ঢাকা উত্তরে এক নেতার 'পকেট কমিটি', বলয়ে জিম্মি দক্ষিণ বিএনপি 

জাহিদ বিপ্লব, ঢাকা টাইমস
| আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ১২:৪৩ | প্রকাশিত : ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ০৮:০৭

সরকার পতনের একদফা আন্দোলনে ব্যর্থতার দায়ভার কেউ নিতে না চাইলেও ঢাকা মহানগর বিএনপির প্রতি অভিযোগের তীর দলটির নেতাকর্মীদের। তাদের মতে, রাজধানীতে কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয় ঢাকা মহানগর বিএনপি। অবশ্য মহানগর নেতারা বলছেন, সরকারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিল নগর নেতারা। গ্রেপ্তার হয়েছেন দুই সহস্রাধিক নেতাকর্মী। সবচেয়ে দমনপীড়নের শিকার হয়েছেন মহানগর বিএনপির নেতারা। খোদ মহানগরেই নিহত হয়েছেন ৭ জন নেতাকর্মী।

ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি সূত্র জানায়, উত্তরে এক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে পুরো নগর কমিটি। তার একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তারের ফলে বাদ পড়েছেন তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী। অপরদিকে দক্ষিণে বিএনপির দুই প্রভাবশালী নেতার বলয়ের কারণে বিভিন্ন ওয়ার্ড ও ১২টি থানা কমিটি করতে বেগ পেতে হচ্ছে নগর কমিটিকে। হেভিওয়েট নেতারা নিজস্ব লোক সেটআপ করতে চাইলে বিরোধ বাধে নগর নেতাদের সঙ্গে।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ

ঢাকা মহানগর দক্ষিণের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা জানান, আন্দোলনের মূলকেন্দ্র দক্ষিণে হওয়ায় অনেক কর্মসূচির সিদ্ধান্ত কেন্দ্র থেকে আসে। এরপর বিএনপির এক স্থায়ী কমিটির সদস্য ও অঙ্গ সংগঠনের এক সভানেত্রী ঢাকা-৮ এবং ৯ আসনে নির্বাচন করবেন। সেজন্য শাহজাহানপুর, পল্টন, মতিঝিল, শাহবাগ, রমনা, খিলগাঁও, সবুজবাগ ও মুগদা থানা কমিটিগুলো নিয়ে তাদের পছন্দকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে নগর নেতাদের। এখানে অনেক ত্যাগী ও যোগ্য নেতারাও স্থানীয় নেতৃত্বে আসতে পারছেন না, শুধু সেই হেভিওয়েট নেতাদের সুদৃষ্টি না থাকার কারণে।

একই অবস্থা ঢাকা-৪ এবং ৫ আসনেও। আগে এই দুটি নির্বাচনি এলাকা মিলে ছিল একটি সংসদীয় আসন। আর এখানে সংসদ সদস্য ছিলেন বিএনপির বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক সালাউদ্দিন আহমেদ। যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, শ্যামপুর, কদমতলীতেও কমিটি গঠন নিয়ে রয়েছে নানা অসন্তোষ। অভিযোগ রয়েছে, এখানেও ওই প্রভাবশালী নেতার কারণে অনেক ত্যাগী ও যোগ্য নেতারা রয়েছেন অবহেলিত। এই অঞ্চলে নগর বিএনপির সিনিয়র নেতা কারাবন্দি নবী উল্লাহ নবী এবং আনম সাইফুল ইসলামের সঙ্গে বিরোধ রয়েছে সাবেক এমপি সালাউদ্দিন আহমেদ এবং তার ছেলে মহানগরের আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক তানভীর আহমেদ রবিনের। বিষয়টি নগর নেতাদের কাছে ওপেন সিক্রেট।

এছাড়া ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতৃত্বও আসছে হেভিওয়েট নেতাদের তদবিরে। যার কারণে আন্দোলন-সংগ্রামে মূলদলের সঙ্গে সমম্বয়ের ঘাটতি থাকে। সেজন্য নগর বিএনপির সঙ্গে একাধিকবার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতারা এক টেবিলে বসলেও পরে আবার অদৃশ্য কারণে নিজ নিজ অবস্থানে চলে যান। এর জন্যও বিএনপির সেই প্রভাবশালী নেতারা নেপথ্যে ভূমিকা রাখছেন বলে রয়েছে অভিযোগ।

নগর দক্ষিণ বিএনপির এক সদস্য ঢাকা টাইমসকে বলেন, “দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস এবং বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক সালাউদ্দিন আহমেদ কারাগারে থাকাকালে এলাকায় তাদের মুক্তির দাবিতে কোনো মিছিল হয়নি। কোথায় ছিল তাদের নিজস্ব কর্মী বাহিনী? আর যারা সত্যিকারের ত্যাগী নেতা, তাদেরকে দল থেকে সাইজ করে রাখা হয়েছে। হেভিওয়েট নেতারা চান, কর্মীরা বিএনপির স্লোগান না দিয়ে যেন সেই নেতার আজ্ঞাবহ হয়।”

ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্য সচিব রফিকুল আলম মজনু ঢাকা টাইমসকে বলেন, “আমরা দায়িত্ব পাওয়ার পর ৮০টি ওয়ার্ড কমিটি সম্মেলনের মাধ্যমে গঠন করেছি। এখানে কারো বাধায় কমিটি করতে পারছি না- এ অভিযোগ সত্য নয়। সবার সঙ্গে আলোচনা করেই কমিটি দেওয়া হয়েছে। সমন্বয় করেই থানা কমিটি করব। থানা কমিটি না থাকলেও থানার সাবেক নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে থানাগুলোতে কাজ চলছে। তারপরও দলের সিনিয়র নেতাদের নিজস্ব চয়েজ থাকতে পারে, অনেকে নিজস্ব লোক চায়। তবে যে-ই নেতৃত্বে আসুক আগে যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেব। আড়াই বছরের অধিক সময়ে আহ্বায়ক কমিটি চলছে। তারুণ্যের অহংকার তারেক রহমান যখন যেভাবে নগর কমিটি দেবেন আমরা সবদিকেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। তার প্রতি আমাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে।”

ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুস সালাম ঢাকা টাইমসকে বলেন, “শত বাধাবিপত্তি, গ্রেপ্তার ও হুলিয়ার মধ্যদিয়েও পাঁচ শতাধিক ইউনিট কমিটি এবং সব ওয়ার্ড গঠন করা হয়েছে। থানা কমিটি গঠন প্রক্রিয়াধীন আছে। আপনারা সাক্ষী আছেন, সংগঠন করতে গিয়ে কীভাবে বাধার সম্মুখীন হয়েছি। ঘরোয়া কর্মিসভাও করতে দেওয়া হয়নি। কমিউনিটি সেন্টারগুলো বিএনপির জন্য অঘোষিতভাবে নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছে। কোথাও ১০-১৫ জন কর্মী একসঙ্গে হলেই মামলা ছাড়া তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরকম একটি পরিস্থিতিতে আমাদের সংগঠন করতে হয়েছে। ২৮ অক্টোবরের পর থেকে মহানগরের অধিকাংশ সিনিয়র নেতাকে আটক করা হয়েছে। এখনো ৬ শতাধিক নেতাকর্মী আটক রয়েছে। ইতোমধ্যে শতাধিক নেতাকে ভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। তারপরও আমরা আমাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।

ঢাকা মহানগর উত্তর

গত ১৩ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আমান উল্লাহ আমান কারাগারে গেলে ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক করা হয় ফরহাদ হালিম ডোনারকে। ২ নভেম্বর সদস্য সচিব আমিনুল হক গ্রেপ্তার হলে যুগ্ম আহ্বায়ক শামছুল হককে দায়িত্ব দেওয়া হয় ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিবের। আমিনুল হক আটক হলে ঢাকা মহানগর উত্তরের সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং আন্দোলনে নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান গঠন করেন ৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি সমন্বয় কমিটি। কমিটির সদস্যরা হলেন- ফরহাদ হালিম ডোনার, তাবিথ আউয়াল, এমএ কাউয়ুম, শামছুল হক এবং শফিকুল ইসলাম মিল্টন।

অভিযোগ রয়েছে, মহানগর সদস্য সচিব ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ককে কোনো সাংগঠনিক কার্যক্রমে সহযোগিতা করছেন না। তিনি নিজস্ব পছন্দের লোকদের অধিষ্ঠিত করছেন বিভিন্ন ইউনিট কমিটিতে। নগর নেতারা বলছেন, আমিনুল কখনই উত্তরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। বাদ দেওয়া হচ্ছে অনেক ত্যাগী ও যোগ্য নেতাকে।

উত্তর বিএনপি প্রতিদিন ওয়ার্ড পর্যায়ে ইফতারের আয়োজন করলেও কোনো প্রোগ্রামে দেখা যায়নি ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক ফরহাদ হালিম ডোনারকে। নেতারা বলছেন, বিভিন্ন কমিটি গঠন নিয়ে আমিনুলের প্রতি অসন্তুষ্ট ডোনার। যার কারণে কোনো কোনো ইফতারে দেখা যায়নি তাকে। যদিও ডোনার ঢাকা টাইমসকে বলেন, “আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সময়ের ব্যস্ততার কারণে আমি শরিক হতে পারিনি।”

ঢাকা মহানগর উত্তরের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার ঢাকা টাইমসকে বলেন, “কিছুটা সমস্যা আছে। ওয়ার্ড পর্যায়ে কিছু কিছু ত্যাগী নেতা বাদ পড়েছেন এটিও সত্য। হয়তো কারো কথা শুনে এগুলো করা হচ্ছে। আর কমিটি করতে গেলে সবাইকে তো আর নেতৃত্ব দেওয়া যায় না। তাই কিছু অসন্তোষ থেকে যায়। আর মহানগরের আহ্বায়ক কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ কমিটি হলে নিজেদের মধ্যে অনেক দূরত্ব কমে যাবে। সংগঠন বড় হলে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা থাকবেই।”

ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শামছুল হক ঢাকা টাইমসকে বলেন, “কিছু ওয়ার্ডে অসঙ্গতি ও ঝামেলা আছে। তা ঠিক করা দরকার। আমি যখন ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেছি তখন সংগঠন করার সুযোগ ছিল না। রাজপথ ছিল উত্তপ্ত। ঢাকা মহানগর উত্তরে নেতৃত্ব নির্বাচনে অসঙ্গতি রয়েছে। বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ড কমিটি থেকে যোগ্য নেতৃত্বকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তাদের যদি মূল্যায়ন না করা যায় তাহলে দল ত্যাগী নেতা হারাবে। অবশ্য এসব বিষয়ে বিএনপির হাইকমান্ড ওয়াকিবহাল। আমরা বিশ্বাস করি দ্রুত সময়ের মধ্যে দল একটি সিদ্ধান্তে আসবে।”

ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সোহেল রহমান ঢাকা টাইমসকে অভিযোগ করে বলেন, “ঢাকা মহানগর উত্তরের থানা ও ওয়ার্ড থেকে ত্যাগী এবং যোগ্য নেতাদের বাদ দিয়ে নিজস্ব বলয় সৃষ্টি করে মহানগর উত্তর বিএনপিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বিগত আন্দোলনে সিংহভাগ থানা ও ওয়ার্ড কমিটি সক্রিয় ছিল না। পলাতক ছিলেন নেতারা। এর কারণ হলো অযোগ্য নেতাদের নেতৃত্ব দেওয়া। উত্তরের সদস্য সচিব আমিনুল হক আটকের পর মহানগরের সমন্বয় কমিটি ফরহাদ হালিম ডোনার এবং শামছুল হকের নেতৃত্বে আমরা চেষ্টা করেছি রাজপথে থাকার।”

অপর যুগ্ম আহ্বায়ক মোয়াজ্জেম হোসেন মতি বলেন, “কিছু ওয়ার্ডে অসঙ্গতি ও ঝামেলা আছে তা ঠিক করা দরকার। থানা কমিটিগুলো গঠন করতে পারলে হয়ত অনেক সংকট দূরীকরণ সম্ভব। তাছাড়া ৬ মাসের আহ্বায়ক কমিটি আজ আড়াই বছর অতিবাহিত হতে চলছে। এ বিষয়ে হাইকমান্ডের দৃষ্টি দেওয়া উচিত। গণমাধ্যমে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে চাই না।”

এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে ঢাকা মহানগর উত্তরের সদস্য সচিব আমিনুল হক বলেন, “এসব অভিযোগের ন্যূনতম সত্যতা নেই। কোনো অভিযোগ প্রমাণ করতে পারলে রাজনীতি ছেড়ে দেব।”

যারা অভিযোগ করেছেন তাদের উদ্দেশে আমিনুল হক বলেন, এরা একটি সিন্ডিকেট।”

ইফতার মাহফিলে ফরহাদ হালিম ডোনারের অনুপস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ওনাকে প্রতিটি ইফতার মাহফিলেই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সময়ের ব্যস্ততার কারণে তিনি আসতে পারেননি।

(ঢাকাটাইমস/১৬এপ্রিল/এআর/এফএ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

রাজনীতি এর সর্বশেষ

দেশ পৈত্রিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে: মির্জা ফখরুল

প্রধানমন্ত্রী নিজের ছায়া দেখেও ভয় পাবেন: গয়েশ্বর

শেখ হাসিনাকে টার্গেট করে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে: নাছিম

আজিজদের মতো অনেক রূপকথার কাহিনি আ.লীগ সরকারের আছে: রিজভী

খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে না পারলে দেশকে মুক্ত করতে পারব না: দুদু

আজিজ, বেনজীর ইস্যুতে সরকার বিব্রত নয়: ওবায়দুল কাদের

সরকার পচে দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে গেছে: মির্জা ফখরুল

তারেক রহমানের আগে আপনার বিচার হয়ে যায় কি না প্রস্তুত থাকেন, প্রধানমন্ত্রীকে রিজভী 

ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা দেখতে যাবেন প্রধানমন্ত্রী: ওবায়দুল কাদের 

সমাজ পরিবর্তনে যোগ্য নেতৃত্ব তৈরির বিকল্প নেই: মাওলানা রফিক

এই বিভাগের সব খবর

শিরোনাম :