মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এবার আমাদের পালা

মনদীপ ঘরাই
 | প্রকাশিত : ২২ জানুয়ারি ২০১৯, ১৩:২১

২০১২ সাল। খবর পড়তাম, রিপোর্টিং করতাম একটা টিভি চ্যানেলে। বেতনটা মন্দ ছিল না। বছরের শেষে এসে সুসংবাদ শুনলাম। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের প্রশাসন ক্যাডারে চাকরির অমূল্য সুযোগ পেয়েছি। পিতার পথে হাঁটতে পারার আনন্দ লিখেই বা বোঝাই কিভাবে।সেই সাথে ভর করে দুশ্চিন্তা। এত কম বেতনে চলতে পারবো তো?

প্রথমদিকে একটু কষ্ট যে হতো অস্বীকার করবো না। তবুও চলে যেত দিন। একটু কষ্টে। খানিকটা অভাবে। তবুও তৃপ্তিতে। টোনাটুনির সংসারে আর এতই বা কি?

বছর ঘোরে।সময় যায়। চাকরিটা চাকরির মতোই করে যাচ্ছিলাম।

এরপর হঠাৎ করেই বেতনটা হয়ে গেল দ্বিগুন। নিঃসন্দেহে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সেরা উপহার সরকারি কর্মচারিদের জন্য।

নিজের সততার গান গাইতে এ লেখার কলম ধরি নি। দুগ্ধস্নান করা তুলশি গাছের ক্লোরোফিলযুক্ত সবুজ অংশ বলে দাবী করি না নিজেকে।

তবে,অকপটে বলছি আজ, যেদিন থেকে বেতন বাড়লো, ঘটা করে কিংবা অনুষ্ঠান করে শপথ নেই নি ঠিকই, তবে হৃদয়ের দুয়ারে টানিয়েছি একটা সাইনবোর্ড

"Not for sale"

কেমন কাটছে দিন? স্বাচ্ছন্দে। সাবলীল। শুধু ভবিষ্যৎ তহবিলে সর্বনিম্ন টাকা কাটাতে পারছি। ভবিষ্যৎ নিয়েও তেমন ভাবছি না। কারণ, বর্তমান নিয়ে দুশ্চিন্তা যেমন দূর করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ভবিষ্যতের হিসেবটাও তাঁর হাতেই সাজবে।

সমাজে একটা প্রশ্ন মোটামোটি বহুল জিজ্ঞাসিত বা FAQ.... কাড়ি কাড়ি টাকা পয়সা উপার্জন করে কি করে মানুষ?

উত্তরটা সহজ: গাড়ি-বাড়ি।

তাই যদি হয়, সে গাড়ি আর বাড়ির ব্যবস্থাও তো সহজ শর্তে ঋণের মাধ্যমে সরকার করেই দিয়েছে।

একদল এখনো বলতে পারেন, ভবিষ্যতের চিন্তা কি শুধু বাড়ি-গাড়ি? চিকিৎসার কথা ভাবতে হবে না?

সেটাও ভাবি না। দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে আমাদের সার্ভিসের নজরুল স্যার ও মেহেদি স্যার যেভাবে ফিরেছেন, সে গল্প কমবেশি সবারই জানা।গর্ব করে বলি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এমন প্রত্যক্ষ সহযোগিতা পৃথিবীর আর কোন দেশে আছে? সেই সাথে এগিয়ে এসেছিলাম সার্ভিসের সব ব্যাচ, সব কর্মকর্তা। তাহলে আমার বেলায় সে আশা কি করতে পারি না?

এখনও বলতে পারেন, সন্তানের পড়াশোনার চিন্তা? আর্থিক সংকটে পড়া আমাদের এক সিনিয়র স্যারের মেয়ের উচ্চশিক্ষায় এই তো সেদিন ব্যাচের সবাই এগিয়ে এলাম।

জীবনে আর বাকি রইলো কোন চাওয়া?

একটু পেছনে ফিরি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষেই চাকরিতে ঢোকে সবাই। সে জীবনে সর্বোচ্চ দুর্নীতি থাকে হলের ক্যান্টিনের বিলখেলাপী হওয়া।

তবে কোন কারণে সার্ভিসে এসেই বদলে যায় কিছু কর্মচারি?

কারণটা নিজের অনুভব করে আসা; চারপাশের প্রভাবের দোষটা এড়ানো কঠিন, চলে আসা রীতিনীতি এড়ানো কঠিন, বাকি দায় পুরোটাই ব্যক্তিগত।

"একটু ভালোভাবে চলা" থেকে যে পাপের শুরু,তা পরিণত হতে থাকে লোভের তলাবিহীন ঝুড়িতে। তখন নিয়ন্ত্রণটাও হয়তো থাকে না।

সময় এসে গেছে। সময় এখনই। থামতে জানার বিদ্যাটা রপ্ত করে নেয়া উচিত সবার।  "একটু ভালোভাবে চলা"?  সে ব্যবস্থা তো সরকারই করে দিলো। তবে দ্বিধা কোথায়?

চাকরির শুরুতে বেশ মনে আছে, স্ট্যাম্পে সই করে অঙ্গীকার করতে হয়েছিল, যৌতুক নেবো না। সেই অঙ্গীকার দুর্নীতির বিরুদ্ধেও হোক। স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করেই হোক। চাকরিতে ঢোকার সময়ই। কিংবা আমাদের জন্য এখনই। এটা অনেকের কাছে হাস্যকর শোনাতে পারে।একটাই প্রশ্ন রেখে যাবো:

যৌতুকের  চেয়ে দুর্নীতি কি বড় সমস্যা নয়?

সবাই চাইলে সব স্তরের সব কর্মচারি কি অন্তর থেকে দুর্নীতিমুক্ত হতে পারেন না?

আমি ও আমার অফিস দুর্নীতিমুক্ত সাইনবোর্ড, দুদকের ভয় কিংবা শাসন নয়, নিজের বিবেকের অনুশাসন হোক নীতির সবচেয়ে বড় বিদ্যালয়। আজ থেকে, এই মুহূর্ত থেকে। সব পর্যায়ের অভিভাবকেরা পাশে আছেন। ছায়া হয়ে আছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। তবে, চিন্তা কিসের?

আরেকটা বিষয়ও জরুরী। শুধু সেবাদাতাদের সৎ থাকলেই যথেষ্ট নয়। সেবাগ্রহীতাদের সততাও সমভাবে জরুরী।

তবে শুরু হোক মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সে আমাদের হানড্রেড পারসেন্ট আন্তরিকতা। সব কর্মচারি। সব সার্ভিস। নবীন কর্মচারির এ ক্ষীণ কন্ঠস্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত পৌঁছাবে কি না জানি না, তবুও বলতে চাই প্রাণখুলে- `মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমাদের যা দিয়েছেন তা যথেষ্টর চেয়ে বেশি। এবার আমাদের দেবার পালা।’

মনদীপ ঘরাই: সিনিয়র সহকারী সচিব এবং লেখক

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :