পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণে নতুন কমিশনের বড় চ্যালেঞ্জ আস্থা ফেরানো, পারবে তো?

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার (বিএসইসি) নেতৃত্বের পরিবর্তন নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত দেড় দশকে বারবার চেয়ারম্যান ও কমিশন বদলেছে, বদলেছে প্রতিশ্রুতির ভাষা, পরিবর্তনের অঙ্গীকার এবং সংস্কারের রূপরেখা। কিন্তু বাস্তবতা হলো- বাজারে স্থিতিশীলতা আসেনি, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরেনি, বরং দীর্ঘ সময় ধরে অনিয়ম, কারসাজি, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং নীতিগত অস্থিরতার কারণে দেশের পুঁজিবাজার এক গভীর আস্থাহীনতার সংকটে নিমজ্জিত হয়েছে।
এই বাস্তবতার মধ্যেই নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খানের নেতৃত্বে নতুন কমিশন দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। তাঁদের সামনে যেমন সম্ভাবনা আছে, তেমনি রয়েছে ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ। কারণ, তাঁরা এমন একটি বাজারের দায়িত্ব নিয়েছেন, যেখানে বিনিয়োগকারীরা বছরের পর বছর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন; যেখানে ভালো কোম্পানির চেয়ে খারাপ কোম্পানির আধিপত্য বেড়েছে; যেখানে কারসাজিকারীদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বারবার নিঃস্ব হয়েছেন। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিরপেক্ষতা ও সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
নতুন কমিশনের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা তাই অনেক বড় ও অনেক বেশি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- এই কমিশন কি সত্যিই বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবে? নাকি অতীতের মতো তারাও শেষ পর্যন্ত একই ব্যর্থতার চক্রে আটকে যাবে?
বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের ইতিহাসে ২০১০ সালের ধস একটি বড় ট্র্যাজেডি। লাখ লাখ বিনিয়োগকারী তখন সর্বস্ব হারিয়ে সর্বশান্ত হয়েছিলেন। অনেকে আত্মহত্যা করেছেন, অনেকে নিঃস্ব হয়ে পথে বসেছেন। সেই ধসের পর প্রত্যাশা ছিল- রাষ্ট্র শিক্ষা নেবে, বাজারকে সংস্কার করবে, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তুলবে এবং বাজারকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের কার্যকর প্ল্যাটফর্মে রূপ দেবে। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখেছি উল্টো চিত্র।
২০১১ সালে এম খাইরুল হোসেন দায়িত্ব নেওয়ার পর বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরলেও ধীরে ধীরে আইপিও বাজারে ভয়াবহ অনিয়ম ছড়িয়ে পড়ে। দুর্বল ও লোকসানি কোম্পানিকে অতিমূল্যায়নে বাজারে আনা হয়। অনেক কোম্পানি তালিকাভুক্তির পর বিনিয়োগকারীদের টাকা নিয়ে কার্যত অদৃশ্য হয়ে যায়। এতে আইপিও বাজারের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এরপর শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের সময়ে বাজারে কৃত্রিম উত্থান-পতনের সংস্কৃতি আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। একটি বিশেষ গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেটের হাতে বাজারের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে উচ্চারিত হয়েছে। অসংখ্য দুর্বল ও ফ্লোরবিহীন শেয়ার অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়। পরে সেই শেয়ারের পতনে লাখো বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হন। বাজারে স্বচ্ছতার বদলে গুজবনির্ভর বিনিয়োগ বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিষ্ক্রিয়তা কিংবা পক্ষপাতিত্ব নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
খন্দকার রাশেদ মাকসুদের সময়কে তুলনামূলকভাবে কম বিতর্কিত বলা হলেও সেখানে নেতৃত্বের দৃঢ়তা ও কর্মচাঞ্চল্যের ঘাটতির অভিযোগ ছিল। বাজারে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার হয়নি। বিএসইসির অভ্যন্তরেও স্থবিরতা তৈরি হয়। এমনকি কমিশনের সদস্যদের কর্মচারীদের হাতে অপদস্থ হওয়ার ঘটনাও দেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। এটি কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতার প্রতীক নয়; বরং নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ারও ইঙ্গিত।
এই দীর্ঘ ব্যর্থতার ইতিহাস নতুন কমিশনের জন্য এক কঠিন বাস্তবতা তৈরি করেছে। কারণ, এখন শুধু বাজার পরিচালনা করলেই হবে না; ভেঙে পড়া আস্থা পুনর্গঠন করতে হবে। আর আস্থা কোনো প্রশাসনিক নির্দেশে তৈরি হয় না। এটি গড়ে ওঠে সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ধারাবাহিক ন্যায্যতার মাধ্যমে।
নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খান দায়িত্ব নিয়েই যে কথাগুলো বলেছেন, সেগুলো নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। তিনি বাজারকে প্রযুক্তিনির্ভর ও ডিজিটালাইজড করার কথা বলেছেন। অযাচিত নিয়ন্ত্রণ কমানোর কথা বলেছেন। একই সঙ্গে যেখানে প্রয়োজন, সেখানে “স্মার্ট রেগুলেশন” বা বুদ্ধিদীপ্ত কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের কথাও বলেছেন। বাজারে কারসাজির বিরুদ্ধে রিয়েল-টাইম ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কথাগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বড় সংকট- প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান।
অতীতেও বহু চেয়ারম্যান দায়িত্ব নিয়ে সংস্কারের অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক চাপ, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্য, অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে সেসব প্রতিশ্রুতির অনেকটাই কাগজে সীমাবদ্ধ থেকেছে। সুতরাং নতুন কমিশনের সামনে প্রথম ও প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণ করা।
বাজারে আস্থা ফেরাতে হলে প্রথমেই নিশ্চিত করতে হবে- কারসাজিকারী যেই হোক, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অতীতে দেখা গেছে, অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী বারবার বাজারে কারসাজি করলেও কার্যকর শাস্তি হয়নি। তদন্ত কমিটি হয়েছে, প্রতিবেদন জমা হয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত শাস্তির মুখোমুখি হয়েছেন খুব কম মানুষ। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মনে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে- বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বড় অপরাধীরা শেষ পর্যন্ত পার পেয়ে যায়। এই সংস্কৃতি ভাঙতে না পারলে কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না।
নতুন কমিশনের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভালো কোম্পানির অভাব। বর্তমানে দেশের অনেক বড় ও লাভজনক কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসতে আগ্রহী নয়। কারণ তারা মনে করে, বাজারে এলে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ, অনিশ্চয়তা ও জটিলতার মুখে পড়তে হবে। অন্যদিকে বাজারে তালিকাভুক্ত বহু কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ভালো কোম্পানি ছাড়া কোনো পুঁজিবাজার দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হতে পারে না। তাই নতুন কমিশনের উচিত হবে- বাজারে তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া সহজ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য করা। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন লাভজনক কোম্পানিগুলোকে ধীরে ধীরে বাজারে আনার উদ্যোগ নেওয়া। এতে বাজারের গভীরতা বাড়বে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য নিরাপদ বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে আরেকটি বড় সংকট হলো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের দুর্বল অংশগ্রহণ। উন্নত বাজারে ব্যাংক, বীমা, মিউচুয়াল ফান্ড, পেনশন ফান্ড ও অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলো বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু বাংলাদেশে এই খাতগুলো নিজেরাই দুর্বল ও অনিয়মে আক্রান্ত। বিশেষ করে মিউচুয়াল ফান্ড খাত প্রায় ধ্বংসের মুখে। অধিকাংশ ফান্ড দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগকারীদের হতাশ করেছে। এই খাত পুনর্গঠন ছাড়া বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আনা কঠিন হবে।
বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করাও নতুন কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মূলত তিনটি বিষয় দেখে- নীতির ধারাবাহিকতা, সুশাসন এবং বাজারের স্বচ্ছতা। কিন্তু বাংলাদেশের বাজারে বারবার নীতিগত হস্তক্ষেপ, কৃত্রিম মূল্যনিয়ন্ত্রণ, হঠাৎ সিদ্ধান্ত এবং নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করেছে।
নতুন চেয়ারম্যান বলেছেন, কমিশন কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম নিয়ন্ত্রণ করবে না। এটি ইতিবাচক বক্তব্য। কারণ, বাজারকে জোর করে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় ক্ষতির কারণ হয়। তবে বাস্তবে এই অবস্থান ধরে রাখতে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ মোকাবিলা করার সক্ষমতাও থাকতে হবে।
পুঁজিবাজারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন। বর্তমান বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ছাড়া বাজার নিয়ন্ত্রণ কার্যত অসম্ভব। রিয়েল-টাইম মনিটরিং, অ্যালগরিদমিক বিশ্লেষণ, স্বয়ংক্রিয় সতর্কতা ব্যবস্থা, ডিজিটাল কমপ্লায়েন্স- এসব এখন উন্নত বাজারের অপরিহার্য অংশ। বাংলাদেশের বাজার এখনও অনেক ক্ষেত্রে সেকেলে কাঠামোর মধ্যে আটকে আছে। ফলে কারসাজি শনাক্ত করতে বিলম্ব হয়। অনেক সময় অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হয়, যখন বিনিয়োগকারীরা ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েন। নতুন কমিশন যদি সত্যিই প্রযুক্তিনির্ভর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে, তাহলে এটি বড় পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।
তবে শুধু প্রযুক্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন নৈতিক নেতৃত্ব। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের অন্যতম বড় সংকট হলো স্বার্থসংঘাত। অনেক সময় নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভেতরের ব্যক্তি, ব্রোকারেজ হাউস, মার্চেন্ট ব্যাংক, কোম্পানি উদ্যোক্তা এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর মধ্যে অস্বচ্ছ সম্পর্কের অভিযোগ উঠেছে। এতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। নতুন কমিশনকে তাই শুধু সুশাসনের কথা বললেই হবে না; নিজেদের কার্যক্রমেও তার প্রমাণ দিতে হবে। নিয়োগ, তদন্ত, অনুমোদন ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে বিএসইসির অভ্যন্তরীণ সংস্কারও জরুরি। দক্ষ জনবল তৈরি, কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা, কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। কারণ, দুর্বল প্রতিষ্ঠান দিয়ে শক্তিশালী বাজার গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। পুঁজিবাজার শুধু অর্থনীতির একটি খাত নয়; এটি দেশের অর্থনৈতিক আস্থার প্রতীক। যখন মানুষ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে, তখন তারা মূলত দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির ওপর আস্থা রাখে। তাই পুঁজিবাজারের সংকট অনেক সময় বৃহত্তর অর্থনৈতিক সংকটেরও প্রতিফলন। বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যাংক খাত চাপের মুখে, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট রয়েছে, শিল্পখাতে বিনিয়োগ কমেছে, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা বেড়েছে। এই বাস্তবতায় শক্তিশালী পুঁজিবাজার দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পায়ন ও বড় বিনিয়োগের জন্য পুঁজিবাজারকে কার্যকর বিকল্প হিসেবে গড়ে তুলতেই হবে।
নতুন কমিশনের সামনে তাই কেবল বাজার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নয়; বরং অর্থনৈতিক আস্থার পুনর্গঠনের দায়িত্বও রয়েছে। তবে এখানে একটি বাস্তব প্রশ্ন থেকেই যায়- বিএসইসি কি সত্যিই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে? বাংলাদেশের বাস্তবতায় বড় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। অতীতে বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থে বাজারে নানাভাবে হস্তক্ষেপ হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাজারকে কৃত্রিমভাবে চাঙ্গা রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। আবার কখনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে রাজনৈতিক বিবেচনায়। এই বাস্তবতায় নতুন কমিশনের প্রকৃত পরীক্ষা হবে—তারা কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। শুধু নতুন চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত সততা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
সরকার যদি সত্যিই একটি স্বচ্ছ, শক্তিশালী ও দীর্ঘমেয়াদি পুঁজিবাজার চায়, তাহলে কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে দুর্নীতিবাজ ও কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে, তারা যত প্রভাবশালীই হোক না কেন।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার সঞ্চয় হারিয়েছে। কেউ মেয়ের বিয়ের টাকা হারিয়েছেন, কেউ অবসরের সঞ্চয় হারিয়েছেন, কেউ জীবনের শেষ সম্বল হারিয়েছেন। তাই এই বাজারের সঙ্গে মানুষের আবেগও জড়িয়ে আছে। এই মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হলে দৃশ্যমান পদক্ষেপ প্রয়োজন। যদি বাজারে কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়, যদি ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়, যদি দুর্বল কোম্পানির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়, যদি নীতিগত স্থিতিশীলতা বজায় থাকে, যদি প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছ নজরদারি গড়ে ওঠে, তাহলে ধীরে ধীরে আস্থা ফিরতে পারে।
কিন্তু যদি অতীতের মতো আবারও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করা হয়, যদি তদন্ত ও শাস্তি কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে, যদি নীতিগত অস্থিরতা চলতেই থাকে, তাহলে নতুন কমিশনও শেষ পর্যন্ত আগের ব্যর্থতার ধারাবাহিকতায় পরিণত হবে।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। নতুন কমিশন চাইলে এটিকে পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে নিতে পারে। আবার ব্যর্থ হলে আস্থাহীনতার সংকট আরও গভীর হবে। সুতরাং এখন প্রয়োজন সাহসী, নিরপেক্ষ ও দূরদর্শী নেতৃত্ব। প্রয়োজন বাজারকে রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত প্রভাবমুক্ত রাখার অঙ্গীকার। প্রয়োজন বিনিয়োগকারীদের স্বার্থকে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা।
নতুন কমিশনের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা অনেক। সেই প্রত্যাশা পূরণ সহজ হবে না। কিন্তু অসম্ভবও নয়। কারণ, পুঁজিবাজারের সংকট কেবল অর্থনৈতিক সংকট নয়; এটি আস্থার সংকট। আর আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে প্রয়োজন বিশ্বাসযোগ্য কর্মসূচি, ধারাবাহিক সংস্কার এবং কঠোর জবাবদিহি। এখন দেখার বিষয়- মাসুদ খানের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশন কতটা সফল হয়।
(ঢাকাটাইমস/৭জুন/মোআ)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন











































