আমি, পদ্মা সেতু ও বিশ্বব্যাংক

অনলাইন ডেস্ক
 | প্রকাশিত : ১৪ জানুয়ারি ২০১৭, ১৭:০১

সৈয়দ আবুল হোসেন বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে আমার কথা। এই বইয়ে তিনি নিজের চিন্তা, কর্মকাণ্ড, মূল্যবোধ, নানা অভিজ্ঞতা ও পরিকল্পনা সম্পর্কে লিখেছেন।

এটি পড়লে তাকে যারা পুরোপুরি চিনেন না তাদের সুবিধা হবে। বইটি ঢাকাটাইমস২৪ডটকম ধারাবাহিকভাবে ছাপছে। বইটির আজকের পর্বে থাকছে - '​আমি, পদ্মা সেতু ও বিশ্বব্যাংক

১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে আমি স্থানীয় সরকার, পল্লি উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাই। পাসপোর্ট সংক্রান্ত একটি অন্যায্য বিতর্কের কারণে আমি মন্ত্রীর পদ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পদত্যাগ করেছিলাম। ‘অন্যায্য’ বলার যথেষ্ট যুক্তি আছে। যে-কারণে আমার পদত্যাগ সে জন্য আমি মোটেও দায়ী ছিলাম না। আমার একজন ব্যক্তিগত কর্মচারীর ভুলের কারণে অবাঞ্ছিত ঘটনাটির উদ্ভব হয়। এ ঘটনায় পত্র-পত্রিকা হুমড়ি খেয়ে পড়ে, আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রতিবেদন ছাপা হয়। আমি পদত্যাগ না করে স্বপদে বহাল থাকতে পারতাম। অনেকে এর চেয়ে জঘন্য কাজ করেও নির্বিকার থাকেন। আত্মসম্মানে আঘাত লাগায় পদত্যাগ করে নিজের নির্লোভ দৃষ্টিভঙ্গি ও সৎ মানসিকতার প্রমাণ দিয়েছিলাম। বাংলাদেশে এমন আর কেউ কি করেছেন? কেউ আমার পদত্যাগে আমার নির্লোভ দৃষ্টিভঙ্গি ও সৎ মানসিকতার প্রতিফলনের প্রশংসা করেননি।

যোগাযোগমন্ত্রী থাকাকালীন পদ্মা সেতু নিয়েও আমি অন্যায্য বিতর্কের সম্মুখীন হই। অনেকে প্রশ্ন করেন, সে-বারের মতো এবারও পদত্যাগ করিনি কেন? তাঁদের অভিমত- এবার তো পত্র-পত্রিকায় আরও বেশি লেখা হয়েছে এবং ঘটনাটিও গুরুতর। গতবার আমি ভুল না করলেও আমার ব্যক্তিগত কর্মচারী ভুল করেছিলেন। ব্যক্তিগত কর্মচারী হিসাবে দায়টা পরোক্ষ হলেও আমার ওপর বর্তায়। সে সময় আমি নিজের বিবেচনাপ্রসূত সৌকর্যকে সমুজ্জ্বল রাখার স্বার্থে ব্যক্তিত্ব ও সততার প্রতিভূ হিসেবে পদত্যাগ করেছিলাম। মনে করেছিলাম, বোদ্ধাজন আমার পদত্যাগকে বিরল ঘটনা হিসাবে দেখবেন। প্রশংসা করবেন। তা করেননি। পদত্যাগ না করলেও দোষ, আবার করলেও দোষ। 

পদ্মা সেতু নিয়ে উদ্ভূত বিতর্ক সম্পূর্ণ অন্যরকম। এবার আমি কিংবা আমার কোনো ব্যক্তিগত কর্মচারী কোনো ভুল করেননি, অন্যায় করেননি। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পদ্মা সেতু সংক্রান্ত কোনো দুর্নীতির সঙ্গে আমি বা আমার কোনো কর্মচারী জড়িত ছিল না। সৎ বা স্বচ্ছতার অধিকারী কেউ আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেনি। এমন একটি প্রতিষ্ঠান আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে, যেটি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে তৃতীয় বিশ্বের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণে অভ্যস্ত। সে প্রতিষ্ঠানটি আমার কোনো কথা শুনতে চায়নি, আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের যৌক্তিকতা যাচাইয়ে বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখায়নি। এটি এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যার বিনিয়োগ, ব্যবস্থাপনা, ঋণপ্রদান, উদ্দেশ্য- সব প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ দ্বারা চালিত। এখানে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের কথা বলার অধিকার নেই বললেই চলে।

প্রতিমন্ত্রী থাকাকালীন স্বচ্ছতা, ঔদার্য, মহত্ত্ব, মূল্যবোধ এবং নির্লোভতার কারণে পদত্যাগ করলেও তা যথাযথভাবে বিবেচিত হয়নি। আমার পদত্যাগকে প্রশংসার চোখে দেখা হয়নি। কিছু কিছু পত্রিকা পদত্যাগের অন্তর্নিহিত মননশীলতাকে অবমূল্যায়ন করে অমর্যাদাকর প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। আমার অনিমেষ অভিলাষ প্রশংসার পরিবর্তে উপহাসে কলঙ্কিত হয়েছে। পদত্যাগ করলে বলা হয়- দোষ না করলে পদত্যাগ করল কেন? পদত্যাগ না করলে বলা হয় : এত লোভী কেন? এটি এক ধরনের নিষ্ঠুরতা, ক্রুর পরিহাস। আমি মন্ত্রী হওয়ার পর একদিনও ভালোভাবে ঘুমোতে পারিনি। সারাদিন, সারারাত অর্পিত দায়িত্ব আমার ওপর কর্তব্যের বোঝা হয়ে আমাকে তাড়িত করেছে। আমি নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়েছিলাম দেশের জন্য; অর্পিত দায়িত্ব সততার সাথে পরিপালনের জন্য। বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা যে-দেশের সংস্কৃতি, সে-দেশের মানুষের ভালো দিকগুলো বিকশিত হওয়ার সকল পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। উপযুক্ত পরিবেশ ছাড়া নান্দনিকতার বিকাশ সম্ভব নয়।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজের মোবাইল আর মেইল নম্বর জনসমক্ষে প্রচার করে যে মহত্ত্বের পরিচয় দিয়েছেন তা পৃথিবীতে বিরল। অথচ এটাকে বিরোধী দলের কিছু নেতা এবং গুটিকয়েক বুদ্ধিজীবী প্রতারণা আখ্যায়িত করেছিলেন। যাঁরা এমন মন্তব্য করেন তাঁদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও ছিলেন। তিনি মন্ত্রীও হয়েছিলেন। তাঁর মতো একজন লোকের ঠোঁট-জিহ্বা যদি এমন অশালীন শব্দ উচ্চারণ করতে পারেন- তাহলে অন্যদের ক্ষেত্রে কী হতে পারে বলাই বাহুল্য। যে দেশে ক্ষমাকে দুর্বলতা, মহত্ত্বকে ভয় হিসাবে উপহাস করা হয়, সে দেশে উদারতা আর মহত্ত্ব কীভাবে বিকশিত হবে? কীভাবে বিস্তৃত হবে মানবীয় গুণাবলির নান্দনিক সৌরভ? কীভাবে প্রসারিত হবে সততার জন্য প্রয়োজনীয় সাহস! তাহলে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে হলো কেন?

আর্থিক স্বাধীনতা ছাড়া রাজনীতিক স্বাধীনতা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। কোনো ঋণগ্রহীতার পক্ষে কখনও স্বাধীনভাবে স্বীয় উন্নয়নে নিবেদিত হওয়ার সুযোগ থাকে না। ঋণচুক্তিতে কোনো দেশকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার অনুুকূল কোনো সুযোগ রাখা হয় না।

পদত্যাগ করতে হলো কথাটা ঠিক নয়। আমাকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করতে বলেননি। আমি নিজে পদত্যাগ করেছি। বিশেষ করে, আমার পরিবারের সদস্যবর্গ এমন একটি অবাঞ্ছিত ও বিব্রতকর অবস্থা মেনে নিতে পারছিল না। বিশ্বব্যাংক প্রথমে বলেছিল, আমাকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দিলে পদ্মা সেতুর ঋণ অবমুক্ত করবে। সরিয়ে দেওয়া হলো। তারপরও ঋণ অবমুক্ত করা হলো না কেন?

এবার দাবি তুলল আমাকে মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হবে। নইলে ঋণ দেবে না, পদ্মা সেতু প্রকল্প আটকে থাকবে। পদ্মা সেতু ১৬ কোটি মানুষের স্বপ্ন। আমার জীবনের চেয়ে অনেক বড়। অনেক মানুষ দেশের জন্য জীবন দিয়েছে। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। দেশ স্বাধীন করার জন্য ত্রিশ লক্ষ লোক জীবন দিয়েছেন। দেশের জন্য জীবন দেওয়ার চেয়ে কৃতিত্ব আর নেই। তাই বলে কি যুদ্ধক্ষেত্রে সবাইকে মরে যেতে হবে? তাহলে জয় আনবে কে? সবাই শাহাদাতবরণ করলে তো স্বাধীনতা আসত না। লড়ে মরাটাই হচ্ছে বাহাদুরি। শত্রু আমাকে মরে যেতে বলল আর আমি শাহাদাতের মর্যাদা নিয়ে প্রাণত্যাগ করব- এটি দেশপ্রেম নয়, পালিয়ে বেড়ানো; বুদ্ধিমত্তা নয়, মূঢ়তা। যুদ্ধক্ষেত্রে একজন সৈনিক প্রাণ দিতে পারেন, আমি আবুল হোসেন পদত্যাগ করতে পারব না; এমনটি হয় না। আমি পদত্যাগ করেছি চ্যালেঞ্জ দিয়ে। বজ্রকণ্ঠে বলেছি- পদ্মা সেতু নিয়ে কোনো দুর্নীতি হয়নি। তবু পদত্যাগ করেছি। যদি আমার পদত্যাগের বিনিময়ে বিশ্বব্যাংক ঋণ দেয়! পদ্মা সেতু হয়!! ১৬ কোটি মানুষের স্বপ্ন সফল হয়।

যার মধ্যে বিবেচনা-বোধ নেই, সে কখনও ভালো হতে পারে না। যে ভালো নয়, সে কখনও সত্য কথা বলতে পারে না। আমি- একজন ব্যক্তির জন্য বিশ্বব্যাংক ১৬ কোটি মানুষকে কষ্ট দিয়েছে, এটি কতটুকু গ্রহণীয় তা বিবেচনার দাবি রাখে। এখানে ব্যক্তিবিশেষের দুর্নীতি কোনো নিয়ামক ছিল না। তা যদি হতো, তাহলে ১৬ কোটি মানুষকে শাস্তি দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিতে যাবে কেন? বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তি বহাল রেখেও দুর্নীতির বিষয়টা খতিয়ে দেখতে পারত। আমার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তি দেওয়া যেত। এ জন্য পদ্মা সেতুর ঋণচুক্তি বাতিল তো উদোর পি-ি বুধোর ঘাড়ে চড়ানোর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। 

আমি তিন বছর যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলাম। আমার সময়ে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে যতগুলো প্রকল্প পাস হয়েছে বিগত একশ’ বছরেও কিংবা আগামী পঞ্চাশ বছরেও প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে পরিমাণ ও গুণগত বিবেচনায় অনুরূপ সংখ্যক প্রকল্প গ্রহণ করা সম্ভব হবে না। এটি আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি। এমনটি সম্ভব হয়েছে- আমার কঠোর শ্রম, আত্মপ্রত্যয়ী মনোভাব, আন্তরিক নিষ্ঠা, অমানুষিক শ্রম, লৌহকঠিন সততা আর বিচক্ষণতার কারণে। কাজের ক্ষেত্রে আমি কর্মী। মন্ত্রী হিসাবে নিজেকে কখনও দেখিনি। কারও সঙ্গে দুর্ব্যবহার করিনি। সরকারি চাকরিজীবী কর্মস্থলে আসার সময় মনটা বাসায় রেখে আসে না। আমি এটি অনুভব করি। তাই সবাইকে ভালবাসা দিয়ে কাজ আদায় করেছি। অনুকূল সাড়া পেয়েছি। কাউকে চড় মারতে হয়নি।

আমি বাংলাদেশের যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পারিনি। ষড়যন্ত্র, পরশ্রীকাতরতা আমার নিষ্ঠা আর সরলতাকে জয়ী হতে দেয়নি। বঙ্গবন্ধুকেও এমন ষড়যন্ত্রের কারণে শাহাদাতবরণ করতে হয়েছে, নিজের দলের বিশ্বস্ত লোকের কাছে।
আমাদের অনেকের কাছে দেশের চেয়ে দল, দলের চেয়ে ব্যক্তি বড়। আমার জন্য পদ্মা সেতু হয়নি, এটার চেয়ে আমার বিরুদ্ধে আনীত তথাকথিত দুর্নীতিটাই সবাই বড় করে দেখেছে। রাস্তাঘাটেও এমন দৃশ্য প্রায় দেখা যায়। দুর্ঘটনায় কাতর লোকটি মৃত্যুযন্ত্রণায় লাফাচ্ছে; তার দিকে কারও খেয়াল নেই। জনগণ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী কে তাকে নিয়ে হুল্লোড়ে মেতে ওঠে। পৃথিবীর আর কোনো দেশে এমনটি দেখা যায় না। পদ্মা সেতু প্রকল্পের ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনটি ঘটেছে। আমার বিরুদ্ধে আনীত তথাকথিত দুর্নীতি নিয়ে আমার বিরুদ্ধে যা লেখালেখি হয়েছে- পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের জন্য তার সহস্রভাগ লেখাও পত্রিকায় আসেনি।

আমি যদি সামান্য দুর্নীতি করতাম তাহলে এতগুলো অপ্রতিরোধ্য শক্তির কাছে কি টিকতে পারতাম? সবাই বলছে দুর্নীতি হয়েছে, কিন্তু কেউ দেখাতে পারেনি। সবার টার্গেট ছিলাম আমি। অযথা কেন একজন মানুষের ওপর এমন দোষারোপ? এটি কি দুর্নীতি নয়? অথচ আমি পদ্মা সেতু কেন, কোনো বিষয়ে কখনও দুর্নীতির আশ্রয় নিইনি।

জনগণকে আমার বিরুদ্ধে যেভাবে উত্তেজিত করার চেষ্টা করা হয়েছে- পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য সেভাবে উদ্দীপ্ত করার চেষ্টা করা হলে, এতদিনে পদ্মা সেতু পুরোটাই হয়ে যেত। এসব কারা করেছে? কেন করেছে? বুদ্ধিজীবীরা। যারা দেশের মাথা বলে পরিচিত। মাথা যদি টলে যায়, তাহলে শরীর কীভাবে ঠিক থাকে!
যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে প্রতিবছর সহস্র কোটি টাকার কাজ হয়। কোনো ঠিকাদার বলতে পারবেন না আমি দায়িত্বকালীন কখনও প্রকল্প বাস্তবায়নে সামান্য নিয়মনীতি লঙ্ঘন করেছি। কোনো অনৈতিক সুবিধা দাবি করেছি। মন্ত্রী থাকাকালীন আমি আমার ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান সাকোর সাথেও জড়িত ছিলাম না।


বিশ্বব্যাংকের মতো দুনিয়া কাঁপানো একটি প্রচ- শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশের প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া, বিরোধী দল, বুদ্ধিজীবী- সবাই আমার ওপর খড়গহস্ত হয়ে উঠেছিল। তাদের সম্মিলিত দাবি ছিল- পদ্মা সেতু নিয়ে কথিত দুর্নীতির সঙ্গে আমি জড়িত। এজন্য বিভিন্ন মহল থেকে আমার শাস্তি দাবি করা হয়েছে। আমাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য, সরকারকে বিপদে ফেলার জন্য লেখালেখি হয়েছে, কিন্তু পদ্মা সেতু প্রকল্প কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তা নিয়ে তেমন কারও মাথাব্যথা লক্ষ্য করা যায়নি। 
দুর্নীতির সাথে জড়িত থাকলে যেকোনো সময় আমাকে ধরা যেত, কিন্তু পদ্মা সেতু প্রকল্পকে বাদ দিয়ে শুধু আমাকে নিয়ে উঠেপড়ে লাগা- এটাই প্রমাণ করে যে এখানে আসলে কোনো দুর্নীতি হয়নি। দুর্নীতির অভিযোগ ছিল ঋণচুক্তি বাতিলের একটি অজুহাত মাত্র। আমি যদি সামান্য দুর্নীতি করতাম তাহলে এতগুলো অপ্রতিরোধ্য শক্তির কাছে কি টিকতে পারতাম? সবাই বলছে দুর্নীতি হয়েছে, কিন্তু কেউ দেখাতে পারেনি। 

সবার টার্গেট ছিলাম আমি। অযথা কেন একজন মানুষের ওপর এমন দোষারোপ? এটি কি দুর্নীতি নয়? অথচ আমি পদ্মা সেতু কেন, কোনো বিষয়ে কখনও দুর্নীতির আশ্রয় নিইনি।
এত কিছুর পরও কেউ দুর্নীতির সামান্যতম প্রমাণ হাজির করতে পারেনি। এর অর্থ- পদ্মা সেতু নিয়ে কোনো দুর্নীতি হয়নি। হয়েছে মিথ্যাচার- বিশ্বব্যাংক বেনামি অভিযোগের ভিত্তিতে আমার মতো একজন নিরীহ ব্যক্তির বিরুদ্ধে নৃশংস খড়গ চালিয়েছে। এমন আচরণকে সিলেটে নৃশংস কায়দায় হত্যা-করা শিশু রাজনের ঘটনার সঙ্গে তুলনা করা যায়। বিশ্বব্যাংক, পত্র-পত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া আমার বিরুদ্ধে যেভাবে উঠেপড়ে লেগেছে সামান্য দুর্নীতির আভাস পেলেও আমার অস্তিত্ব থাকত না। কিন্তু আমার বিরুদ্ধে শুধু একটি অভিযোগ- পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতি হয়েছে। তাও আবার ভুয়া, কাল্পনিক। পাঠক, জন্মের পূর্বে জীবনধারণ কীভাবে সম্ভব? আমি দুর্নীতি করলে সরকার অবশ্যই আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিত। ব্যক্তিবিশেষের জন্য সরকার দায় নিতে যাবে কেন? আমি এমন প্রভাবশালীও নই যে, প্রধানমন্ত্রী তার দায় নেবেন। আমি কোনো অন্যায় করিনি, আমার কোনো দুর্নীতির প্রমাণ পাননি বলে প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী এবং সরকার সাহসী গলায় বলতে পারছেন- পদ্মা সেতু নির্মাণে কোনো দুর্নীতি হয়নি। যা শেষ পর্যন্ত প্রমাণ হয়েছে।


যোগাযোগমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের পর পর আমার বিরুদ্ধে কোটি টাকা খরচ করে মন্ত্রীর কক্ষ নির্মাণের অভিযোগ আনা হয়েছিল। অথচ কক্ষটি নির্মাণ নয়, মেরামত করা হয়েছিল। সেটি মেরামত যোগাযোগ মন্ত্রণালয় নয়, করেছিল গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। খরচ হয়েছে মাত্র সাত লক্ষ টাকা। অভিযোগ করা হয়েছে আমি কোটি টাকার গাড়ি কিনেছি, অথচ কোনো গাড়িই কেনা হয়নি। 


আমি বাংলাদেশের একমাত্র মন্ত্রী, যে একদিনের জন্যও সরকারি গাড়ি ব্যবহার করিনি। নিজের গাড়ি চড়ে অফিস করেছি। বিদেশি মেহমানদের নিজের খরচে আপ্যায়ন করেছি। তারপরও যদি এমন মিথ্যা খবর ছাপা হয়, তাহলে সংবাদপত্রের গ্রহণযোগ্যতা কীভাবে থাকে! ভূতের গল্প যেমন মানুষ পরম আগ্রহে পড়ে কিন্তু বিশ্বাস করে না, তেমনি কিছু পত্রিকার অবস্থাও অনেকটা সেরূপ। আমিই বাংলাদেশের একমাত্র মন্ত্রী যে গত সাড়ে তিন বছরে মাত্র দুই বার সরকারি খরচে বিদেশ গিয়েছি। তাও ডেলিগেশনের নেতা হিসাবে। তারপরও আমাকে দুর্নীতির দায় নিতে হয়েছে? আমি নিজের অর্জিত বৈধ অর্থ দিয়ে কেনা গাড়িতে চড়ে অফিস করেছি। পত্রিকা প্রতিবেদন ছাপায়- আমি কোটি কোটি টাকা গাড়ি ক্রয়ে ব্যয় করেছি। মন্ত্রীর কথা বাদ দিলাম, অনেক অফিসারও একাধিক গাড়ি হাঁকিয়ে বেড়ান; স্ত্রী-পুত্র-কন্যারা সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেন। আমার পরিবারের কোনো সদস্য কখনও একদিনের জন্যও সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেনি। বিদেশ ভ্রমণে অনেকে কাঁড়ি কাঁড়ি সরকারি অর্থ ব্যয় করেন। আমি রাষ্ট্রীয় কাজেও নিজের অর্থ খরচ করে বিদেশ গিয়েছি। গ্রামের বাড়িতে আমি একটি রেস্ট হাউস করেছি, আমার রুচিমতো। এটি নিয়েও বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় বিরূপ মন্তব্য করা হয়েছে। কিন্তু কেন আমি ঐ রেস্ট হাউসটি করেছি সে বিষয়ে কেউ লেখেননি। লেখেননি আমি এলাকার উন্নয়নের জন্য কত অবদান রেখেছি, লেখেননি শিক্ষা বিস্তারে আমার অবদান কত অনবদ্য। এটি কি দুর্নীতি নয়? এটি কি নিষ্ঠুরতা নয়? এটি কি পরশ্রীকাতরতা নয়?


যে এলাকায় আমি রেস্ট হাউস করেছি, সেখানে জাতীয়করণকৃত শেখ হাসিনা একাডেমী অ্যান্ড উইমেন্স কলেজ, সৈয়দ আতাহার আলী একাডেমী অ্যান্ড কলেজ ছাড়াও অনেকগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। ডাসার থানা কার্যালয়ও এখানে অবস্থিত। যেগুলো আমি প্রতিষ্ঠা করেছি, আমার চেষ্টায় প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। প্রতিদিন দেশ-বিদেশের বহু লোক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দেখার জন্য আসেন। কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ছাড়াও অনেক লোক এখানে এসেছেন, প্রতিদিন আসছেন। তাঁদের জন্য এমন একটি রেস্ট হাউস প্রয়োজন। অধিকন্তু আমি নিজের অর্থ ব্যয় করেÑ  এ রেস্ট হাউস করেছি। কোনো সরকারি অর্থ ব্যয়ে নয়। প্রতিটি অর্থের বিপরীতে সরকারি কোষাগারে আয়কর দিয়েছি। আমাকে নিয়ে লেখালেখি যতই হোক- বিশ্বব্যাংকের কাল্পনিক অভিযোগ ছাড়া কেউ কখনও দুর্নীতির অভিযোগ আনতে পারেনি। এমনকি আমার শত্রুরাও। পুরো পৃথিবীর মানুষও যদি বলে পৃথিবী চ্যাপ্টা, তবু পৃথিবী গোল। হায় কপাল, দশচক্রে ভগবান ভূত হয়ে যায়।


বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ- পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগে কানাডাভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের নিকট থেকে অবৈধ অর্থ দাবি করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক প্রথম দিকে আমার প্রাক্তন প্রতিষ্ঠান সাকোর কোনো এক কর্মকর্তার জড়িত থাকার ধুয়া তুলে যথাসময়ে তার নাম প্রকাশের দাবিও করেছিল। তখন আমি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে জড়িত ব্যক্তির নাম প্রকাশ করতে বলেছিলাম। বলেছিল যথাসময়ে নাম প্রকাশ করবে। পারেনি। মিথ্যা কখনও প্রতিষ্ঠা করা যায় না। অতঃপর তারা সে দাবি থেকে সরে আসে।
আমার প্রতিষ্ঠান সাকো কোন অন্যায়, অবৈধ কাজ করেনি, করতে পারে না। সাকো আমার হাতে শ্রম-নিষ্ঠা আর সততায় গড়া একটি প্রতিষ্ঠান। সাকোর সুনাম, সাকোর দৃঢ়তা বিশ্বের যেকোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ে অনেক বেশি। আমার প্রতিষ্ঠানের জড়িত থাকার প্রমাণ দিতে না পারায়Ñ মোড় অন্য দিকে পাল্টে দেয়। 


দাবি করা হয়, কানাডাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তার ডায়রিতে কিছু সাংকেতিক নাম পাওয়া গিয়েছে। কারও খাতায় সাংকেতিক নাম পাওয়া যদি দুর্নীতি প্রমাণের চিহ্ন হয়, তাহলে যে-কেউ যে-কাউকে দুর্নীতিবাজ বানিয়ে নিতে পারে। ডায়েরিতে সাংকেতিক নাম লিখে রাখলেই হলো। আমার ডায়েরিতে আমি যদি কারও নাম লিখে রাখি, তাহলে সে ব্যক্তিকে কি দুর্নীতিবাজ বলা যাবে? 


তর্কের খাতিরে পরামর্শক নিয়োগে কোনো দুর্নীতি কিংবা ঘুষ আদান-প্রদানের কথিত দাবি সত্য বলে ধরে নেওয়া হলেও- এর সঙ্গে আমার জড়িত থাকার কোনো সুযোগ ছিল না। কারণ আমি আমাকে জানি। আমি দুর্নীতি করেছি কিনা তা আমার চেয়ে আর বেশি কেউ জানে না। পৃথিবীর সবাই যদি বলে আমি দুর্নীতি করেছি- তাও সত্য হবে না, যদি আমি দুর্নীতি না করি। আবারও বলছি, এক্ষেত্রে আমার দুর্নীতি করারও কোনো সুযোগ ছিল না।


কানাডাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি জানে, পরামর্শক নিয়োগে আমার বিন্দুমাত্র ভূমিকা ছিল না। আমি প্রভাবিত করতে পারি- এমন কোনো ব্যক্তি পরামর্শক কমিটিতে ছিলেন না। বিশ্বব্যাংকের নির্দেশনায় আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠন করা হয়েছিল। প্যানেলের দশ জন বিশেষজ্ঞের মধ্যে তিনজন জাপানি, একজন হল্যান্ডের, একজন নরওয়ের এবং বাকি পাঁচজন ছিলেন বাংলাদেশি। 


ডিজাইন পরামর্শক সংস্থা যে প্রতিবেদনগুলো জমা দিয়েছিল- তা পর্যালোচনা করে বিশেষজ্ঞ প্যানেল তাদের মতামত দিয়েছিল। সে মতামতের ভিত্তিতে পদ্মা সেতুর ডিজাইন চূড়ান্ত করা হয়। প্রাক-যোগ্যতা নির্ধারণের জন্য সরকার আর-একটি কমিটি গঠন করে, যার সুপারিশ বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও জাইকা অনুমোদন করেছিল। সুতরাং এটি নিশ্চিত যে, পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগের ব্যাপারে আমার কিংবা আমার মন্ত্রণালয়ের অন্য কারও প্রভাব বিস্তারের কোনো সুযোগ ছিল না।


বিশ্বব্যাংক পরামর্শক নিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদন করার পর, হঠাৎ দুর্নীতির কথা তুলে পদ্মা সেতুর প্রত্যাশাকে ধূলিস্যাৎ করে দেয়। এর কারণ হচ্ছে- বিশ্বব্যাংকের কিছু তদবিরের বিরুদ্ধে পরামর্শক কমিটির অবস্থান। বিশ্বব্যাংক একটি চায়না কোম্পানিকে প্রাক্-যোগ্য ঘোষণার জন্য চাপ প্রয়োগ করে আসছিল। চায়না কোম্পানিটি প্রাক্-যোগ্য বিবেচিত না হওয়ায় বিশ্বব্যাংক ক্ষেপে যায়। কোম্পানিটিকে প্রাক্-যোগ্য করার জন্য সরকারের ওপর প্রচ- চাপ প্রয়োগ করতে শুরু করে। আমাকেও এ বিষয়ে প্রভাব খাটানোর জন্য চাপ প্রয়োগ করেছিল। আমি জানিয়েছিলাম, এ বিষয়ে আমার কিছু করার নেই। কমিটিই সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারী।


বিশ্বব্যাংকের তথাকথিত দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগকে সবাই বড় করে দেখল; আমার আর বাংলাদেশের অবস্থানকে বাঙালি হয়েও অধিকাংশ বাঙালি বুদ্ধিজীবী আমলে নিল না। এটি আমাদের সাদা-চামড়া প্রীতি আর পুঁজিবাদ-পুজোর পরিচয়কে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। সাদা চামড়ার লোক যেন কোনো অপরাধ করতে পারে না?


তারপরও বিশ্বব্যাংক অযোগ্য বিবেচিত চায়না কোম্পানিটিকে প্রাক্-যোগ্য করার জন্য সরকার ও কমিটির ওপর চাপ দিয়ে যেতে থাকে। পরামর্শক নির্বাচন কমিটি বার বার যাচাই করেও চায়না কোম্পানিটিকে যোগ্য বলার কোনো হেতু খুঁজে পায়নি। বরং প্রমাণিত হয়, কোম্পানিটি ভুয়া অভিজ্ঞতার সনদ ও জাল কাগজপত্র দিয়ে প্রস্তাব জমা দিয়েছিল। একটি ভুয়া কোম্পানির স্বপক্ষে বিশ্বব্যাংকের ওকালতি এবং তা সরকার কর্তৃক দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়ে শুরু হয়- বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের প্রকাশ্য বিরোধ। তার সঙ্গে ইন্ধন জোগায় কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তির ষড়যন্ত্র এবং মিডিয়ার মিথ্যা বিবরণ ও অপপ্রচার।  যে সকল সাংবাদিক মিথ্যা লেখেন, যে জন্যই এমন করা হোক না কেন, পক্ষান্তরে নিজেদেরই ক্ষতি হয়, নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন। আমার বিরুদ্ধে পত্রিকায় যা লেখা হয়েছিল, তার পুরোটাই ছিল মিথ্যা। এসব লেখা যে মিথ্যা তা প্রমাণের চ্যালেঞ্জ আমি প্রকাশ্যে দিয়েছিলাম। কিন্তু পরাজিত হবে জেনে- কেউ এগিয়ে আসেননি। তারা জানতেন, আমার বিরুদ্ধে যা বলা হয়েছে সব মিথ্যা ও বানোয়াট।


সরকার বিশ্বব্যাংকের অন্যায় দাবির কাছে মাথা নত না করায়, আমি বিশ্বব্যাংকের অনৈতিক দাবির অনুকূলে সাড়া দিতে অপারগতা প্রকাশ করায়, প্রতিশোধস্বরূপ দুর্নীতির কথা তোলে। দরিদ্র দেশগুলোর ওপর বিশ্বব্যাংকের এমন অনৈতিক চাপ কোনো নতুন বিষয় নয়। ‘গরিবের বৌ সবার ভাবী’- প্রবাদের ন্যায় সুযোগ পেলে সবাই ঠোকা মারে। এ অবস্থায় প্রভাবশালীর অনৈতিক কার্যকে আমলে না নিয়ে গরিবের বৌটাকে সবাই দুষে। বিশ্বব্যাংকের তথাকথিত দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগকে সবাই বড় করে দেখল; আমার আর বাংলাদেশের অবস্থানকে বাঙালি হয়েও অধিকাংশ বাঙালি বুদ্ধিজীবী আমলে নিল না। এটি আমাদের সাদা-চামড়া প্রীতি আর পুঁজিবাদ-পুজোর পরিচয়কে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। সাদা চামড়ার লোক যেন কোনো অপরাধ করতে পারে না?


একটি পত্রিকায় ‘ব্যক্তির দায় প্রজাতন্ত্র বইবে কেন’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদন দেখলাম। তাতে কী লেখা হয়েছে পুরো পড়িনি। তবে কয়েকজন জানালেন- আমাকে লক্ষ্য করে লেখা হয়েছে। শিরোনাম দেখে লেখকের দূরদর্শিতার আর বিচক্ষণতার ঘাটতি দেখে হাসি পেয়েছিল। প্রজাতন্ত্রের প্রধান কর্তব্য প্রজাকে রক্ষা করা। কোনো প্রজা যাতে অন্যায়-অবিচার কিংবা প্রভাবশালী কারও হেনস্তার শিকার না হয়, তা দেখার দায়িত্ব প্রজাতন্ত্রের। যে প্রজাতন্ত্র ব্যক্তিকে রক্ষা করতে পারবে না সে কীভাবে রাষ্ট্রকে রক্ষা করবে? এ বিষয়টি ওই লেখকের বোধে ছিল না হয়তো।

একাত্তরে অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে পাকিস্তানিরা দুর্যোগ সৃষ্টি করেছিল বলে স্বাধীনতার সুযোগ এসেছে। আমরা প্রেরণা পেয়েছিলাম ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। বিশ্বব্যাংকের ঋণচুক্তি বাতিল আমাদের আবার ঐক্যবদ্ধ হয়ে জাপানের মতো, সিঙ্গাপুরের মতো, মালয়েশিয়ার মতো আর্থিকভাবে সার্বভৗম হবার প্রেরণায় উজ্জীবিত হওয়ার বিরল সুযোগ সৃষ্টি করেছিল।


অত্যন্ত গৌরবের সাথে বলতে পারি, বর্তমান সরকার বিশ্বব্যাংকের অন্যায় আবদার আর আচরণের বিরুদ্ধে প্রবল সাহসে প্রতিবাদমুখর ছিল। একাত্তরে বাংলাদেশের জনগণ বিশ্বব্যাংকের চেয়ে বড় শক্তিকে প্রতিহত করেছিল। রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য অন্যায়-অত্যাচার হতে নিরীহ, সৎ ও সজ্জন ব্যক্তিকে রক্ষা করা, হোক সে একজন কিংবা একশ জন। একশ জন লোক একজন লোককে হত্যা করেছে বলে কি অপরাধীগণ ক্ষমা পেয়ে যাবে! 


অনেকে বলেন, বিশ্বব্যাংকের পদ্মা সেতু প্রকল্প হতে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত একটি দুর্যোগ। তা বটে- কিন্তু দুর্যোগ ছাড়া সুযোগ সৃষ্টি হয় না। তাই দুর্যোগ আর সুযোগ সব সময় রাত-দিনের মতো পর্যায়ক্রমিক পরিবন্ধন। একাত্তরে অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে পাকিস্তানিরা দুর্যোগ সৃষ্টি করেছিল বলে স্বাধীনতার সুযোগ এসেছে। আমরা প্রেরণা পেয়েছিলাম ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। বিশ্বব্যাংকের ঋণচুক্তি বাতিল আমাদের আবার ঐক্যবদ্ধ হয়ে জাপানের মতো, সিঙ্গাপুরের মতো, মালয়েশিয়ার মতো আর্থিকভাবে সার্বভৗম হবার প্রেরণায় উজ্জীবিত হওয়ার বিরল সুযোগ সৃষ্টি করেছিল। 


মনে রাখা উচিত, আর্থিক স্বাধীনতা ছাড়া রাজনীতিক স্বাধীনতা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। কোনো ঋণগ্রহীতার পক্ষে কখনও স্বাধীনভাবে স্বীয় উন্নয়নে নিবেদিত হওয়ার সুযোগ থাকে না। ঋণচুক্তিতে কোনো দেশকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার অনুুকূল কোনো সুযোগ রাখা হয় না। 


পত্রিকায় বিভিন্নভাবে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা, বানোয়াট ও মনগড়া প্রতিবেদন ছাপা হয়। বিশ্বব্যাংক জানায়, আমি যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে থাকলে পদ্মা সেতুর ঋণ প্রদান করা হবে না। দেশের স্বার্থে আমি যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে সরে যাই। তারপরও বিশ্বব্যাংক ঋণ দেয়নি। এতে কী বোঝা যায়? চায়না কোম্পানির নিকট থেকে প্রতিশ্রুত সুবিধা পেতে ব্যর্থ হয়ে বিশ্বব্যাংক প্রচ-ভাবে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। কাল্পনিক দুর্নীতির তদন্ত করার দাবি জোরদার করে। সরকার কোনো দুর্নীতি হয়নি জানানো সত্ত্বেও আর্থিক কারণে বিশ্বব্যাংকের অন্যায় দাবির কাছে মাথা নত করতে বাধ্য হয়। তাহলে, বিশ্বব্যাংক কি সার্বভৌমত্বের চেয়ে বড়? বিশ্বব্যাংকের গ্রহণযোগ্যতা কি বাংলাদেশ সরকারের চেয়ে অধিক? একটি অর্থলগ্নীকারী প্রতিষ্ঠান কখনও দেশের চেয়ে, রাষ্ট্রের চেয়ে, সরকারের চেয়ে বড় হতে পারে না।


বিশ্বব্যাংকের দাবির মুখে দুদক আমার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। তদন্তে কিছু পাওয়া যায়নি। সত্য প্রকাশ হয়ে পড়ায় আরও ক্ষেপে যায় বিশ্বব্যাংক। তার পরও আমার প্রতি হিংস্র থাবা বাড়িয়ে রাখে। বিভিন্নভাবে আমাকে হয়রানি করার চেষ্টা করা হয়। দেশীয় কয়েকটি পত্রিকার মাধ্যমে এটি আরও বিকট করে তোলা হয়। অবশেষে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু নির্মাণে তাদের প্রতিশ্রুত অর্থ প্রদান এবং চুক্তি বাতিল করে দেয়। আমি দুর্নীতি না করা সত্ত্বেও দুদক যদি দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছি বলত- তাহলে সেটি কি উচিত হতো! দুদক তদন্তের পর তদন্ত করে শেষ পর্যন্ত দেখতে পায়- আমি কোনো অন্যায় করিনি। বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। তাই চূড়ান্ত বিশ্লেষণে দুদকের তদন্তে ও প্রমাণিত হয় যে, আমি নির্দোষ। 


বিশ্বব্যাংক উন্নয়নশীল বিশ্বের দুর্বল অবস্থানের কথা জানলেও আমার নৈতিক ও দৃঢ় মনোবল বিষয়ে ধারণা রাখে না। নইলে কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠানের কাছে ঘুষ দাবির বিষয়ে আমার সংশ্লিষ্টতার কথা কখনও তুলত না। শিশিরবিন্দুর কাছ থেকে যেমন সমুদ্র জলপ্রত্যাশী নয়, তেমনি কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকেও আমি অর্থপ্রত্যাশী হতে পারি না। আমার নিকট কল্পিত দুর্নীতির বর্ণিত ১০ ভাগ অর্থ সমুদ্রের কাছে শিশিরবিন্দুর ন্যায়। এটি আমার অবস্থান, মনোবল ও সততার প্রতি যাঁরা পরিচিত তাঁরা সহজে অনুধাবন করতে পারবেন। 
আমি অর্জিত অর্থ জনগণের কল্যাণে আর শিক্ষা বিস্তারে ব্যয় করেছি। ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে যোগাযোগমন্ত্রী হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত যে পরিমাণ অর্থ বিভিন্ন শিক্ষালয়সহ জনকল্যাণে ব্যয় করেছি- তা বিনিয়োগ করলে এ রকম একটা পদ্মা সেতু সহজে একাই নির্মাণ করে দিতে পারতাম। 
মূলত আমি ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচারের শিকার। বিশ্বব্যাংক এখন নিজেই তা অনুধাবন করতে পেরেছে। তারা বুঝতে পেরেছে- গুটিকয়েক ষড়যন্ত্রকারীর বেনামি পত্রের ভিত্তিতে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিয়ে এবং ষড়যন্ত্রকারীদের মিথ্যা অভিযোগের ফাঁদে পা দিয়ে বিশ্বব্যাংক ভুল করেছে। এ ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যাঁরা জড়িত ছিলেন তাঁদের অনেকে চাকরি হারিয়েছেন। যে একজন আইনজীবীকে দিয়ে আমার বিরুদ্ধে আনীত মিথ্যা অভিযোগ চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়েছিল তার কী পরিণতি হয় তা দেখার অপেক্ষায় আছি। বিশ্বব্যাংক নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে। অপপ্রচারকারী মিডিয়া ও ষড়যন্ত্রকারীদের সকল মিথ্যা অভিযোগ সর্বৈব মিথ্যা প্রমানিত হয়েছে- এটি আমার এখন বড় সান্ত¦না।


তিল তিল শ্রমে অর্জিত সততার মাধ্যমে ব্যবসায় করে নিজেকে এ অবস্থানে এনেছি। মানুষ অর্জিত আয় আমোদ-ফুর্তি ও আয়-বর্ধনের কাজে লাগায়। আমি অর্জিত অর্থ জনগণের কল্যাণে আর শিক্ষা বিস্তারে ব্যয় করেছি। ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে যোগাযোগমন্ত্রী হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত যে পরিমাণ অর্থ বিভিন্ন শিক্ষালয়সহ জনকল্যাণে ব্যয় করেছি- তা বিনিয়োগ করলে এ রকম একটা পদ্মা সেতু সহজে একাই নির্মাণ করে দিতে পারতাম। 


এ অবস্থায় কানাডিয়ান একটি অখ্যাত প্রতিষ্ঠানের নিকট থেকে পরামর্শক নিয়োগের জন্য ঘুষ দাবি করার যুক্তি- নিতান্তই অবিশ্বাস্য ও হাস্যকর। পত্র-পত্রিকায় এটি কীভাবে লেখা হলো, তা ভাবলে আমি অস্থির না হয়ে পারি না। তিল তিল করে গড়ে তোলা আমার সততা ও শ্রম এভাবে ষড়যন্ত্রের শিকারে রক্তাক্ত হয়ে গেল! এ বেদনা আমাকে নিয়ত কুরে কুরে খায়। কোনো দোষ না করেও ষড়যন্ত্রের জালে পড়ে আমার সব অর্জন ধূলিস্যাৎ হয়ে গেল। আমি এ কষ্ট বুকের ভেতর আর কতদিন চেপে রাখব?


বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রবার্ট জুলিক চীনে অনুষ্ঠিত বোয়াও ফোরাম সম্মেলনে মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে আমার বিরুদ্ধে মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে- স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেন। বিশ্বব্যাংকের তৎকালীন আবাসিক প্রতিনিধি গোল্ড স্টেইন পদ্মা সেতুর তথাকথিত দুর্নীতি নিয়ে যা বলেছেন, একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের বিরুদ্ধে যা করেছেন, যে ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন- তা বাংলাদেশের মানুষের কাছে ক্ষমার অযোগ্য বিবেচিত হবে। বিশ্বব্যাংকের নিযুক্ত আইনজীবী ওকাম্পা আমাকে এবং বাংলাদেশকে দুর্নীতিগ্রস্ততার কালিমা লিপ্ত করার অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন। আমি দোষী কিনা তা বিবেচনা করা তার উদ্দেশ্য ছিল না, প্রকৃতপক্ষে তার মূল উদ্দেশ্য ছিল আমাকে অপরাধী সাব্যস্ত করা। তারপরও আনীত অভিযোগের সামান্য প্রমাণও তিনি উপস্থাপন করতে পারেননি। তৎসঙ্গে আমাদের দেশের কিছু সম্মানিত ব্যক্তি বুঝে হোক বা না বুঝে হোক, বিশ্বব্যাংকের পক্ষ অবলম্বন করেন। পৃথিবীর আর কোনো দেশের মানুষ নিজের দেশের মানুষের প্রতি এমন আচরণ করতে পারেন বলে আমার জানা নেই। আজ বিশ্বব্যাংকের সকল অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে, অবনত মস্তকে বিশ্বব্যাংক তা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট কৌসিক বসু বলেছেন- দুর্নীতির অভিযোগ তুলে পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়ন থেকে সরে আসা বিশ্বব্যাংকের জন্য একটি খারাপ ইতিহাস। তারপরও তিনি সান্ত¦না খুঁজেছেন এ বলেÑ অনেক সময় ব্যাড নিউজ হিস্ট্রি থেকে গুড নিউজ সৃষ্টি হয়।


বিশ্বব্যাংক আমার বিরুদ্ধে এ মিথ্যা অভিযোগ না আনলে বাংলাদেশ হয়তো নিজের অর্থায়নে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়ন করত না। তাহলে বাংলাদেশ যে, নিজের অর্থায়নে একাই এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারেÑ সে শক্তিমত্তার প্রকাশ ঘটত না। যতই কষ্ট হোক, এটাও আমার জন্য কম প্রাপ্তি নয়। বিশ্বব্যাংকের নিষ্ঠুরতা ও অমানবিক সিদ্ধান্ত বাংলাদেশকে জাগিয়ে দিয়েছে বাঘের শক্তিতে, ঠিক যেমনটি হয়েছিল ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে। তখন আমরা জেগে উঠেছিলাম পাকিস্তানের নিষ্ঠুরতায়, এবার জেগে উঠেছি- বিশ্বব্যাংকের নৃশংসতায়। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের ১২ ডিসেম্বর মূল সেতুর নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতির জনকের মতোই সগর্বে বলতে পেরেছেন, “অনেকের ধারণা ছিল, কোনো কাজ করতে হলে অন্যের কাছে হাত পাততে হবে। এ মানসিকতা আমাদের পেয়ে বসেছিল। অন্যের সাহায্য ছাড়া কিছু করতে পারব না। অমুককে ধরেন, টাকা পাব, তমুককে ধরেন টাকা পাব। আমি বলেছিলাম, এ টাকা বন্ধ করেন। আমরা কারও টাকা নেব না। নিজেদের টাকাতেই করব।” মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যাশা ও গর্বিত উচ্চারণ সফল হয়েছে- এর চেয়ে বড় আর কী হতে পারে! বিশ্বকে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, বাংলাদেশ কারও মুখাপেক্ষী নয়। নিজের অর্থায়নে বাংলাদেশ যেকোনো কাজ করার সক্ষমতা অর্জন করেছে।

আগামীকাল কাল থাকছে - “ওয়ান-ইলেভেনের দুঃসহ সৃতি” 

আরও পড়ুন - বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাঃ একটি পর্যালোচনা, সুস্থ মানুষ ও সুস্থ নেতাএকটি শিশুর স্বপ্ন, '​মন্ত্রিসভার রদবদল’ পর্যটন ও ভ্রমন, সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ, জাতিগত ঐক্য : অপরিমেয় শক্তির আধার, প্রেরণা ও উৎসাহঃ কর্মক্ষমতা বাড়ায়, ‘​​কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কাছে প্রত্যাশা’ বৈশ্বিক সহায়তা, বাংলাদেশের সফলতা, ​প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের গুরুত্ব,​ সরকারি কাজের পর্যবেক্ষণ, ব্যবসায়ীদের বিশ্বসমাবেশ, ‘‘অসম্ভব’: একটি ভৌতিক শব্দ’ 'বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া', ‘ক্যারিয়ার গঠনে প্রতিযোগিতা’ ঝুঁকি বনাম সাফল্য, ভিশন-২০২১, ‘সৃজনশীলতা’ ‘বিনিয়োগ’, ‘বাংলার বসন্ত’, ‘সময়, শ্রম ও অধ্যবসায়’ ‘আমার আদর্শ আমার নায়ক’ , ‘ধৈর্য পরীক্ষা’, ‘খেলাধুলা ও বাংলাদেশ’ ‘অধ্যয়ন, লেখালেখি ও নেতৃত্ব’ ‘নারীর ক্ষমতায়ন ও বাংলাদেশ’, ‘সাফল্যের স্বর্ণদ্বার’ , ‘ঐক্যবদ্ধ শক্তি সাফল্যের মেরুদণ্ড’ ‘পদ্মা সেতু’, `বিজয়চিহ্ন 'V' প্রকাশে ভিন্নতা', ‘উন্নয়ন ও অগ্রাধিকার’ , ​‘ইতিবাচক ভাবনা সাফল্যের চাবিকাঠি’ , ‘ভবিষ্যতের সরকার কেমন হবে’   ‘মাতৃভাষার প্রতি মমতা’‘সুখ ও শান্তি : আমাদের করণীয়’ , ‘নেতৃত্বের শক্তি’ ‘আদর্শ জীবন গঠনে মূল্যবোধ’, ‘আমার প্রাত্যহিক জীবন’​, 'আমার অনুভব'

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত