ফেসবুকে বর্ডার ক্রস বাইক বিক্রির হিড়িক 

হাসান মেহেদী, ঢাকা টাইমস
 | প্রকাশিত : ১২ মে ২০২৪, ০৯:৪৬

দেশে ক্রমেই বাড়ছে মোটরবাইকের চাহিদা। পাশাপাশি বাড়ছে দামও। আকর্ষণীয় নিত্যনতুন ডিজাইন, আকৃতি আর অপ্রতিরোধ্য গতির কারণে ইঞ্জিনচালিত দুই চাকার এ যান এখন উদীয়মান তরুণ ও যুবকদের কাছে স্বপ্নে পরিণত হয়েছে। দেশের শোরুমগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী যথেষ্ট মোটরবাইক পাওয়া যাচ্ছে। তবে বর্তমানে বাইকের বাজার দর বেড়েছে ব্যাপকহারে। সখের বাইকের দাম বেশি হলেও ক্রেতাদের চাহিদাও রয়েছে ব্যাপক। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য বলছে, সারাদেশে বর্তমানে মোটরযান নিবন্ধনের সংখ্যা ৬০ লাখ ৫৮ হাজার ৯৯৯টি। এর মধ্যে শুধুমাত্র নিবন্ধিত মোটর বাইক রয়েছে ৪৪ লাখ ৮ হাজার ২৬টি। বাকি ১৯ প্রকারের নিবন্ধিত যান রয়েছে ১৬ লাখ ৫০ হাজার ৯৭৩টি।

২০১০ সালে নিবন্ধিত মোটরবাইকের সংখ্যা ছিল ৭ লাখ ৫৫ হাজার ৫১৪টি। ২০১০ থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ৪৪ লাখ ৮ হাজার ২৬টি। এর মধ্যে গত বছর ২০২৩ সালে ৩ লাখ ১০ হাজার ৪১৮টি মোটরবাইক নিবন্ধিত হয়েছে।

মোটরবাইকের এই চাহিদাকে পুঁজি করেই দেশের বেশকিছু অসাধু চক্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে বিক্রি করছে চোরাই বাইক। আবার কেউ কেউ সীমান্ত থেকে চোরাই পথে মোটরবাইক এনে তা স্বল্পমূল্যে বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়ে আসছে।

বাহারি নামের ফেসবুক পেজ ও আইডি খুলে মোটরবাইক (মোটরসাইকেল) বিক্রি করছে কয়েকটি প্রতারক চক্র। দীর্ঘদিন ধরে এসব প্রতারক চক্র বিভিন্ন মোটরসাইকেলের ভুয়া ভিডিও ও ছবি দিয়ে সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা করে আসছে। বাজার দরের চেয়ে কমমূল্যে এসব বাইক বিক্রির কথা বলে অনেকের কাছ থেকে নেওয়া হয় নগদ অর্থে অগ্রিম পেমেন্ট। প্রতারক চক্রগুলো নগদ, বিকাশের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন করে থাকে। বেশির ভাগ মানুষ বাইক হাতে না পেয়েই নিজেদের অর্থ খুইয়ে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।

কিভাবে এসব বাইক, যা বর্ডার ক্রস বাইক নামে বেশি পরিচিত তা সীমান্ত পেরিয়ে দেশে আসছে, আর কিভাবে প্রকাশ্যে বিজ্ঞাপন দিয়ে তারা বিক্রি করছে সে বিষয়ে অনুসন্ধান চালিয়েছে ঢাকা টাইমস।

অনুসন্ধানের প্রাপ্ত তথ্য বলছে চোরাকারবারিদের বেশিরভাগ সিন্ডিকেট সীমান্তঘেঁষা এলাকা থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইনে বর্ডার ক্রস বাইকের বিজ্ঞাপন দিয়ে আসছে। বিজ্ঞাপনে তাদের সাথে যোগাযোগের জন্য মোবাইল নম্বর দিয়ে থাকে। নানা প্রলোভনে যারাই এসব বাইক কিনছেন তাদের অবৈধভাবেই সড়কে মোটরবাইকগুলো নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। কারণ এসব বাইকের কোনো বৈধ অনুমোদন বা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ থেকে গাড়ির নিবন্ধন দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

এদিকে এই চক্রের সদস্যরা নিবন্ধিত বাইকের নামে নকল কাগজপত্র তৈরি করে চোরাই বাইক বিক্রি করে আসছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। সেই ক্ষেত্রে তারা অধিকাংশ বাইকের চেসিস নম্বর পরিবর্তন করে থাকে।

