গল্প

বৈশাখের সোনালি সুতো

মুহম্মদ মাহবুব আলী
  প্রকাশিত : ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৫৩
অ- অ+

বৈশাখের প্রথম সূর্য যেন এক টুকরো গলানো সোনাশুধু আলো নয়, উষ্ণতা, মিষ্টি আর ঘন হয়ে চৈত্রের বিবর্ণ প্রান্ত বেয়ে ধীরে ধীরে নামছিল মধুর মতোপুরোনো ঢাকার শাখারী বাজারের অলিগলিতে সকালবেলা একটা অদ্ভুত চাঞ্চল্য লেগে থাকে বৈশাখী হাওয়ায়রিনা বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাঁপিয়ে উঠলতার গায়ে নতুন কুর্তাসাদা, পাতলা লাল পাড় দেওয়া, সরল, সুন্দরকিন্তু কী চুলকায়!

"আম্মু !" সে গলায় নখ বসাতে বসাতে ডাকল"আমাকে কি এটা পরতেই হবে?"

রান্নাঘর থেকে মা ফাতেমা বেগমের গলা ভেসে এলতিনি ব্যস্তএকটা বড় বাটিতে পান্তা ইলিশ সাজানো হচ্ছেভেজানো চাল, তার ওপর সোনালি ইলিশ"নতুন বছর বদ্ধ মনে ঢোকে না, রিনা," মা মিষ্টি গলায় বললেন"পুরোনো বছরের ধুলো ঝেড়ে ফেলার জন্যই নতুন পোশাক"

রিনা জিব কামড়ালঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী সেতার কাছে "পুরোনো বছরের ধুলো" মানে শুধু ময়লা নয়বরং বৈষম্যের কালো ছাই, যা সে চোখের সামনে দেখে রোজরিকশাওয়ালার মেয়ে, যে বই কেনার টাকাও জোগাড় করতে পারে না; সেই প্রতিবেশী, যে কাজিনের বিয়েতে কটূক্তি করে; সেই অদৃশ্য দেওয়াল, যা ধনীদের আর স্বপ্নবাজদের থেকে আলাদা করে রাখেসংস্কৃতি! রিনার কাছে তা যেন এক সোনার জিঞ্জিরে বাঁধা সুন্দর খাঁচাকিন্তু কথা গিলে সে কুর্তা টেনে পরলচুল বাঁধলমায়ের পেছন পেছন বেরিয়ে পড়ল

দ্বিতীয়

রমনার পার্কের বর্ষবরণ মেলা তার হতাশাকে পেছনে ফেলে দিলচারদিকে শুধু উৎসবের আমেজঢোলের আওয়াজ যেন বুকের ভেতর বাজেগভীর, প্রাচীন, ছন্দময়বাতাস মেতে উঠল মুড়ি, ঝালমুড়ি আর টকটকে বেগুনির গন্ধেকোথাও বাজছে " বৈশাখ, বৈশাখ / মাটির কাছ থেকে মাটির ডাক..." গানটির সুর যেন সবাইকে একসঙ্গে দোলা দিচ্ছে

রিনার বাবা শিশুপুস্তকের ছোট প্রকাশকনতুন হালখাতার পাহাড়ের পেছনে দাঁড়িয়ে তিনি যেন রাজালাল, সবুজ, নীল খাতার মলাট সকালের রোদে চিকচিক করছেপাশের স্টলে নকশি খাতা, হাতে আঁকা হাতে তৈরি ডায়েরি, আর ঘরে তৈরি হস্তশিল্পবেতের ঝুড়ি, শোলার কাজ, রঙিন সুতোর তৈরি দুলআরেক স্টলে স্যান্ড পুতুলমাটির তৈরি ছোট ছোট পুতুল, যাদের চোখে যেন প্রাণ আছেরংবেরঙের ফুলের মালা, শিমুল ফুলের গুচ্ছ, আর শুকনো চামেলির গন্ধ মেলার বাতাসে মেশানো

হঠাৎ এক স্টলে রিনার চোখ আটকে গেলসেখানে বালির পুতুল সাজানোএকটি পুতুল যেন মাটির মতো হাতে তৈরি, গায়ে নীল-সাদা রংপাশেই রঙিন কাঠের ঘুড়ি, শোলার ডল, আর গারোদের তৈরি হাতে বোনা ঝুড়িএকজন বৃদ্ধ কারিগর বসে আছেনছোট ছেলে মেয়েদের হাতে ঘরোয়া কারুকাজ শেখাচ্ছেনকী অপূর্ব! রিনা মনে মনে ভাবলএই তো আসল বৈশাখস্টলের পর স্টল জুড়ে নকশি , হাতে আঁকা পাখা, বাঁশের তৈরি বাদ্যযন্ত্র, আর মাটির সরার ওপর ডালিমের খোসা দিয়ে আঁকা নকশিএক সময় কাঠের পুতুল, ছোট টেবিল, চেয়ার, আর ঘর সাজানোর জিনিস হাটে হাটে বিক্রি হতো

মেলার শিশুস্বর্গ-হাওয়াই মিঠাই! নামটাই যেন মুখে নিলে বাতাসের মতো হালকা লাগেশৈশবে রমনার মেলায় বাবার হাত ধরে গিয়ে প্রথম দেখেছিলামএক লাফে বেড়ে ওঠা তুলতুলে সুতোর বল, ময়দার তৈরি সোনালি জাল, চিনির প্রলেপ যেন শিশিরের মতো ঝলমল করেবিক্রেতা লোহার কড়াইতে বাঁশের কঞ্চি ডুবিয়ে ঘুরিয়ে তুলতেই তৈরি হয়ে যেত অদ্ভুত সেই মিষ্টিছোট্ট হাতের মুঠোয় ধরে যখন মুখে দিতাম, মুখে না রেখেই যেন গলে যেতঠিক শৈশবের মতোই, ঠিক মেলার উৎসবের মতোইকুমিল্লার হাটে সিলভিয়ার সঙ্গে মেলায় গিয়ে এক টুকরো হাওয়াই মিঠাই ভাগ করে খাওয়ার স্মৃতি আজও মনে পড়েসে খেত গোলাপি রঙের, আমি সাদাআমরা ধর্ম দেখিনি, রং দেখেছিওটা ছিল আমাদের বৈশাখের প্রথম স্বাদহালকা, মিষ্টি, উদ্বেল

ঠিক তখনই এক ছোট্ট মেয়ে এলবয়স বারোফ্রকটা বিবর্ণএতবার কাচা হয়েছে যে আসল রং ভূত হয়ে গেছেহাতে কয়েকটা কুঁচকে যাওয়া নোট"একটা খাতার দাম কত?" ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল মেয়েটি

"চল্লিশ টাকা," বাবা বললেন

মেয়েটি তার টাকার দিকে তাকালতার কাছে আছে ত্রিশরিনা দেখল, মেয়েটির মুখটা যেন ম্লান হয়ে যাচ্ছেমেয়েটি ফিরে যেতে উদ্যত

"থামো," রিনা বললটেবিল থেকে সবচেয়ে মোটা খাতাটা তুলে নিলওপরটা সাজানো শোলার নকশি ফুল দিয়ে"এটা ফ্রি"

মেয়েটির চোখ বড় হয়ে গেল"ফ্রি?"

"হ্যাঁকী লিখবে?"

মেয়েটি খাতাটা বুকের কাছে চেপে ধরল, যেন কোনো ধন"গল্প," বলল, "আমার নিজের গল্প লিখতে চাই" ছুটে পালাল সেবিবর্ণ ফ্রকটা পেছনে উড়ছে ছোট্ট খুশির পতাকার মতোরিনা তাকিয়ে রইলবুকের ভেতর একটা উষ্ণতা জাগলঅনেকদিন পর

তৃতীয়

সকাল আরেকটু বাড়তেই রিনার মোবাইলে এল ভিডিওকলকুমিল্লা থেকেসিলভিয়া! রিনার দূরসম্পর্কের বান্ধবীখ্রিস্টান মেয়েছোটবেলায় কুমিল্লার আওয়ার লেডি অব ফাতেমা কনভেন্টে পড়ত

সিলভিয়া কান্নায় ভরা গলায় বলল, "রিনা, আজ মনে পড়ল সেই পুরোনো দিনের কথাকুমিল্লায় আমরা যে ডালহাউসি হাউসে থাকতামওই মস্ত পুরোনো বাড়িটা, বারান্দায় লোহার কাজ, ভেতরে কাঠের সিঁড়ি, আর ছাদ থেকে দেখা যেত পুরো কুমিল্লা শহরজানিস, বৈশাখের সকালে আমরা হাটে যেতামবাবা কাতল মাছ কিনতএকটা এত বড় যে আনা যায় কষ্টেআর তরমুজ! সারি সারি তরমুজলাল টুকটুকে, মিষ্টিআমরা খ্রিস্টান হয়েও কনভেন্টের মাঠে বসে পান্তা খেতাম, আর তরমুজ কাটতামআর তোর মতো মুসলিম বন্ধুরা বলত, 'আরে সিলভিয়া, তুই তো ক্রিসমাস পালবি, বৈশাখ পালিস কেন?' আমি বলতাম, 'বৈশাখ সবারঈশ্বর যেমন সবার, উৎসবও সবার'"

“আর ওই হাটে কাঠশিল্পের স্টল থাকতহাতে খোদাই করা কাঠের পুতুল, ছোট টেবিল, চেয়ারএকবার আমি একটা কাঠের পাখি কিনেছিলামডানা মেলার মতো করে খোদাই করাএখনো আমার কাছে আছে"

রিনা অবাক"এখনো আছে?"

"হ্যাঁঅস্ট্রেলিয়ায় এনে রেখেছি কারিগর বলেছিল, 'এটা বানিয়েছি- আমাদের নববর্ষের স্মৃতি'

রিনার চোখ ভিজে গেল"তুই এখন কোথায়?"

"অস্ট্রেলিয়ায়অনিতার কাছেইসিডনিতে"

রিনা অবাক"বৌদ্ধ? সামিত্রর কথা বলছিস?"

সিলভিয়া হেসে উঠল"হ্যাঁ রে! সামিত্রযে পাহাড়ি এলাকায় নববর্ষ দেখতে যেতসে বৌদ্ধ হয়েও বৈশাখ মানে পাহাড়ে উঁচু জায়গায় বসে সূর্যোদয় দেখাআর কুমিল্লায় যে কাতাল মাছ আর তরমুজের হাট বসতসেই হাটে আমরা সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে বসতাম"

রিনা ভাবলকি আশ্চর্য! কুমিল্লায় খ্রিস্টান সিলভিয়া কনভেন্টের ঘণ্টার নীচে বৈশাখ পালতবৌদ্ধ সামিত্র পাহাড়ে চড়ে নববর্ষ দেখতসবাই মিলে কাতল মাছ আর তরমুজ ভাগ করতকেউ কাউকে প্রশ্ন করে নাশুধু উৎসব করে

চতুর্থ

বিকালে রিনা আরও ভেতরে গেল মেলায়হঠাৎ দূর থেকে ভেসে এল গম্ভীর আওয়াজ—"জয় জব্বার! জয় জব্বার!" জব্বারের বলীখেলা (কুস্তি) শুরু হয়েছেলালপেড়ে পাজামা পরা পাহলোয়ানরা লাঠি হাতে নেচে উঠছেআরেক জায়গায় লাঠিখেলাদুই দলের যুবক লাঠি ঘোরাচ্ছে, তালে তালেদর্শক হাততালি দিচ্ছেবাচ্চারা কাঁধে উঠে দেখছে

হঠাৎ রিনার নজর পড়ল এক বৃদ্ধার দিকেবটগাছের নীচে কাঠের বেঞ্চিতে একা বসে আছেন তিনিপরনে পাড়হীন বিবর্ণ সাদা শাড়িচোখে বয়সের কুয়াশা, তবু বলীখেলা আর লাঠিখেলার দৃশ্য দেখছেন মৌন ব্যাকুলতায়তাঁর পাশে একটি ছোট স্টলহাতে তৈরি শোলার ডল, বালির পুতুল, আর শুকনো ফুলের মালা

রিনা এগিয়ে গেল"আসসালামু আলাইকুমআপনি একা?"

বৃদ্ধা তাকালেনধীরে হাসলেন"ওয়ালাইকুম আসসালাম, বাবাআমার নাম মৌসুমীস্বামী গত চৈত্রে মরে গেছেনছেলেমেয়েরা বিদেশেএই আমার স্টলশোলার ডল, বালির পুতুল বানাইশখের কাজ"

"মৌসুমী খালা, আপনি কি কুমিল্লার ডালহাউসি হাউসের কথা শুনেছেন?"

মৌসুমীর চোখ জ্বলে উঠল"কী যে বলো! আমি ছোটবেলায় ওই বাড়িতে গিয়েছিসিলভিয়া নামে এক খ্রিস্টান মেয়ে থাকতওর মা আমাকে খাবার দিতআর ওরা সবাই যেত পাহাড়ি এলাকায় সামিত্রর সঙ্গেসে বৌদ্ধকুমিল্লায় বৈশাখের হাটে আমরা সবাই যেতামকাতল মাছ কিনতে, তরমুজ কিনতে, মাটির পুতুল কিনতেবাবা, একসময় কুমিল্লা ছিল মিলনের জায়গাখ্রিস্টান কনভেন্ট, হিন্দু মন্দির, মুসলিম মসজিদ, বৌদ্ধ বিহারসব একসঙ্গেবলীখেলা দেখতাম, লাঠিখেলা দেখতামআমরা কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করতাম না, 'তোর ধর্ম কী?' শুধু বলতাম, 'আয় বৈশাখ খাই'"

রিনা মৌসুমীর স্টলের দিকে তাকালবালির পুতুলগুলো যেন প্রাণ পেয়েছেএকটি পুতুলের গায়ে নীল রঙের শাড়ি, আরেকটির হাতে ঘুড়ি"খালা, এই পুতুলগুলো কিনতে কত?"

"তোমার জন্য ফ্রি, বাবাতুমি আমার পুরোনো দিনের কথা মনে করিয়ে দিয়েছ"

রিনা একটি বালির পুতুল হাতে নিলচোখ ভিজে এল

রিনা কাঠের পাখিটার দিকে তাকালডানা মেলা পাখি যেন উড়তে চাইছেসেই কুমিল্লার আকাশে, সেই ডালহাউসি হাউসের বারান্দায়, সেই ঢোলের তালে

পঞ্চম

ঠিক তখনই রিনার মোবাইলে এল আরেক ভিডিওকলসামিত্রবৌদ্ধ যুবকপাহাড়ি এলাকায় থাকেলম্বা চুল, গায়ে সাদা পাঞ্জাবি, গলায় নীল পশ্চাওয়ে

"রিনা, শুভ নববর্ষ! তোকে পাহাড়ি মেলায় দেখতে চাইএখানে সূর্য উঠছে পাহাড়ের আড়াল থেকেসবাই এসেছেবৌদ্ধ, হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টানআর জানিস, আজ গারোদের ওয়াংগালা উৎসবও হচ্ছে"

রিনা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, "ওয়াংগালা কী?"

গারো সম্প্রদায়ের নিজস্ব নববর্ষ উদযাপনের নাম ওয়াংগালাতাঁরা পশু বলি ও শস্য নিবেদনের মাধ্যমে এই উৎসব পালন করেনবর্তমানে গারোদের অধিকাংশই প্রচলিত ধর্ম থেকে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছেনতবে ওয়াংগালার চর্চা অনেক খ্রিস্টান গারোর মধ্যেও টিকে আছেএকটি সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ হিসেবেতাঁরা প্রার্থনা, গান ও নাচের মাধ্যমে পুরোনো বছরকে বিদায় জানান এবং নতুন বছরকে স্বাগত জানানএই উৎসবটি এখন ধর্মের চেয়েও সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে

সামিত্র বলল, "গারোদের নিজস্ব নববর্ষ উদযাপনতারা পশু বলি দেয়, নতুন শস্য নিবেদন করে, আর নাচেমাটি কাঁপানো ঢোলের তালেএখন তাদের অধিকাংশই খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত, কিন্তু ওয়াংগালা থেমে যায়নিএখনো তারা এই উৎসব করেসাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবেএক বৃদ্ধ গারো আমাকে বলল, 'আমরা খ্রিস্টান হয়েছি, কিন্তু আমাদের পূর্বপুরুষের রক্ত নাচতে চায়'"

সামিত্র হাসল"আর কুমিল্লার সেই হাটের কথা মনে আছে? কাতাল মাছ, তরমুজ, বালির পুতুল, নকশি সব মিলিয়ে এক সাংস্কৃতিক মেলাওই বাড়িটা এখন নেইকিন্তু ওই বাড়ির বারান্দায় বসে আমি আর সিলভিয়া বৈশাখের গল্প করতামসে বলত, 'খ্রিস্টান হওয়ায় কি হয়েছে? বৈশাখ সবার' আর আমি বলতাম, 'বৌদ্ধ হওয়ায় কী হয়েছে? বুদ্ধ তো শান্তির পথ দেখিয়েছেনআর বৈশাখ তো শান্তির উৎসবগারোদের ওয়াংগালা দেখায়ধর্ম বদলালেও উৎসব বদলায় না'"

কল শেষ হতেই রিনা ঠিক করলআজ সে সবাইকে একসঙ্গে আনবেভিডিওতে সিলভিয়াকে , সামিত্রকে পাহাড় থেকে, অনিতাকে সিডনি থেকে, মৌসুমী খালাকে বেঞ্চি থেকে, আর গারোদের ওয়াংগালার ঢোলের আওয়াজটুকুও

ষষ্ঠ

রিনা মৌসুমীর পাশে ফিরে গেল"মৌসুমী খালা, আপনি কীভাবে পুরোনো বছরকে ধন্যবাদ দেন?"

মৌসুমী থলে থেকে একটা শুকনো চামেলি ফুল বের করলেন"প্রতি চৈত্রের ৩১ তারিখে আমি একটা ফুল তুলিআর বলি: ধন্যবাদ সেই বৃষ্টির জন্য, ধন্যবাদ নিঃসঙ্গতার জন্য, ধন্যবাদ বন্ধুদের জন্য, ধন্যবাদ তাদের জন্যও যারা করে নিতারপর ফুলটা আমার বাইবেলের ভেতর চেপে রাখি"

রিনা জিজ্ঞেস করল, "আপনি খ্রিস্টান?"

"হ্যাঁ বাবাকিন্তু আমার স্বামী ছিলেন হিন্দুআমাদের ছেলে-মেয়ে কেউ কেউ বৌদ্ধ মন্দিরে যায়আর প্রতিবেশী সিলভিয়া খ্রিস্টান হয়েও আমাদের বাড়িতে পান্তা খেতসংস্কৃতি ধর্ম মানে না, বাবাসংস্কৃতি মানে মানুষআর দেখো গারোদের ওয়াংগালাতারা খ্রিস্টান হয়েও পশু বলি দেয়? না, বাবাতারা নাচেতারা স্মৃতি রেখেছে"

রিনা ফুলটা হাতে নিলচোখ বন্ধ করলধন্যবাদ সিলভিয়ার জন্য, সামিত্রের জন্য, অনিতার জন্য, মৌসুমী খালার জন্যযে বাইবেলে চামেলি ফুল চেপে রাখেআর ধন্যবাদ গারোদের জন্যযারা ধর্ম বদলালেও নিজেদের নববর্ষ ভোলেনি

সপ্তম

"বৈশাখ, / মাটির কাছ থেকে মাটির ডাক..." যেন সেই সুরেই মিলিয়ে যায় রিনার দেখা সেই স্মৃতিকুমিল্লায় ভোর ৪টায় মা সব ঘর ঝাড়তেন, ধুলো মুছতেননারীরা যেন দশ হাতের মতো কাজ করে মাটির মহামানব

পাশের ছেলেটির ঘুড়ি কাটা পড়লসে কাঁদতে শুরু করলরিনা থলে থেকে একটা ঘুড়ি বের করলপুরোনো খবরের কাগজের ঘুড়িতাতে লিখল: সিলভিয়া, সামিত্র, অনিতা, মৌসুমী, গোমেজ, গারোদের ওয়াংগালা, বলীখেলা, লাঠিখেলা, কাতল মাছ, তরমুজ, বালির পুতুল, নকশি , শোলার ডলসকল ধর্ম ও সংস্কৃতির মিলনকোনো দাঙ্গা নেইকোনো দুর্নীতি নেই

রিনা মৌসুমীকে বলল, "আপনি কি এই ঘুড়ি উড়াবেন?"

মৌসুমীর হাত কাঁপে"চল্লিশ বছর ঘুড়ি ওড়াইনি"

"তাহলে আমরা একসঙ্গে কাঁপব"

রিনা মৌসুমীর কাঁপা হাতে সুতো ধরিয়ে দিলনিজের হাত ওপর চাপালকয়েক পা দৌড়োলঘুড়ি উড়ল! টলমলে, তবু উড়ছে!

মৌসুমী হেসে কাঁদল"দেখ! আমাদের ঘুড়ি! সব ধর্মের ঘুড়ি! গারোদের ওয়াংগালার ঘুড়ি! বলীখেলা-লাঠিখেলার ঘুড়ি! কাতল মাছ-তরমুজের ঘুড়ি!"

রিনা ভিডিও করলপাঠাল সিলভিয়াকে, সামিত্রকে, অনিতাকেসঙ্গে লিখল: এই ঘুড়ি শান্তিরকোনো দাঙ্গা নেইকোনো দুর্নীতি নেইশুধু বৈশাখ

কয়েক মিনিট পর এল তিনটে রিপ্লাই

সিলভিয়া (সিডনি): "আমি কুমিল্লার ডালহাউসি হাউসের বারান্দা থেকে দেখছিঘুড়ি পৌঁছে গেছে আমার কাছেসেই কাতল মাছ আর তরমুজের গন্ধ এখনো নাকে"

সামিত্র (পাহাড়): "পাহাড়ের চূড়া থেকে দেখলামসূর্যের সাথে মিশে গেছেবুদ্ধের আশীর্বাদ থাকলোগারোদের ওয়াংগালার ঢোলও বাজছে পাশেবলীখেলার লাল পাজামা যেন উড়ছে আকাশে"

অনিতা (সিডনি): "তরমুজের টুকরো আর বালির পুতুল রেখো আমার জন্যআসছিশান্তি নিয়ে আসছি"

আকাশের দিকে তাকাল রিনাঘুড়িটার গায়ে লেখা সব নামএটা সবচেয়ে সুন্দর ঘুড়ি নয়কিন্তু এটাতে আছে খ্রিস্টান সিলভিয়ার ভালোবাসা, বৌদ্ধ সামিত্রের শান্তি, হিন্দু অনিতার আশীর্বাদ, খ্রিস্টান মৌসুমীর কৃতজ্ঞতা, গারোদের ওয়াংগালার ঐতিহ্য, কুমিল্লার কাতল মাছ-তরমুজের স্মৃতি, বলীখেলা-লাঠিখেলার উল্লাস, আর মুসলিম রিনার স্বাধীনতাএইভাবল রিনাএই তো বৈশাখের সোনালি সুতোধর্ম নয়মানুষ

অষ্টম

বিকালে সবাই মিলে বটগাছের নীচে পান্তা ইলিশ খেতে বসলপাশেই মৌসুমী খালার স্টল থেকে বালির পুতুলগুলো যেন সবাইকে দেখছেরিনা বলল, "আম্মু, জানো পান্তা ইলিশ আসলে ব্যাংক বানিয়েছে চল্লিশ বছর আগে?"

মা হাসলেন"জানি বাবাকিন্তু তাতে কী? তোর দিদা আমাকে পান্তা খেতে শিখিয়েছিলেনআর আমি তোকে শিখিয়েছিব্যাংক বানিয়েছে ঠিকই, কিন্তু ভালোবাসা তো আমরা বানিয়েছি"

রিনা ভাবলকী সুন্দর! ব্যাংক বানিয়েছে পান্তা ইলিশ, কিন্তু মা বানিয়েছেন স্মৃতিডালহাউসি হাউস ভাঙা, কিন্তু সিলভিয়ার মনে তার বারান্দা আছেসামিত্র পাহাড়ে, অনিতা সিডনিতে, গারোদের ওয়াংগালা বেঁচে আছে নাচ আর ঢোলেসবাই একসঙ্গেকুমিল্লার সেই কাতাল মাছ আর তরমুজের হাট এখন নেই, কিন্তু স্বাদটা আছে সিলভিয়ার গলায়বালির পুতুল মৌসুমী খালার স্টলে আছেখাতায় লেখা হবে নতুন গল্প

রিনা ইলিশ মুখে দিয়ে বলল, "কে বানিয়েছে, কিছু যায় আসে নাআমরা ভাগ করিএকসঙ্গে খাইএটাই আসল বৈশাখ"

নবম

সেই রাতে রিনা হালখাতায় লিখল:

পুরোনো বছরকে ধন্যবাদ: সিলভিয়ার জন্য, যে কুমিল্লার ডালহাউসি হাউসের গল্প বাঁচিয়ে রেখেছে সামিত্রের জন্য, যে পাহাড়ে বৈশাখের সূর্য দেখায় অনিতার জন্য, যে অস্ট্রেলিয়া থেকেও ভালোবাসা পাঠায় মৌসুমী খালার জন্য, যে বাইবেলে চামেলি ফুল চেপে রাখে আর বালির পুতুল বানায় গারোদের জন্য, যারা ধর্ম বদলালেও ওয়াংগালা ভোলেনি কুমিল্লার সেই হাটের জন্যকাতল মাছ, তরমুজ, বলীখেলা, লাঠিখেলা, সব মিলিয়ে এক বাঙালি সংস্কৃতির জন্য

নতুন বছরের প্রতিজ্ঞা: . আমি কখনো ধর্মের নামে বিভক্ত করব না . আমি দেখবমুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, গারোসবাই মিলে ঘুড়ি ওড়ায় . কুমিল্লার মতো সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে কাতল মাছ আর তরমুজ ভাগ করে খাবে . মেলায় বালির পুতুল, শোলার ডল, নকশি, হস্তশিল্পসবই একসঙ্গে থাকবে . কোনো দাঙ্গা নয়কোনো দুর্নীতি নয়শুধু শান্তি . সংস্কৃতি কারও একার নাবৈশাখ সবার

লিখল:

নববর্ষ বা বৈশাখ উদযাপন অনেক পুরোনো প্রথার মিশ্রণসম্রাট আকবর জাঁকজমক করে নববর্ষ উৎসব চালু করেছিলেন মূলত রাজ্যজমা ও করসংক্রান্ত কাজগুলোকে সমন্বয় করার জন্যএকই সময়ে রাজ্যে ট্যাক্স বা খাজনা সংগ্রহের কাজ সহজতরকল্পেবাংলা অঞ্চলে পরে শায়েস্তা খাঁ এই ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করেন; তার সময়কালে করসংগ্রহ পদ্ধতি ব্যবস্থা করা হয় এবং চৈত্র মাসের ৩১ তারিখে পুরোনো হিসাব বন্ধ করে পুণ্য/পুরস্কার প্রদানের রেওয়াজ চালু করেনসেখান থেকেই হালখাতা প্রচলিত হয়এভাবেই ব্যবসায়ীরা নতুন বর্ষকে নিয়ে আশাবাদ ও হিসাব-নিশ্চয়তার সঙ্গে বাণিজ্য শুরু করতেন

খাতা বন্ধ করে রিনা ঘুমিয়ে পড়লস্বপ্ন দেখলকুমিল্লার ডালহাউসি হাউসের বারান্দাসেখানে সিলভিয়া, সামিত্র, অনিতা, মৌসুমীসবাই বসেআর পাশে গারোদের ওয়াংগালার ঢোল বাজছেবলীখেলার পাহলোয়ানরা লাঠি ঘোরাচ্ছেকাতল মাছ আর তরমুজ কাটা হচ্ছেআকাশে ঘুড়িগায়ে লেখা: শান্তি, মিলন,বৈশাখ

কথা

নতুন বছর শুরু হয়ে গেছেসব ধর্ম ও সংস্কৃতির একসঙ্গে

কুমিল্লায় সিলভিয়া স্বপ্ন দেখছে ডালহাউসি হাউসের বারান্দারমনে পড়ছে কাতল মাছ আর তরমুজের হাটের কথা পাহাড়ে সামিত্র বুদ্ধের মূর্তির সামনে প্রদীপ জ্বালিয়ে বলছে, "শুভ নববর্ষ, সবাইকেশান্তি থাকগারোদের ওয়াংগালা বাজুক" সিডনিতে অনিতা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়েহাতে হলুদ ফুলবলছে, "শুভ নববর্ষ, বাংলাদেশআমি আসছিআমার জন্য বালির পুতুল রেখো" ঢাকায় মৌসুমী বাইবেলে শুকনো চামেলি ফুল চেপে রাখলেনপাশে রাখলেন একটি বালির পুতুলফিসফিস করে বললেন, "ধন্যবাদ সেই মেয়েটির জন্যধন্যবাদ সেই ঘুড়ির জন্যধন্যবাদ নতুন বছরের জন্যযেখানে কোনো দাঙ্গা নেই, কোনো দুর্নীতি নেইশুধু শান্তি" গারো পাহাড়ে ওয়াংগালার ঢোল বাজছেনাচছে তারাবলছে, "আমাদের নববর্ষ আমাদের আছেখ্রিস্টান হয়েছি, কিন্তু স্মৃতি কেড়ে নেয়ার ক্ষমতা কারো নেই" রমনার মেলায় এখনো নকশি বিক্রি হচ্ছে, বালির পুতুল বানাচ্ছেন কারিগররা, লাঠিখেলা হচ্ছে, বলীখেলা হচ্ছেআর গান বাজছে" বৈশাখ, বৈশাখ..."

আর শাখারী বাজারে রিনার মা শেষ বাসন মেজে স্বামীর দিকে হাসলেন"সবশেষে সে বুঝেছেবৈশাখ সবার"

বাবা মাথা নাড়লেন"নতুন সূর্য ওকে চুমু খেয়েছে শেষমেশআর সিলভিয়াকেআর সামিত্রকেআর অনিতাকেআর মৌসুমীকেওআর গারোদের ওয়াংগালাকেওআর কুমিল্লার কাতল মাছ-তরমুজের স্মৃতিকেও"

নতুন বছর শুরু হয়ে গেছে

কাঠের পুতুল তৈরি করছেবলছে, "আমাদের নববর্ষ আমাদের আছেআমাদের কাঠশিল্প আমাদের আছে স্মৃতি কেড়ে নেয়ার ক্ষমতা কারো নেই"

শেষ

মিরপুর থেকে ধানমণ্ডি যাওয়ার পথে ট্রাফিক জ্যামে পেছন থেকে একটি গাড়ি ধাক্কা দেয়প্রথমে ড্রাইভার নেমে ক্ষমা চায়তারপর নেমে দেখেন ড্রাইভার ছাড়া ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী সাতজন মেয়েএকজন মধ্যবয়সী মহিলার তত্ত্বাবধানেড্রাইভার ক্ষমা চাইতেই সেই মেয়েরা আর মহিলা শুরু করেন অশালীন গালিগালাজ ও বুলিং

রিনা দাঁড়িয়ে দেখেযেন সেই পুরোনো দিনের কুমিল্লার মাযে ভোর ৪টায় ঘর ঝাড়তেন, ধুলো মুছতেন, দশ হাতের মতো কাজ করতেনআর আজকের এই নারীদের মধ্যে ফারাকটা শুধু একটা সুতোয় বাঁধাসেই সুতো বৈশাখের সোনালি সুতোযা শেখায়: ধর্ম নয়, মানুষ বড়ভালোবাসা নয়, ভাগ করে নেয়াটা বড়গালিগালাজ নয়, নীরবতা আর ক্ষমা বড়কাতল মাছ ভাগ করা বড়, তরমুজ কাটা বড়, বালির পুতুল উপহার দেয়া বড়নতুন বছরের প্রথম সূর্য ওদের গায়েও পড়লকেউ দেখল, কেউ দেখল না

রিনা জানালা বন্ধ করলগান বাজতে লাগল"বৈশাখ / মাটির কাছ থেকে মাটির ডাক..."

লেখক: ঔপন্যাসিক, অর্থনীতিবিদ, আইটি বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তা বিশারদ

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
সীমান্ত হত্যা ও পুশইনের প্রতিবাদে বিকেলে শাহবাগে ১১ দলীয় ঐক্যের সমাবেশ আজ
প্রতারণার মামলায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর তৌহিদ আফ্রিদি গ্রেপ্তার
দিল্লি বিমানবন্দরে হয়রানি, সম্মেলনে যোগ না দিয়েই শ্রীলঙ্কা হয়ে দেশে ফিরলেন জাহেদ উর রহমান
হরমুজ প্রণালি খোলা ও মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার: যা যা থাকছে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান চুক্তিতে
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা