মুরগির ‘লটিপটি’ দিয়ে ঝালমুড়ি

কাওসার শাকিল, ঢাকাটাইমস
  প্রকাশিত : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ০৮:১৮
অ- অ+

আপনি হয়তো খান না, কিংবা কখনো হয়তো খাওয়ার কথা ভাবেনওনি। কিন্তু কেউ কেউ আছেন শখ করে হলেও মুরগির পা, পাখনা, গিলা-কলিজা দিয়ে এক প্লেট ঝালমুড়ি খাওয়ার জন্য রামপুরায় হাজির হন। কোনো কোনো সন্ধ্যায় লাইন পড়ে যায় আলমগীর ভাইয়ের দোকানে। তখন দুই হাতে পা-পাখনা দিয়ে বানানো ঝালমুড়ি বেচে কুলাতে পারেন না।

আলমগীর হোসেনের বাড়ি চাঁদপুর। ঢাকায় এসেছেন আজ প্রায় ১৩-১৪ বছর হয়ে গেল। প্রথম প্রথম ঢাকায় এসে কাজ খুঁজতে গিয়ে এক হোটেলে চাকরি নিলেন। বাবুর্চির সহকারীর কাজ। বাবুর্চির সঙ্গে থাকতে থাকতে শিখে ফেললেন কিছু কিছু রান্না। ফুল বাবুর্চি হতে বছর খানেক লেগে থাকতে হয়েছিল আলমগীরের।

বাবুর্চি বনে যাওয়ার পর হোটেলে চাকরি করলেন বছর কয়েক। এর মধ্যে বিয়ে করলেন, সংসারে ছেলেমেয়ে এল। হোটেলের বেতনে আর সংসার চলে না। তখন তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন নিজেই একটা ব্যবসা শুরু করবেন। কী করবেন ভাবতে ভাবতে একদিন ছোলা রান্না করে তাই দিয়ে মুড়ি মেখে বেচা শুরু করলেন। মুড়ি সবটাই বিক্রি হয়ে গেল, লাভও হলো কিছু। এবার আলমগীর আরো বেশি মুড়ি নিয়ে বেচা শুরু করেন।

লোকজনও বেশ জমিয়ে তার ঝালমুড়ি খেল। আস্তে আস্তে বিক্রি আরো বাড়ল। নাম ছড়াল তার ঝালমুড়ির। আলমগীর হোসেন হযে গেলেন আলমগীর ভাই। আর তিনিও একটা গাড়ি নিয়ে নেমে এলেন রাস্তায়, পুরোদমে শুরু করলেন ঝালমুড়ির ব্যবসা।

ঝালমুড়ির সঙ্গে আর কী দেয়া যায়- এই ভাবতে ভাবতে মুরগির লটিপটির কথা মনে পড়ল তার। লটিপটি হলো মজার এক তরকারি। সাধারণত ঢাকার বড় বড় হোটেলে, যেখানে দুপুরে আর রাতে প্রচুর মুরগি রান্না হয়, সেখানেই মুরগির উচ্ছিষ্ট দিয়ে তৈরি করা হয় লটিপটি। যেসব অংশ হোটেলে সাধারণত ভাতের সঙ্গে খাওয়া হয় না, যেমন পা, পাখনা, গিলা, গুর্দা, কলিজা ইত্যাদি মসলায় কষিয়ে ঝোল তরকারি রান্না করা হয়। সকালের নাশতায় লোকে এই জিনিস খায় পরোটা দিয়ে।

আলমগীর ভাই ভাবলেন, এই জিনিস দিয়ে ঝালমুড়ি বানালে কেমন হয়? বানালেনও। তবে প্রতিটা জিনিস আলাদা করে রাঁধলেন। মানে পা আলাদা রান্না হলো, পাখনা আলাদা রান্না হলো। গিলা, কলিজা এগুলোও আলাদা আলাদা করে রাঁধলেন। তাতে করে তার বেশ সুবিধা হলো। প্রতিটা আইটেম তখন আলাদা আলাদা বিক্রি করা যায়। যে খদ্দের মুরগির পা খেতে চায় সে শুধু মুরগির পা দিয়েই ঝালমুড়ি খেল। আর যে গিলা-কলিজা চায় সে নিল গিলা-কলিজা।

দিন কয়েকের ভেতর ভালো সাড়া পেলেন তার এই নতুন কায়দার ঝালমুড়ি নিয়ে। অনেকেই শুধু টেস্ট করার জন্য ঝালমুড়ি খেতে এল। বাড়ল ঝালমুড়ির বিক্রি, বাড়ল আলমগীরের ব্যবসা।

কত টাকা আয় হয় প্রতিদিন? এ্র প্রশ্ন করতেই হেসে ফেললেন আলমগীর ভাই। বললেন, ‘বেচা-বিক্রি হলে দিনে তিন-সাড়ে তিন হাজার টাকা থাকে।’

খুব যে বেশি সময় তাকে রাস্তায় ঘুরতে হয় তা না। বিকেল চারটার পর গাড়ি নিয়ে বের হলে ৯-১০টার মধ্যে বিক্রি শেষ করে বাড়ি ফিরে যেতে পারেন। অফিস ফিরতি লোকজন তার ঝালমুড়ির গাড়ির কাছে এসে একটু বিরতি নেন। ঝালমুড়ি কিনে খেয়ে সন্ধ্যার নাশতাটা সারেন।

এই মুরগির পা, পাখনা, গিলা-কলিজা আসে কোত্থেকে? আলমগীর বললেন, ‘আমি সব কিনি গ্রিলে মুরগির দোকান থেইকা। একমাত্র তারাই সব মুরগি একই সাইজের কেনে। তাই পা, গিলা-কলিজা সব এক সমান হয়। এগুলো তাগো কোনো কামে লাগে না। ১৪০ টাকা কেজিতে বিক্রি কইরা দেয়। আমি কেজি দরে কিনি, বাড়ি আইন্যা ধুইয়া, পরিষ্কার কইরা মুরগির মসলা দিয়া রান্ধি।’

প্রতিটা আইটেম তিনি ২০ টাকা করে বিক্রি করেন। মানে মুরগির পা দিয়ে ঝালমুড়ি খেলেও ২০ টাকা, আবার কলিজা দিয়ে মুড়ি মাখিয়ে খেলেও ২০ টাকা। অবশ্য মুরগির লটিপটির পাশপাশি ছোলা মুড়ি, আলু মুড়ি, ডিম মুড়ি এসবও বিক্রি করেন আলমগীর হোসেন। ব্যবসা তার সেজন্যই মন্দ হয় না, কেননা এতগুলো পদ থেকে ক্রেতা তার পছন্দ মতন কিছু না কিছু পেয়েই যায়।’

এরপর কী করবেন- সে প্রশ্নে আলমগীর জবাব দিলেন, ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার জন্যই এখনো ঢাকায় পড়ে রয়েছেন। নইলে কবেই চলে যেতেন চাঁদপুর! এত ভালো ব্যবসা রেখে ওখানে গিয়ে কী হবে? এ প্রশ্নের জবাবে আলমগীর বলেন, ‘কিছু টাকা জমাইতাছি। চাঁদপুরে আমার বাড়িঘর সব আছে। ভাবছি ওইখানেই একটা ভাতের হোটেল খুলমু। রানতে তো পারিই আমি। রান্নার হাতও খারাপ না। তাছাড়া সারা জীবন তো ঝালমুড়ির গাড়ি ঠেইল্যা পার করণ যাইবো না। ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যত আছে, তারা লেখাপড়া শিখতাছে। পরিচয় দেয়ার মতন একটা কিছু করণ লাগবো তখন।’

ঢাকাটাইমস/০৬ফেব্রুয়ারি/কেএস

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
চীনের জুতার কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত ২৮
এমপি হিসেবে শপথ নিলেন বিএনপির সারোয়ার আলমগীর
জিম্বাবুয়ের কাছে ১৩ রানে হার, সিরিজে সমতায় বাংলাদেশ
নিম্নমানের শিশুখাদ্য ও কসমেটিক বিক্রি, বসুন্ধরা শপিংমলে ২ প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা