বিপিও সামিট বাংলাদেশ ২০১৮

ওয়াহিদ শরিফ
 | প্রকাশিত : ১৬ এপ্রিল ২০১৮, ১১:৪০

বিপিও মানে বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও)। ‘ বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং’ নামটা বিশ্বজুড়ে খুব পরিচিত। আউটসোর্সিং বলতে শুধু কল সেন্টার আউটসোর্সিং নয়। টেলিকমিউনিকেশন, ব্যাংক, বীমা, হাসপাতাল, হোটেলের ব্যাক অফিসের কাজ, এইচআর, আইটি, অ্যাকাউন্ট সবকিছুই এর অন্তর্ভুক্ত। এসব কাজ আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে করার বিষয়টি সাধারণভাবে ‘বিপিও’ বলে পরিচিত।

বিশ্বের সবচেয়ে ক্রমবর্ধমান ইন্ডাস্ট্রি হচ্ছে এই বিপিও খাত। আইসিটিতে বর্তমানে বাংলাদেশে যে পরিবর্তনের গল্প, তার উল্লেখযোগ্য অবদান হচ্ছে বিপিও খাতের। বছরে প্রায় ১৮০ মিলিয়ন ডলার বিদেশি মুদ্রা আসে আইসিটি খাত থেকে। সরকার আইসিটি সেক্টর থেকে ২০২১ সাল নাগাদ ৫ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, আশা করা যায় তার সিংহ ভাগ অংশই আসবে বিপিও থেকে।

আমাদের দেশে নব্বইয়ের দশকে কল সেন্টার এবং ডাটা এন্ট্রি কাজের মধ্য দিয়ে বিপিওর ধারাটির সূচনা ঘটে। প্রথমে ছোট আকারে শুরু হয়েছিল। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এখন এটি বেশ বড় আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণাটির পৃষ্ঠপোষকতা করার কারণে এ ব্যাপারে নতুন একটি জাগরণ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে ‘বিপিও’ একটি নতুন সম্ভাবনার নাম। কারণ বাংলাদেশের বিপিও ব্যবসার প্রবৃদ্ধি বছরে শতকরা ১০০ ভাগের বেশি। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বিপিওর বাজার ৫০০ বিলিয়ন ডলার। সেখানে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ দখল করতে পেরেছে মাত্র ১৮০ মিলিয়ন ডলার! সুতরাং বিষয়টি স্পষ্ট যে, বিপিও খাতে একটা বিশাল বাজার পড়ে আছে। এখন যদি বাংলাদেশ এই খাতে নজর দেয় তাহলে তৈরি পোশাকশিল্পের পরই বিপিও হবে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সবচেয়ে বড় খাত।

এখন প্রয়োজন বিপিওকে তরুণ প্রজন্মে কাছে আরও জনপ্রিয় করা। কারণ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য  ও জাপানে এই মুহূর্তে প্রোগ্রামারের প্রয়োজন প্রায় ২০ লাখ। আগামী ৫ বছরে ২০ লাখ প্রোগ্রামার কোডার এর প্রয়োজন হবে জাপান, ইউরোপ,আমেরিকাতে। তাদের সেই তরুণ জনগোষ্ঠী নেই, জাপানে ৫০ শতাংশ জনগোষ্ঠী ৫০ এর উর্ধ্বে। ইউরোপ আমেরিকাতেও তাদের তরুণ প্রজন্মের সংকট বিরাজ করছে। বাংলাদেশ যদি তার বিপুল সংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠীকে সঠিক প্রশিক্ষণে দিতে পারে তাহলে আগামী ৫ বছরে ইউরোপ, আমেরিকা, জাপানের বাজার আমাদের তরুণরাই নিয়ন্ত্রণ করবে।

বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার শিক্ষার্থী ¯œাতক ডিগ্রি লাভ করছে। এদের বিরাট অংশ বিপিও সেক্টরে কাজ করতে পারে। যে কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতার মানুষের এখানে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। এই খাতে যারা কাজ করবেন তাদের মাত্র দুইটি যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন। প্রথম যোগ্যতা ‘অ্যাবিলিটি টু লার্ন’ অর্থ্যাৎ ‘আমি জানি না, জানতে চাই’ এই মনোভাব থাকতে হবে। দ্বিতীয় যোগ্যতা- ‘কমিউনিকেশন স্কিল’ তথা যোগাযোগে দক্ষতা।

২০০৯ সালে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের আয় ছিল মাত্র ২৬ মিলিয়ন ডলার। ৬ বছরের মধ্যে এ খাতে আয় ৩০০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। বর্তমানে বিপিও সেক্টরে ৪০ হাজারের বেশি লোক কাজ করছে। ২০২১ সালের মধ্যে এ খাতে ১ লাখ লোক কাজ করবে। বিপিও খাতে আয় যত বাড়বে দেশ অর্থনৈতিকভাবে ততই এগিয়ে যাবে। তরুণদের উচ্চতর প্রশিক্ষণ দিয়ে তথ্যপ্রযুক্তির বিভিন্ন খাতে কাজে লাগাতে হবে। দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য পোশাক খাতের চেয়ে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে আয় কয়েকগুণ বেশি এবং ভবিষ্যতে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার,আইনজীবি পাশাপাশি বিপিও পেশা হিসেবে নিবে।

সব বয়সীদের এ সেক্টরে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। রয়েছে খন্ডকালীন ও পূর্ণকালীন কাজের সুযোগ। বিপিওতে দুই ধরনের কাজ হয়ে থাকে। একটি হলো ভয়েসের মাধ্যমে, আরেকটি লিখিত কাজ। বর্তমানে বাংলাদেশে ভয়েসের মাধ্যমেই বিপিওর কাজ করা হয়ে থাকে। যারা বিপিওতে ভয়েসের মাধ্যমে কাজ করে তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার ধরাবাধা কোনো নিয়মের মধ্যে নেই। এখানে অল্প শিক্ষিতরাও কাজ করতে পারে। আর যারা লিখিত বিষয় নিয়ে কাজ করে তাদের শিক্ষিত হলে এগিয়ে যাওয়ার ভালো সুযোগ রয়েছে। দেশে শিক্ষার্থীদের বুঝাতে সক্ষম হয়েছে বিপিও কী, এখানে কাজের সম্ভাবনা কতটুকু। অনেকেরই ধারণা ছিল বিপিও মানেই কল সেন্টার। এই ভুল ধারণাটি গত বছরের প্রচার-প্রচারণার ফলে অনেকটা দূর হয়েছে।

বিপিওতে যারা কাজ করছে তাদের স্কিল ডেভেলপমেন্টের জন্য প্রতিটা প্রতিষ্ঠানই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের জন্যও যে কেউ নিজেকে প্রস্তুত করতে পারছে। এজন্য এখন যারা বিপিওতে কাজ করছেন তাদের গ্রাহকদের সন্তুষ্টি অর্জন করতে হবে। না হলে নতুন কাজ সৃষ্টি হবে না।

বিপিও কাজের ধরণ বা কলসেন্টারের ধরণ এবং তারা যে সেবা দেয় তার উপর মূলত নির্ভর করে আবেদনকারীর শিক্ষাগত ও অন্যান্য যোগ্যতা। কলসেন্টারের বেশির ভাগ কাজই খন্ডকালীন। তবে পাশাপাশি পূর্ণকালীন কাজের জন্যও কলসেন্টারগুলোতে প্রচুর লোকবল নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে। আর তাই কলসেন্টারে খন্ডকালীন ও পূর্ণকালীন চাকরির জন্য যোগ্যতাগুলোও আলাদা হয়ে থাকে। খন্ডকালীন চাকরির জন্য আবেদন করতে আবেদনকারীকে বিশ্ববিদ্যালয় অথবা কলেজে অনার্স বা ডিগ্রি পড়–য়া হতে হবে। পূর্ণকালীন চাকরির জন্য আবেদন করতে আবেদনকারীরকে কমপক্ষে ¯œাতক হতে হবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কাজের কোনো অভিজ্ঞতা থাকলে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি আবেদনকারীকে শুদ্ধ করে বাংলা ও ইংরেজিতে কথা বলা, সুন্দর উপস্থাপনা, কম্পিউটার ব্যবহার সম্পর্কে মৌলিক ধারণা থাকা, স্মার্ট, উপস্থিত বুদ্ধিমত্তা ইত্যাদি বাড়তি যোগ্যতা থাকা জরুরি।

যদি সুনির্দিষ্ট একটি পরিকল্পনার আওতায় এ নিয়ে কাজ করতে পারা যায় তাহলে অল্প দিনে বাংলাদেশকে বিপিওর বিশ্ববাজারে আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

ওয়াহিদ শরিফ: সভাপতি, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কলসেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিং (বাক্য)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত