কোটা ও খিচুড়ি রান্না শিখতে বিদেশ যাওয়া

শাহনূর শাহীন
| আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২৪, ১৮:৫১ | প্রকাশিত : ০৮ জুলাই ২০২৪, ১০:২২

কোটা প্রথা নিয়ে সারা দেশে ২০১৮ সালে তুমুল আন্দোলনে নামে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এক পর্যায়ে জাতীয় সংসদে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কোটা প্রথা বিলুপ্তির ঘোষণা দেন। ঐ বছরই এপ্রিলের শুরুর দিকে এবং অক্টোবরে কোটা বাতিলে এবং কিছু ক্ষেত্রে শর্তসাপেক্ষে কোটা পদ্ধতি রেখে দুটি প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। পরে মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হলে ২০১৯ সালের ৩০শে জুন পূর্বের প্রজ্ঞাপনের অধিকতর ব্যাখ্যা দেয় সরকার। ওই প্রজ্ঞাপনে সরকার জানায়, চাকরিতে ৯ম থেকে ১৩তম গ্রেডে চাকরির ক্ষেত্রে বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে। একইসঙ্গে ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান মুক্তিযোদ্ধা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, এতিম, শারীরিক প্রতিবন্ধী ও আনসার-গ্রাম প্রতিরক্ষা কোটায় সম্ভাব্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে অপূর্ণ পদে জেলার প্রাপ্যতা অনুযায়ী মেধা তালিকার শীর্ষ থেকে শূন্য পদ পূরণ করা হবে। এক্ষেত্রে কোনো পদ সংরক্ষণ বা খালি রাখা যাবে না। এর দুই বছর পর কয়েকজন শিক্ষার্থী সরকারের ওই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। রিটের শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট সরকারি ঐ পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করেন। ফলে পূর্বের কোটা পদ্ধতি পুনরায় বহাল হয়। রাষ্ট্রপক্ষ সেটার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করে। গত বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ সরকারের আবেদন মুলতবি রেখে রায় দেন। এর ফলে এখনো কোটা প্রথা বহালই রইলো।

মূলত, হাইকোর্টের রায়ের পর থেকেই দ্বিতীয় দফায় কোটা বিরোধী আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। এটা ঠিক যে, আন্দোলন করে আদালতের রায় পরিবর্তন বা সংশোধন করা আদৌ সম্ভব নয়। এখানে সরকারেরও কিছু করার নেই, যদি না উচ্চ আদালত রায় পরিবর্তন করেন।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে এ আন্দোলনের শেষ কোথায়, এর সমাধানই-বা কী। সরকার এখন উচ্চ আদালতে আপিল করবে। আদালত সরকারকে আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন করতে বলেছেন। আদালত হয়তো হাইকোর্টের রায় স্থগিত করবেন কি করবেন না সেটা নিয়ে আরও বিস্তর পর্যবেক্ষণ করতে চাচ্ছেন। আদালতের প্রতি পূর্ণ আস্থা ও শ্রদ্ধা রেখেই বলছিÑ সমাজ বাস্তবতার প্রেক্ষিত বিবেচনা করেই আদালত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। কারণ আদালতের একটি সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় দেশের কোটি কোটি জনতা, লক্ষ লক্ষ পরিবার এমনকি গোটা রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা তাকিয়ে আছে। আমাদের দেশে মেধাবীদের চাকরি থেকে বঞ্চিত থাকার নানান কারণ রয়েছে। এরমধ্যে একটা দেশের মোট জনসংখ্যার বিপরীতে মেধায় মাত্র ৪৪ শতাংশ চাকরি রেখে বাকি ৫৬ শতাংশ পিছিয়েপড়া জনগোষ্ঠী এবং মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও নাতি-নাতনিদের জন্য বরাদ্ধ করে রাখা কতটা যৌক্তিক হতে পারেÑ তা বিরাট প্রশ্ন। পাঁচ দশক পেরিয়ে বাংলাদেশের বয়স এখন ৫৩ বছরে। এতটা সময় পারি দিয়ে দেশটাকে যখন উন্নতির শিখরে নেওয়ার পালা; সেই মুহূর্তে পিছিয়েপড়া বলতে কোনো কথা থাকতে পারে না।

ডিজিটাল বাংলাদেশ পেরিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশে গঠনের কথা জোরেসোরেই বলছে সরকার। দেশের প্রতিটি কোণায় কোণায় সব ধরনের রাষ্ট্রীয় নাগরিক সেবা পৌঁছে গেছে নিঃসন্দেহে। হয়তো কোথাও কোথাও একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে কুসংস্কার এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে কিছুটা অবহেলার শিকার কেউ কেউ হতে পারেন। সেটা যে খুব একটা ধর্তব্যের তাও নয়। নারীরাও এখন সমানতালে এগিয়ে যাচ্ছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, মন্ত্রিসভার সদস্য থেকে শুরু করে চাকরিক্ষেত্রেও সমানতালে ক্ষেত্রমতে এগিয়েও রয়েছে। তথাপিও কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশেষত, একেবারে দুর্গম এলাকার মানুষ বা প্রতিবন্ধীদের জন্য শর্তসাপেক্ষে কোটা থাকতে পারে। সেখানেও রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করলে বা সুষম বণ্টন নিশ্চিত করলে একসময় তার আর প্রয়োজন পড়বে না। বাকি রইলো মুক্তিযোদ্ধা কোটা। এটা নিয়েই যত আলোচনা-সমালোচনা চলছে এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

মুক্তিযোদ্ধারা অবশ্যই জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। কিন্তু যে স্বপ্ন আর চেতনায় জীবন বাজি রেখে বীর যোদ্ধারা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সেটার সঙ্গে কোটার দাবি সংগত কি না সেটাও এখন প্রশ্নের মুখে পড়েছে। কেননা, তারা চেয়েছিলেন সাম্যের বাংলাদেশ। অথচ কোটা প্রথায় সামগ্রিকভাবে দেশের মোট সংখ্যার সর্বোচ্চ ১ শতাংশের বিপরীতে ৯৯ শতাংশের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ বিদ্যমান রেখে কোনোভাবেই মুক্তিসেনাদের চেতনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। একজন ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পদের ভাগিদারও প্রথমত তার সন্তানরা হয়ে থাকেন। পরবর্তী প্রজন্ম নন।

মুক্তিযোদ্ধারা যে লড়াই করেছেন, তাদের প্রতি সম্মান জানাতে রাষ্ট্র কোনোকিছুতেই কার্পণ্য করেনি। এরপর তাদের পারিবারিক সামাজিক সুরক্ষার নিমিত্তে সন্তানদের জন্য চাকরিতে কোটার পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা হয়। এরপরের প্রজন্মের জন্য এই প্রথা বহাল রাখতেই যত আপত্তি আর প্রশ্ন। কথা হলো, একজন সক্ষম চাকরিজীবী নিজের সন্তানকে যোগ্য করে গড়ে তুলতে পারলেন না, তাই তার দাদার নামের উপর ভরসা করে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সুবিধা চাইবেন সেটা নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। কোনো সচেতন সুনাগরিক, এমনকি রণাঙ্গনের কোনো বীরযোদ্ধাও এটা সমর্থন করেন বলে মনে হয় না।

দেশে নানা কারণে মেধাবীরা চাকরি থেকে বঞ্চিত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বিপরীতে প্রতিবছরই জাতীয় সংসদে সংশ্লিষ্ট দপ্তর, মন্ত্রীর তথ্যে উঠে আসে লক্ষ লক্ষ সরকারি পদ শূন্য পড়ে আছে। একদিকে পদ শূন্য, অন্যদিকে শিক্ষিত বেকারের বোঝা দিনদিন বাড়তেই থাকে। ফলে দেশের মেধাবী চাকরি প্রত্যাশীদের মাঝে হতাশা দীর্ঘদিনের। এ কারণে চাকরি প্রত্যাশী এবং শিক্ষার্থী কোটা প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সরকার যৌক্তিক পর্যায়ে কোটা প্রথা বাতিল করলেও (শর্তসাপেক্ষে যৌক্তিক কিছু কোটা রেখে) আদালতের হস্তক্ষেপে সেটা এখনো বহাল। সর্বশেষ উচ্চ আদালত চূড়ান্ত সমাধান না দিয়ে বিষয়টা আরও ঝুলিয়ে রাখলেন। আন্দোলন করে আদালতের রায় যেমন পাল্টানো যায় না, তেমনি আদালতেরও সমাজ বাস্তবতা উপলব্ধি করা উচিত। হয়তো আদালত বিষয়টি আরও কিছু সময় পর্যবেক্ষণ করবেন। কিন্তু সামাজিক বিশৃঙ্খলা, বিভেদ, জাতিগতভাবে দ্বন্দ্ব সমাধান করাও আদালতের দৃষ্টিতে আসতে পারে। আদালত মানুষের ভরসার শেষ আশ্রয়স্থল। সেই জায়গা থেকে দেশের তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে, ভবিষ্যৎ সামাজিক সম্পর্ক ও বিভক্তির কথা চিন্তা করে দ্রুতই সমাধান দেওয়া অধিক যুক্তিযুক্ত। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের আন্দোলন করে রায় পরিবর্তন করা যাবে না মর্মে হতাশ না করে আদালত সুবিবেচনা করবে জানিয়ে আশান্বিতও করতে পারে। কেননা, গোটা দেশের মানুষ এখন বিষয়টি নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছে। এ অবস্থা বেশিদিন জারি থাকলে মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনাদের সম্মানহানির আশঙ্কা তৈরি হবে, যেটা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

কেননা, ‘কোটা’ বর্তমানে বাংলাদেশে আলোচিত এবং তুমুল বিতর্কিত একটি শব্দ। সরাসরি নিয়োগের সরকারি চাকরিতে দুর্নীতিরও অন্যতম প্রধান কারণ। কোটার কারণে প্রথমত, সরকারি চাকরির ৫৬ শতাংশ পদ খালি পড়ে থাকে। সেটা হয় এভাবে যে- সংশ্লিষ্ট পদের বিপরীতে প্রায় ছাপ্পান্ন শতাংশ কোটা বরাদ্দ আছে কিন্তু বিপরীতে সেই পরিমাণ প্রার্থী নেই। কেননা, দেশের মোট জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশ আদিবাসী নৃগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও মুক্তিযোদ্ধা মিলিয়ে কখনোই ছিল না। এর ফলে দেশের মোট চাকরি প্রার্থীদের ৯৯ শতাংশের জন্য চাকরির পদ থাকে ৪৪ শতাংশ (মোট জনসংখ্যার বিপরীতে সর্বোচ্চ ১ শতাংশ কোটা প্রার্থী ধরে)। একজনের (একক অর্থে) জন্য ৫৬টি পদ জমা রেখে বাকি ৪৪টি পদ উন্মুক্ত করা হয় ৯৯ জনের জন্য। ফলে চাকরির বাজারে প্রচুর কামড়াকামড়ি হয়। আর এই সুযোগটাই নেন দুর্নীতিবাজ নেতা, আমলা, টাকাওয়ালা প্রভাবশালীরা।

দ্বিতীয়ত, কোটার কারণে একাডেমিক পরীক্ষা, সৃজন ও মননশীলতা এবং চাকরির পরীক্ষায় সর্বোচ্চ ভালো করেও একজন মেধাবী প্রার্থী বাদ পড়ে যেতে পারেন। অথচ বিপরীতে কোটাধারী এবং ক্ষেত্রমতে অন্য একজন অযোগ্য প্রার্থীও ঐ চাকরি পেয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ- ধরুন, কোনো একটি প্রজ্ঞাপনে চারজনকে চাকরি দেওয়া হবে। এর মধ্যে দুটি পদ কোটায় বরাদ্দ। এখন কোটায় একজন বা দুজন আবেদন করলো, তাদের চাকরি সুনিশ্চিত। বাকি দুই পদের বিপরীতে দশজনের আবেদন জমা পড়লো। পরীক্ষায় ১০০ নম্বরের মধ্যে ৬ জন ৫০ নম্বরের উপরে পেলো। এর মধ্যে ৪ জনই ৭০-৮০ নম্বর বা তারও বেশি পেলো। এখন কাকে রেখে বাদ দেওয়া হবে তা নিয়ে দ্বিধায় নিয়োগ পরীক্ষক বোর্ড। এই যখন অবস্থাÑ তখন হঠাৎই উপর থেকে ফোন আসে ওমুক-ওমুককে চাকরিটা দিতে হবে। সবশেষে পরীক্ষায় মার্কসিটের তলানিতে থাকা দুজন নিয়োগ পেলেন। ফলত এভাবে সরকারি দপ্তরগুলো গাধায় ঠাসাঠাসি হয়ে যায়। আর এ কারণেই খিচুড়ি রান্না এবং পুকুর খনন শিখতে সরকারি চাকরিজীবীদের ইউরোপ ভ্রমণে যেতে হয়। যেগুলোতে গ্রামের আলাভোলা বধূ এবং নিরক্ষর চাষার হাতও শতভাগ দক্ষ। যাদেরকে ঐ উচ্চবংশীয় চাকুরেরা অশিক্ষিত, আনস্মার্ট মনে করে। মূলত- এই অশিক্ষিত, আনস্মার্ট চাষা-বধূরা উচ্চবংশীয়দের যে গাধা মনে করে সেটা তারা জানেই না।

শাহনূর শাহীন: সিনিয়র সহসম্পাদক, দৈনিক ঢাকা টাইমস

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :