প্রভাবশালীর বাসায় শিশু নির্যাতন, মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে মোহনা

ভাত-কাপড়, পড়াশোনা আর ভবিষ্যতে ধুমধাম করে বিয়ের আশ্বাসে ১১ বছরের শিশু মোহনাকে তুলে দেওয়া হয়েছিল এক ‘প্রভাবশালী’ পরিবারের হাতে। কিন্তু সেই রঙিন প্রতিশ্রুতি অল্প সময়েই রূপ নেয় ভয়ংকর দুঃস্বপ্নে। টানা সাত মাসের নির্মম নির্যাতনের পর গুরুতর আহত অবস্থায় এখন হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে শিশুটি।
অভিযোগ উঠেছে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. মো. সাফিকুর রহমানের বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করার সময় এই নির্যাতনের শিকার হয় মোহনা। ঘটনায় তার স্ত্রী বিথী রহমানসহ আরও দুই গৃহকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এমন একটি ঘটনায় দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা জনমনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
মামলার নথি ও ভুক্তভোগী পরিবারের বরাতে জানা যায়, ২০২৫ সালের জুন মাসে উত্তরা পশ্চিম থানার এক নিরাপত্তারক্ষীর মাধ্যমে শিশুটিকে ওই বাসায় কাজের জন্য নেওয়া হয়। মোহনার বাবা গোলাম মোস্তফা পেশায় একজন হোটেল কর্মচারী। স্ত্রীহারা এই দরিদ্র পিতা ভেবেছিলেন, অভিজাত পরিবারের আশ্রয়ে অন্তত তার মেয়েটির ভবিষ্যৎ নিরাপদ হবে।
কিন্তু কাজ শুরুর কিছুদিনের মধ্যেই শুরু হয় নির্যাতন। মেয়েকে দেখতে চাইলে নানা অজুহাতে ফিরিয়ে দেওয়া হতো বাবাকে। গত দুই মাসে একবারও সন্তানের সঙ্গে দেখা করতে পারেননি তিনি।
শেষ পর্যন্ত গত ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ফোন আসে— ‘আপনার মেয়ে অসুস্থ, দ্রুত এসে নিয়ে যান।’
সেদিন সন্ধ্যায় উত্তরার ৯ নম্বর সেক্টরের ৭-এর সি’র রোডে ২৬ নম্বর বাড়ির বাইরে বাবার হাতে তুলে দেওয়া হয় ক্ষতবিক্ষত শিশুটিকে। মেয়ের অবস্থা দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে যান গোলাম মোস্তফা। শরীরজুড়ে দগদগে ক্ষত, হাত-পা ফুলে যাওয়া, যন্ত্রণায় কথা বলার শক্তিও নেই।
দ্রুত তাকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের ৩ নম্বর বেডে ভর্তি করা হয়।
হাসপাতালের বেডে শুয়ে শিশুটি জানায় ভয়ংকর নির্যাতনের কথা। গত বছরের ২ নভেম্বর থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে তাকে মারধর করা হতো। তুচ্ছ অজুহাতে খুন্তি আগুনে গরম করে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়েছে। প্রধান দুই আসামিসহ আরও অজ্ঞাত ব্যক্তিরা নিয়মিত এই নির্যাতনে জড়িত ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
চিকিৎসকরা জানান, শিশুটির শরীরের এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে আঘাতের চিহ্ন নেই। কিছু ক্ষত শুকালেও অনেক জায়গায় এখনও দগদগে জখম রয়ে গেছে।
এ ঘটনায় মোহনার বাবা বাদী হয়ে উত্তরা পশ্চিম থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে ড. মো. সাফিকুর রহমান, তার স্ত্রী বিথী রহমান এবং গৃহকর্মী রুপালী খাতুন ও সুফিয়া বেগমকে গ্রেপ্তার করে।
পরদিন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তাদের হাজির করা হয়। শুনানি শেষে আদালত জামিন নামঞ্জুর করে চারজনকেই জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী তাহমিনা আক্তার বলেন, ‘একজন ১১ বছরের শিশুর ওপর এ ধরনের বর্বরতা কোনোভাবেই ক্ষমাযোগ্য নয়।’
হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা মোহনার চোখে-মুখে এখনও ভয়। কথা বলতে গেলে বারবার থেমে যাচ্ছে। আবাসিক চিকিৎসক এস কে ফরহাদ জানান, শিশুটির অবস্থা আগের চেয়ে কিছুটা উন্নতির দিকে, তবে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা প্রয়োজন।
এই ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে— রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তার বাসায় একটি শিশু কীভাবে দিনের পর দিন এমন পাশবিক নির্যাতনের শিকার হলো? আর আদৌ কি বিচার নিশ্চিত হবে, নাকি ক্ষমতার ছায়ায় এ ঘটনাও চাপা পড়ে যাবে?
(ঢাকাটাইমস/৩ ফেব্রুয়ারি/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































