প্রস্রাবের রং বদল এলে সাবধান, যেসব রোগের বার্তা দেয়

স্বাস্থ্য ডেস্ক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২২ জুন ২০২৪, ১০:৪৭ | প্রকাশিত : ২২ জুন ২০২৪, ১০:৪৪

মানুষের জীবনের প্রচেষ্টা থাকে সুস্থ সুন্দরভাবে বাঁচার। অনেক সময় শরীরকে সুস্থ ও স্বাভাবিক রাখাটা সম্ভব হয়ে ওঠে না। ফলে শরীরে বাসা বাঁধে নানা রোগ। কিছু রোগ বালাই খুবই হালকা হলেও অনেক রোগ আছে যা জটিল আকার ধারণ করতে পারে। তবে জটিল এইসব রোগ হবার আগে শুধু শরীরের ভেতরই নয় বরং বাইরের অনেক লক্ষণ মিলিয়ে নিয়েও দ্রুত সেই রোগ প্রতিরোধে কার্যকরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব। সেরকমই এক উপায় হলো প্রসাবের রং দেখে শারীরিক অবস্থা নির্ণয় করা। চিকিৎসকদের মতে খুব সহজেই প্রস্রাবের রং দেখে অনেক সময় রোগ নির্ণয় করা যায়।

মানুষের প্রস্রাব শরীরের খারাপ পদার্থ বের করে দেওয়ার এক মস্ত্র হাতিয়ার। সুস্থ মানুষের প্রস্রাবের রং সম্পূর্ণ স্বচ্ছ হলদেটে। আবার গাঢ় হলুদ রংও হল স্বাভাবিক। এমন প্রস্রাবের অর্থ হল শরীর ঠিকমতো তার নিজের কাজ সামলে নিলেও সামান্য ডিহাইড্রেটেড। বেশি পরিমাণ পানি পান করলে সেই সমস্যারও সমাধান হয়ে যায়। সাধারণত প্রস্রাব গন্ধহীন প্রকৃতির। প্রস্রাব পানি এবং শরীরের বর্জ্য মিশ্রিত তরল হয়। পানির প্রস্রাবের পরিমাণ ৯৫% স্নিগ্ধ পদার্থগুলো মূত্রের পরিমাণের ৫% অংশ তৈরি করে এবং শরীর থেকে বর্জ্য স্রাবের অন্যতম রূপ হল প্রস্রাব। কিডনি এটিকে গঠন করে এবং তা ভরাট না হওয়া পর্যন্ত মূত্রাশয়ে জমা হয়। এবং মূত্রনালী দিয়ে শরীর থেকে বেরিয়ে আসে। প্রস্রাবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পদার্থ হলো ইউরিয়া, ইউরিক অ্যাসিড, ইউরিয়া এবং ক্রিয়েটিনিন। এর মধ্যে প্রস্রাবের সর্বাধিক সাধারণ পদার্থ হল ইউরিয়া। পানি এবং সোডিয়াম ক্লোরাইড থেকে আসা এই বর্জ্যগুরোর সাথে মূত্রও তৈরি হয়। এমন আরও অনেক উপাদান রয়েছে যা শরীর থেকে শরীর থেকে বেরিয়ে আসে, যেমন পটাসিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়াম। ।

প্রস্রাবের রং বলে দেয় শরীরে কোনও অসুস্থতা রয়েছে কি না। লাল, হলুদ, গোলাপী ও সবুজ— এমনকি, আপনার প্রস্রাব রংধনু মতোও হতে পারে। শুধু তাই নয়, আপনি অবাক হবেন যে এর রং বেগুনি, কমলা কিংবা নীলও হতে পারে। আবার, এগুলোর পাশাপাশি কারও কারও প্রস্রাবের রং এমন কিছুও হতে পারে, যা ঠিক স্বাভাবিক বা পরিচিত কোনও রং না। প্রস্রাবের রঙে হঠাৎ বদল আসলে, চিকিৎসকদের মতে, তা কোনও রোগের ইঙ্গিত হতে পারে। কী ভাবে বুঝবেন?

লাল

কারো যদি প্রস্রাবের রং লাল হয়, তাহলে সাধারণত এর মানে হল, এতে রক্ত আছে। মূত্রনালীর সাথে সম্পর্কিত যে কোনও সমস্যার কারণে এটি হতে পারে। কিডনি, মূত্রাশয় ও প্রোস্টেট এবং মূত্রনালীর সাথে সংযোগকারী কোনও টিউব থেকে রক্তপাত হলে প্রস্রাব লাল হয়ে যেতে পারে। প্রস্রাবের সাথে মিশে থাকা রক্তের পরিমাণ ও সতেজতার উপর নির্ভর করে যে ওই রক্তের রং কী রকম হবে। এক্ষেত্রে প্রস্রাবের রং একেক সময় একেক রকম হতে পারে। রক্তপাত যদি প্রবল মাত্রায় হয়, তাহলে প্রস্রাবের রং এত গাঢ় হতে পারে যে এটিকে রেড ওয়াইনের মতো দেখতে লাগতে পারে। এই ধরনের রক্তপাতের পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। যেমন— কিডনিতে পাথর, ক্যান্সার, ট্রমা কিংবা মূত্রনালীতে কোনও সংক্রমণ। আবার, হয়ত সাধারণভাবে অতিরিক্ত বিটরুট খেলেও প্রস্রাবের রং লাল হয়ে যেতে পারে।

কমলা ও হলুদ

শরীরে পানির অভাব থাকলে প্রস্রাবের রং গাঢ় হলুদ হয়ে যাবে। আবার কখনও কখনও এটি কমলা রঙ-এরও হতে পারে। আপনি যদি পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করেন, তবে প্রস্রাবের রং হবে পাতলা এবং ফ্যাকাশে হলুদ। যে উপাদানটি প্রস্রাবকে হলুদ করে, তাকে বলে ইউরোবিলিন। শরীরে উপস্থিত পুরানো লোহিত রক্তকণিকাকে ভাঙ্গার মাধ্যমে ইউরোবিলিনের গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়। ওই রক্তকণিকাগুলো যথাযথা আকারে না থাকায় শরীর প্রস্রাবের মাধ্যমে সেগুলোকে সরিয়ে ফেলে। এই প্রক্রিয়ায় শরীরে একটি যৌগ তৈরি হয়, যাকে বলা হয় বিলিরুবিন। এটি কিছু পরিমাণে প্রস্রাবের মাধ্যমে ও কিছুটা অন্ত্রের মাধ্যমে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। আমাদের লিভার বা যকৃত ওই বিলিরুবিন ব্যবহার করে পিত্তরস তৈরি করে। পিত্তরস হজম এবং শরীরের চর্বি ভেঙ্গে ফেলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পিত্তরস অন্ত্রে থাকে এবং মলের মাধ্যমে বেরিয়ে যায়। এই পিত্তরসের কারণেই মলের রং বাদামী হয়ে থাকে। কিন্তু অনেকসময় পিত্তথলির পাথর কিংবা ক্যান্সারের কারণে পিত্তনালী বন্ধ হয়ে যায় এবং তখন পিত্তরস অন্ত্রে পৌঁছাতে পারে না।

ওইসময় বিলিরুবিন রক্তনালীতে ফিরে যায় এবং প্রস্রাবের মাধ্যমে নির্গত হয়। এই কারণে প্রস্রাবের রং গাঢ় হতে শুরু করে - কমলা বা বাদামী। প্রস্রাবে বিলিরুবিনের পরিমাণ বেড়ে গেলে ত্বকের রংও হলুদ হতে শুরু করে। এই অবস্থাকে বলা হয় 'অবস্ট্রাকটিভ জন্ডিস', যা এক ধরনের জন্ডিস। তবে কিছু ওষুধ আছে, যেগুলোর কারণে প্রস্রাব কমলা রঙা হয়ে যেতে পারে।

সবুজ ও নীল

সবুজ এবং নীল রংয়ের প্রস্রাব হওয়ার ঘটনা খুব বিরল। প্রস্রাব করার পর আপনি যদি দেখেন যে তার রং সবুজ বা নীল, আপনি নিশ্চিতভাবেই অবাক হয়ে যাবেন। টয়লেটে কোনও কিছুর উপস্থিতি যদি প্রস্রাবের রং পরিবর্তন না করে, তাহলে শরীর অন্য কোনও কারণে সবুজ বা নীল রংয়ের প্রস্রাব তৈরি করতে পারে। চেতনানাশক, ভিটামিন, অ্যান্টিহিস্টামিনের মতো কিছু ওষুধ খাওয়ার কারণেও প্রস্রাবের রঙ সবুজ বা নীল হয়ে যেতে পারে। একটি মজার তথ্য হল যে, কিছু ব্যাকটেরিয়া আছে, যেগুলো এমন যৌগ তৈরি করে যে তা সবুজ বর্ণের হয়। সিউডোমোনাস অ্যারুগিনোসা নামক ব্যাকটেরিয়া নীল ও সবুজ রঙের পাইওসায়ানিন যৌগ তৈরি করে। এটি মূত্রনালীর সংক্রমণের একটি বিরল কারণ। এটি হলে একজন ব্যক্তিকে প্রস্রাব করার সময় জ্বালাপোড়া এবং ব্যথার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

বেগুনি

প্রস্রাব বেগুনি মানে ইন্ডিগো বা পার্পল বা ভায়োলেট রং ধারণ করার ঘটনাও খুব বিরল। এর একটি সম্ভাব্য কারণ হল পোরফাইরিয়া। এটি এক ধরণের জেনেটিক রোগ, যা ত্বক এবং স্নায়ুতন্ত্রকে প্রভাবিত করে। এটি আরেকটি কারণেও হতে পারে। ‘পার্পল ইউরিন ব্যাগ সিনড্রোম’ নামক একটি বিরল রোগ আছে, যা ইউরিনারি ইনফেকশন বা সংক্রমণের কারণে হয়ে থাকে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের প্রস্রাব নির্গমনের জন্য ক্যাথিটার থাকলে এক্ষেত্রে তাতে পার্পল রংয়ের দাগ দেখা যায়।

গোলাপি প্রস্রাব

এই রঙের প্রস্রাব দেখলে অনেকেই ভয় পেয়ে যান। তবে সব সময় গুরুতর সমস্যার কারণেই এমনটা যে হয়, তা নয়। চারটি কারণে এটা হতে পারে। প্রস্রাবে রক্ত চলে এলে কিংবা কোনও বিশেষ ওষুধ বা টক্সিনের কারণে এমনটা হয়। টক্সিন, লেড বা পারদের কারণেও গোলাপি রঙের প্রস্রাব হতে পারে। তবে যদি রক্তের কারণে হয় তা হলে ইউটিআই, টিউমর, প্রস্টেটের সমস্যা, কিংবা কিডনিতে স্টোন হয়ে থাকতে পারে।

ঘোলাটে প্রস্রাব

কিডনির সমস্যা বা ইউটিআই হলে প্রস্রাবের রং ঘোলাটে হয়ে যায়। তবে যদি মাঝেমাঝে আপনার ঘোলাটে প্রস্রাব হয়, তা হলে চিন্তার বিশেষ কিছু নেই। খাবারে প্রোটিনের পরিমাণ বেশি হলে এমনটা হতে পারে। কিন্তু প্রতি দিন ঘোলাটে প্রস্রাব হলে অবশ্যই চিকিৎকের কাছে যান।

চিকিৎসকের মতে, প্রস্রাবের রং স্বাভাবিক রাখার জন্য প্রতিদিন বিশুদ্ধ পানি পান করা জরুরি। বিশেষ করে দেহে পানি ঘাটতি দেখা দিলে প্রাকৃতিক ভাবেই আপনি তৃষ্ণা অনুভব করবেন। তাছাড়া আপনার প্রস্রাবের রং বলে দিবে পানি পান করার প্রয়োজন রয়েছে কিনা। যদি প্রস্রাবের রং হলুদ বা কমলা হয়ে আসে, তবে পর্যাপ্ত পানি পান করুন।

(ঢাকাটাইমস/২২ জুন/আরজেড)

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :