আমার বেঁচে থাকা মৃত্যুর চেয়ে কষ্টকর: শেখ হাসিনা

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০১৯, ২০:২৪ | প্রকাশিত : ১৬ আগস্ট ২০১৯, ১৭:৫১

বাবা, মা, ভাইদের হত্যার কথা বলতে গিয়ে আপ্লুত শেখ হাসিনা বলেছেন, তার বেঁচে থাকা মৃত্যুর চেয়ে কষ্টকর।

শুক্রবার রাজধানীতে জাতীয় শোক দিবসের আলোচনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবারকে হত্যার কথা বলতে গিয়ে বরাবরের মতো আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন জাতির জনকের কন্যা।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে হামলা করে শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা ছাড়া জাতির জনকের গোটা পরিবারকে খুন করে সেনাবাহিনীর একটি দল। বাঁচতে পারেনি নয় বছর বয়সী শিশু শেখ রাসেলও। দুই বোন বেঁচে যান বিদেশে থাকায়।

এই ঘটনার দুই সপ্তাহ আগে বিদেশে যান শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। সেই কথা বলতে গিয়ে আবেগে গলা ধরে আসে বঙ্গবন্ধু কন্যার। বলেন, ‘১৫ দিন আগে আমরা দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম। আমি গিয়েছিলাম দুটি বাক্স নিয়ে, বাচ্চা নিয়ে, বাচ্চাদের সাথে নিয়ে রেহানাকে সাথে নিয়ে স্বামীর কর্মস্থলে। আমরা বেঁচে গিয়েছিলাম। সে বাঁচা বাঁচা না। সেই বাচ্চাটা যন্ত্রণাটা মৃত্যুর থেকেও অনেক বেশি।’

স্বজন হারিয়েও দেশবাসীর ভালোবাসাকে সম্বল করেই বেঁচে থাকার প্রেরণা পাওয়ার কথাও জানান বঙ্গবন্ধু কন্যা। বলেন, ‘মা, বাবা হারিয়ে নিঃস্ব-রিক্ত হয়েছিলাম। ... কিন্তু পেয়েছিলাম লাখো মানুষ। তাদেরকে আপন করে নিয়েছি। আর আমাদের অগুণতি নেতাকর্মী... তারাই আমাকে আপন করে নিয়েছে। সেখানেই পেয়েছি বাবা-মা-ভাই-বোন ভালোবাসা। এখানেই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি, সবচেয়ে বড় পাওয়া, সেখানে সেটাই আমার বড় প্রেরণা।’

এই হত্যায় জড়িতরা সবাই চেনাজানা ছিলেন বলেও আক্ষেপ করেন বঙ্গবন্ধু কন্যা। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সে সময়ের উপসেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘মাসে একবার করে আমাদের বাড়িতে আসত। কখনও একা, কখনও খালেদা জিয়াকে নিয়ে।... ঘন ঘন তা যাতায়াত ছিল ডালিম, ডালিমের বউ, শাশুড়ি দিনরাত আমাদের বাসায় আসত, ঘোরাঘুরি করত।’

বিবিসিতে আত্মস্বীকৃত খুনি ফারুক ও রশীদের সাক্ষাৎকারের কথা তুলে ধরে এই হত্যার পেছনে জিয়াউর রহমানের সংশ্লিষ্টতার কথা তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।

গোটা পরিবারকে হারানো শেখ হাসিনা ছয় বছর দেশে আসতে পারেননি। বেলজিয়াম থেকে পশ্চিম জার্মানি হয়ে ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় পান তিনি। ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগ তাকে সভাপতি নির্বাচিত করার পর জিয়াউর রহমানের সরকার দেশে আসার অনুমতি দেয়।

সে কথা তুলে ধরে বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, ‘ছয় বছর দেশে আসতে পারিনি। অন্য দেশে আশ্রয় নিয়ে থাকতে হয়েছিল।’

শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু পরিবার ছাড়াও তার চাচা, ফুপুর বাড়িতে আক্রমণ এবং নির্মম হত্যাযজ্ঞের কথা তুলে ধরেন। বলেন, এটা নিছক কোনো হত্যাযজ্ঞ ছিল না। এটা ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর আঘাত।

“ধীরে ধীরে এটা পরিষ্কার হয়েছিল যে হত্যাকাণ্ড ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের প্রতিশোধ নেওয়া। ...স্বাধীনতা বিরোধীদের আবার ক্ষমতায় পুনর্বাসিত করা, পাকিস্তানি ভাবধারা নিয়ে আসা। যে কারণে খুনিরা এই হত্যার পরপরই প্রথম ঘোষণা দিয়েছিল ‘ইসলামিক রিপাবলিক অফ বাংলাদেশ’ যেটা পরবর্তীতে আপনার রাখতে সাহস পায়নি।”

প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতা উত্তর নানা ঘটনাপ্রবাহের কথা তুলে ধরে বলেন, ষড়যন্ত্রকারীরা সক্রিয় ছিল শুরু থেকে। বলেন, ‘তখনও পাটের গুদামে আগুন, থানা লুট করা, আওয়ামী লীগ নির্বাচিত সংসদ সদস্যকে হত্যা করা... স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার, আলবদর বাহিনী অনেক এগিয়ে ছিল। অনেকেই আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গিয়েছিল। আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে গিয়েছিল। একের পর এক ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে শুরু করেছিল।’

‘আমাদের অনেক রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তখন বুঝতেই পারেনি যে, তারা এত সহজেই ছাড়বে না। ...এই উপলব্ধিটা তখনকার দিনে অনেকের মধ্যেও আসেনি। তাই তারা এটা হয় না ওইটা হলো না কেন... নানা ধরনের প্রশ্ন, কথা লেখালেখি; অনেক কিছু শুরু করেছিলেন। ...অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু একটা দেশ গড়ে তোলা যে অন্তত কঠিন কাজ, এটা যে একদিনে গড়ে  ওঠে না, এই উপলব্ধিটা যদি সকলের মাঝে থাকতো তাহলে হয়তো ১৫ আগস্ট এর মত এত বড় একটা আঘাত এদেশের উপর আসতো না।’

‘অনেক জ্ঞানী-গুণী এখানে আছেন। ৭৫ সাল পর্যন্ত অনেক লেখালেখি আছে। কেউ একবার যদি চোখ বুলান, দেখবেন কত ভুল পথে পথে নিয়েছিলেন।’

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দেশ ‘অন্ধকার যুগে’ চলে গেলেও সেখান থেকে উত্তরণের সংগ্রামের কথাও তুলে ধরেন জাতির জনকের কন্যা। বলেন, ‘পৃথিবীর যে কয়টা উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে, বাংলাদেশ তার একটি। আমরা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছি, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়েছে, দারিদ্র্যের হার কমিয়েছি। আজকে আমাদের খাদ্যের অভাব নেই।মানুষ দুই বেলা খেতে পারছে। দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি।’

‘আমাদের রপ্তানি বেড়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে। ... মাত্র ১০ বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে আমরা বাংলাদেশটাকে একটা সম্মানজনক অবস্থানে নিয়ে এসেছি। ... পাকিস্তান আজকে আমাদের অনেক পিছনে পড়ে আছে।’

‘পাকিস্তানকে আমরা পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে পেরেছি,...আমরা যদি স্বাধীন না হতাম, এটা আমরা করতে পারতাম না।’

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের দেশ গড়ে তাকে শ্রদ্ধা জানানোর কথাও বলেন তার কন্যা। বলেন, ‘তিনি (বঙ্গবন্ধু) আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তার আদর্শ আমাদের মাঝে আছে। সেই আদর্শ নিয়ে রাজনীতি করলেই দেশের মানুষের আস্থা বিশ্বাস সম্মান পাব এবং দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব।’

‘আমি শুধু এটুকুই বলতে চাই, আজকের দিনে ব্যথা বুকে নিয়ে এদেশের মানুষের জন্য কাজ করেছি। শুধু আমার বাবার কথা চিন্তা করে যে, তিনি কীভাবে কষ্ট স্বীকার করেছেন, কীভাবে জীবনে সবকিছু বিসর্জন দিয়েছেন এ  দেশের জন্য।’

‘তিনি বলেছিলেন, প্রয়োজনে রক্ত দেব, তিনি দিয়ে গিয়েছেন। তার রক্ত তিনি দিয়ে গেছেন, আমাদের তা শোধ করতে হবে তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের মাধ্যমে।’

‘সোনার বাংলাদেশ গড়ে তোলার মাধ্যমে বাংলাদেশকে আমরা গড়ে তুলব। আজকের দিনে এই প্রতিজ্ঞা করি, তোমাকে কথা দিলাম, তোমার সোনার বাংলা গড়ে তুলব। এটাই আমাদের অঙ্গীকার।’

আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, মতিয়া চৌধুরী, আবদুল মতিন খসরু, জাহাঙ্গীর কবির নানক, বাহাউদ্দিন নাছিম প্রমুখ এ সময় বক্তব্য রাখেন। আলোচনা সভা পরিচালনা করেন দলের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হাছান মাহদুম।

ঢাকাটাইমস/১৬আগস্ট/এনআই/ডব্লিউবি

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :