গ্রামীণ নারীদের কারিগরি শিক্ষায় প্রশিক্ষিত করতে হবে

ড. উষা রানী বড়ুয়া
| আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০১৬, ১৫:০৭ | প্রকাশিত : ১৫ অক্টোবর ২০১৬, ০৮:৪৯

অক্টোবর মাসের পনের তারিখ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস হিসাবে পালিত হয়ে আসছে। প্রথম আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী  দিবস পালিত হয় ১৫ অক্টোবর, ২০০৮ সালে। ২০০৭ সালে ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে রেজলিউশন ৬২/১৩৬ মাধ্যমে এই দিবসটিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। গ্রামীণ ও আদিবাসী নারীদের কৃষি এবং পল্লী উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ দারিদ্র বিমোচনে উল্লেখযোগ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরুপ এ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গ্রামীণ নারীরা অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক দিক থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। দক্ষিণ এশিয়ার গ্রামীণ নারীরা প্রধানত কৃষিকাজে পুরুষদের পাশাপাশি নিজেদেরকেও নিয়োজিত রাখে। উন্নয়নশীল দেশে ৪৩% মহিলারা কৃষিকাজে অবদান রাখে। ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলংকা প্রভৃতি দেশের গ্রামীণ মহিলারা পরিবারের লোকদের জন্য রান্না করা, পরিবারের দেখভাল করা, সন্তান লালন-পালন, হাঁস-মুরগী পালন, গবাদী পশু পালন ইত্যাদি কাজে নিজেদের সর্বদা নিয়োজিত রাখে।

নানা কুসংষ্কার এখনো গ্রামীণ নারীদের উন্নয়নের অগ্যযাত্রাকে বাঁধায় পর্যবেশিত করছে। বাল্যবিবাহ, যৌক্তুক এদের মধ্যে অন্যতম। আনেক গ্রামীণ নারী সচেতনতা ও সুশিক্ষার অভাবে সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়েছে। তাদের গৃহস্থলী কাজকে অর্থিকভাবে সমাদর করা হয় না। ফলে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান না করায় পারিবারিক নির্মম নির্যাতনের শিকার হন মেয়েরা। ফলে অনেক মেয়ের জীবনে নেমে আসে অন্ধকার কালো ছায়া অকাল মৃত্যুতে তার ইতি হয়। 

বাংলাদেশের শতকরা ৪০ ভাগ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই নারী এবং এর মাঝে নারী প্রধান পরিবারের সংখ্যা অধিক। এখনও নারীর অনেক কাজের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন হয় নাই। গৃহস্থালী কর্মে নারীর শ্রম ও কৃষি অর্থনীতিতে নারীর অবদানের মূল্যায়ন দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। 

বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার ২০২১ সালের রূপকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা, ক্ষমতায়ন এবং সার্বিক উন্নয়নের মূল ধারায় সম্পৃক্তকরণের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় নারী দারিদ্র বিমোচন, নারী নির্যাতন বন্ধ, নারী পাচার রোধ, কর্মক্ষেত্রসহ সকল ক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা বিধান এবং আর্থ-সামাজিক কর্মকান্ডে নারীর পূর্ণ ও সম অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে।

হতদরিদ্র নারীদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে বিধবা ও স্বামী পরিত্যাক্তা মহিলাদের ভাতা প্রদান কর্মসূচী, শহরাঞ্চলে কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মাদার ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা, বিত্তহীন মহিলাদের খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত ভিজিডি কর্মসূচী, দারিদ্র বিমোচন ঋণ প্রদান কর্মসূচী। নারীদের কৃষি, সেলাই, ব্লক-বাটিক, হস্তশিল্প, বিউটিফিকেশন, কম্পিউটার ও বিভিন্ন আয়বর্ধক বিষয়ে ব্যাপক প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থন সৃষ্টি, শ্রমবাজারে ব্যাপক অংশগ্রহণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারী উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ও বিনা জামানতে ঋণ সহায়তা প্রদান ও পৃষ্ঠপোষকতার মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ব্যাপক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের অনেক গ্রামীণ নারী এন জি ওর মাধ্যমে ঋণ নিয়ে নিজেকে আর্থিকভাবে সাবলম্বী করে তুলছেন। পারুল বেগম তার উজ্বল উদাহরণ। ৪ সন্তানের জননী পারুল বেগমের বয়স ৪৫ । গ্রামের বাড়ি নোয়াখালি ডুমচর। তার কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। ব্রাক থেকে লোন নিয়ে সে প্রথমে হাঁস-মুরগী পালন শুরু করে্ সে পরবর্তীতে লোনের টাকা কিস্তিতে পরিশোধ করেছে এবং লাভের টাকায় পাঁচ কাঠা জমির উপর নিজের থাকার জন্য বাড়ি তৈরি করেছে। পুকুরে মাছ চাষ শুরু করেছে এবং সাবলম্বী হয়েছেন। নিজের এক মেয়েকে বিয়ে দেওয়া ও তিন ছেলেকে ব্যবসায়ের জন্য টাকা দিয়েছেন।

নেপোলিয়ন বোনাপার্ট অনেক আগে বলেছিলেন ‘তোমরা আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও,আমি তোমাদের একটা শিক্ষিত জাতি উপহার দেব’। Give me an educated mother, I shall promise you the birth of a civilized, educated nation”. Napoleon Bonaparte.)

গ্রামীণ নারীদের শিক্ষার প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষা যাতে প্রদান করতে হবে যাতে করে তাদেরকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের পর অন্যের কাছে হাত পাততে না হয়। পুরুষের পাশাপাশি মেয়েদের সামাজিক সকল কাজের স্বীকৃতি প্রদান করতে হবে। নারীর প্রতি শারিরিক ও মানসিক নির্যাতনসহ সকল প্রকার নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল তার নারী কবিতায় বলেছেন, “সাম্যের গান গাই - আমার চক্ষে পুরুষ-রমনী কোনো ভেদাভেদ নাই। বিশ্বে যা-কিছু মহান্ সৃষ্টি চির-কল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর”।

সুতরাং, নারী পুরুষের সামান অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিশ্বের বুকে আমরা একদিন মাথা উচু করে দাঁড়াবো। এই হোক আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী  দিবসে সবার প্রত্যয়। সবাইকে আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী  দিবসের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

লেখক. লাইব্রেরিয়ান, সিরড্যাপ

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত