গল্প
বৈশাখের সোনালি সুতো

বৈশাখের প্রথম সূর্য যেন এক টুকরো গলানো সোনা—শুধু আলো নয়, উষ্ণতা, মিষ্টি আর ঘন হয়ে চৈত্রের বিবর্ণ প্রান্ত বেয়ে ধীরে ধীরে নামছিল মধুর মতো। পুরোনো ঢাকার শাখারী বাজারের অলিগলিতে সকালবেলা একটা অদ্ভুত চাঞ্চল্য লেগে থাকে বৈশাখী হাওয়ায়। রিনা বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাঁপিয়ে উঠল। তার গায়ে নতুন কুর্তা—সাদা, পাতলা লাল পাড় দেওয়া, সরল, সুন্দর। কিন্তু কী চুলকায়!
"আম্মু !" সে গলায় নখ বসাতে বসাতে ডাকল। "আমাকে কি এটা পরতেই হবে?"
রান্নাঘর থেকে মা ফাতেমা বেগমের গলা ভেসে এল। তিনি ব্যস্ত। একটা বড় বাটিতে পান্তা ইলিশ সাজানো হচ্ছে—ভেজানো চাল, তার ওপর সোনালি ইলিশ। "নতুন বছর বদ্ধ মনে ঢোকে না, রিনা," মা মিষ্টি গলায় বললেন। "পুরোনো বছরের ধুলো ঝেড়ে ফেলার জন্যই নতুন পোশাক।"
রিনা জিব কামড়াল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী সে। তার কাছে "পুরোনো বছরের ধুলো" মানে শুধু ময়লা নয়—বরং বৈষম্যের কালো ছাই, যা সে চোখের সামনে দেখে রোজ। রিকশাওয়ালার মেয়ে, যে বই কেনার টাকাও জোগাড় করতে পারে না; সেই প্রতিবেশী, যে কাজিনের বিয়েতে কটূক্তি করে; সেই অদৃশ্য দেওয়াল, যা ধনীদের আর স্বপ্নবাজদের থেকে আলাদা করে রাখে। সংস্কৃতি! রিনার কাছে তা যেন এক সোনার জিঞ্জিরে বাঁধা সুন্দর খাঁচা। কিন্তু কথা গিলে সে কুর্তা টেনে পরল। চুল বাঁধল। মায়ের পেছন পেছন বেরিয়ে পড়ল।
দ্বিতীয়
রমনার পার্কের বর্ষবরণ মেলা তার হতাশাকে পেছনে ফেলে দিল। চারদিকে শুধু উৎসবের আমেজ। ঢোলের আওয়াজ যেন বুকের ভেতর বাজে—গভীর, প্রাচীন, ছন্দময়। বাতাস মেতে উঠল মুড়ি, ঝালমুড়ি আর টকটকে বেগুনির গন্ধে। কোথাও বাজছে " বৈশাখ, বৈশাখ / মাটির কাছ থেকে মাটির ডাক..." গানটির সুর যেন সবাইকে একসঙ্গে দোলা দিচ্ছে।
রিনার বাবা শিশুপুস্তকের ছোট প্রকাশক—নতুন হালখাতার পাহাড়ের পেছনে দাঁড়িয়ে তিনি যেন রাজা। লাল, সবুজ, নীল খাতার মলাট সকালের রোদে চিকচিক করছে। পাশের স্টলে নকশি খাতা, হাতে আঁকা হাতে তৈরি ডায়েরি, আর ঘরে তৈরি হস্তশিল্প—বেতের ঝুড়ি, শোলার কাজ, রঙিন সুতোর তৈরি দুল। আরেক স্টলে স্যান্ড পুতুল—মাটির তৈরি ছোট ছোট পুতুল, যাদের চোখে যেন প্রাণ আছে। রংবেরঙের ফুলের মালা, শিমুল ফুলের গুচ্ছ, আর শুকনো চামেলির গন্ধ মেলার বাতাসে মেশানো।
হঠাৎ এক স্টলে রিনার চোখ আটকে গেল। সেখানে বালির পুতুল সাজানো—একটি পুতুল যেন মাটির মতো হাতে তৈরি, গায়ে নীল-সাদা রং। পাশেই রঙিন কাঠের ঘুড়ি, শোলার ডল, আর গারোদের তৈরি হাতে বোনা ঝুড়ি। একজন বৃদ্ধ কারিগর বসে আছেন—ছোট ছেলে মেয়েদের হাতে ঘরোয়া কারুকাজ শেখাচ্ছেন। কী অপূর্ব! রিনা মনে মনে ভাবল—এই তো আসল বৈশাখ। স্টলের পর স্টল জুড়ে নকশি , হাতে আঁকা পাখা, বাঁশের তৈরি বাদ্যযন্ত্র, আর মাটির সরার ওপর ডালিমের খোসা দিয়ে আঁকা নকশি।এক সময় কাঠের পুতুল, ছোট টেবিল, চেয়ার, আর ঘর সাজানোর জিনিস হাটে হাটে বিক্রি হতো।
মেলার শিশুস্বর্গ-হাওয়াই মিঠাই! নামটাই যেন মুখে নিলে বাতাসের মতো হালকা লাগে। শৈশবে রমনার মেলায় বাবার হাত ধরে গিয়ে প্রথম দেখেছিলাম—এক লাফে বেড়ে ওঠা তুলতুলে সুতোর বল, ময়দার তৈরি সোনালি জাল, চিনির প্রলেপ যেন শিশিরের মতো ঝলমল করে। বিক্রেতা লোহার কড়াইতে বাঁশের কঞ্চি ডুবিয়ে ঘুরিয়ে তুলতেই তৈরি হয়ে যেত অদ্ভুত সেই মিষ্টি। ছোট্ট হাতের মুঠোয় ধরে যখন মুখে দিতাম, মুখে না রেখেই যেন গলে যেত—ঠিক শৈশবের মতোই, ঠিক মেলার উৎসবের মতোই। কুমিল্লার হাটে সিলভিয়ার সঙ্গে মেলায় গিয়ে এক টুকরো হাওয়াই মিঠাই ভাগ করে খাওয়ার স্মৃতি আজও মনে পড়ে। সে খেত গোলাপি রঙের, আমি সাদা। আমরা ধর্ম দেখিনি, রং দেখেছি। ওটা ছিল আমাদের বৈশাখের প্রথম স্বাদ—হালকা, মিষ্টি, উদ্বেল।
ঠিক তখনই এক ছোট্ট মেয়ে এল। বয়স বারো। ফ্রকটা বিবর্ণ—এতবার কাচা হয়েছে যে আসল রং ভূত হয়ে গেছে। হাতে কয়েকটা কুঁচকে যাওয়া নোট। "একটা খাতার দাম কত?" ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল মেয়েটি।
"চল্লিশ টাকা," বাবা বললেন।
মেয়েটি তার টাকার দিকে তাকাল। তার কাছে আছে ত্রিশ। রিনা দেখল, মেয়েটির মুখটা যেন ম্লান হয়ে যাচ্ছে। মেয়েটি ফিরে যেতে উদ্যত।
"থামো," রিনা বলল। টেবিল থেকে সবচেয়ে মোটা খাতাটা তুলে নিল। ওপরটা সাজানো শোলার নকশি ফুল দিয়ে। "এটা ফ্রি।"
মেয়েটির চোখ বড় হয়ে গেল। "ফ্রি?"
"হ্যাঁ। কী লিখবে?"
মেয়েটি খাতাটা বুকের কাছে চেপে ধরল, যেন কোনো ধন। "গল্প," বলল, "আমার নিজের গল্প লিখতে চাই।" ছুটে পালাল সে। বিবর্ণ ফ্রকটা পেছনে উড়ছে ছোট্ট খুশির পতাকার মতো। রিনা তাকিয়ে রইল। বুকের ভেতর একটা উষ্ণতা জাগল—অনেকদিন পর।
তৃতীয়
সকাল আরেকটু বাড়তেই রিনার মোবাইলে এল ভিডিওকল। কুমিল্লা থেকে। সিলভিয়া! রিনার দূরসম্পর্কের বান্ধবী। খ্রিস্টান মেয়ে। ছোটবেলায় কুমিল্লার আওয়ার লেডি অব ফাতেমা কনভেন্টে পড়ত।
সিলভিয়া কান্নায় ভরা গলায় বলল, "রিনা, আজ মনে পড়ল সেই পুরোনো দিনের কথা। কুমিল্লায় আমরা যে ডালহাউসি হাউসে থাকতাম—ওই মস্ত পুরোনো বাড়িটা, বারান্দায় লোহার কাজ, ভেতরে কাঠের সিঁড়ি, আর ছাদ থেকে দেখা যেত পুরো কুমিল্লা শহর। জানিস, বৈশাখের সকালে আমরা হাটে যেতাম। বাবা কাতল মাছ কিনত—একটা এত বড় যে আনা যায় কষ্টে। আর তরমুজ! সারি সারি তরমুজ—লাল টুকটুকে, মিষ্টি। আমরা খ্রিস্টান হয়েও কনভেন্টের মাঠে বসে পান্তা খেতাম, আর তরমুজ কাটতাম। আর তোর মতো মুসলিম বন্ধুরা বলত, 'আরে সিলভিয়া, তুই তো ক্রিসমাস পালবি, বৈশাখ পালিস কেন?' আমি বলতাম, 'বৈশাখ সবার। ঈশ্বর যেমন সবার, উৎসবও সবার।'"
“আর ওই হাটে কাঠশিল্পের স্টল থাকত—হাতে খোদাই করা কাঠের পুতুল, ছোট টেবিল, চেয়ার। একবার আমি একটা কাঠের পাখি কিনেছিলাম—ডানা মেলার মতো করে খোদাই করা। এখনো আমার কাছে আছে।"
রিনা অবাক। "এখনো আছে?"
"হ্যাঁ। অস্ট্রেলিয়ায় এনে রেখেছি। কারিগর বলেছিল, 'এটা বানিয়েছি- আমাদের নববর্ষের স্মৃতি।'
রিনার চোখ ভিজে গেল। "তুই এখন কোথায়?"
"অস্ট্রেলিয়ায়। অনিতার কাছেই। সিডনিতে।"
রিনা অবাক। "বৌদ্ধ? সামিত্রর কথা বলছিস?"
সিলভিয়া হেসে উঠল। "হ্যাঁ রে! সামিত্র। যে পাহাড়ি এলাকায় নববর্ষ দেখতে যেত। সে বৌদ্ধ হয়েও বৈশাখ মানে পাহাড়ে উঁচু জায়গায় বসে সূর্যোদয় দেখা। আর কুমিল্লায় যে কাতাল মাছ আর তরমুজের হাট বসত—সেই হাটে আমরা সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে বসতাম।"
রিনা ভাবল—কি আশ্চর্য! কুমিল্লায় খ্রিস্টান সিলভিয়া কনভেন্টের ঘণ্টার নীচে বৈশাখ পালত। বৌদ্ধ সামিত্র পাহাড়ে চড়ে নববর্ষ দেখত। সবাই মিলে কাতল মাছ আর তরমুজ ভাগ করত। কেউ কাউকে প্রশ্ন করে না। শুধু উৎসব করে।
চতুর্থ
বিকালে রিনা আরও ভেতরে গেল মেলায়। হঠাৎ দূর থেকে ভেসে এল গম্ভীর আওয়াজ—"জয় জব্বার! জয় জব্বার!" জব্বারের বলীখেলা (কুস্তি) শুরু হয়েছে। লালপেড়ে পাজামা পরা পাহলোয়ানরা লাঠি হাতে নেচে উঠছে। আরেক জায়গায় লাঠিখেলা—দুই দলের যুবক লাঠি ঘোরাচ্ছে, তালে তালে। দর্শক হাততালি দিচ্ছে। বাচ্চারা কাঁধে উঠে দেখছে।
হঠাৎ রিনার নজর পড়ল এক বৃদ্ধার দিকে। বটগাছের নীচে কাঠের বেঞ্চিতে একা বসে আছেন তিনি। পরনে পাড়হীন বিবর্ণ সাদা শাড়ি। চোখে বয়সের কুয়াশা, তবু বলীখেলা আর লাঠিখেলার দৃশ্য দেখছেন মৌন ব্যাকুলতায়। তাঁর পাশে একটি ছোট স্টল—হাতে তৈরি শোলার ডল, বালির পুতুল, আর শুকনো ফুলের মালা।
রিনা এগিয়ে গেল। "আসসালামু আলাইকুম। আপনি একা?"
বৃদ্ধা তাকালেন—ধীরে হাসলেন। "ওয়ালাইকুম আসসালাম, বাবা। আমার নাম মৌসুমী। স্বামী গত চৈত্রে মরে গেছেন। ছেলেমেয়েরা বিদেশে। এই আমার স্টল—শোলার ডল, বালির পুতুল বানাই। শখের কাজ।"
"মৌসুমী খালা, আপনি কি কুমিল্লার ডালহাউসি হাউসের কথা শুনেছেন?"
মৌসুমীর চোখ জ্বলে উঠল। "কী যে বলো! আমি ছোটবেলায় ওই বাড়িতে গিয়েছি। সিলভিয়া নামে এক খ্রিস্টান মেয়ে থাকত। ওর মা আমাকে খাবার দিত। আর ওরা সবাই যেত পাহাড়ি এলাকায় সামিত্রর সঙ্গে—সে বৌদ্ধ। কুমিল্লায় বৈশাখের হাটে আমরা সবাই যেতাম—কাতল মাছ কিনতে, তরমুজ কিনতে, মাটির পুতুল কিনতে। বাবা, একসময় কুমিল্লা ছিল মিলনের জায়গা। খ্রিস্টান কনভেন্ট, হিন্দু মন্দির, মুসলিম মসজিদ, বৌদ্ধ বিহার—সব একসঙ্গে। বলীখেলা দেখতাম, লাঠিখেলা দেখতাম। আমরা কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করতাম না, 'তোর ধর্ম কী?' শুধু বলতাম, 'আয় বৈশাখ খাই।'"
রিনা মৌসুমীর স্টলের দিকে তাকাল। বালির পুতুলগুলো যেন প্রাণ পেয়েছে—একটি পুতুলের গায়ে নীল রঙের শাড়ি, আরেকটির হাতে ঘুড়ি। "খালা, এই পুতুলগুলো কিনতে কত?"
"তোমার জন্য ফ্রি, বাবা। তুমি আমার পুরোনো দিনের কথা মনে করিয়ে দিয়েছ।"
রিনা একটি বালির পুতুল হাতে নিল। চোখ ভিজে এল।
রিনা কাঠের পাখিটার দিকে তাকাল। ডানা মেলা পাখি যেন উড়তে চাইছে—সেই কুমিল্লার আকাশে, সেই ডালহাউসি হাউসের বারান্দায়, সেই ঢোলের তালে।
পঞ্চম
ঠিক তখনই রিনার মোবাইলে এল আরেক ভিডিওকল। সামিত্র। বৌদ্ধ যুবক। পাহাড়ি এলাকায় থাকে। লম্বা চুল, গায়ে সাদা পাঞ্জাবি, গলায় নীল পশ্চাওয়ে।
"রিনা, শুভ নববর্ষ! তোকে পাহাড়ি মেলায় দেখতে চাই। এখানে সূর্য উঠছে পাহাড়ের আড়াল থেকে। সবাই এসেছে—বৌদ্ধ, হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান। আর জানিস, আজ গারোদের ওয়াংগালা উৎসবও হচ্ছে।"
রিনা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, "ওয়াংগালা কী?"
গারো সম্প্রদায়ের নিজস্ব নববর্ষ উদযাপনের নাম ওয়াংগালা। তাঁরা পশু বলি ও শস্য নিবেদনের মাধ্যমে এই উৎসব পালন করেন। বর্তমানে গারোদের অধিকাংশই প্রচলিত ধর্ম থেকে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছেন। তবে ওয়াংগালার চর্চা অনেক খ্রিস্টান গারোর মধ্যেও টিকে আছে—একটি সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ হিসেবে। তাঁরা প্রার্থনা, গান ও নাচের মাধ্যমে পুরোনো বছরকে বিদায় জানান এবং নতুন বছরকে স্বাগত জানান। এই উৎসবটি এখন ধর্মের চেয়েও সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সামিত্র বলল, "গারোদের নিজস্ব নববর্ষ উদযাপন। তারা পশু বলি দেয়, নতুন শস্য নিবেদন করে, আর নাচে—মাটি কাঁপানো ঢোলের তালে। এখন তাদের অধিকাংশই খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত, কিন্তু ওয়াংগালা থেমে যায়নি। এখনো তারা এই উৎসব করে—সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে। এক বৃদ্ধ গারো আমাকে বলল, 'আমরা খ্রিস্টান হয়েছি, কিন্তু আমাদের পূর্বপুরুষের রক্ত নাচতে চায়।'"
সামিত্র হাসল। "আর কুমিল্লার সেই হাটের কথা মনে আছে? কাতাল মাছ, তরমুজ, বালির পুতুল, নকশি —সব মিলিয়ে এক সাংস্কৃতিক মেলা। ওই বাড়িটা এখন নেই। কিন্তু ওই বাড়ির বারান্দায় বসে আমি আর সিলভিয়া বৈশাখের গল্প করতাম। সে বলত, 'খ্রিস্টান হওয়ায় কি হয়েছে? বৈশাখ সবার।' আর আমি বলতাম, 'বৌদ্ধ হওয়ায় কী হয়েছে? বুদ্ধ তো শান্তির পথ দেখিয়েছেন। আর বৈশাখ তো শান্তির উৎসব। গারোদের ওয়াংগালা দেখায়—ধর্ম বদলালেও উৎসব বদলায় না।'"
কল শেষ হতেই রিনা ঠিক করল—আজ সে সবাইকে একসঙ্গে আনবে।ভিডিওতে সিলভিয়াকে , সামিত্রকে পাহাড় থেকে, অনিতাকে সিডনি থেকে, মৌসুমী খালাকে বেঞ্চি থেকে, আর গারোদের ওয়াংগালার ঢোলের আওয়াজটুকুও।
ষষ্ঠ
রিনা মৌসুমীর পাশে ফিরে গেল। "মৌসুমী খালা, আপনি কীভাবে পুরোনো বছরকে ধন্যবাদ দেন?"
মৌসুমী থলে থেকে একটা শুকনো চামেলি ফুল বের করলেন। "প্রতি চৈত্রের ৩১ তারিখে আমি একটা ফুল তুলি। আর বলি: ধন্যবাদ সেই বৃষ্টির জন্য, ধন্যবাদ নিঃসঙ্গতার জন্য, ধন্যবাদ বন্ধুদের জন্য, ধন্যবাদ তাদের জন্যও যারা করে নি। তারপর ফুলটা আমার বাইবেলের ভেতর চেপে রাখি।"
রিনা জিজ্ঞেস করল, "আপনি খ্রিস্টান?"
"হ্যাঁ বাবা। কিন্তু আমার স্বামী ছিলেন হিন্দু। আমাদের ছেলে-মেয়ে কেউ কেউ বৌদ্ধ মন্দিরে যায়। আর প্রতিবেশী সিলভিয়া খ্রিস্টান হয়েও আমাদের বাড়িতে পান্তা খেত। সংস্কৃতি ধর্ম মানে না, বাবা। সংস্কৃতি মানে মানুষ। আর দেখো গারোদের ওয়াংগালা—তারা খ্রিস্টান হয়েও পশু বলি দেয়? না, বাবা। তারা নাচে। তারা স্মৃতি রেখেছে।"
রিনা ফুলটা হাতে নিল। চোখ বন্ধ করল। ধন্যবাদ সিলভিয়ার জন্য, সামিত্রের জন্য, অনিতার জন্য, মৌসুমী খালার জন্য—যে বাইবেলে চামেলি ফুল চেপে রাখে। আর ধন্যবাদ গারোদের জন্য—যারা ধর্ম বদলালেও নিজেদের নববর্ষ ভোলেনি।
সপ্তম
"বৈশাখ, / মাটির কাছ থেকে মাটির ডাক..." যেন সেই সুরেই মিলিয়ে যায় রিনার দেখা সেই স্মৃতি—কুমিল্লায় ভোর ৪টায় মা সব ঘর ঝাড়তেন, ধুলো মুছতেন। নারীরা যেন দশ হাতের মতো কাজ করে মাটির মহামানব।
পাশের ছেলেটির ঘুড়ি কাটা পড়ল। সে কাঁদতে শুরু করল। রিনা থলে থেকে একটা ঘুড়ি বের করল। পুরোনো খবরের কাগজের ঘুড়ি। তাতে লিখল: সিলভিয়া, সামিত্র, অনিতা, মৌসুমী, গোমেজ, গারোদের ওয়াংগালা, বলীখেলা, লাঠিখেলা, কাতল মাছ, তরমুজ, বালির পুতুল, নকশি , শোলার ডল—সকল ধর্ম ও সংস্কৃতির মিলন। কোনো দাঙ্গা নেই। কোনো দুর্নীতি নেই।
রিনা মৌসুমীকে বলল, "আপনি কি এই ঘুড়ি উড়াবেন?"
মৌসুমীর হাত কাঁপে। "চল্লিশ বছর ঘুড়ি ওড়াইনি।"
"তাহলে আমরা একসঙ্গে কাঁপব।"
রিনা মৌসুমীর কাঁপা হাতে সুতো ধরিয়ে দিল। নিজের হাত ওপর চাপাল। কয়েক পা দৌড়োল—ঘুড়ি উড়ল! টলমলে, তবু উড়ছে!
মৌসুমী হেসে কাঁদল। "দেখ! আমাদের ঘুড়ি! সব ধর্মের ঘুড়ি! গারোদের ওয়াংগালার ঘুড়ি! বলীখেলা-লাঠিখেলার ঘুড়ি! কাতল মাছ-তরমুজের ঘুড়ি!"
রিনা ভিডিও করল। পাঠাল সিলভিয়াকে, সামিত্রকে, অনিতাকে। সঙ্গে লিখল: এই ঘুড়ি শান্তির। কোনো দাঙ্গা নেই। কোনো দুর্নীতি নেই। শুধু বৈশাখ।
কয়েক মিনিট পর এল তিনটে রিপ্লাই।
সিলভিয়া (সিডনি): "আমি কুমিল্লার ডালহাউসি হাউসের বারান্দা থেকে দেখছি। ঘুড়ি পৌঁছে গেছে আমার কাছে। সেই কাতল মাছ আর তরমুজের গন্ধ এখনো নাকে।"
সামিত্র (পাহাড়): "পাহাড়ের চূড়া থেকে দেখলাম। সূর্যের সাথে মিশে গেছে। বুদ্ধের আশীর্বাদ থাকলো। গারোদের ওয়াংগালার ঢোলও বাজছে পাশে। বলীখেলার লাল পাজামা যেন উড়ছে আকাশে।"
অনিতা (সিডনি): "তরমুজের টুকরো আর বালির পুতুল রেখো আমার জন্য। আসছি। শান্তি নিয়ে আসছি।"
আকাশের দিকে তাকাল রিনা। ঘুড়িটার গায়ে লেখা সব নাম। এটা সবচেয়ে সুন্দর ঘুড়ি নয়। কিন্তু এটাতে আছে খ্রিস্টান সিলভিয়ার ভালোবাসা, বৌদ্ধ সামিত্রের শান্তি, হিন্দু অনিতার আশীর্বাদ, খ্রিস্টান মৌসুমীর কৃতজ্ঞতা, গারোদের ওয়াংগালার ঐতিহ্য, কুমিল্লার কাতল মাছ-তরমুজের স্মৃতি, বলীখেলা-লাঠিখেলার উল্লাস, আর মুসলিম রিনার স্বাধীনতা। এই—ভাবল রিনা—এই তো বৈশাখের সোনালি সুতো। ধর্ম নয়—মানুষ।
অষ্টম
বিকালে সবাই মিলে বটগাছের নীচে পান্তা ইলিশ খেতে বসল। পাশেই মৌসুমী খালার স্টল থেকে বালির পুতুলগুলো যেন সবাইকে দেখছে। রিনা বলল, "আম্মু, জানো পান্তা ইলিশ আসলে ব্যাংক বানিয়েছে চল্লিশ বছর আগে?"
মা হাসলেন। "জানি বাবা। কিন্তু তাতে কী? তোর দিদা আমাকে পান্তা খেতে শিখিয়েছিলেন। আর আমি তোকে শিখিয়েছি। ব্যাংক বানিয়েছে ঠিকই, কিন্তু ভালোবাসা তো আমরা বানিয়েছি।"
রিনা ভাবল—কী সুন্দর! ব্যাংক বানিয়েছে পান্তা ইলিশ, কিন্তু মা বানিয়েছেন স্মৃতি। ডালহাউসি হাউস ভাঙা, কিন্তু সিলভিয়ার মনে তার বারান্দা আছে। সামিত্র পাহাড়ে, অনিতা সিডনিতে, গারোদের ওয়াংগালা বেঁচে আছে নাচ আর ঢোলে—সবাই একসঙ্গে। কুমিল্লার সেই কাতাল মাছ আর তরমুজের হাট এখন নেই, কিন্তু স্বাদটা আছে সিলভিয়ার গলায়। বালির পুতুল মৌসুমী খালার স্টলে আছে। খাতায় লেখা হবে নতুন গল্প।
রিনা ইলিশ মুখে দিয়ে বলল, "কে বানিয়েছে, কিছু যায় আসে না। আমরা ভাগ করি। একসঙ্গে খাই। এটাই আসল বৈশাখ।"
নবম
সেই রাতে রিনা হালখাতায় লিখল:
পুরোনো বছরকে ধন্যবাদ: সিলভিয়ার জন্য, যে কুমিল্লার ডালহাউসি হাউসের গল্প বাঁচিয়ে রেখেছে। সামিত্রের জন্য, যে পাহাড়ে বৈশাখের সূর্য দেখায়। অনিতার জন্য, যে অস্ট্রেলিয়া থেকেও ভালোবাসা পাঠায়। মৌসুমী খালার জন্য, যে বাইবেলে চামেলি ফুল চেপে রাখে আর বালির পুতুল বানায়। গারোদের জন্য, যারা ধর্ম বদলালেও ওয়াংগালা ভোলেনি। কুমিল্লার সেই হাটের জন্য—কাতল মাছ, তরমুজ, বলীখেলা, লাঠিখেলা, সব মিলিয়ে এক বাঙালি সংস্কৃতির জন্য।
নতুন বছরের প্রতিজ্ঞা: ১. আমি কখনো ধর্মের নামে বিভক্ত করব না। ২. আমি দেখব—মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, গারো—সবাই মিলে ঘুড়ি ওড়ায়। ৩. কুমিল্লার মতো সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে কাতল মাছ আর তরমুজ ভাগ করে খাবে। ৪. মেলায় বালির পুতুল, শোলার ডল, নকশি, হস্তশিল্প—সবই একসঙ্গে থাকবে। ৫. কোনো দাঙ্গা নয়। কোনো দুর্নীতি নয়। শুধু শান্তি। ৬. সংস্কৃতি কারও একার না। বৈশাখ সবার।
লিখল:
নববর্ষ বা বৈশাখ উদযাপন অনেক পুরোনো প্রথার মিশ্রণ। সম্রাট আকবর জাঁকজমক করে নববর্ষ উৎসব চালু করেছিলেন মূলত রাজ্যজমা ও করসংক্রান্ত কাজগুলোকে সমন্বয় করার জন্য—একই সময়ে রাজ্যে ট্যাক্স বা খাজনা সংগ্রহের কাজ সহজতরকল্পে। বাংলা অঞ্চলে পরে শায়েস্তা খাঁ এই ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করেন; তার সময়কালে করসংগ্রহ পদ্ধতি ব্যবস্থা করা হয় এবং চৈত্র মাসের ৩১ তারিখে পুরোনো হিসাব বন্ধ করে পুণ্য/পুরস্কার প্রদানের রেওয়াজ চালু করেন। সেখান থেকেই হালখাতা প্রচলিত হয়—এভাবেই ব্যবসায়ীরা নতুন বর্ষকে নিয়ে আশাবাদ ও হিসাব-নিশ্চয়তার সঙ্গে বাণিজ্য শুরু করতেন।
খাতা বন্ধ করে রিনা ঘুমিয়ে পড়ল। স্বপ্ন দেখল—কুমিল্লার ডালহাউসি হাউসের বারান্দা। সেখানে সিলভিয়া, সামিত্র, অনিতা, মৌসুমী—সবাই বসে। আর পাশে গারোদের ওয়াংগালার ঢোল বাজছে। বলীখেলার পাহলোয়ানরা লাঠি ঘোরাচ্ছে। কাতল মাছ আর তরমুজ কাটা হচ্ছে। আকাশে ঘুড়ি। গায়ে লেখা: শান্তি, মিলন,বৈশাখ।
কথা
নতুন বছর শুরু হয়ে গেছে—সব ধর্ম ও সংস্কৃতির একসঙ্গে।
কুমিল্লায় সিলভিয়া স্বপ্ন দেখছে ডালহাউসি হাউসের বারান্দার। মনে পড়ছে কাতল মাছ আর তরমুজের হাটের কথা। পাহাড়ে সামিত্র বুদ্ধের মূর্তির সামনে প্রদীপ জ্বালিয়ে বলছে, "শুভ নববর্ষ, সবাইকে। শান্তি থাক। গারোদের ওয়াংগালা বাজুক।" সিডনিতে অনিতা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে। হাতে হলুদ ফুল। বলছে, "শুভ নববর্ষ, বাংলাদেশ। আমি আসছি। আমার জন্য বালির পুতুল রেখো।" ঢাকায় মৌসুমী বাইবেলে শুকনো চামেলি ফুল চেপে রাখলেন। পাশে রাখলেন একটি বালির পুতুল। ফিসফিস করে বললেন, "ধন্যবাদ সেই মেয়েটির জন্য। ধন্যবাদ সেই ঘুড়ির জন্য। ধন্যবাদ নতুন বছরের জন্য—যেখানে কোনো দাঙ্গা নেই, কোনো দুর্নীতি নেই। শুধু শান্তি।" গারো পাহাড়ে ওয়াংগালার ঢোল বাজছে। নাচছে তারা। বলছে, "আমাদের নববর্ষ আমাদের আছে। খ্রিস্টান হয়েছি, কিন্তু স্মৃতি কেড়ে নেয়ার ক্ষমতা কারো নেই।" রমনার মেলায় এখনো নকশি বিক্রি হচ্ছে, বালির পুতুল বানাচ্ছেন কারিগররা, লাঠিখেলা হচ্ছে, বলীখেলা হচ্ছে। আর গান বাজছে—" বৈশাখ, বৈশাখ..."
আর শাখারী বাজারে রিনার মা শেষ বাসন মেজে স্বামীর দিকে হাসলেন। "সবশেষে সে বুঝেছে। বৈশাখ সবার।"
বাবা মাথা নাড়লেন। "নতুন সূর্য ওকে চুমু খেয়েছে শেষমেশ। আর সিলভিয়াকে। আর সামিত্রকে। আর অনিতাকে। আর মৌসুমীকেও। আর গারোদের ওয়াংগালাকেও। আর কুমিল্লার কাতল মাছ-তরমুজের স্মৃতিকেও।"
নতুন বছর শুরু হয়ে গেছে।
কাঠের পুতুল তৈরি করছে। বলছে, "আমাদের নববর্ষ আমাদের আছে। আমাদের কাঠশিল্প আমাদের আছে। স্মৃতি কেড়ে নেয়ার ক্ষমতা কারো নেই।"
শেষ
মিরপুর থেকে ধানমণ্ডি যাওয়ার পথে ট্রাফিক জ্যামে পেছন থেকে একটি গাড়ি ধাক্কা দেয়। প্রথমে ড্রাইভার নেমে ক্ষমা চায়। তারপর নেমে দেখেন ড্রাইভার ছাড়া ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী সাতজন মেয়ে—একজন মধ্যবয়সী মহিলার তত্ত্বাবধানে। ড্রাইভার ক্ষমা চাইতেই সেই মেয়েরা আর মহিলা শুরু করেন অশালীন গালিগালাজ ও বুলিং।
রিনা দাঁড়িয়ে দেখে। যেন সেই পুরোনো দিনের কুমিল্লার মা—যে ভোর ৪টায় ঘর ঝাড়তেন, ধুলো মুছতেন, দশ হাতের মতো কাজ করতেন—আর আজকের এই নারীদের মধ্যে ফারাকটা শুধু একটা সুতোয় বাঁধা। সেই সুতো বৈশাখের সোনালি সুতো—যা শেখায়: ধর্ম নয়, মানুষ বড়। ভালোবাসা নয়, ভাগ করে নেয়াটা বড়। গালিগালাজ নয়, নীরবতা আর ক্ষমা বড়। কাতল মাছ ভাগ করা বড়, তরমুজ কাটা বড়, বালির পুতুল উপহার দেয়া বড়। নতুন বছরের প্রথম সূর্য ওদের গায়েও পড়ল। কেউ দেখল, কেউ দেখল না।
রিনা জানালা বন্ধ করল। গান বাজতে লাগল— "বৈশাখ / মাটির কাছ থেকে মাটির ডাক..."
লেখক: ঔপন্যাসিক, অর্থনীতিবিদ, আইটি বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তা বিশারদ
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































