কুড়িগ্রামে স্কুলে না গিয়েও সুবিধা নিচ্ছেন শিক্ষকরা

মমিনুল ইসলাম বাবু, কুড়িগ্রাম
 | প্রকাশিত : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৮:৪২

কুড়িগ্রামে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বছরের পর বছর ধরে শিক্ষকরা অনুপস্থিত। অথচ সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। তাদের ওপর প্রভাবশালীদের ছত্রছায়া থাকায় প্রশাসনও নীরব ভূমিকা পালন করছে। এতে চরাঞ্চলসহ জেলায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে মারাত্মকভাবে। জেলার বিভিন্ন স্কুলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে একই দৃশ্য।

৩০ জানুয়ারি জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার কেদার ইউনিয়নের ঢলুয়াবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, পাঁচজন শিক্ষকের পরিবর্তে উপস্থিত আছেন তিনজন। প্রায় ২৫০ জন শিক্ষার্থীর পাঠদান করাচ্ছেন তারাই। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছুটিতে থাকলেও অপর সহকারী শিক্ষক সানজিদা শারমিন ২০১৬ সালের ২ এপ্রিল যোগদানের পর থেকে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত রয়েছেন। তার স্বামী পেশায় কাস্টমস ইন্সপেক্টর আর শ্বশুর উপজেলা শিক্ষক নেতা হাফিজুর রহমান বাবু।

একই উপজেলার কচাকাটা ইউনিয়নের টেপারকুটি মোল্লাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঁচজন শিক্ষকের মধ্যে উপস্থিত মাত্র দুজন সহকারী শিক্ষক। এই দুজনই ১৫০ জন শিক্ষার্থীর পাঠদান করাচ্ছেন। উপস্থিত নেই প্রধান শিক্ষকও। এখানে সহকারী শিক্ষক শিরিন আক্তার ২০১৫ সালে যোগদানের পর বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত। তার বাবা আব্বাস আলী একজন অবসরপ্রাপ্ত সাব রেজিস্ট্রার। তার বাড়ি ভুরুঙ্গামারী শহরেই। ভুরুঙ্গামারী উপজেলার পাথরডুবি ইউনিয়নের দক্ষিণ পাথরডুবি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খন্দকার শামীমা সুলতানা স্বর্ণালী ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি যোগদান করেন। তিনি একই বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত। অভিযোগ রয়েছে তিনি এখন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত।

সদর উপজেলার ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের বাসুরভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেখা যায় প্রায় ২৫০ জন শিক্ষার্থীর পাঠদান করাচ্ছেন একজন ভাড়াটিয়া শিক্ষকসহ দুজন সহকারী শিক্ষক। এই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শিউলি বেগম তিনিও অনিয়মিত। তিনি মাঝে মধ্যে বিদ্যালয়ে এসে শিক্ষক হাজিরা খাতায় সই দেন। আর তার স্বাক্ষরিত তারিখবিহীন ছুটির দরখাস্ত তৈরি থাকে। কেউ বিদ্যালয়ে পরিদর্শনে গেলেই দরখাস্তে তারিখ বসিয়ে ছুটি দেখানো হয়। ঘটনার সত্যতা মেলে ২৯ জানুয়ারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক হাজিরা খাতায় প্রধান শিক্ষক গোলাপ উদ্দিন এবং সহকারী শিক্ষক শিউলি বেগমের স্বাক্ষর নেই। শিউলি বেগমের স্বামী ঢাকায় কর্মরত একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর। তিনি নিয়মিত বিদ্যালয় না এসে ঢাকায় অবস্থান করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ওই দিন পাঁচগাছি আশরাফিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বেলা ১১টায় গিয়ে দেখা যায়, এই বিদ্যালয়ে আটজন শিক্ষকের মধ্যে মাত্র একজন শিক্ষক উপস্থিত হয়েছেন। অথচ বিদ্যালয়ের প্রায় ২৫০ জন শিক্ষার্থী থাকলেও শিক্ষকরা নিয়মিত নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়ভাবে এসব শিক্ষক এবং তাদের স্বজনরা প্রভাবশালী হওয়ায় অন্য সহকারী শিক্ষকরা প্রতিবাদ করার সাহস পান না। ফলে প্রভাব বিস্তার করেই শিক্ষা বিভাগ এবং প্রশাসনের নাকের ডগায় বসেই অনিয়মিত থেকেও সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। এতে করে শিক্ষকদের এমন অনিয়মের কারণে জেলার প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীরা সঠিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

বাসুরভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কনা ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘শিউলি আপার ব্যাপারে প্রধান শিক্ষকই ভালো বলতে পারবেন।’ এই বিদ্যালয়ের ভাড়াটিয়া শিক্ষক একরামুল হক স্বীকার করেন, তিনি বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকট থাকায় বেতন ছাড়াই এক প্রকার স্বেচ্ছাশ্রমে পাঠদানে সহযোগিতা করছেন।

ফোনে সহকারী শিক্ষক শিউলি বেগম জানান, প্রধান শিক্ষককে বলেই তিনি উপজেলা শিক্ষা অফিসে এসেছেন। হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর না করে তিনি উপজেলায় কী করছেন এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি ফোনটি কেটে দেন।

ঢলুয়াবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আমিনুল ইসলাম ও ফেরদৌসী জানান, সানজিদা শারমিন দীর্ঘদিন থেকে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত রয়েছেন। কিন্তু বেতনভাতাদি তুলছেন কি না আমরা জানি না।

টেপারকুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক জহুরুল ও লাইলী বলেন, ‘শিরিন আপা বহুদিন থেকে বিদ্যালয়ে আসেন না। বিষয়টি প্রধান শিক্ষক কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন।’

কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবের সভাপতি আহসান হাবীব নীলু ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘সরকারের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলের বা স্থানীয় প্রভাবশালীদের কঠোরভাবে দমনে আইনের শাসন সবার জন্য সমানভাবে নিশ্চিত করতে হবে। জেলা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে কঠোর নজরদারির আওতায় আনার ওপর তাগিদ দেন।’

নাগেশ্বরী উপজেলা শিক্ষা অফিসার মোসলেম উদ্দিন শাহ্ ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘বিষয়টি আমি জানার পর প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে রিপোর্ট নিয়ে অ্যাকশন নিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে কপি দিয়েছি। আমি এই পর্যন্ত বলতে পারি।’

জেলা শিক্ষা অফিসার স্বপন কুমার রায় চৌধুরী ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘এসব ব্যাপারে তদন্ত করে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) হাফিজুর রহমান ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘মানসম্মত শিক্ষা বাস্তবায়নে সরকার কঠোর অবস্থানে। কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড়া দেবার সুযোগ নেই।’ শিক্ষক অনুপস্থিতির তথ্য এবং তালিকা পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত