বিশ্ব মোড়ল আমেরিকার ট্রাম্পকান্ডের হুমকিতে আতঙ্ক সারা বিশ্ব!

ডোনাল্ড ট্রাম্প, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও বিশ্ব রাজনীতির এক আলোচিত নাম, দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই একের পর এক ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও হুমকিতে বিশ্বমঞ্চে উত্তেজনা ছড়াচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি দ্বিতীয় দফায় দায়িত্ব নেওয়ার একের পর এক কাণ্ড করে চলেছেন। কখনো যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতা করছেন, কখনো নিজেই যুদ্ধের ঘোষণা দিচ্ছেন, কখনো শুল্ক-যুদ্ধ শুরু করছেন, আবার কখনো দেশে সেনা মোতায়েন করছেন। আবার কখনও মাদক নির্মূলের নাম করে সরাসরি বিভিন্ন দেশে হামলা চালিয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছেন।
২০২৬ সালের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্রের একের পর এক যুদ্ধহুমকিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। সাবেক ও বর্তমান ক্ষমতাকেন্দ্রের নীতিনির্ধারকদের বক্তব্য, সামরিক প্রস্তুতি এবং কূটনৈতিক ভাষা মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা আর কেবল আশঙ্কা নয়, বরং বাস্তব সম্ভাবনায় রূপ নিচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই বিশ্ব রাজনীতিতে ঝড় উঠেছে। ইরানকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার মধ্যেই তিনি একে একে ভেনিজুয়েলা, গ্রিনল্যান্ড, কানাডা, পানামা, মেক্সিকো, চীন, রাশিয়া এমনকি ভারতকেও সরাসরি বা পরোক্ষভাবে হুমকির আওতায় এনেছেন। হোয়াইট হাউস সূত্র জানায়, পেন্টাগনকে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল কূটনৈতিক চাপ নয়, বরং বৈশ্বিক সংঘাতের স্পষ্ট ইঙ্গিত।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল ২০২৫ নথিতে অভিবাসন, মাদক ও চীনা প্রভাবকে প্রধান হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ভেনিজুয়েলা ও কলম্বিয়াকে সরাসরি নিরাপত্তা ঝুঁকি উল্লেখ করে সেখানে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে। মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের বক্তব্য অনুযায়ী, ট্রাম্প এই দেশগুলোকে নিয়ে সামরিক শক্তি প্রয়োগে পিছপা হবেন না। এর ফলে লাতিন আমেরিকাজুড়ে নতুন যুদ্ধের শঙ্কা তৈরি হয়েছে, যেখানে মাদকচক্র দমনের নামে পূর্ণমাত্রার সামরিক আগ্রাসনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
উত্তর আমেরিকাতেও উত্তেজনা কম নয়। কানাডা ও গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে ট্রাম্পের মন্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে। গ্রিনল্যান্ড দখলের কথা প্রকাশ্যে বলার পাশাপাশি কানাডার সঙ্গে সীমান্ত বিরোধে সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দেওয়া হয়েছে। এর জবাবে কানাডা নাগরিক প্রতিরক্ষা জোরদার করছে। ইউরোপীয় বিশ্লেষকরা বলছেন, ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোর বিরুদ্ধেই এমন বক্তব্য জোটের ভেতর ভাঙন সৃষ্টি করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। গাজা, ইরান ও আশপাশের অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান জোরদার করা হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন প্রকাশ্যেই ‘দখল’ ও ‘নির্মূল’ শব্দ ব্যবহার করছে, যা ইরানসহ মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি করেছে। তেহরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, যেকোনো আগ্রাসনের জবাব পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ দিয়েই দেওয়া হবে।
চীন ও রাশিয়ার সঙ্গেও উত্তেজনা চরমে। পেন্টাগনকে যুদ্ধপ্রস্তুতির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আর চীনের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের ভাষায়, রাশিয়া ও চীন মিলে নতুন ‘অ্যাক্সিস অব পাওয়ার’ গড়ে তুলছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। ভারতকেও চাপ দেওয়া হচ্ছে যেন তারা ইরান থেকে দূরে সরে গিয়ে আমেরিকান স্বার্থে অবস্থান নেয়।
১ ফেব্রুয়ারি অভিবাসন ও মাদক চোরাচালান বন্ধের কথা বলে কানাডা ও মেক্সিকো থেকে আমদানি পণ্যে ২৫ শতাংশ শুল্ক ঘোষণা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ১৩ ফেব্রুয়ারি ‘ফেয়ার অ্যান্ড রেসিপ্রোকল’ বাণিজ্য পরিকল্পনা ঘোষণা দেন তিনি, এতেই মূলত চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয়। এর ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতি টালমাটাল হয়ে ওঠে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ওভাল অফিসে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ে জড়ান ট্রাম্প, যা তখন বিশ্বব্যাপী আলোচনার জন্ম দেয়।
২০২৫ সালে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার নির্দেশ দেন ট্রাম্প। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার নির্দেশদাতাও তিনি। এ ছাড়া তার অনুমোদনে ভেনেজুয়েলা, নাইজেরিয়াসহ কয়েক দেশে হামলা চালায় মার্কিন সেনারা।
৪ জুন তিনি একটি ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেন, যাতে অন্তত ১২টি দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র প্রবেশ সীমিত করার ঘোষণা থাকে, তাদের ‘নিরাপত্তা হুমকি’ উল্লেখ করা হয়।
১১ আগস্ট তিনি ওয়াশিংটন ডিসিতে ‘ক্রাইম ইমার্জেন্সি’ ঘোষণা করে পুলিশকে ফেডারেল পর্যায়ে নিয়ে আসেন এবং ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করেন। দাবি করেন যে তিনি ‘উচ্চ অপরাধ’ পরিস্থিতি মোকাবিলা করছেন। এ উদ্যোগ ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করে।
ট্রাম্প নিজ উদ্যোগে বেশ কয়েকটি সংঘাত সমাধানে মধ্যস্থতা করেছেন। তবে তিনি এসব বিষয় বারবার প্রকাশের মাধ্যমে নিজেকে ‘শান্তিদূত’ হিসেবে জাহির করেন। এ জন্য তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের দাবিদার হিসেবে তদবিরও করেন বলে খবর প্রকাশিত হয়।
সর্বশেষ ভেনেজুয়েলায় হামলার অনুমোদন দেওয়া হয়। সেপ্টেম্বরে মাদক পাচারের অভিযোগ তুলে ভেনেজুয়েলায় হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এর পর অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বরে টানা হামলা চালায় তারা। সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার কারাকাসে সেই পূর্ণ হামলা চালায় ট্রাম্পের আমেরিকা এবং দেশটিকে নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের মতোই এবারও কূটনৈতিক পথের বদলে শক্তির ভাষা বেছে নেওয়া হয়েছে। তবে এবারের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ, কারণ একসঙ্গে বহু ফ্রন্টে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে, বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত, আর সাধারণ মানুষ শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে।
(ঢাকাটাইমস/০৪ জানুয়ারি/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন











































