ব্যাটারি কারখানার গ্যাসে বিপর্যস্ত শিক্ষা-খেলাধুলা

শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ০৭ জুলাই ২০১৮, ১৮:০১

গত ২৭ জুন (বুধবার) বঙ্গবন্ধু বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টের ভেন্যু ছিল শ্রীপুর পৌর এলাকার কেওয়া পূর্বখ- সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ। শিশুদের ফুটবল খেলা চলছিল। এরই মধ্যে বিদ্যালয় লাগোয়া গেলি ইন্ডাস্ট্রিজ নামের একটি ব্যাটারি কারখানা থেকে বিষাক্ত গ্যাস বেরোতে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে কান্নাকাটি শুরু হয়ে যায় শিশুদের মধ্যে। অসুস্থ হয়ে পড়ে অনেকে। খেলার আনন্দ পরিণত হয় বিষাদে। পরে সেদিনের খেলা প- হয়ে যায়।

এ সমস্যা শুধু ওই দিনই হয়েছে তা নয়। প্রায় প্রায়ই এমনটি ঘটছে, আর স্কুলের কোমলমতি শিশুরা অস্বস্তি নিয়ে স্কুল ছাড়ে।

বছর তিনেক আগে প্রশাসনের চোখের সামনে স্থানীয় মানুষের আপত্তি উপেক্ষা করে বিদেশি মালিকানাধীন কারখানাটি গড়ে ওঠে। সেখানে পুরনো ব্যাটারি ভেঙে নতুন ব্যাটারি তৈরি করা হয়। এর পুরো কার্যক্রমে জড়িয়ে রয়েছে এসিডসহ নানা ক্ষতিকর রাসায়নিক।

এই কারখানার রাসায়নিকের ধোঁয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে কারখানার ১০০ গজের মধ্যে থাকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুরা। রাসায়নিক পোড়ার ধোঁয়া আর এসিডের গন্ধ ছড়াচ্ছে চারপাশে। এ থেকে শিশুদের রক্ষায় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় অধিবাসীরা বারবার প্রশাসনের দ্বারস্থ হলেও কোনো ফল পায়নি। এখন শিশুদের স্বাস্থ্যনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ইয়াসমিন আক্তার জানান, ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ে বর্তমানে ৪৫১ জন নিয়মিত শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। কারখানাটি প্রতিদিন অনবরত পুরনো ব্যাটারির বিভিন্ন উপকরণ পোড়ায়। এতে সৃষ্ট ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় বিদ্যালয়সহ ওই এলাকার আশপাশ। ধোঁয়ার কারণে শ্রেণীকক্ষের জানালা বন্ধ করে পাঠদান করতে হয়।

বিষাক্ত ধোঁয়ায় আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের মুহূর্তের মধ্যে কাশি, চোখ জ্বলা, বমি, মাথা ঘুরানো ও পেট ব্যথা শুরু হয় জানিয়ে প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘ফলে অনেকটা বাধ্য হয়ে তাদের শিক্ষার্থীদের ছুটি দিতে হচ্ছে। এতে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।’ কারখানার এই যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে অনেক শিক্ষক-শিক্ষিকা অন্যত্র বদলি হওয়ার  আবেদন করছেন বলে জানান তিনি।

প্রধান শিক্ষিকার ভাষ্যমতে, কারখানার ক্ষতিকর দিকের তথ্য তুলে ধরে গত বছর পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও শিক্ষা কর্মকর্তা বরাবর আবেদন করেন তারা। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। উপরন্তু বিদ্যালয় থেকে কারখানাকে এনওসি দেয়ার জন্য চাপ তৈরি করা হচ্ছে। এর বিনিময়ে বিদ্যালয়ের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করে দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে।

কিন্তু কারখানার ক্ষতিকর দিকের কথা ভেবে এনওসি দিতে অপারগতার সিদ্ধান্ত নেয় স্কুল কর্তৃপক্ষ।

সবশেষ গত বৃহস্পতিবার (২৮ জুন) কারখানার ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসকের কাছে আবার আবেদন করা হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে  এই বিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন সহকারী শিক্ষিকা সেলিনা রেজা। তিনি বলেন, ‘কিন্তু এখন কারখানার বিষাক্ত ধোঁয়ায় শারীরিকভাবে শিক্ষার্থীদের সাথে নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়ছি। তাই অন্যত্র বদলি হওয়ার জন্য চেষ্টা করছি।’

বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহমুদার অভিভাবক আব্দুল আজিজ জানান, ‘শিশুদের শিক্ষা গ্রহণের জন্য বিদ্যালয়ে পাঠাই। কিন্তু দুঃখের বিষয় পাশের কারখানার ধোঁয়ায় মাঝে মাঝে শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়ে। মুক্ত নিঃশ্বাস নেয়া শিশুদের অধিকার। আশা করি সরকার শিশুদের জীবন রক্ষার্থে ভূমিকা রাখবে।’

গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক সালেহ ফয়সালের মতে, পুরাতন ব্যাটারি পোড়ানোর ফলে যে ধোঁয়া নির্গত হয় তাতে নানা ক্ষতিকর দিক রয়েছে। বিশেষ করে শিশুরা দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের নানা রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এমনকি এ রোগের প্রকোপে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে চলে যেতে পারে যে কোনো শিশু।’

গেলি কারখানার বিষয়ে ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকার কাছ থেকে আবেদন পাওয়ার কথা নিশ্চিত করে গাজীপুর জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির জানান, এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য বলা হয়েছে। প্রতিবেদন এলে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

(ঢাকাটাইমস/৭জুলাই/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :