সিরিয়াল নম্বর তৈরির কাজটা দ্রুততম সময়ের মধ্যে করে ফেলতে চেষ্টা করছি। আপাতত এটাই নকল ওষুধ সরবরাহ বন্ধের একমাত্র উপায়। তবে এসব ওষুধ উৎপাদনকারী কারখানাগুলোকে যদি খুঁজে বের করা যায় তাহলেও কিছুটা সমাধান হতে পারে।’

কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা

বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. উত্তম বড়ুয়া ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘অসাধু ব্যবসায়ীরা নকল ওষুধে কী ধরনের উপাদান ব্যবহার করছে সেটা আগে দেখতে হবে। কোনো ক্ষতিকর পদার্থ ব্যবহার করলে তা আমাদের শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।’

এ বিশেষজ্ঞ জানান, গ্যাস্ট্রিকের ওষুধগুলো যেমন অ্যাসিডিটি, আলসার, ক্যানসারের প্রকেটশন দিচ্ছে। আর নকল বা ভেজাল গ্যাস্ট্রিকের ওষুধে উল্টো আলসার হওয়ার সম্ভাবনা আছে। পাশাপাশি ডায়রিয়া, কিডনি বিকল, লিভার সমস্যাসহ বিভিন্ন রোগের সম্ভাবনা রয়েছে।

অধ্যাপক ড. উত্তম বড়ুয়া ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘প্রত্যেকে প্রায় প্রতিদিন গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খেয়ে থাকেন। দীর্ঘদিন যদি মানুষ নকল ওষুধ খায় তাহলে শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতি হবে। ক্ষেত্রবিশেষ নকল ওষুধে যদি উচ্চতর ক্ষতিকর উপাদান থাকে তাহলে ব্রেনেও সমস্যা হতে পারে। দীর্ঘদিন যেকোনো ওষুধ খেলে যেমন ক্ষতিকর; তেমনি নকল ক্ষতিকর ওষুধ দীর্ঘদিন খেলে কিডনি-লিভার তো বিকল হবেই।’

(ঢাকাটাইমস/২০মে/ডিএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

জাতীয় এর সর্বশেষ

এই বিভাগের সব খবর

শিরোনাম :