‘বাইক সেল বাজার কুমিল্লা’ নামের একটি ফেসবুক পেইজে মেহেদী হাসান নামের এক ফেসবুক ইউজার পোস্ট করেছেন জিক্সার এসএফ বর্ডার ক্রস একটি বাইক তিনি মাত্র ৯০ হাজার টাকায় বিক্রি করতে চান। বাইকটি তিনি নেত্রকোনার কলমাকান্দা এলাকে থেকে বিক্রি করবেন। সেখানে তিনি একটি মোবাইল নম্বর দিয়েছেন। মোবাইল নম্বরটিতে একাধিকবার কল করেও কাউকে পাওয়া যায়নি।

এসকে বাইক বিডি নামের আরেকটি ফেসবুক পেইজে বলা হয়, তারা সারাদেশে বর্ডার ক্রস মোটরবাইক হোম ডেলিভারি দিয়ে থাকেন। বাইক নিতে হলে তাদেরকে ৬ হাজার ৪০০ টাকা ডেলিভারি বুকিং ফি দিতে হবে। বর্ডার ক্রস বাইক তাদের কাছ থেকে ক্রয় করলে তারা বিআরটিএ থেকে রেজিস্ট্রেশন করে দিতে পারবে।

‘বাইক মার্ট’ নামের আরেকটি ফেসবুকে আতিকুর রহমান অভি নামের এক ফেসবুক ইউজার পোস্ট করেছেন, তিনি স্বল্পমূল্যে বর্ডার ক্রস ভারতীয় মোটরবাইক বিক্রি করেন। তার সাথে মোবাইল কলে নয় হোয়াটসআপে যোগাযোগ করতে কয়েকটি মোবাইল নম্বরও তিনি দিয়েছেন। তার সেই বিজ্ঞাপনে দেখা গেছে মাত্র ৭০ হাজার টাকায় তিনি ওয়ান ফাইভ মোটরবাইক বিক্রি করছেন যার বাজার মূল্য ৫ লাখ টাকা।

তাদের দেওয়া ০১৭৭৮০১৭৭৮৪ মোবাইল নম্বরের হোয়াটসআপে কথা হয় ঢাকা টাইমসের। জানিন নামের এক ব্যক্তি বলেন, তারা সারাদেশে বর্ডার ক্রস বাইক হোম ডেলিভারি দিয়ে থাকেন। বাইক নিতে হলে তাদের বিকাশ নম্বরে প্রথমে ৫ হাজার ৪শ টাকা অগ্রিম দিতে হবে। পরে তারা বাইক হোম ডেলিভারি দিবে। তাদের শোরুমের ঠিকানা জানতে চাইলে সিলেটের একটি ঠিকানা দেন। খোঁজখবর করে জানা যায়, সেই ঠিকানাটি ভুয়া।

ফেসবুকে বেশকিছু প্রতারক চক্র এভাবেই চটকদার বিজ্ঞাপনের ফাঁদে ফেলে মোটরবাইকপ্রেমীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে নগদ অর্থ। তবে মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানেও এদের কেউ কেউ গ্রেপ্তার হচ্ছে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সীমান্ত এলাকা থেকে ৯৪টি মোটরবাইক জব্দ করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এসময় চোরাই মোটরবাইকের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) উপপরিচালক (প্রশাসন) রিপন কুমার সাহা ঢাকা টাইমসকে বলেন, অনিবন্ধিত মোটরবাইকের বিষয়ে বিআরটিএ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে থাকে। বিআরটিএতে এনফোর্সমেন্ট নামের একটি শাখা রয়েছে। সেখানকার ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে অভিযান পরিচালিত হয়। প্রতিনিয়তই এই অভিযানে অসংখ্য অবৈধ মোটরবাইক জব্দ করা হচ্ছে। জড়িতদের জরিমানাও করা হচ্ছে।

বর্ডার ক্রস অবৈধ মোটরবাইকগুলোর কোনো প্রকার নিবন্ধনের সুযোগ আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্ডার ক্রস বাইকের নিবন্ধনের সুযোগ নেই।

চোরাই পথে আসা মোটরবাইকগুলো অবৈধ। অবৈধ বাইকের নিবন্ধন দেওয়ার কোনো প্রকার সুযোগ নেই। শুধুমাত্র বৈধ পথে আসা মোটরবাইকেরই নিবন্ধন দেওয়া হয়।

র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) এর লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার আরাফাত ইসলাম ঢাকা টাইমসকে বলেন, চোরাকারবারিদের বিষয়ে র‍্যাব নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে আসছে। কেউ যদি প্রতারিত হয়ে থাকেন তাহলে তিনি অভিযোগ করলে আমরা সাথে সাথে ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। মোটরবাইক চোরাকারবারিদের ধরতে র‍্যাব অভিযান অব্যাহত রেখেছে বলেও জানান তিনি।

(ঢাকাটাইমস/১২মে/এইচএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :