নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণ ঝুঁকিপূর্ণ, সতর্ক থাকবেন যেভাবে

অনলাইন ডেস্ক, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:৪৪
অ- অ+

নিপাহ ভাইরাস অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং এটি একটি প্রাণঘাতী রোগ। এ ভাইরাস সরাসরি মস্তিষ্ক (এনসেফালাইটিস) বা শ্বাসতন্ত্রকে আক্রমণ করে, যা দ্রুত মৃত্যুর কারণ হতে পারে। এর কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। এখন পর্যন্ত এর কোনো কার্যকর টিকা ও সুনির্দিষ্ট ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি। শুধু উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়। দেশে নিপাহ ভাইরাস শুধু শীতকালীন বা খেজুরের রসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন সারা বছর এবং বিভিন্ন ফলের মাধ্যমেও ছড়াতে পারে। আক্রান্ত বাদুড়ের খাওয়া ফল বা রস পান করলে ও রুগ্ন শূকরের সংলগ্নতা থেকে মানুষের দেহে এই রোগের সংক্রমণ ঘটে। সংক্রমিত পশু ও মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে এই রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে।

বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাস নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। আক্রান্তদের মৃত্যুহার তুলনামূলক অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে। গত দুই বছরে আক্রান্ত শতভাগ রোগীর মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি নতুন উদ্বেগের কারণ হয়েছে অ-মৌসুমে সংক্রমণ। গত বছর আগস্ট মাসেও নিপাহ শনাক্ত এবং একজন মারা যায়। এ ঘটনা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের গভীর চিন্তায় ফেলেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ ক্ষমতা ও মৃত্যুহার কোভিডের তুলনায় অনেক বেশি। এই পরিস্থিতিতে খেজুরের রসের অনিয়ন্ত্রিত বিক্রি বন্ধ করা না গেলে বড় ধরনের মহামারি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করছেন তারা।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) তথ্যমতে, ২০০১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দেশে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৪৭ জন। তাদের মধ্যে ২৪৯ জন মারা গেছেন। শুধু ২০২৪ সালে নিপাহ ভাইরাসে পাঁচজনের মৃত্যু হয়। আর ২০২৫ সালে এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান আরও চারজন। অর্থাৎ সর্বশেষ দুই বছরে আক্রান্ত হওয়া ৯ জনের প্রত্যেকেরই মৃত্যু হয়েছে।

বিশ্বজুড়ে নিপাহ ভাইরাসে মৃত্যুহার গড়ে ৭২ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে সাম্প্রতিক চিত্র ভয়াবহ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

দেশের অর্ধেকের বেশি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে প্রাণঘাতী নিপাহ ভাইরাস। প্রতি বছর নতুন নতুন জেলায় ভাইরাসটির উপস্থিতি শনাক্ত হচ্ছে। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) জানায়, গত ২৫ বছরে দেশের অন্তত ৩৫টি জেলায় নিপাহ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। এর মধ্যে ফরিদপুর, রাজবাড়ী, নওগাঁ ও লালমনিরহাট জেলায় রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে।

এই রোগটি ১৯৯৯ সালে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে প্রথম দেখা যায়। সুঙ্গাই নিপাহ নামক মালয়েশিয়ার একটি গ্রামের নামে এই রোগের নামকরণ করা হয়। সেই সময় এই রোগ যাতে ছড়িয়ে না পড়ে সে জন্য লাখ লাখ শূকরকে মেরে ফেলা হয়।

সংক্রমণের সাধারণত ৪ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে লক্ষণ দেখা দেয়। তীব্র জ্বর এবং মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা, বমি ভাব এবং গলাব্যথা, শ্বাসকষ্ট ও কাশি হতে পারে।

মারাত্মক পর্যায়ে মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনসেফালাইটিস), যার ফলে মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হওয়া বা খিঁচুনি হতে পারে।

যারা এ রোগ থেকে সুস্থ হন, তাদের অনেকের মধ্যে পরবর্তী সময়ে খিঁচুনি বা মানসিক পরিবর্তনের মতো স্নায়বিক সমস্যা থেকে যেতে পারে।

কোনোভাবেই কাঁচা খেজুরের রস পান করবেন না। প্রয়োজনে রস ফুটিয়ে খেতে পারেন। যে কোনো ফল খাওয়ার আগে ভালো করে ধুয়ে নিন এবং খোসা ছাড়িয়ে খান। বাদুড় বা পাখির আধখাওয়া ফল খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। সাবান দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস করুন।

দেশে প্রধানত কাঁচা খেজুরের রস পানের মাধ্যমে এ ভাইরাস ছড়ায়। তাই বাদুড়ের লালা বা মলমূত্র মিশে থাকা কাঁচা খেজুরের রস পান করা থেকে বিরত থাকতে হবে। বাদুড়ের আধখাওয়া ফল খাওয়া যাবে না। সংক্রমিত ব্যক্তির সেবা করার সময় বা তার সংস্পর্শে এলে এটি অন্যদের মধ্যেও ছড়াতে পারে। তাই সংক্রমিত ব্যক্তির সেবা করার সময় মাস্ক এবং গ্লাভস ব্যবহার করুন।

বাংলাদেশ মুসলিমপ্রধান দেশ হওয়ায় অধিকাংশ মানুষ ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী বাদুড় ও শূকরের সংলগ্নতা এড়িয়ে চলে। তবে এই ভাইরাসটির সূত্রপাত কোথা থেকে হলো এই কৌতূহলের গন্তব্য ঠেকল এদেশের মানুষের অত্যন্ত প্রিয় শীতকালের ঐতিহ্যবাহী খেজুর রসের নিকট। আমাদের দেশে খেজুর রস সংগ্রহের যে পদ্ধতি বিদ্যমান তার সঙ্গে বাদুড়ের সংলগ্নতা সুস্পষ্ট। তাই একথা স্পষ্ট যে, খেজুর রস নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের অন্যতম কারণ।

নিপাহ ভাইরাস যেহেতু এটি সংক্রামক রোগ সেহেতু এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে এই রোগ। দেশের মানুষ আবারও এক দুর্বিষহ অবস্থার সম্মুখীন হতে পারে এবং হতে পারে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের শিকার। তাই এর ভয়ংকর পরিণতি থেকে বাঁচতে হলে এখনই যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

সর্বপ্রথম জনসাধারণের মধ্যে নিপাহ ভাইরাস ও এর ভয়াবহতা নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। পাশাপাশি খেজুর রসের সঙ্গে নিপাহ ভাইরাসের সম্পর্ক সম্বন্ধে সাধারণ মানুষকে অবগত করতে হবে এবং এর প্রতিরোধ হিসেবে খেজুর রস খাওয়া থেকে বিরত থাকার ও আক্রান্ত রোগীদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখার পরামর্শ দিতে হবে। যদি কারও মধ্যে নিপাহ ভাইরাসের লক্ষণ দেখা দেয়, তবে বিলম্ব না করে নিকটস্থ হাসপাতালে যোগাযোগ করুন।

(ঢাকাটাইমস/১১ জানুয়ারি/আরজেড)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নামে ভুয়া হোয়াটসঅ্যাপ, যা করতেন আতিয়ার দর্জি
অভিমান করে ৬৪ হাজার টাকা ও খেলনা নিয়ে বাড়ি ছাড়ে শিশু, অতঃপর...
মিস ওয়ার্ল্ডে অংশ নেওয়া কে এই আনিকা মেরাজ
বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে কানাডার দাবানলের ধোঁয়া যুক্তরাষ্ট্রে, হুমকির মুখে জনস্বাস্থ্য
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা