সঞ্চয়পত্র কেনার আগে সতর্ক হোন: কোন বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?

দেশে দীর্ঘদিন ধরেই সঞ্চয়পত্র সাধারণ মানুষের কাছে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত। নির্দিষ্ট মুনাফা, সরকারি গ্যারান্টি এবং ঝামেলামুক্ত প্রক্রিয়ার কারণে ছোট ও মাঝারি আয়সম্পন্ন মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকে থাকেন এই স্কিমের প্রতি। বাংলাদেশ জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই স্কিমে ব্যক্তি তার ছোট সঞ্চয়কে তুলনামূলকভাবে বেশি লাভজনকভাবে কাজে লাগাতে পারেন। তবে আর্থিক নিরাপত্তার পাশাপাশি এ বিনিয়োগেও রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকি—যা অনেক ক্ষেত্রে সঞ্চয়কারীদের বিপাকে ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত দরকারে নগদ অর্থ তুলতে হয়—এমন ব্যক্তিদের জন্য সঞ্চয়পত্র মোটেও উপযুক্ত নয়। কারণ, এটি মূলত দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় স্কিম। মেয়াদপূর্তির আগে ভাঙালে মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এছাড়া অল্প অল্প করে টাকা লাগবে—এরকম ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই বিনিয়োগ বাস্তবে লোকসানের কারণ হতে পারে।
তবে যেকোনো বিনিয়োগের মতো সঞ্চয়পত্র কেনার ক্ষেত্রেও কিছু শর্ত, সীমা এবং ঝুঁকি আছে—যা না জানলে পরে বিপাকে পড়তে হয়।
সঞ্চয়পত্র কেনার সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশি নাগরিক, প্রবাসী বাংলাদেশি এবং নির্দিষ্ট শর্তে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের। দেশের বাইরে থাকলেও নির্ধারিত নিয়মে প্রবাসীরা এই সুবিধা নিতে পারেন। পরিবারের নামে যে স্কিমটি রয়েছে, সেটি শুধুমাত্র নারীদের জন্য বরাদ্দ।
সঞ্চয়পত্র কেনার আগে প্রয়োজনীয় যেসব নথি প্রস্তুত রাখতে হবে— জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট সাইজ ছবি, ব্যাংক হিসাব নম্বর, টিআইএন সার্টিফিকেট (যদি থাকে), এবং অর্থের উৎসের প্রমাণপত্র যেমন আয়কর বিবরণী বা বেতন স্লিপ। বিনিয়োগের সময় এগুলো বাধ্যতামূলকভাবে জমা দিতে হয়।
সঞ্চয়পত্রের প্রতিটি স্কিমের জন্য বিনিয়োগসীমা আলাদা। নারীরা পরিবার সঞ্চয়পত্রে সর্বোচ্চ ৪৫ লাখ টাকা, পাঁচ বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্রে একক নামে ৩০ লাখ এবং যৌথ নামে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে পারেন। পেনশনার স্কিমে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
সঞ্চয়পত্র মূলত দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। জরুরি প্রয়োজনে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ভাঙাতে হলে মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। তাই বিনিয়োগের আগে কিছু নগদ অর্থ আলাদা করে রাখা এবং অগ্রিম পরিকল্পনা করা জরুরি।
২০২১ সাল থেকে সঞ্চয়পত্র কেনার আগে ডিজিটাল ন্যাশনাল সেভিংস সার্ভিস (DNSS)–এ নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক হয়েছে। নিবন্ধন ছাড়া কেউ সঞ্চয়পত্র কিনতে পারবেন না।
মুনাফা সরাসরি আপনার ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবেই জমা হয়—তাই বৈধ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকা জরুরি। দালাল বা ব্যক্তিপর্যায়ে সঞ্চয়পত্র কেনা-বেচা আইনত নিষিদ্ধ। সঞ্চয়পত্র কেনার বৈধ মাধ্যম হলো ডাকঘর, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং নির্ধারিত বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহ।
যাদের নিয়মিত অল্প সময়ে টাকা প্রয়োজন পড়ে বা বারবার নগদ টাকার দরকার হয়, তাদের জন্য সঞ্চয়পত্র উপযুক্ত নয়। সাধারণত এর মেয়াদ ৩ থেকে ৫ বছর। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ভাঙালে মুনাফা কমে যাওয়াই নিয়ম।
বর্তমানে সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার ১১ থেকে ১২.৫ শতাংশ। তবে সাড়ে সাত লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ করলে সুদের হার ধাপে ধাপে কমে যায়। মুনাফার ওপর উৎসে কর ১০ শতাংশ, আর টিআইএন না থাকলে করের হার হয় ১৫ শতাংশ। তবে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত কোনো উৎসে কর কাটে না।
সঞ্চয়পত্রে নির্দিষ্ট হারে মুনাফা মিললেও উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময় এই লাভ প্রকৃত অর্থে কমে যেতে পারে। ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় লাভের প্রকৃত মূল্য কমে যেতে পারে। তাই বিনিয়োগের আগে বাজারের মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
সঞ্চয়পত্র নিঃসন্দেহে একটি নিরাপদ ও নিশ্চিত মুনাফাধারী বিনিয়োগ। তবে নিজের প্রয়োজন, আয়কর–সংক্রান্ত নথি, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং বর্তমান মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। নিয়ম মেনে ও সঠিকভাবে বিনিয়োগ করতে পারলে এটি হয়ে উঠতে পারে আপনার সঞ্চয়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয়।
সঞ্চয়পত্র কীভাবে কিনবেন?
প্রথমে DNSS–এ অনলাইনে নিবন্ধন করতে হবে। এরপর ব্যাংক বা ডাকঘর থেকে ফর্ম পূরণ করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিলেই সঞ্চয়পত্র কেনা যায়।
স্কিমভেদে সীমা ভিন্ন। নারীরা পরিবার সঞ্চয়পত্রে ৪৫ লাখ, পেনশনার স্কিমে ৫০ লাখ, আর তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে একক নামে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে পারেন।
মুনাফার হার ১১% থেকে ১২.৫% পর্যন্ত। নির্দিষ্ট সীমার বেশি বিনিয়োগে ধাপে ধাপে সুদের হার কমে।
মুনাফার ওপর ১০% উৎসে কর কাটা হয়। টিআইএন না থাকলে ১৫%। তবে ৫ লাখ টাকার নিচে কোনো কর কাটা হয় না।উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে সঞ্চয়পত্রের স্থির মুনাফা বাস্তব আয় কমিয়ে দিতে পারে। তাই বিনিয়োগের আগে মূল্যস্ফীতির হার যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ভালো।
(ঢাকাটাইমস/১৯ নভেম্বর/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































