নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রার অভূতপূর্ব উৎসবের ভোট

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচিত হতে যাচ্ছে আজ ১২ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার। বহুল প্রতীক্ষিত একটি পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক আবহে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে এই নির্বাচনকে ঘিরে সারা দেশে তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন উৎসাহ-উদ্দীপনা। এর মধ্য দিয়ে নতুন গণতন্ত্রে ফেরার আকাঙ্ক্ষা দেশবাসী ও রাজনৈতিক দলগুলোর।
দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একই দিনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে জুলাই সনদের অঙ্গীকার- রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও সাংবিধানিক পরিবর্তন নিয়ে জনমত যাচাইয়ের গণভোট। এবারই দেশে প্রথম চালু হলো পোস্টাল ব্যালটে ভোট। তাই ভোটের উৎসবে বাদ নেই প্রবাসী, কারাবন্দি এবং নির্বাচনী কাজে এলাকার বাইরে থাকা ভোটাররা।
সকাল সাড়ে সাতটা থেকে সারা দেশে একযোগে ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে বিরতিহীনভাবে চলবে বিকাল সাড়ে চারটা পর্যন্ত। গণভোটের কারণে সকালে আধা ঘণ্টা ও বিকালে আধা ঘণ্টা ভোট গ্রহণের সময় বাড়িয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
দীর্ঘ ১৮ বছর পর একটি অংশগ্রহণমূলক ভোটগ্রহণ প্রত্যক্ষ করতে যাচ্ছে জাতি, যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। বিশ্বজুড়ে আলোচিত জেনজি ও ২০-৩৫ বছর বয়সী তরুণরা এবারই প্রথমবার ভোট দিতে যাচ্ছেন। নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অভূতপূর্ব। তাদের কাছে এই নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং নিজেদের ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণের সুযোগ। রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবার তরুণদের ভোট দল ও প্রার্থীর জয়-পরাজয়ে বড় ভূমিকা রাখবে।
গত তিনটি নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮, ২০২৪) কার্যত স্বৈরাচারী কায়দায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে বিরোধী দল ও ভোটারদের আস্থা ছিল শুন্যের কোটায়। শেখ হাসিনার সরকার উন্নয়নের নামে গণতন্ত্রকে বলি দিয়েছিল। তার অধীনে ২০১৪ সালের নির্বাচনটি পরিচিত ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা’র ভোট হিসেবে, ২০১৮ সালের নির্বাচন হলো ‘রাতের ভোট’ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনকে বলা হয় ‘আমি-ডামি’র ভোট।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১৮ মাস ধরে সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে অবশেষে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন করেছে। তবে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না।
ভোট গ্রহণ সামনে রেখে সারা দেশে এক অভুতপূর্ব উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। শহর-নগর ছেড়ে মানুষ ট্রেন-বাস-লঞ্চ বোঝাই হয়ে নিজ এলাকায় ফিরে গেছেন পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার জন্য। এ এক বিরল দৃশ্য।
দেশে মোট ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে (একটি আসনের একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে আসনটিতে ভোটগ্রহণ স্থগিত রয়েছে) ভোট নেওয়া হবে আজ। ইসির সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী এবার প্রায় ১২ কোটি ৭৫ লাখ ভোটার। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার এবং নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার।সারা দেশে প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্রে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন তারা। এর মধ্যে প্রায় ২৪ হাজার কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার ভোটকক্ষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ১০ লাখের মতো সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
২০ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), ধর্মভিত্তিক জামায়াতে ইসলামী, জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের গঠিত নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন, জাতীয় পার্টিসহ অর্ধশত নিবন্ধিত দল নির্বাচনে অংশ নিয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৯টি আসনে মোট প্রায় দুই হাজার প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে ৫১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের প্রার্থী আছেন ১ হাজার ৭৩২ জন। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী আছেন ২৪৯ জন।
ইসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসনে প্রার্থী আছেন বিএনপির, ২৮৮টি আসনে। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আছেন ২২৪টি আসনে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী আছেন ২৫৩ আসনে। জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রার্থী আছেন ১৯২ আসনে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী আছেন ৩২টি আসনে।
অন্য দলগুলোর মধ্যে সিপিবির ৬৫ জন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) ৩৯, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ৩৪, খেলাফত মজলিসের ২১, গণ অধিকার পরিষদের ৯০, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির ৩০, গণফোরামের ১৯, গণসংহতি আন্দোলনের ১৭ ও নাগরিক ঐক্যের ১১ জন প্রার্থী আছেন।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি তাদের জোট শরীক নাগরিক অধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন, জমিয়তে ইসলামকে আটটি আসন ছেড়ে দেয়।
ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বাধীন জামায়াতে ইসলামী তাদের ১১ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর ৫০ আস ছেড়ে দেয়। জামায়াত-ই-ইসলামী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে ২৫০ আসনে।
জিএম কাদেরের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির ২১০ জন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ১৫০ জন, স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রায় ৪৫০ জন। এছাড়া অর্ধশতাধিক আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন, যারা ধানের শীষের প্রার্থীর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
ব্যতিক্রমী
বিচ্ছিন্ন দু-একটি ঘটনা ছাড়া প্রায় অহিংস প্রচারণা দেখা গেছে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচিতে। দলগুলোর পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়িও তেমন ছিল না। তবে অনলাইনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব, ভুয়া সংবাদ, অপতথ্য ছড়াতে দেখা গেছে।
একনজরে ১০৯১ থেকে ২০২৪ নির্বাচন
- ১৯৯১: গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর বিচারপতি সাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে অস্থায়ী সরকারের অধীন নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে।
- ১৯৯৬: বিচারপতি হাবিুবর রাহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধনে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ক্ষমতায় আসে, বিএনপি শক্তিশালী বিরোধী দল হয়।
- ২০০১: বিচারপতি লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে আবার বিএনপি বড় জয় পায়।
- ২০০৮: সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায় সরকারের অধনে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ভুমিধস জয় পেয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকে।
- ২০১৪:শেখ হাসিনার অধনে নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। আওয়ামী লীগের ১৫২ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়, যা সরকার গঠ্ন করার জন্য যথেষ্ট।
- ২০১৮: বিএনপি অংশ নিলেও আওয়ামী লীগ একক আধিপত্য বজায় রাখে এবং রাতেই ভোট করে ফেলে।
- ২০২৪: ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের আগে অনুষ্ঠিত নির্বাচন কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন ছিল।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা
- দায়িত্বে থাকবেন প্রায় ৯ লাখ ৫৮ হাজার জন নিরাপত্তা সদস্য, যা বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অংশগ্রহণ।
- প্রায় ৯০ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
- পুলিশ সদস্যরা বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করবেন।
- প্রথমবারের মতো ড্রোন ব্যবহার করে ভোট পর্যবেক্ষণ করা হবে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এই নির্বাচনকে বলা হচ্ছে ‘গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী ভোট’। তরুণ ভোটারদের অংশগ্রহণ নির্বাচনের ফলাফলকে নাটকীয়ভাবে বদলে দিতে পারে। বিএনপি ও জামায়াতের শক্তিশালী উপস্থিতি নতুন রাজনৈতিক ভারসাম্য তৈরি করছে। সেনাবাহিনী ও বিজিবির সক্রিয় ভূমিকা ভোটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার গতকাল জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে একটি নিরাপদ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট উপহার দেবেন বলেছেন। তিনি সব ভোটারকে নির্ভয়ে কেন্দ্রে নিজের পছন্দের প্রার্থকে ভোট দিতে আহ্বান জানিয়েছেন।
(ঢাকাটাইমস/১২ফেব্রুয়ারি/মোআ)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












