খালেদার ভাগ্নে আমাদেরকে উচ্ছেদ করতে চেয়েছিল: মাহজাবিন

মহিউদ্দিন মাহী
ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১২ জুন ২০১৭, ১৭:২৯ | প্রকাশিত : ১২ জুন ২০১৭, ০৮:৫৭

গুলশান-২ এ যে বাড়ি জাল দলিল করে তিন দশক দখলে রাখার পর বাড়ি ছেড়েছেন মওদুদ আহমদ। আর এই দখলদারিত্বের অবসানের পর সামনে চলে এসেছে আরও দুটি ঘটনা। শহীদ বুদ্ধিজীবীর পরিবার বরাদ্দ দেয়া বাড়ির দখল ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল বিএনপি সরকারের আমলে। আর মুক্তিযুদ্ধের এক বীরকে বরাদ্দ দেয়া বাড়ি ছাড়তে হুমকি ধামকি দেয়া হয়েছিল।  

শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদের পরিবারকে বঙ্গবন্ধু সরকারের বরাদ্দ দেয়া বাড়ি থেকে ১৯৮২ সালে উচ্ছেদ করা হয় বিএনপি সরকারের আমলে। আর ২০০৫ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালেই প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা কে ফোর্সের প্রধান খালেদ মোশারফের পরিবারকে বরাদ্দ দেয়া বাড়ি দখলের চেষ্টা হয়েছে। সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভাগ্নে এই হুমকি দিয়েছিলেন বলে ঢাকাটামসকে জানিয়েছেন এই মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে মাহজাবিন খালেদ।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম সংসদ নির্বাচনের পর মাহজাবিনকে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য করে আওয়ামী লীগ। ঢাকাটাইমসকে তার সেই অভিজ্ঞতা বলেছেন তিনি মহিউদ্দিন মাহীর সঙ্গে আলাপচারিতায়।

জ্যৈষ্ঠের গরমে কেমন আছেন?

গরম তো ভালই তবে আমার কাছে এসব কিছুই না। কারণ আমরা গরম-ঠান্ডা মোকাবেলা করেই বড় হয়েছি। এসব নিয়ে সমস্যায় আছেন বিএনপি চেয়ারপারসন।

গরমে খালেদা জিয়া সমস্যায় আছেন বলে মনে করছেন কেন?

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সম্প্রতি আদালতে গিয়েছেন। সেখানে কিছুক্ষণ এসি বন্ধ থাকায় তিনি হাঁসফাঁস করেছেন। এ নিয়ে তিনি অভিযোগও করেছেন। তার নাকি খুব গরম লেগেছে। এ কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এমন শরীর নিয়ে তিনি কেন রাজনীতি করেন? তার রাজনীতি ছেড়ে দেয়া উচিত।

মওদুদ আহমেদকে তো বাড়ি ছাড়তে হল।

মওদুদ আহমেদ দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বাড়ি দখল করে রেখেছেন। তার তো ‍উচিত ছিল এই বাড়ি বহু আগেই ছেড়ে দেয়া। কিন্তু তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে বাড়ি দখল করে রেখেছেন। এটি তো সরকারি সম্পত্তি। তিনি দখল করে রাখতে পারেন না।

মওদুদ তো বলেছেন তিনি ন্যায়বিচার পাননি।

মওদুদ তো একজন বড় মাপের আইনজীবী। তার সঙ্গে আইনি লড়াইয়ে জেতা কঠিন। তিনি নিজেই এই মামলায় লড়াই করেছেন। তিনি হেরে গেছেন। তার মানে বুঝতে হবে তার কোনো আইনি ভিত্তি ছিল না।

দলটির প্রধান খালেদা জিয়াও তো একই কাজ করেছেন। তিনি সরকারি সম্পত্তি দখল করে রেখেছিলেন। তাকেও আদালতের রায়ে বাড়ি ছাড়তে হয়েছে। এসবই ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। কারণ তারাও মানুষকে এভাবে বাড়ি ছাড়া করেছেন।

আপনাদেরকেও তো বাড়ি থেকে উচ্ছেদের চেষ্টা হয়েছিল

আমাদেরকেও উচ্ছেদের চেষ্টা হয়েছে। তবে আগে এর ইতিহাসটা জানা দরকার।

জ্বি, বলুন

আমার বাবাকে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর হত্যা করা হয়। এরপর আমরা আর ক্যান্টনমেন্টে ঢুকতে পারিনি। কারণ সেখানে ছিল ভিন্ন রকম পরিস্থিতি। আমার মা সেখানে আমার নানিকে পাঠিয়েছিলেন। গিয়ে দেখেন আমাদের বাসা লুটপাট হয়ে গেছে। আমরা আর সেখানে যেতে পারিনি। আমরা তখন আমার মামার বাড়িতে গেলাম সেখানেই থাকতাম। একটা রুমে আমরা চারজন থাকতাম। আমরা তিনবোন আর মা। খুবই কষ্ট করে থাকতে হয়েছে।

তখন জিয়াউর রহমান ক্ষমতায়। আমাদেরতো আর কিছু করার নেই। এরপর যখন এরশাদ ক্ষমতায় আসল তখন তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যারা বীর উত্তম বা মুক্তিযোদ্ধা তাদেরকে কিছু কিছু বাড়ি দেয়া হবে। এরপর আমরা আবেদন করলাম। তখন এরশাদ সরকার একটি পরিত্যক্ত বাড়ি নির্দিষ্ট পরিমাণ ভাড়ার বিনিময়ে আমাদেরকে দিলেন।

বাড়িটি কোথায় ছিল?

গুলশান-২ নম্বরে। রোড নং ৫৬। বাড়িটিতে আমরা ভালই ছিলাম।  কিন্তু মাঝখানে একটি ঘটনা ঘটে যায়।

কী ঘটনা?

আমি তখন সেভেন/এইটে পড়ি। আমাদের বাসায় একদিন একজন সাংবাদিক আসলেন। তিনি আমাকে আমাকে জিজ্ঞাস করলেন, বাবাকে কে মেরেছে? আমি বলেছি জিয়াউর রহমান। এরপর ওই সাংবাদিক চলে গেলেন। এরপর মা বাসায় আসলে আমি তাকে এই ঘটনা বলি। মা তো পুরোই ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি ওই সাংবাদিককে ফোন করলেন। বললেন, যেন কোনভাবেই জিয়াউর রহমানের নাম না লিখেন। কী পরিমাণ ভয়ে আমরা ওই সময় ছিলাম বুঝতেই পারছেন। এভাবে আমাদের দিনগুলি কাটতে লাগলো। 

কখন উচ্ছেদের মুখে পড়লেন?

এরশাদ সরকারের পর ক্ষমতার পলাবদলে যখন বিএনপি সরকার আসলো তখন থেকেই আমরা হুমকি ধমকির মধ্যে ছিলাম। ২০০৫ সালে বিএনপির আমলে আমাদের উচ্ছেদের হুমকি দেয়া হয়।

এই হুমকি কে দেয়?

খালেদা জিয়ার বোনের ছেলে আমাদের হুমকি-ধামকি দেয়। সে আমাদের বাড়িতেও কয়েকবার আসে। বাড়ি ছাড়ার জন্য আল্টিমেটাম দিয়ে যায়। পরে শুনলাম, খালেদা জিয়ার বোনের ছেলে রাজউকের মাধ্যমে অবৈধভাবে তার নামে বাড়ি লিখিয়ে নিয়েছেন। সে আমাদের বাড়িতে ভাড়াটে গুন্ডা পাঠিয়ে আল্টিমেটাম দিয়েছে। উচ্ছেদের জন্য বুলডোজারও পাঠানো হয়েছিল। সর্বশেষ তারা একদিন আমাদের বাসার গেটে ঢুকে পড়ল। একদিন সময় দিয়ে বলল, পরদিন বুলডোজার নিয়ে আসবে, আমরা যেন দ্রুত সরিয়ে ফেলি। এ ঘটনায় আমরা পড়লাম ভয়াবহ বিপদে। কী করব বুঝতে পারছিলাম না। আদালতে যাবো না কোথায় যাব, কিছু বুজতে পারছি না। কারণ সব জায়গায়ই তাদের লোক।

এরপর কী করলেন?

এরপর আমরা আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ করলাম। পরামর্শক্রমে যেদিন বুলডোজার নিয়ে আসার কথা সেদিন সকালে আমরা আদালতে রিট করলাম। রিট আমাদের পক্ষে আসল। আদালত স্টে অর্ডার দিল। আর তারা আমাদের সরাতে পারল না।

খালেদার কোন বোনের ছেলে?

চকলেট নামে একজন বোন আছে, তার ছেলে।

সেই বাড়িতে কি এখন আপনারা আছেন?

না, আমরা সেই বাড়িতে এখন আর থাকি না। আমি তো ওখানে আগেও ছিলাম না। কারণ আমার বিয়ে হয়ে গেছে। আমি স্বামীর সঙ্গেই থাকতাম।

ওই বাড়ির এখন কী অবস্থা?

ওই বাড়ির আসল মালিক চলে এসেছে। তিনি পুরান ঢাকার বাসিন্দা। যেহেতু এটা পরিত্যক্ত বাড়ি হিসেবে ছিল। সরকারকে আসল মালিক কাগজপত্র দেখিয়ে তিনি নিয়ে নিয়েছেন।

পরিত্যক্ত বাড়ির পরিণতি তাহলে এ রকমই হয়?

আসলে এসব বাড়ির মালিক সাময়িকভাবে সরকার হয়। কিন্তু এর মূল মালিকরা যদি বৈধ কাগজপত্র দেখিয়ে দাবি করে তখন রাষ্ট্রও তাদেরকে দিতে বাধ্য। ধরুন, খালেদা জিয়াকে যে বাড়িটি দেয়া হল তিনি ধরে নিয়েছেন আজীবন তিনি ওই বাড়িতে থাকবেন। এটা কিন্তু ঠিক নয়। কারণ এই বাড়ি কিন্তু তাকে অস্থায়ীভাবে দেয়া হয়েছে।

কাল পড়ুন: মাহজাবিনের সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয় পর্ব  

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাক্ষাৎকার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত